MOBILE VERSION

popular-recent

Recent Posts
     
 
TranslationTranslation PoetryPoetry ProseProse CinemaCinema
Serialধারাবাহিক
Weekly
Weekly
Visual-art
Art
ReviewReview
Web IssueWeb Issue InterviewInterview Little-MagazineLil Mag DiaryDiary
 
     

recent post

txt-bg




top

top












txt

Pain

আড্ডা, সাবেকী ভাষায় Interview
আমার জীবন থেকে উঠে আসা সুর
এখনো অ্যানাউন্সমেন্ট হয় নাই, আসবে কি না জানা নাই
ব্যথার পূজা হয়নি সমাপন

MOBILE : হারাতে হারাতে একা : বারীন ঘোষাল পর্ব ১ - ২১



|পর্ব ১






কেবলই মনে হয় আমি সেই ছেলেটি নই, যে, শুনেছি, জন্মেছিল আগরতলায়, সেই কবে, চৌঠা ডিসেম্বর, ১৯৪৪ সালে| বাইরে প্রচন্ড ঠান্ডা, তাই ওম ছেড়ে নামতে চাইনি বলে কান ধরে বার করা হয়েছিল। মা আমাকে কোলে করে মাত্র তিন মাস বয়সে বিক্রমপুর-বজ্রযোগিনী-নাহাপাড়ার ঘোষাল গোডাউনে প্রথমে, তারপর জামশেদপুরে কখন কিভাবে পাচার হলাম জানি না। দেশের বাড়ি দেখিনি, ইংরেজের শাসন দেখিনি, দেখেছি শুধু স্বাধীনতাহীনতায় বাঁচতে চাওয়া মানুষের ঢল। এ-মা, ও-বাবা, এসব তো শেখানো বুলি। পরে বইয়ে পড়া ধর্ম আর কুসংস্কার। খুব ইচ্ছে করে দেশের বাড়িটা স্বচক্ষে দেখে আসি। একজন, জালালুদ্দিন, ফেসবুকে আলাপ, বলল, আসুন না, আমার বাড়ি ওই কাছেই, আপনাকে নিয়ে যাব। তবুও হয়ে ওঠে না। নিয়তি একেই বলে কি ? তো, একদিন টের পেলাম -- স্বপন -- বলে কেউ ডাকলে সাড়া দিচ্ছি, একদিন -- বারীন -- বললে। কী করে যে মানুষের নাম ঢুকে যায় আত্মপরিচয়ে ! এইসব আমারই জীবনে ঘটেছিল কিনা আমি নিশ্চিত নই। কেবলই মনে হয় আমি এক হারিয়ে যাওয়া কুড়িয়ে পাওয়া ছেলে। বারে বারে সবাই আমাকে চিনে ফেলছে আর আমি অবাক হয়ে তাদের নতুন করে দেখছি। বারে বারে দেখি কেউ আমাকে চেনে না অথচ আমি তাদের চিনি। কম বয়সে ব্যাপারটা বুঝতাম না। আজও যে বুঝি তেমনও নয়।


মনে পড়েছে। বয়েস চারে মাসীমার বাড়ি গেছি সীতারামপুর। একদিন মেশোমশাই অফিসে বেরোচ্ছে, আমি খানিকটা দূরে পিছু নিয়েছি, লোকটা কোথায় যায় দেখতে। পারি নাকি ? মশাই হারিয়ে গেল, আর আমি দেখি স্টেশনে ঢুকে পড়েছি| আজকালকার বাচ্চারা জন্মের পরই রেলগাড়ি চেনে। তখন কোথায় কি ? একা বিস্ময়ে অবাক হয়ে দেখতে থাকলাম প্লাটফর্ম, মানুষের যাতায়াত, বুকের সামনে ঝোলানো দোকান। সবচেয়ে ভাল লাগে ট্রেন। দাঁড়ায়। লোকেরা নামে ওঠে। চলে যায়। আমাকে ভুতে টানলো। পরের ট্রেনেই উঠে জানলার ধারে লম্বা বেঞ্চে বসে পড়লাম। ভেতরে অনেক মানুষ। আমার বয়সীও দু-একটা। আমার বাইরে মন। মাঠ, নালা, গাছ, মানুষ, ঘর, সব স্যাট স্যাট করে পেরিয়ে যাচ্ছে। কী মজা ! চোখ ফেরাতে পারছি না। চোখে কয়লার গুঁড়ো পড়তে মুখ ফিরিয়ে চোখ কচলাচ্ছি, কেউ আমার সামনে দাঁড়িয়ে বলল -- 'আরে, স্বপন না !' আমি অবাক। লোকটাকে কোনদিন দেখিনি। -- 'কই যাও ? লগে কেডা ? সুধা ?' তিনি চোখ ঘুরিয়ে খুঁজছেন। একনাগাড়ে এতগুলো কথায় বিরক্ত আমি বাইরের দিকে মুখ ঘোরালাম। কয়লার ইঞ্জিন কয়লাপাড়া দিয়ে চলেছে। জায়গাটাকে রাণীগঞ্জ বলে, পরে জেনেছি। এরপর সে আমার হাত ধরে টানলো। আপত্তিতে ছটফট করছিলাম। নাটক দেখে কামরার লোকরা বলল -- 'মশাই কি ছেলেধরা ?' তারপর লোকটা আমাকে পরের স্টেশনে নামিয়ে ফেরত ট্রেনে সীতারামপুরে মাসীর বাড়ি পৌঁছে দিল। লোকটাকে শত্রু মনে হল। আমার হারিয়ে যাওয়া থেমে গেল নাকি আমার চামড়া পরিয়ে অন্য কাউকে স্বপন বলে চালিয়ে গেল ? চিনে উঠতে কষ্ট হয়। আজ বুঝি আমি ওদের কারো মতো নই কেন। আমার হারা-ফেরার গল্প শুনে মা হেসে বাঁচে না। বহুকাল পরে একদিন আসানসোলের বাইরে কবি সম্পাদক মনোজ মাজীর ধাবায় মদ খেতে খেতে গল্পটা বলছিলাম। মনোজ বলল --'তাই নাকি ! আমার বাড়ি সীতারামপুরে। এই তো এদিকে একটা স্টেশন। ও, আপনিই সেই, যার গল্প মায়েরা শোনায় ছেলেবেলায় ঘুম পাড়াবার সময় ?' আমার ইচ্ছা হচ্ছিল আর একবার সীতারামপুর যাবার। মনোজ আমাকে হতাশ করল। আমার গল্প শুনেছে গুল দিলো। মদ খেতে বসেও খেজুরে কথা কখনো কখনো ভাল লাগে না।


সেই বছরই, মায়ের সঙ্গে আগরতলা, মামাবাড়ি যাচ্ছি, জন্মস্থানে আবার। পূর্ব পাকিস্তানের মধ্য দিয়ে, ট্রেনে। সঙ্গে একজন চলনদার যাকে দাদু বলতে বলা হয়েছিল। ট্রেন গোয়ালন্দে পৌঁছে দিলো আমাদের। মাইলটাক বালিয়াড়ি পেরিয়ে পদ্মার পাড়। হেঁটে এগোচ্ছি। পথের দুপাশে পান সিগারেট মণিহারি মিস্টির দোকান, ভাতের হোটেল -- যেমন হয় আর কি জেটির পথে। এগোচ্ছি আর ভিড় বাড়ছে আর গতি কমে যাচ্ছে। ক্রমশ আমার চারপাশে লোক আর আমি কিছু দেখতে পাচ্ছি না। বেঁটে তো। দাদু হাত ধরে টেনে নিয়ে চলেছে। জেটি ছাড়িয়ে স্টিমারে চড়ছি, সিড়ি দিয়ে উঠছি, মা চোখের আড়ালে, হঠাৎ হাত খুলে গেল। সিড়িতে তখন মানুষের ঢল। হাত খুলে যেতে ধাক্কা খেয়ে সিড়ির নিচে ডেকে এসে পড়লাম। ঠেলা খেয়ে জেটি ব্রিজ দিয়ে একেবারে বাইরে। চাপ কমে এলে পেছন ফিরে স্টিমার দেখতে পেলাম। না দাদু, না মাকে। কেঁদে ফেললাম এই অনিচ্ছায় হারানোতে। তখন আর ভিড় ঠেলে স্টিমারের অচেনায় ফিরে যাবার হিম্মত নেই। আমি 'দাদু,দাদু' বলে কাঁদতে কাঁদতে পেছন পায়ে। হাপুস নয়নে যাচ্ছি, এক সৌম্য চেহারা, সাদা দাড়ি, বুড়ো মানুষ একটা হোটেলের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল, বলল -- 'কান্দো ক্যান দাদু ?' তিনকা আঁকড়ে ধরার মতো আমি বললাম --'দাদু হারিয়ে গেছে।' আশ্চর্য, না ? কোথায় আমি হারিয়েছি আর বললাম দাদু হারিয়েছে। বুড়ো বলল -- 'কই ম্যালা দিসিলা ?' আমি স্টিমারর দিকে আঙুল তুলে দেখালাম। বুড়ো বলল -- 'এইহানে বহ আইয়া। জিলাপি খাও। দাদু আইব হন'। চোখে জল, মুখে মিস্টি, চোখ স্টিমারের দিকে, বসে খাচ্ছি আর কাঁপছি। বুড়ো পাশে দাঁড়িয়ে মাথায় হাত বোলাচ্ছে। ক্রমে দাদু ফুটে উঠল। আমি লাফিয়ে উঠে কাছে গিয়ে জড়িয়ে ধরলাম। বুড়ো বলল --'আইসসা আক্কল আপনের, এট্টুন পোলারে সামলাইতে পারেন না, লগে লন ক্যান'? দাদু তাকে ধন্যবাদ দিয়ে ফিরিয়ে নিয়ে চলল আমাকে। ততক্ষণে তৃতীয় ভোঁ বাজছে।


আজ মনে হয় গোয়ালন্দের স্টিমার ঘাটের সেই বৃদ্ধ মুসলমান ভদ্রলোক একজন ফরিস্তার মতো উদয় হয়েছিলেন আমার জীবনে। কখনো মনে হয়, আমার মুস্কো লিঙ্গ দেখে, সুন্নত হয়ে গেছে। নিশ্চয়ই আমি বদলে গেছি। যাই হোক, স্টিমারে ফিরতে মা আমাকে জড়িয়ে ধরে আপার ডেকে কান্না থামাল। আসলে আমিই বদলে যেতে চাই। এই জীবন যে কেন ভাল লাগে না, তা বোঝার বয়স ছিল না তখন। জীবন যে কি, তাই কি জানতাম ? আমি তখন রেলিং পেরিয়ে পদ্মার ঢেউয়ে। পদ্মার পরে মেঘনা একথা পরে শুনেছি। আমরা চাঁদপুরে যাচ্ছিলাম। তখন মুগ্ধ কিন্তু বর্ণনার ভাষাটা আমি পরে পেয়েছিলাম শরৎচন্দ্রের বর্মাযাত্রার গল্পে। আমি যে কোথাকার কে সে ব্যাপারে সন্দেহ আজো গেল না। একা তো। একাই তো। আছি- নেই, আমি-আমি না, এই দোলাচলে বেঁচে থাকার মজা যে পেল না !


ওই বছরই আমার কি যে হয়েছিল ! শেষে তো পদ্মা-মেঘনা-চাঁদপুর-আখাউড়া-আগরতলা-মামাবাড়িতে। এখনকার তুলনায় সে গ্রামগঞ্জ। সেবার হাবড়া নদীতে বন্যা। আগরতলা ভাসলো। ঘর থেকে পথে নামতে বাঁশের সাঁকোয় পেরোতে হয় নয়ানজুলি। মনে হয় শালা বাঞ্চোত। নয়ানজুলি নামটা কোন বাঞ্চোত রেখেছিল ? থৈ থৈ করছে। জলদি পেরোতে গিয়ে স্লিপ। পপাত। যাই আর কি ! বন্যার স্রোতে খোলামকুচি। মাইরি, পরে অভিধানের খোলামকুচিতে সেই ফিলিং জাগেনি। ভেসে খানিক দূরে দ'য়ে আবিষ্কার। এসব গল্পে শোনা। কেবল মনে হয় এরা স্তোক দিচ্ছে। একটা বাচ্চা কতবার হারাবে ? এরপর শুনুন না, আমার কি হল। --


পর্ব ২






রাতে আমার শোবার জায়গা ছিল মায়ের পাশে। একটি বোন হতে রাতে জায়গা হত পাশের ঘরে ঠাকুরদার বিছানায়। আরো একটি ভাই হতে বাইরে খাটিয়া পেতে আলাদা বিছানা। অন্ধকারে শুয়ে সাত পাঁচ ভাবতে ভালই লাগতো, কখন ঘুমিয়ে পড়তাম। বুঝতে পারিনি আমি একা হয়ে যাচ্ছি। মনের মধ্যে নিজের আলাদা পৃথিবী তৈরি হচ্ছে। একদিন এক ভীষণ অভিজ্ঞতা চিড় ধরিয়ে দিলো পাকাপাকিভাবে। আমিই টের পেলাম। আর কেউ পেলো না। হয়েছিল কি, রাতে গভীর ঘুম হঠাৎ ভেঙে গেল এক বিচিত্র হাড় কাঁপানো চিৎকারে। বাগানের বাইরেই রাস্তায় মনে হল একদল ভুত চলেছে বাদ্যি বাজিয়ে, ভুতুড়ে গান গাইতে গাইতে। আমার সাত বছরের জীবনে অত ভয় কখনো পাইনি। আমি ছিটকে উঠে গিয়ে ভেতর থেকে বন্ধ দরজায় কিল মারতে মারতে ‘মা-মা-মা’ ব’লে কাঁদতে থাকলাম। সারা শরীর কাঁপছিল। অনেকক্ষণ পরে দরজা খুলে মা-বাবা-ঠাকুরদা বেরিয়ে এল একে একে। বাবা বলল ‘কি হয়েছে, চেঁচাচ্ছিস কেন ?’ মা আমাকে জড়িয়ে ধরে পিঠে হাত বোলাচ্ছিল। আমি ফোঁপাতে ফোঁপাতে রাস্তার দিকে আঙুল তুলে বললাম – ‘ভুত’’।’ ততক্ষণে ভুতরা অনেকদূরে চলে গেছে। বাবা বলল – কোথায় কে ? মাকে বলল, ‘আমি বলেছি ওকে ভুতের বই পড়তে দিও না, তুমি শুনবেই না, এখন বোঝ। নে, স্বপ্ন দেখেছিস, শুয়ে পড় আবার’—বলে বাবা চলে গেল। দরজা আবার বন্ধ হয়ে যেতে আমার মনে হল – বাবা লোকটা কী পাষন্ড ! সারারাত ঘুম এল না আর। চোখ মুছে রাস্তার দিকে তাকিয়ে শুয়ে থাকলাম। কাঁপুনি থামতে সময় লাগল। সে রাতে আর ঘুম এল না। পরের রাতে খুব ইচ্ছে ছিল মা’র সাথে শোব। হল না। সেই বাইরে। সারারাত জেগে থাকলাম। আবার মাঝরাতে সেই ভুতের বাদ্যি, চেঁচিয়ে বহু কন্ঠের গান। আতঙ্কে উঠে বসলাম। রাস্তা দিয়ে বাজনা বাজিয়ে গান গাইতে গাইতে কয়েকজন লোক চলে যাচ্ছে। তাদের পরনে আলখাল্লা, জোব্বা। এদেরই ভুত ভেবেছিলাম। ভয় কমে গেল। পরের দিন স্কুলে গিয়ে বন্ধুদের সেই ভয়ানক গল্প শোনালাম। একটা ছেলে, নুরুল, বলল – ও তো মেসাহারাতি’র কাফেলা। ভয় পাস না। আমাদের জাগাতে আসে। নুরুল কি বলল বুঝলাম না, আমাদের জাগাতে আসে মানে কি, তবে ভয় চলে গেল।


সেই দিনগুলোতে আমরা, পড়শীরা এমনভাবে থাকতাম যে হিন্দু মুসলমানের ভেদাভেদ জানা ছিল না। স্কুলে বা বাড়িতে সেই শিক্ষা কেউ দিতো না। বড় হয়ে পরে জেনেছি, রোজার সময় ধার্মিক মুসলমানেরা রাতের খাবার খেয়ে সারাদিনের ক্লান্তিতে যাতে ঘুমিয়ে না থাকেন, সারাদিনের মনে ভোরের খাবার তৈরি করে খেয়ে নামাজ পড়ে দিন শুরু করতে পারেন, সে জন্য পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে গান গেয়ে তাদের সতর্ক করার পূণ্যকাজটি করে সেই কাফেলা। তাকেই বলে মেসাহারাতি। এই অভিজ্ঞতা আমার ছিল না। আমাকে সেই অভিজ্ঞতার দিকে ঠেলে দিয়ে বাবা আমার মনকে তৈয়ার হবার ট্রেনিং দিয়েছিল হয়তো, কিন্তু ঐ কম বয়সে আমি বুঝলাম যে একা হয়ে যাচ্ছি, দূরে সরিয়ে দেয়া হচ্ছে আমাকে। অভিমান হচ্ছিল। মুখ ঘুরে যাছিল আমার। আমাকে আদর করে বুঝিয়ে দেবার চেষ্টা করল না বাবা।


সন্তান মানুষ করার এসব পারিবারিক খুঁটিনাটি লক্ষ্য করার সময় ছিল না বাবার। গার্জেনি করার স্বভাব ছিল তার। পূর্ববঙ্গ থেকে বৃহৎ পরিবারের সবাইকে এদেশে টেনে এনে একে একে তাদের আখেরের ব্যবস্থা করতে গিয়ে নিজের উপার্জনের প্রায় সবটা খরচ করে ফেলার আত্মগর্বে অভিবাবকের চড়া সুর ছিল তার। পরিবারের সবাই মান্য করতো তাকে, তাই নিজের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত ছিল বাবা। নিজের সংসারের জন্য কিছুই প্রায় থাকতো না। পরে এসব ভেবেছি। তখন কোন চাহিদা ছিল না আমাদের ভাইবোনদের। আমাদের বাড়িতে ইলেকট্রিসিটি, জলের লাইন, গ্যাস, ফোন, রেডিও, কাজের লোক ইত্যাদি কিছুই ছিল না প্রথম দিকে। শুধু স্কুলের বইপত্র। এ টু জেড নিচুতলার সব কাজ মাকে করতে দেখতাম মুখ বুজে। ওপরতলা থেকে যত দূরে যাচ্ছি, নিচুতলার দিকে তত আকর্ষিত হচ্ছি। মা’র জন্য কষ্ট হতো। সিনেমা থিয়েটার ফ্যাশন তো ভাবাই যেত না।


দিনের সবচেয়ে ভাল সময় কাটতো স্কুলে, তারপর বাইরের খেলাধূলায়। মা আমাকে পড়াশুনো শিখিয়েছে। বই পড়ার অভ্যাসের জন্য আমি মায়ের কাছে ঋণী। সময় পেলেই মায়ের সাথে ভিড়ে তার সমস্ত কাজে হাত লাগাতাম। মা আপত্তি করতো না। আমাকে দেখিয়ে দিত যাতে কোন বিপত্তি না ঘটে। ধীরে ধীরে আমি ঘরের সমস্ত কাজ শিখে ফেললাম। এজন্যও আমি মায়ের কাছে ঋণী। একদিন যখন রিয়ালি আমি এই দুনিয়ায় একা হয়ে গেলাম, একাই জীবন যাপন করতে পেরেছিলাম। বাবাকে ভয় পেতাম। সামান্য ত্রুটির জন্য মার খেতাম বলে কাছে ঘেঁষতাম না। বাবার গার্জেনি অসহ্য লাগতো আমার। ফলে কোনদিন কারও গার্জেনি বরদাস্ত করতে পারিনি। বাবার, টিচারের, কর্মক্ষেত্রে অফিসারের, সিনিয়র কবির, মিডিয়ার, ধর্মগুরুর, এমনকি আমার ছেলের – কারও না, কারও না। আমার মা নিজে পড়াশুনোয় অসম্ভব ভাল ছিল, কিন্তু পারিবারিক কারণে কলেজে যাবার আগেই বিয়ে হয়ে যায়। আফশোষ ছিল তার। আমাকে পড়াতে ভালবাসতো। সংসারের কাজের পর লাইব্রেরি থেকে আনা বই পড়তো মা। কম বয়সেই সে সব বই পড়ে ফেলতাম আমিও। বুঝে উঠতে সময় লেগেছিল। আমাদের বাড়িতে বইয়ের প্রচুর স্টক ছিল ঠাকুর্দার। পুরনো প্রবাসী, ভারতবর্ষ, শনিবারের চিঠি বাঁধিয়ে রাখা ছিল। আমার বারো তেরো বয়সে সে সব শেষ। ছিল দাস ক্যাপিটাল-এর বাংলা অনুবাদ। এখন হাসি পায় ভাবলে, তাও পড়া শেষ। বাবার চোখের সামনে নয়। সারাদিন খেলাধূলা করতে দেখে বাবা বলতো – আধ ঘন্টাও পড়ে না স্বপন, পাশ করে কি করে ? ঠাকুরদার ট্রেনিং মনে পড়ল। বাবার চোখের সামনে ঘড়ি ধরে আধঘন্টা পড়ে পড়ার বই তুলে রাখতাম। কি বলবে, বল এবার।


প্রাইমারি আর সেকেন্ডারিতে বিবেকানন্দ সোসাইটির স্কুলে পড়তাম। কেন জানি না, বিবেকানন্দের দর্শন আর যোগ-এর বইগুলো পাঠ্যতালিকায় না থাকলেও স্কুলের লাইব্রেরিতে ছিল। রাজযোগ, জ্ঞানযোগ, কর্মযোগ, ভক্তিযগ, সে সব পড়ে ফেললাম। ছোটবেলা থেকে সবাই ভাবতে থাকে বড় হয়ে সে আইসক্রিমওয়ালা হবে, ড্রাইভার হবে, বাস কন্ডাক্টর হবে, পাইলট হবে, ভিখারী হবে, ইত্যাদি। সবার একজন হিরো থাকে আর তা ফেসবুকের প্রোফাইলের মতো পালটাতে থাকে। কেউ ভাবে অতুল স্যারের মতো হবে, রবীন্দ্রনাথের মতো, নেতাজীর মতো, পাড়ার বুড়োদার মতো, হীরা-মাস্তানের মতো হবে। আমিও পালটাতে পালটাতে বিবেকানন্দকে আমার হিরো ঠাউরালাম। তাঁর অনুকরণে একদিন একটা বাটিতে খানিকটা জল নিয়ে মাকে বললাম –- মা, তোমার ডান পায়ের বুড়ো আঙুলটা জলে ডোবাও তো। মা তো হাঁ ! – কী বলছিস স্বপন ! আমি মা’র ডান পাটা তুলে বুড়ো আঙুলটার তলায় জলের বাটিটা ধরে তারপর জলটা খেয়ে নিলাম। মা কেঁদে ফেলে আর কি। আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরলো। সেই থেকে রোজ সকালে আমি ওই পাদোদক খেতাম যতদিন না হিরো পালটাল। রাতে ছোলা ভিজিয়ে রাখতাম জলে। সকালে উঠে ওই পাদোদকের পরে ছোলা ভেজানো জলটা খেতাম। ব্যায়াম করতাম। ক্রমশ ক্লাবের জিমে। বডি বিল্ডিং শো করতাম জামশেদপুরে। সমস্তই বিবেকানন্দের ঝোঁকে। আমি আঙুল ডোবাতে বললে মা আগে বাথরুমে ধুয়ে নিতো পা।


আমার যখন বয়েস চার পেরিয়েছে, ঠাকুর্দা তখন আমাকে ঘড়ি দেখা শেখালেন। বড় কাঁটা, ছোট কাঁটা, দম দেয়া, সময়, কখন চারটে বাজে, কখন আটটা। বলতেন – স্বপন, সাড়ে পাঁচটায় বড় কাঁটা কোথায় থাকবে বল তো। এসবই তার নিজের স্বার্থে। ঠাকুর্দা গড়গড়ায় তামাক খেতেন। আমাকে শেখালেন কি করে পরিষ্কার করতে হয়, কি করে গড়গড়া সাজাতে হয়, টিকেতে আগুন দিয়ে তামাকের ওপরে চেপে ফুঁ দিতে হয় চোখ বাঁচিয়ে, অম্বুরি তামাক কি করে গন্ধে চিনতে হয়, কোন দোকান থেকে কিনতে হয় সেসব, ইত্যাদি। আমি সময়মতো তৈরি করে দিতাম গড়গড়া। ঠাকুর্দার কাছে আমাদের বংশের গল্প, দেশের বাড়ির গল্প, পুরনো ইতিহাস শুনতাম। সেগুলো ছিল জমিদার মার্কা গল্প। ঠাকুর্দার সঙ্গে টাইম পাস করলে বাবা রাগতো না, বোধহয় তার বাবা বলে। তলে তলে সময় সচেতন হয়ে উঠলাম আমি। বাবার ছিল শিফট ডিউটি, আটঘন্টা রোজ, ছুটির দিন বাদে। অতএব দশঘন্টা বাড়ির বাইরে প্লাস আট ঘন্টা ঘুম মিলিয়ে আমার ফুর্তি করার জন্য পেতাম আঠারো ঘন্টা। এর মধ্যে স্কুল আর মায়ের সাথে কাজ করা, ঠাকুর্দার সাথে গুলতানি মারা ছাড়াও অঢেল সময় থাকতো বাইরে বাইরে খেলেধুলে বয়ে যাবার। ঠাকুর্দাকে ধন্যবাদ, ছোটবেলা থেকেই আমাকে সময়-সচেতন করার জন্য। পরবর্তী সময়ের জীবনে খুব কাজে লেগেছিল তা। অতিরিক্ত আস্থা অনেক সময় বিপদেও ফেলতে পারে, সেই শিক্ষাও হল একদিন। কি হয়েছিল বলি।


পর্ব ৩






মা’র জন্য আনা বইগুলোর মধ্যে অনুবাদ করা ‘প্রদীপ ও পতঙ্গ’ পড়লাম। ‘লেডি চ্যাটার্লির প্রেমিক’ পড়ছি, বাবার চোখে গেল। ব্যাস, বন্ধ হয়ে গেল নাকি অন্য কোন গোপন ব্যবস্থা হল, আমার হাতে আর এল না। তখন বাড়ির স্টক বই পত্রিকাই ভরসা। ভারতবর্ষ, প্রবাসী, শনিবারের চিঠি থেকে পড়লাম --- রমলার প্রেম, বিপিনের সংসার, তিলোত্তমা, ডানা, দুই পুরুষ, শীতে উপেক্ষিতা, মহাস্থবির জাতক ইত্যাদি। প্রেম টেম নয়, এই শেষের বইটাই আমার মাথা ঘুরিয়ে দিলো। স্থির, স্থবির আর অস্থিরের মধ্যে অস্থির আমার মন কাড়লো। ওদের বাবা যেন আমারই বাবা। আমি মনে মনে বাউন্ডুলে হয়ে যাচ্ছি তখন। কেবল বাইরে বাইরে মন আর পা।


জামশেদপুরে আমাদের বাড়ির উত্তরে একমাইল দূরে সুবর্ণরেখা নদী। কখনো একা কখনো বন্ধুদের সাথে গিয়ে পাথরের ওপর বসে নদীর দিকে তাকিয়ে থাকতাম, জলের দিকে, শব্দের দিকে। ভাল লাগতো। নদীর দাগ যখন মাথার ভেতরে তখন একদিন চোখে পড়ল তার ওপরে মানুষের আনাগোনা, অনেকে পায়ে হেঁটে পারাপার করছে। পথ আছে নিশ্চয়ই। আমরাও সেই পথে। ওপারে গ্রাম আছে একটা। মানুষজন, ফলের বাগান, বিশেষ করে কুলের বাগান বেশি টানলো। কাঁটা বাঁচিয়ে টপাটপ ছেঁড়ো আর খাও। বাড়ি নিয়ে যাবার ভরসা হল না। একমাইল পুবে ছিল টাটা কোম্পানির ডেয়ারি ফার্ম। সেখানে গরু মোষ হাঁস মুরগি শুয়োর পালন হত, প্যাকেট করে দুধ আর মাংস বিক্রি হত। ফডারের জন্য চাষ হত। আর দুটো পুকুর ছিল মাছ ধরার জন্য। আমার ভাল লাগতো দেখতে একটা ষাঁড়কে একটা গরুর পিঠে চড়িয়ে দিলে ষাঁড়টা কি করে। মুগ্ধ হয়ে দেখতাম। আর পুকুরপাড়ে মাছ ধরার দৃশ্য। ছিপ ফেলে অনেকে বিড়ি ফুঁকে যাচ্ছে ছাতা মাথায়, তাদের ছিপের কায়দা, চারা, মাছের ঠোকরানো, এবং বোকা মাছগুলোকে। ভাবতাম, আমি এটা পারব একদিন। ডেয়ারি ফার্মের আরো একমাইল পুবে একটা জঙ্গল, সেখানে ছিল বিশ্বযুদ্ধের পরিত্যক্ত মিলিটারি ক্যাম্প আর চাঁদমারি। আমরা বলতাম বারাক্যাম্প আর বারাজঙ্গল। সেখানে অনেক গাছপালা, জলের নালা, ব্রিজ – ভাল লাগতো এসব। ডেয়ারি ফার্মের পুকুরে তো ছোটদের অ্যালাও করবে না, ভেবেছিলাম ওই নালাতে একদিন মাছ ধরব। একদিন বাড়ি থেকে বেরোবার সময় পকেটে খানিকটা সুতলি আর একটা সেফটিপিন নিয়ে বেরোলাম একাই। পায়ে পায়ে বারাজঙ্গলের সেই নালায়। একটা সরু ডাল ভেঙ্গে সুতো পিন দিয়ে ছিপ হল, নালার মাটি খুঁড়ে কেঁচো বার করে চারা লাগিয়ে জলে ছিপ ডুবিয়ে বসে থাকলাম বিড়ি ছাড়াই। অনেকক্ষণ আকাশ কুসুম ভাবার পরে ছিপে টান। কি করে ছিপ তোলে দেখা ছিল, তাই করলাম। একটা মাছ উঠল ছ-ইঞ্চি মতো। আমার সে কী আনন্দ। ছিপটা কাঁধে রেখে মাছটা পেছনে ঝুলিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ফিরে চললাম। পথের মানুষরা অবাক হয়ে দেখছে ছোট ছেলেটাকে আর আমার বুক ফুলে উঠছে। মা’র জন্য একটা মাছ এনেছি ভেবে গর্ব হচ্ছিল।


কিন্তু আসল ব্যাপারটাই ভুলে গেছিলাম। ঠাকুর্দার শেখানো সময়চেতনা সেই মুহুর্তে মনে ছিল না। খেয়াল ছিল না কটা বাজে, স্কুলের সময় বয়ে যাচ্ছে। বাবাও আবার সেদিনই কারখানা থেকে কোন কারণে বাড়ি ফিরে এসে, আমি স্কুলে যাইনি, সেই সকাল থেকে পাত্তা নেই শুনে, একটা লাঠি হাতে বারান্দায় উত্তেজিত হয়ে পায়চারি করছে। ঘরে ঢোকা মাত্র টান মেরে ছিপ ছুঁড়ে ফেলে কথা নেই বার্তা নেই লাঠি দিয়ে বেদম প্রহার শুরু করে দিলো। আমি উঠোনে শুয়ে ছটফট করতে করতে আর্তনাদ করছি, কারও সাহস নেই এগিয়ে তাকে বাধা দেবার, মা আপত্তি জানাতে জানাতে কাঁদতে লাগল। কতক্ষণ সেই মার চলল, লাস্ট সিন কি ছিল, আমার মনে নেই সেসব।


শুধু মনে আছে, সামান্য ত্রুটির জন্য আমার আনন্দের বিপরীতে ওরকম অ্যান্টি ক্লাইম্যাক্স, আর সেদিন জীবনের সবচেয়ে সাংঘাতিক অত্যাচার আমাকে এই পরিবার থেকে পার্মানেন্টলি দূরে ঠেলে দিলো। আমি চূড়ান্তভাবে একা হয়ে গেলাম। বাবা শত্রু হয়ে গেল আমার। মায়ের জন্য দুঃখ হতো। মহিলা আমার বন্ধু, কিন্তু বাধ্য হয়ে নীরবে চোখের জল গিলে ফেলে কষ্ট পায়। আমারও কষ্ট হতো মায়ের জন্য। কিছু করার নেই, এখানে আমার জায়গা নেই। অপেক্ষা করে থাকলাম কবে স্কুলের জীবন ফুরোবে আর আমি বিদায় নেব।


মনোনিবেশ বাড়তে থাকল আমার। পড়াশোনায় – কসম খেলাম ভাল পাশ দিয়ে এই শহর ছেড়ে কলকাতায় যাবো কলেজে পড়তে। ক্লাবে ভর্তি হলাম। মার্চ পাস্ট, ব্রতচারী, যোগব্যায়াম, জিমনেসিয়াম, জিমনাস্টিক্স, আউটডোর ইনডোরের সমস্তরকম খেলাধুলা, গ্রামের আর শহরের খেলা – কিছুই বাদ গেল না। সহ্যশক্তি আর দলবলকে একত্র ধরে রাখার ক্ষমতায় ধীরে ধীরে আমি সবার লিডার, শিক্ষক হয়ে উঠলাম, হাইস্কুলে থাকতেই। এছাড়া বাড়িতে পড়াশোনার পরে কাগজ পড়া, রবিবাসরীয়র গল্প, আর আমার লাইব্রেরির বইয়ের নাগাল বন্ধ হবার পর বাবা যে শুকতারা, শিশুসাথী রাখতো আমাদের ভাইবোনদের জন্য, সেইসব। মনে হত আমিও পারবো। শুরু করলাম গল্প লেখা। ঠাকুর্দার হাতের লেখা ছিল চমৎকার। আমাকে জোর করে শিখিয়েছিলেন ক্যালিগ্রাফি। খাতার বড় পাতায় ধরে ধরে আমার লেখা গল্প কপি করে শুকতারা, শিশুসাথী, বসুমতীতে পাঠাতাম। বাবার কাছে পয়সা চাওয়া অপরাধ, তাই বাবার পকেট থেকে খুচরো সরাতাম পোস্টাল খরচের জন্য। কোপটা মায়ের ওপর পড়তো। মা জেনেশুনে নীরবে সহ্য করতো। সেই গল্প মাঝে সাঝে দু-একটা ছাপা হলে আমি আর মা দুজনেই আনন্দ পেতাম। স্কুলের ম্যাগাজিনেও গল্প লিখেছি। আমার রোখ চেপে গিয়েছিল, কিছু একটা করবো যাতে আমি নিপীড়ন ভুলে থাকতে পারি। সেই লেখালিখির শখ আমার আজও গেল না। আর লিডার আমি হতে চাইনি কখনো। কোন প্রচেষ্টা, শিক্ষা বা প্রতিযোগিতা ছাড়াই তলে তলে সবাই মেনে নিতে শুরু করলো কবে থেকে, আমি নিশ্চিত নই। একেই বলে জ্যাক অফ অল ট্রেডস, মাস্টার অফ নান। যা পারি তা বাস্তবে মূল্যহীন হলেও আমার মনে তার মূল্য অপরিসীম। কেবলই মনে হতো আমি আরো চাই আমি আরো চাই।


ফলে হল কি, কোনদিন প্রেম বুঝলাম না, পরকীয়াও না। মেয়েদের শরীর চিনলাম, কিন্তু কিশোর বয়সের প্রেম কি জিনিষ, জানলাম না। দুরুদুরু বুকের কথা গল্পে, উপন্যাসে পড়েছি, সমবয়সীদের অভিজ্ঞতা থেকে জেনেছি। কিন্তু আমার তখন বুক ভরা মাসল। রামনবমী আর মহরমের মিছিলে লাঠি ঘোরাচ্ছি, বুকের ওপর পেরেক মারা তক্তা ফেলে গাড়ি তুলছি, বেপাড়ার ছেলেরা আমার পাড়ার মেয়েদের হিড়িক দিতে এলে প্যাঁদাচ্ছি। প্রেম ফেম পোষাতো না। তাই এখন টের পাই, ছোটবেলায় গল্প লিখতাম কিন্তু ছড়া, পদ্য পারতাম না কেন। কবিতাও আমি শুরু করেছি দেরিতে। একবার আমার অসুখ, জ্বর, তারই মধ্যে স্কুলের ম্যাট্রিকের টেস্ট পরীক্ষা, একদিনে দুটো। মাঝখানের ফাঁকা সময়ে দেখি বাবা সাইকেল চালিয়ে এসেছে ওষুধ আর শরবত নিয়ে। সেদিন খেয়ে নিলাম, কিন্তু বাবাকে বললাম – তুমি আর কোনদিন আসবে না এভাবে খাবার নিয়ে। বাবা কি মনে করল কেয়ার করলাম না।


আমাকে সিগারেট খাওয়া শিখিয়েছিল তাপুদা (তাপস), সবিতার দাদা, যে সবিতা আমাকে প্রথম শরীর চিনিয়েছিল। আমাদের পাড়াতেই থাকতো, আমার প্রাইমারি স্কুলের ব্যাচমেট। আমরা তখন অনেকগুলো বাড়ির একটা ব্লকে সবাই লুকোচুরি খেলছি। তাপুদা সিগারেট খাবে, আমি দেখছি, পাছে বলে ফেলি, আমাকেও একটা ধরিয়ে দিয়ে টানতে বলল। আমি কাশছি। বাথরুমে দরজা দিয়ে ভেতর থেকে বলল – তুই টানতে থাক, আমি একটা ম্যাজিক করছি দেখ। বলে, আমার হাফ প্যান্টের সামনের বোতাম খুলে ধনটা বার করে আস্তে আস্তে মাস্টারবেট করে দিলো। কি সব বেরোচ্ছে শিরশির করে গা কাঁপিয়ে, আমি জানতামই না, জোরে জোরে টেনে সিগারেটটা ফুরিয়ে ফেললাম। জীবনের সেই প্রথম অভিজ্ঞতা, অসাধারণভাবে আজো আমার স্মরণে। আমার স্বমেহনের কাল শুরু হল হাইস্কুলে থাকতে। আর সঙ্গে নীল বাক্সের স্টার সিগারেট। আজ তাপুদা কোথায় জানি না, সবিতাকেও হারিয়েছি কবেই। পরে একবার আমি আর আমার বন্ধু কমল চক্রবর্তী বনগাঁতে ইছামতীর এপার ওপার ব্রিজের কাছে দাঁড়িয়ে আছি, ওপারের যশোরের একটা ছেলে এসে বলল – দাদা কি চান বলুন, এনে দেব। আমি বললাম – স্টার সিগারেট আর সিজার্স এনে দাও। ছেলেটা এনে দিলো। সেই আমার খাওয়া শেষ স্টার সিগারেট।


পর্ব ৪









ক্লাস ফাইভে তখন, পরীক্ষার আগে কিছুদিন ধরে ক্লাসের কয়েকটা ছেলে রাতে আমার কাছে অঙ্ক প্র্যাক্টিস করতে আসতো| তারা অত রাতে না ফিরে থেকেই যেত| ঠাকুরদা তখন আর নেই| তার ঘরটা ফাঁকা হতে আমিই ব্যবহার করতাম| সেখানে শতরঞ্জি পেতে আমরা গল্প করতে করতে ঘুমিয়ে পড়তাম| কি যে মজা লাগত ! অঙ্ক করতে করতে রোজ একবার চা বানিয়ে খেতাম| চা চিনি তো এনে রাখতাম, দুধ পেতাম না| আমরা ভাইবোনেরা বাড়িতে তখনো চা খেতে পাইনি, চাইওনি, তবু এটুকু অ্যালাওড ছিল, কেন জানি না| মা আমাকে চা বানানো শিখিয়েছিল পাছে বিপদ না হয়| একটা পোড়ো হিটার ছিল সেটা ইউজ করতাম| পরে টের পেয়েছিলাম আমি আর বন্ধুরা রাতে পড়াশুনো করতাম চা খাওয়ার লোভেই| যাই হোক, ক্রমে আমার লেজ মোটা হতে শুরু করল| তাই তো বলে বাচ্চাদের বেলায়, তাই না ? আসলে আমার আত্মবিশ্বাস বাড়ছিল| বাবার অনাদরের কারণে আমার এই বিগতির প্রয়োজন ছিল বোধ হয়| ছোটবেলার রাতের বন্ধুদের মধ্যে একজন ছিল বিজন, সমবয়সী, পাড়ার ছেলে| ক্লাসমেট| পথে বিপথের খেলাধুলায় আড্ডায় আমার প্রাণের সখা ছিল বিজন| যখন তখন বাড়ির বাইরে পুলে দাঁড়িয়ে ডাক দিত – ‘বারীঈঈন’ -- অমনি আমি ছুটে বেরিয়ে যেতাম| বাবা বলতো – ওই কেশব ভারতী এল| কে কেশব ভারতী, তার কথাই বা কেন, জানতাম না তখন| পরে জেনেছি কেশব ভারতী ছিল নিমাই সন্যাসীর বালকসখা| সে এসে ডাকলে নিমাই দিকবিদিক-জ্ঞানশূন্য অবস্থায় এক ছুটে বাইরে বেরিয়ে যেত| আমারও ছিল সেই আকর্ষণ| পরে বিজন একদিন ভরা যৌবনে, আকাশ মেঘলা, ঘনায়মান, নামবে, উপেক্ষা করে কারখানা থেকে সাইকেলে বাড়ি ফিরছে, মাঝপথে মাঠের মধ্যে বজ্রপাতে শেষ হয়ে গেল| সেই বজ্র যেন আমার বুকেই পড়েছিল| কয়েকদিন নিঃশব্দে কাটালাম| তখন কবিতা লিখি| লিখলাম ‘বিজনের আলোবাতাস’ নামের কবিতা, যেটা আমার খুব প্রিয়, এখনো পড়ি মাঝে মাঝে| বিজনের কথা আজও ভুলতে পারিনি| নিমাই একদিন নিজেই কেশব ভারতীকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন| আমার কেশব ভারতী আমাকেই ছেড়ে চলে গেল ! হায় !


প্রাইমারি থেকে হাইস্কুল অব্দি আমাদের না ছিল বাস, না ইউনিফর্ম, না ব্যাগ| চটি পায়ে, ছাতা আর জলের বোতল ছাড়াই, হাতে চার-পাঁচটা বই খাতা নিয়ে দুমাইল হেঁটে তখন স্কুলে যেতাম সবাই মিলে গল্প করতে করতে| একদিন হয়েছে কি, তখন প্রাইমারি স্কুলে, গল্প করতে করতে মাঠের শর্টকাট দিয়ে বাড়ি ফিরছি, একটা গরুকে একলা পেয়ে পেছনে লাগলাম| সেটা মুখ ঘুরিয়ে ঢুঁসোয়, আমি হাতের খাতাবই দিয়ে মুখের সামনে হুস হুস করি| গরুটা একসময় সুবিধা মতো জিভ বাড়িয়ে বইখাতা টেনে নিয়ে চিবোতে লাগল| তখন বাবার মুখ মনে প’ড়ে আমি কাঁদছি আর বন্ধুরা খিলখিল করে হাসছে| পরে যা হবার হল আর কি| মিডল স্কুল থেকে কলেজ পাস করা পর্যন্ত ক্লাসে কোন মেয়ে ছিল না| তাই মেয়েদের সাথে জানাশোনা, বন্ধুত্ব হল না| কী রসে যে বঞ্চিত ছিলাম, হায় ! তাপুদার হাতে আমার মেহন শিক্ষা বিফলে যায়| তার আগে প্রাইমারি স্কুলে থাকতে ক্লাসে মেয়েরা পড়ত, তখন তাদের সাথে আলাপও ছিল| তাদের একজন সবিতা, পাড়ায় থাকে বলে বাড়িতে যাতায়াত আর সখ্যতা বেড়েছিল| তখন না জানি মন না যৌনতা| মায়ের কাছে পড়া লাইব্রেরির বই থেকে এক-আধটু কৌতুহল জেগেছিল শুধু| আমার মেহন শিক্ষার আগের কথা| একদিন খেলতে খেলতে পুতুল খেলার ছলে আমরা দুই বালক বালিকা উলঙ্গ হয়ে অন্য জীবকে আদর করার মতো দুজনের গায়ে হাত বোলাই| কিছুই শিখি না ভাল লাগা ছাড়া| তারপর থেকে বাড়িতে আমার বোনকে দেখে অবাক হতাম, কিন্তু চোখের দিকে তাকাতে পারতাম না| কিছুদিনে সেটা সেরে যায় বাইরের আকর্ষণে|


এরপর মিডল স্কুলে অন্য এক অঞ্চলে এলাম| সেখান থেকে মাইলটাক এগোলেই পেতাম বারাজঙ্গল| বাড়ি থেকে বেরোবার সময় পকেটে তো আর রুমাল থাকতো না, থাকতো এক পকেটে রাবার-পেন্সিল আর অন্য পকেটে একটা গুলতি| স্কুল ছুটির পর সোজা বাড়ি না ফিরে প্রায়ই সেখানে গিয়ে ঘুরে বেড়াতাম| একা| কোন লোক দেখতাম না আশেপাশে| কথা নেই| শব্দচুপির মধ্যে কেবল বাতাসের গাছের, পাখির, ছোটো জীবজন্তুর শব্দ| শুনতাম, শুনতাম| মাঝে মাঝে গুলতি দিয়ে কোন গাছে মারলেই আবার সেই শব্দ বেড়ে যেত কিছুক্ষণের জন্য| মাছ ধরে মার খাবার পরে আমিও মাছ ধরিনি, বাবাও আর আমাকে মারেনি| ক্রমশ ভুলে গেছি সেই বিভিষীকা| দেরি করে বাড়ি ফিরলে আর প্রশ্ন হত না, বরং সয়ে গেছিল সবার| বারাজঙ্গলের পথে এক্স এন টাইপ নামের একটা এরিয়াতে বড় একটা মাঠ ছিল| শহরের অনেক জায়গায় ওরকম মাঠ ছিল| তখনকার দিনে টাটাকোম্পানী ওই সব মাঠে বড় সাদা পর্দা টাঙ্গিয়ে কর্মচারিদের পরিবারকে বিনে পয়সায় সিনেমা দেখাতো প্রতি সপ্তাহে একদিন সন্ধ্যাবেলায়, ঘুরে ঘুরে, সপ্তাহে একই সিনেমা সব জায়গায়| একটা গাড়িতে করে প্রোজেক্টর আসতো| সবাই বসে দঁড়িয়ে দেখতো, সিটি মারতো, হাসতো, কাঁদতো, জনমনোরঞ্জন আর কি| তারপর খবরের কাগজের গল্পের মতো সিনেমার গল্প নিয়ে আলোচনা করতে করতে সবাই ফিরে যেত| আমি বন্ধুদের সাথে প্রথমে ওই এক্স এন টাইপের মাঠে, তারপর ঘুরে ঘুরে অনেক জায়গায় একই সিনেমা বারেবারে দেখতে দেখতে নেশা লেগে গেল|


এই সিনেমার নেশা আমার লেগেছিল ফাইভে থাকতেই| কোন হলে নতুন সিনেমা এলে লোকেরা একটা গাড়িতে মাইক লাগিয়ে ঘোষণা করতে করতে যেত সিনেমার কথা আর ফাঁকে ফাঁকে ওই সিনেমার গান| তারা হ্যান্ডবিল ছড়াতো যা বাচ্চারা পেছনে দৌড়ে কুড়িয়ে ঘরে নিয়ে যেত| একদিন এল ‘নাগিন’ সিনেমা| গাড়ির মাথায় পোস্টার, গান, পর্চা সব মিলে আমার মাথা খারাপ| ঘরে জমে গেছিল আগেকার আরো অনেক পর্চা| সেগুলো অবসর সময়ে বারে বারে পড়তাম| ভাবলাম নাগিন কি করে দেখা যায়| একদিন, সে খুব মজার কথা, ভাবলে এখনো হাসি পায়, বাড়ি থেকে খবরের কাগজ সরিয়ে পুরনো কাগজওলাকে বিক্রি করে চার আনা পাওয়া গেল| সিনেমার মিনিমাম টিকিটের দাম তখন ছ’আনা| চুপচাপ দু মাইল দূরের বসন্ত সিনেমাহলে, সেই প্রথমবার কোন হলের ভেতরটা দেখবো, উত্তেজনায়, একাই পৌঁছলাম| ততক্ষণে সিনেমা শুরু হয়ে গেছে, দরজা বন্ধ| আমি দরজার পাশে ঘোরাঘুরি করছি, একজন গেটকিপার বলল কি চাই ? আমি বললাম সিনেমা দেখতে চাই, বলে চার আনা তার হাতে দিলাম| সে টর্চ জ্বালিয়ে আমাকে নিয়ে অন্ধকার হলে ঢুকে সামনের সারিতে একটা বাচ্চা ছেলের পাশে বসিয়ে দিল| সেই অন্ধকার হল, অত লোক, নাগিন সিনেমা হচ্ছে বড় পর্দায়, গান, নাচ, সাপ, উরেব্বাস ! জীবনে সেই অভিজ্ঞতা ভুলতে পারবো না| ১৯৫৫| কিন্তু আমার অজ্ঞাতে আর একটা ঘটনা ঘটেছিল সেদিনই| বাবার এক কলিগ সেদিন ওই সিনেমাটাই দেখছিল| শেষ হতে যখন আড়ালে লুকিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছি, পাছে কেউ দেখে না ফেলে, তখন তার নজরে পড়ে যাই| পরের দিনই বাবা প্রশ্ন করল –- কাল তুই বসন্ত টকিজে সিনেমা দেখতে গেছিলি ? বাবা কি সবজান্তা – কোনরকম ধানাই পানাই না করে সেদিন সাহস করে বলে ফেললাম – হ্যাঁ| আশ্চর্য, বাবা সেদিন আর কিছু বলল না| তবে পরের দিন আমার সাথে প্রাইমারি স্কুলে, সেই প্রথমবার, গিয়ে একটা কার্ড কিনে দিল আমাকে| ওটাতে জামশেদপুরের একটা বিশেষ সিনেমা হলে একমাসে চারটে রবিবার সকালে বাচ্চাদের সিনেমা দেখা যাবে| আমি দেখলাম দু বিঘা জমিন, হাম পঞ্ছি এক ডালকে, অ্যালিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড, রবিনসন ক্রুশো, ইত্যাদি সিনেমাগুলো| এভাবে কোন যুক্তিজ্ঞান ছাড়াই আমার ফ্যান্টাসির জগৎ খুলতে থাকল, যেমন খুলেছিল রূপকথায়, অরণ্যদেবে, মায়ের থেকে নিয়ে পড়া বইগুলো থেকে| আমার নেশা হয়ে গেল|


তার পরের বছরই ওই বিনে পয়সার সিনেমার হাতছানি| আর ছাড়ি ! পরে জেনেছি শুনেছি ভেবে দেখেছি আসলে ডিসিপ্লিন শেখানো হচ্ছিল আমাকে, মুখে না বলে| প্রথমে সময় সচেতনতা, তারপর একে একে -- সত্য কথা বলার সাহস, ফ্যান্টাসির জগত, স্বনির্ভরতার আস্থা, একা নিজের মনে বেড়ে ওঠা – আরো সব| যে বয়সে কিছু না বুঝেই আমি বাবাকে শত্রু আর পাষন্ড ভাবতাম, তখন আসলে বাবা ওই মারটি ছাড়া -- আপনি আচরি ধর্ম পরকে শেখাও – প্রবাদটি ফলো করছিল| আমি যখন হলে সিনেমা দেখতে গিয়ে ধরা পড়ি, সে সময় মা তো সিনেমা যাবার কথা ভাবতেই পারতো না, বাবার সঙ্গেও না, বাবা তার বন্ধুদের সঙ্গে সিনেমা যেত, বড়দিনে বা কোন পার্টিতে মাঝে মাঝে ড্রিংক করতো, যদিও আমি কোনদিন তা টের পাইনি| সেই থেকে বাবা পার্টিতে যাওয়া বা ড্রিংক করা ছেড়ে দিল| আমার পাখা গজিয়েছে দেখে আমাকে উড়তে এগিয়ে দিল মুখে কিছুই না বলে| ওই সময় যদি আমাকে কেউ বলতোও, আমার বয়ে যেত, আমি দুচোক্ষে দেখতে পারি না বাবাকে| অথচ সেই বাবা বিনা বাক্যব্যয়ে এসব করেছিল| আজ মনে হয় এমন বন্ধু আর কে আছে ? বাবা চুপচাপ নিজের কর্তব্য করে গেছে| আমি বুঝব, কৃতজ্ঞ হব, বাবা তা চায়নি| কোনদিন বাবাকে পুজো টুজো করতে, দেবতার সামনে প্রণাম করতে, মন্ত্র উচ্চারণ করতে দেখিনি| সাধারণ মানুষের মতো ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাস, ভক্তি প্রদর্শন ছিল না তার| আমারও তা হল না| এটা বাবার গল্প না, আমি কিভাবে গড়ে উঠলাম সেটাই ভাবছি| বাড়িতে একটা নিয়ম ছিল, আমরা বড় হবার পর, রাতের বেলায় সবাই টেবিলে একসাথে ডিনার করবে| কেউ না এলে বাবা হাত গুটিয়ে বসে থাকত| একদিন মা আমাকে বলেছিল -- স্বপন, যেদিন ওইসব ছাইপাঁশ গিলবি, বাড়ি ফিরে বাবার সামনে বসবি না| পরে আমি প্রশ্ন করাতে মা বাবার সেই মদ ছাড়ার গল্পটা শুনিয়েছিল| আমি অবাক হয়েছিলাম| ছোটবেলা থেকে একা হলে লোকে স্বাধীন ভাবে বাঁচতে শেখে| প্রাপ্তবয়সের নতুন একাকীত্ব অসহ্য মনে হয়| আমাকে বাইরের দিকে ঠেলে বাবা আমার উপকারই করেছিল|


স্কুলের সময় আমরা সবাই গল্প করতে করতে একমুখী হেঁটে যেতাম, ভাঙ্গলে আবার উল্টোমুখে, সবটাই ছড়িয়ে ছিটিয়ে| তেমনি একটা আশ্চর্য দৃশ্য দেখা যেত সকালে, দুপুরে আর রাত্রিবেলায়| সব কলোনিতেই হয়ত| তবে জামশেদপুর কখনো কলোনি মনে হয়নি আমাদের| এটি একটি শহর| সে সময় শহরে কারও কাছে সাইকেল ছাড়া অন্য সাধন ছিল না| কারখানার শিফটের সময় ছিল সকাল ৬টা, দুপুর ২টো, রাত ১০টায়| ঠিক তার আধঘন্টা আগে রাস্তায় দেখা যেত পিপড়ের সারির মতো সাইকেল চালিয়ে মানুষ চলেছে একমুখে, গেটের দিকে, যেন সাইকেলের মিছিল| আবার শিফট টাইমের আধঘন্টা পর দেখা যেত উল্টোমুখি ঢল| আমি সে দিকে চেয়ে ভাবতাম, আমিও কি কোনদিন ওভাবে সারি বাঁধবো ? বাবা বাড়িতে থাকলে সুযোগ পেলে আমি যখন তখন সাইকেলটা নিয়ে বেরিয়ে পড়তাম| হাফ প্যাডেল করে চালানো শিখে গেলাম| একটু লম্বা হতে ফুল প্যাডেল| দূরে দূরে চলে যাই, একলাই| কতবার পড়ে যেতে গায়ে চোট, সাইকেলে চোট| বাড়ি ফিরে বলে দিতাম| তাই কোন আপত্তি ছিল না বাবার| কবেকার সেই মৎসবৃন্তাত্ত ছিল আমার লাস্ট সিন| বাড়িতে মার খেয়ে খেয়ে হীনমন্যতা কাটিয়ে ওঠার একমাত্র উপায় ছিল নিজের বাহাদুরি গড়ে তুলে আত্মশ্লাঘা বোধ করা| সাইকেল ছিল তারই এক অবলম্বন| বেরিয়ে পড়তাম শহরের মধ্যেকার একটা লেকে| গোল গোল ঘুরতে থাকতাম| জল মাছ মানুষ ছিপ এসব আগেকার দেখা, একটু সাহস হতে প্রায় মাইল দশেক দূরে দলমা পাহাড়ের কোলে বিশালাকার ডিমনা লেকের ধারে| সাইকেল পাড়ে লক করে রেখে পায়ে হেঁটে চক্কর দিতাম| কোনদিন উৎসটা দেখতে পাইনি| শুনেছি দলমার একটা ঝর্ণা থেকে ডিমনার উৎপত্তি| সেই অসীম লেকের জলে কত নৌকা, মাছ, পাখি, হাঁস, বক, পানকৌড়ি, মাছ, নৌকা, কাক শালিকের কথা আর কি বলব, বিস্ময়ে চেয়ে থাকতাম সেই বিস্তারের দিকে| অত জল আর অত প্রাণী তাকে ঘিরে| অনেক মানুষও| কাপড় কাচছে সাবান দিয়ে, চান করছে, সাঁতার কাটছে, গাড়ি ধুচ্ছে, বাসন মাজছে, আবার সেই জল তুলে রান্নাো করছে| এটাই নাকি জামশেদপুরের মানুষদের পেয় জলের ভান্ডার| কত মানুষ তার ধারে পিকনিক করছে, কত কিশোর কিশোরীরা খেলছে| সেই জলের ঢেউয়ের মাছের পাখির কিশোরদের খেলা বারে বারে দেখতে আমার প্রিয় জায়গা হয়ে উঠল ডিমনা লেক|


মা ধরিয়েছিল বই পড়ার নেশা| সেই ছোটবেলা থেকেই পড়ার কোন বাছ বিচার ছিল না, কেউ নিয়ন্ত্রণও করেনি| ভাগ্যিস বুদ্ধি ছিল কম আর ফ্যান্টাসি আনলিমিটেড| সবেতেই রূপকের মায়া| কিন্তু আফশোষ, মা কোনদিন আমার স্কুল কলেজ দেখেনি| মা ছিল রোমান্টিক, বাবা একেবারে বিপরীত| বই পড়েও বাহাদুরি করা যায় টের পেয়ে আমি বন্ধুদের কাছে নেম ড্রপিং করতাম| বলতো জুলে ভার্নে কে ছিল ? টমাস মান ? পিকউইক পেপার্স পড়েছিস ? কী সব, যা তা| তো সবাই যে চোখ বড় করে শুনছে তাই দেখে আমার কী আঁত ! ভাবি বাবা যদি ছোটবেলা থেকে আমাকে বাবা-বাছা করে মানুষ করতো তাহলে আমিও আর পাঁচজনের মতো হয়ে থাকতাম| এই কেউকেটা হবার চাপই আমাকে ড্রাইভ করে নিয়ে চলল জীবনে| বইয়ের নেশা ছাড়া আরো একটা দারুণ ব্যাপার শিখিয়েছিল মা| তা হল যে, সংসারের প্রত্যেকটা জিনিষেরই একটা বিশেষ জায়গা থাকে রাখার| বাতিক মনে হত আগে, কিন্তু শিখেছিলাম দেখে দেখে| ঠিক যেভাবে লাইব্রেরির বই, ওষুধের দোকানের ওষুধ রাখতে হয়| তার সুফল টের পেইয়েছি অনেক পরে| কর্মক্ষেত্রে একবার জাপানীদের সাথে কাইজেন প্র্যাকটিস করতে গিয়ে দেখি ওরাও একই নিয়মের ব্যাপার শেখাচ্ছে| মার কথা মনে পড়ে আনন্দে আমার বুক ভরে গেল|


আচ্ছা, এবার মা বাবার গপ্পো ছেড়ে আমার কথায় আসি| স্কুল আর কলেজের মধ্যখানে যাই, চলুন|


পর্ব ৫










বর্ষা আর শীতকাল বাদে বাগানে খাটিয়া পেতে শোয়ার অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল সেই ছোটবেলা থেকেই। একবার রাতে দেখা আচমকা ভুতুড়ে ভয় কেটে যাবার পর ধীরে ধীরে মা’র পাশে শোবার কান্নাও ভুলেছিলাম। বাগানে অনেক ফুল গাছ। সুগন্ধ। সব অভিমান ভুলে যাবার পর কী ভাল লাগতো। আমরা যে কোয়ার্টার্সে থাকতাম তার সামনের বাগান, তার দিয়ে ঘেরা আর গেটে তালা, পেছনে উঠোন পাঁচিল ঘেরা, যতটুকু জমি ছিল সবটায় বাবা ফুল ফল আর সব্জি গাছ লাগাতো। বক ফুল, সজনে আর নিম গাছ ছিল আর একটা বড় শিউলি গাছ। আরো ফুলের মধ্যে হেনা, কামিনী, গোলাপ, বেলিফুল, গাঁদা, জিনিয়া, চন্দ্রমল্লিকা, ডালিয়ার কথা মনে আছে। ছোট বড় অনেক টব। বাগান আর গাছের দেখাশোনা, জল দেওয়া, মাটি আলগা করা, নতুন গাছ লাগানো আর পুরনো গাছ তুলে ফেলা ছিল বাবার নিত্যদিনের কাজ। বাবার এই একটা ব্যাপার আমার ভাল লাগতো। আমিও হাত লাগাতাম সঙ্গে। বাড়িতে একটা খুরপি আর একটা কোদাল ছিল যাতে ইংরাজিতে লেখা ছিল ‘এগ্রিকো’। আমাদের কলোনিটার নামও ছিল এগ্রিকো কলোনি। পায়ে হেঁটে গোলমুড়ি বাজার আর বাস স্ট্যান্ড মাইলটাক। পথে যেতে বাঁ দিকে পাঁচিল ঘেরা এগ্রিকো কারখানা, গেটে সেপাই, ফাঁক দিয়ে ভেতরের খানিকটা দেখা যেত। আমরা কিছুক্ষণ না দঁড়িয়ে যেতাম না। তাহলে এখানেই তৈরি হয়েছিল ওই সব মাটির যন্ত্র ! একদিন সন্ধ্যায় সেরকম দাঁড়িয়ে আছি, পেচ্ছাপ পেয়ে গেল। গেট পেরিয়ে দেয়ালের ধারে শুরু করেছি, অমনি সেপাই এসে আমাকে পাকড়াও করলো খ্যাঁক করে। -- য়াহাঁ পিসাব করতা ? চলো আজ নহিঁ ছোড়েগা। আমি খানিকটা প্যান্টে করে ফেলে কাঁদো কাঁদো মুখে বললাম –- আমি নয়া হ্যায়, জানি না, প্লিজ ছোড় দিজিয়ে, আর করব না। সে বলল – নহী জানতা ? ইয়ে কেয়া লিখা হ্যায় ? সে দেখালো দেয়ালে লেখা “য়হাঁ পিসাব করনা মনা হ্যায়”। আমি তো পড়তে পারি, কিন্তু বলব কি করে ? আমি বললাম – পড়তে নেহি পারতা। কলকাতা সে আয়া। সে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে ছেড়ে দিল। আমি তখন পালা পালা, জোরে হাঁটা দিলাম সেপাইটাকে ফিসফিসে গাল দিতে দিতে। হি হি হি ! হাসি পেল ভেবে। তো, বাবার সাথে এই একটি কর্ম আমি করতাম। খুরপি দিয়ে গাছের গোড়ার মাটি নেড়ে দেওয়া, গোবর সার বা ইউরিয়া মেশানো, জল দেওয়া, গাছে চড়ে বকফুল আর সজনে পাড়া। সজনে গাছের ডাল খুব দুর্বল, সাবধানে চড়তাম। টাটা কোম্পানি রাস্তার ধারে গাছ লাগাতো কর্মচারী পথিকরা ছায়াতে বিশ্রাম করবে বলে। অরন্য বিনষ্ট করে কারখানা আর জনপদ বানিয়ে টাটারা তার খানিকটা পূরণ করতে চাইতো এভাবে। কর্মচারীদের উৎসাহ দিতো বাগানে ফুল ফল সব্জি করতে। বীজ, সার, চারা আর যন্ত্রপাতি দিতো। কম্পিটিশনে প্রাইজ দিতো। বাবা প্রতিবছর প্রাইজ পেতো বলে আমার শত্রু হওয়া সত্বেও গর্ব হতো। আমি মন দিয়ে বাগানের কাজ করতাম। ভালোপাহাড়ের স্কুলিং চলছিল আমার। তখন বুঝিনি।


রাতে ঘুমের সময় ফুলের গন্ধ জরুরি হয়ে উঠল ক্রমে। আর ভাল লাগতো কিছুক্ষণ নির্মল আকাশের দিকে চেয়ে থাকতে। তারাদের দেখতাম। চিনতাম না। বই পড়ে জেনেছিলাম সপ্তর্ষি মন্ডল, শুকতারা, ধ্রুবতারা, অরুন্ধতী, মঘা, মৃগশিরা, বশিষ্ঠ, কালপুরুষ, কত শত মৃত মানুষের নাম – তারাদের কেউ কি করে নাম রাখে কে জানে ! কত দূরে! এত স্নিগ্ধ আলো! নিশ্চয়ই তারাদের মুখ আরো আলোময় সুন্দর! মাঝে মাঝে এক আধটা তারা খসে আকাশে দৌড়তো ফুলঝুরি ফুটিয়ে। আমার গায়ে পড়বে না তো ? লুকোচুরি খেলতে খেলতে ঘুমিয়ে পড়তাম রোজ। সুগন্ধ আর তারামালা খেলায় খুব প্রিয় ছিল আমার রাতগুলো। পরে জেনেছি তারারা সূর্যেরও বাড়া, অগ্নিপিন্ড এক-একটা, কিন্তু তাই বলে ছোটবেলার ভাল লাগা তো মিথ্যে হয়ে যায় না। এই অভ্যাসটা আমার কোনদিনও যায়নি। জলপাইগুড়িতে যখন পড়তাম, তেতলা হোস্টেলের ছাদের প্যারাফেট ওয়ালের ওপর চিত হয়ে শুয়ে থাকতাম প্রায়ই সন্ধ্যাবেলায় তারা ফুটলে। পড়াশুনো হত রাতের বেলা ডিনারের পর। সন্ধ্যার সঙ্গী তারা। ঘন্টার পর ঘন্টা। সহপাঠীরা আগে এসে গুলতানি মারার চেষ্টা করত আমার সঙ্গে। আমাকে নিরব দেখে তারপর নিজেরাই আড্ডা মারতো। ক্রমে ওরাও সঙ্গ ছাড়লো আমার আগ্রহ নেই দেখে। তারাদের মুখোমুখি একা আমার রাতগুলো মনে পড়ে। তখনো কি ভাবতাম না কিছু ? আমার ফ্যান্টাসি কি ফানুস ওড়াতো না ? নিশ্চয়ই। সেসবের প্রকাশ আরও পরের কথা। তারাদের মুখোমুখি আমি ক্রমশ বিচ্ছিন্ন, একা। সেই একা হয়ে যাওয়া আজ টের পাই। ভাবলেই প্রথম দিকে দুঃখ পেতাম, তারপর ক্রমশ মুক্তিবোধ, এখন উদাসীনতা। তখনকার মতো আকাশে একটা খালি জায়গা বেছে ঠিক করতাম বাবা মারা গেলে ওখানটায় রাখব তাকে। রোজ জায়গাটা চিনেও ভুলে যেতাম। বাবার ডাকনাম ছিল চিনু। কাকতালীয়। না ?


কম বয়সে যে সব বই পড়তাম তার হার্ডবাউন্ড মলাটের দুদিকের পুস্তানিতেই ভারতের মনীষী আর স্বাধীনতা সংগ্রামীদের ছোট ছোট ছবি থাকত। মা তাদের সম্পর্কে গল্প বলতে বলতে চিনিয়ে দিতো। নামগুলো মুখস্ত হয়ে গেছিল। ভাবতাম কার মতো হওয়া উচিত হবে আমার ? বালক বিবেকানন্দ’র মতো হবার চেষ্টায় ছিলাম আগে। হাইস্কুলে ইংরাজি র‍্যাপিড রিডার পড়ানো হতো। তাতে নেহেরুর ছোটবেলায় কলম চুরির একটা গল্প ছিল, যেটায় সে মারের ভয়ে মিথ্যা কথা বলে ধরা পড়েছে, আর তার বাবা মতিলাল নেহেরু তাকে আদর করে বোঝাচ্ছেন যে সত্য কথা বলার আনন্দ আরো বেশি। আমার নিজের বাবার মুর্তিটা মনে পড়ল। খুব যত্ন করে নিজস্ব বাংলায় সেই গল্পটাই লিখে স্কুলের ম্যাগাজিনে দিলে ওরা ছাপলো। খুব গর্ব হল আমার। বাড়িতে এনে মাকে দেখিয়ে বললাম – বাবাকে পড়তে দিও। মা পড়ে নিয়ে মুখ তুলে অদ্ভুতভাবে চেয়ে ছিল আমার দিকে। সেই মুখের নিরব ভাষা আজ বুঝি। মা’র মুখে ছিল ব্যথা। স্যরি মা। তখন তো গর্বে আমার পা পড়ে না। আমার লেখা প্রথম গল্প ছাপা হয়েছে তো! তারপর আরো অনেক গল্প স্কুলে, কলকাতার পত্রিকায়। সমানে। ইংরাজিতে অতটা না পারলেও বাংলা আর হিন্দিতে কোন বিষয়ে আলোচনা বা ব্যাখ্যা লিখতে দিলে পাতার পর পাতা বানিয়ে বানিয়ে লিখে ফেলতাম, এমনকি পরীক্ষার খাতায়ও, সে গরুর সম্বন্ধে রচনাই হোক বা, একটি পেরেকের কাহিনী। এত ছড়িয়ে ছিটিয়ে ভাবলে তো আর পদ্য লেখা হয় না। কি আর করা যাবে ? প্রাথমিক লেখক জীবনে তাই আমি গল্পকার হয়েই থেকে গেলাম। কত আর বানাবো ওইটুকু বুদ্ধি দিয়ে, তাই লোকের মুখে তাদের জীবনের গল্প শুনতে ভাল লাগত।


আরো একটা অভ্যাস হয়েছিল ছোটবেলা থেকে। বাড়ি বাড়ি চাঁদা তোলা। পাড়ার ছোটরা মিলে ‘বালক সংঘ’ ক্লাব করেছিলাম, যেমন সব পাড়াতেই থাকে আর কি। সরস্বতী পুজো হতো। সবাই আমরা একই রকম দেখতে কোয়ার্টারে থাকতাম। কারও বাড়িতে বারান্দায় প্রথমে, পরে ম্যারাপ বেঁধে বাগানে, গলিতে পুজো হতো। কাপড় আর বাঁশের টুকরো দিয়ে মাটি মেখে পাহাড় সাজিয়ে মুর্তি এনে রাখা হতো একটা টুলে। পুরুত ডেকে পুজো, প্রসাদ। খরচ উঠতো চাঁদা তুলে। তখন তো আর মদ ফদ ছিল না। পুরোটা পুজোয়। লক্ষ্য করতাম পুরুত কি করে। একবারের কথা মনে পড়লে হাসি পায় এখন। কাছে এক বাড়িতে থাকতো সরকাররা। তাদের বারান্দায় প্রাইভেট সরস্বতী পুজোর আয়োজন হয়েছে, পুরুত আসেনি। কোথাও খেপ মারতে গিয়ে দেরি করে ফেলেছে। সরকার কাকীমা আমাদের বাড়িতে এসে মাকে বলল – স্বপনকে বলুন না একটু এসে পুজোটা করে দেবে। আমি আঁৎকে উঠি – আমি ! সরকার কাকীমা বলল – কি হয়েছে ? বামুনের ছেলে। চল না বাবা পুজোটা করে দেবে। দক্ষিণা দেবো। দক্ষিণার কথায় আমি গিয়ে পুজোয় বসলাম। পৈতে হাতে নিয়ে ওং ফোং ফিট ফাট করে ফুল চন্দন চাল কলা দিয়ে পুজোটা করে দিলাম। সবাই আমাকে সাষ্টাঙ্গ প্রণাম করল। দক্ষিণা পেলাম। বাড়িতে এসে মাকে গল্পটা বলে জানতে চাইলাম – মা, বামুন কি ? আর একবার, বাবার সঙ্গে সবাই পারিবারিক বন্ধু সেনকাকুর বাড়ি গেছি বিজয়া করতে। সেনকাকুর ছেলেমেয়েরা মা বাবার পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতে আমিও সেনকাকু আর কাকীমার পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলাম সহবৎ শিক্ষা অনুযায়ী। ফলে বাড়ি ফিরে বাবা আমাকে এক থাপ্পড়। -- যার তার পায়ে হাত দিস কেন ? তুই বামুন না ? বামুন হবার কারণে আমার ঘেন্না হয়ে গেল। তারপর থেকে মা ছাড়া আর কারো পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করিনি কোনদিন।


তো ক্রমে যেমন বড় হচ্ছি, সরস্বতী ছেড়ে গনেশ পুজো, দুর্গা পুজোতে অংশ নিতে শুরু করলাম। আমাদের কলোনিতে বাঙালি অবাঙালি সবার বাড়ি চাঁদা চাইতে গিয়ে সবার নাম ধাম জানা হল, ছেলেপুলেরা কি করে, কোথায় পড়ে সব জানা হয়ে গেল। কে কিপটে আর কে দরাজ। চাঁদা চাইতে উৎসাহের অভাব হয়নি কখনো। এটা কাজে লেগেছিল কৌরব বেরোবার পরে। পুজো প্যান্ডেলে পাব্লিককে, পাড়ায় দরাজ মনের মানুষদের কাছে, কোন অনুষ্ঠানের গেটে দাঁড়িয়ে কৌরব বিক্রি করতাম সোৎসাহে। একবার তো জানা নেই শোনা নেই, কাউকে চিনি না, কলকাতায় রবীন্দ্র সদনে ২৫শে বৈশাখ পৌঁছে গেছি কাগজ হাতে করে। কী যে মজা! বাড়ি বাড়ি যখন চাঁদা চাইতে যেতাম, ধীরে ধীরে ক্রমশ বাড়ির মানুষদের বিভিন্ন চরিত্র টের পাচ্ছিলাম। বিভিন্ন গল্প শুনতাম। কে কোন বিষয়ে কথা বলা পছন্দ করে জেনে সেই বিষয়ে গল্প জমাতাম – মাসীমা, বাতের ব্যাথাটা কমেনি ? – চন্দনদা কি এবার কলেজে ছুটি পেল না কাকু ? – বলুন দাদু, বাবলুর নতুন বদমাশির খবর। কত গল্প জমা হয়ে যেত আমার মনের ভেতর। ফলে আমারই ভাল হল। গল্প বানাতে হতো না। ক্রমে বদনাম হয়ে গেল। একটা বেশ সুন্দরী মেয়েকে দেখব বলে তাদের বাড়ির গেটে হাত দিতেই ভেতর থেকে আওয়াজ এল – আবার কিসের চাঁদা ?


ব্রতচারী থেকে শুরু করে ক্লাব, স্কাউট, এসিসি, এনসিসি, ক্যাম্প, সব করতে করতে অনেক শেখা হল। কিচ্ছু ছাড়িনি। ব্যান্ড বাজানো, সেই তালে সবার সাথে পা মিলিয়ে, মিলিটারির মতো হাত দুলিয়ে সোজা পা ফেলে হাঁটা আমার চলন শুধরে দিলো। বাহাদুরি করার প্রবণতা তখন চরমে। মহর্‌রম রামনবমীর মিছিলে লাঠি খেলা, তলোয়ার খেলা, গায়ে তেল মেখে মঞ্চে দাঁড়িয়ে পোজ মেরে মাসল দেখানো, মাটির তলায় অন্ধকারে দুঘন্টা চুপচাপ শুয়ে থাকা, পুজোর শো’য়ে জিমনাস্টিকস দেখানো – কানে হাততালি আর হাততালি – এত যে, শেষে হাততালিতে বিরক্ত হয়ে গেলাম। ভবিষ্যতে লেখক হয়ে, কবিতাকর্মী হয়ে কোনদিন ওপথ মাড়াইনি। সযত্নে দূরে থেকেছি।


তো, আমি হাইস্কুলের দিনগুলোর কথা বলছিলাম। স্কাউটের ক্যাম্পে বিভিন্ন ভাষার, ধর্মের ছেলেদের সংগে একসাথে টেন্টে থাকার অভ্যাস হয়ে গেল, সবাই বন্ধুর মতো মিশে গেলাম। সেই থেকে আমার হোস্টেল জীবনের স্বপ্ন শুরু হল। কলকাতায় কলেজে যেতেই হবে। আমাদের সময়ে ক্লাস ইলেভেনে ম্যাট্রিক পরীক্ষা হতো। সেটাই স্কুলের শেষ। হায়ার সেকেন্ডারি পড়ানো শুরু হয় আরো পরে। কিরকম যেন উলটো যুক্তি ছিল আমার। কলকাতার হোস্টেলে যেতে হবে। সেজন্য ভালভাবে স্কুলের পরীক্ষায় পাশ করতে হবে। সেজন্য ভাল ভাবে পড়াশুনো করতে হবে। আমার একাকী জীবনে হোস্টেল লাইফ খুব জরুরি ছিল। নয়তো কি দরকার জান লাগানোর – ভাবখানা এরকম প্রায়। হাসি পায় এখন।


পর্ব ৬






সারাদিন স্কুল আর বাইরের খেলাধুলো বাদে যেটুকু সময় বাড়িতে থাকি আমার প্রথম ও শেষ বিনোদন ছিল বই পড়া। খানিকটা অংক আর পড়ার বই, আর বাকি সময়টা বাইরের বই। প্রচুর গল্প আর উপন্যাস। সেই কবে ঠাকুমার ঝুলি দিয়ে শুরু, ক্রমে বুড়ো আংলা, ক্ষীরের পুতুল, রঘু ডাকাত, কিরীটি রায়, দীপক চ্যাটার্জি, বিমল, ব্যোমকেশ, জুলে ভার্ণে, টম সোয়্যার, কত কি। লুকিয়ে রাখা থাকতো স্বপন কুমার আর চটি পন্ডির বই। ততদিনে আমার আত্মমেহন শিক্ষা হয়ে গেছে। মহাস্থবির জাতক তো আগেই পড়া। ধীরে ধীরে মহাপ্রস্থানের পথে, দেবতাত্মা হিমালয়, চাঁদের পাহাড়, দেশে বিদেশে, রমানাথ বিশ্বাসের ভ্রমণ কথা যাতে তার সাইকেলে তিন বছরে বিশ্বভ্রমণের কথা লিখেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ, বঙ্কিমচন্দ্র, শরৎচন্দ্র, বিভুতি ভুষণ, তারাশংকর, মাণিক, আরো কত লেখকের নাম জানতাম, পড়ার সময় মনে মনে তাদের ছবি আঁকতাম কিন্তু রমানাথ বিশ্বাস ছাড়া আর কোন লেখককে জীবন্ত আমার সামনে দেখিনি। রমানাথ আমার মনে দাগ কাটলো না। পরে একদিন আবিষ্কার করলাম পাড়ায় বেপাড়ায় পুজোর ফাংশানে লম্বা সৌম্যকান্তি রাজপুত্রের মতো দেখতে একজন তরুণ স্বরচিত কবিতা বলছেন। অত সুন্দর পুরুষ আমি আর দেখিনি। কী সুন্দর কন্ঠস্বর, আর কথা বলা! নাম কবি সত্যেন্দ্র দে। ভাবলাম আমিও ওনার মতো হব। কিন্তু কি করে হব, আমি তো বেঁটে। সেই আমার মনে প্রথম ইচ্ছা জাগল স্বরচিত কবিতা লিখতে হবে। মনে প্রশ্ন এল, স্বরচিত কবিতা মানে কি ? কি করে লেখে ? তার স্বরচিত কবিতা আমি কিচ্ছু বুঝিনি যদিও। ক্লাবের জিম মাস্টার দুলুদাকে জিজ্ঞাসা করলাম – দুলুদা, স্বরচিত কবিতা মানে কি ? দুলুদা বলল – এই যে তুই ডন মারতে মারতে এক সময় ছেড়ে দিস, তা না থামিয়ে আরো দশটা ডন মারলে যে ঘাম বেরোবে তাকে বলে স্বরচিত কবিতা। দুলুদা ইয়ার্কি মারলো বুঝতে পারি। কবিতা মানে তো জানতাম ক্লাসের বইয়ে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, আবোল তাবোল। সেসব তো ছড়া মনে হতো। ব্যাখ্যা লিখতে বললে দশ পাতা লিখে দেব, কিন্তু নিজে থেকে একটাও লিখতে ইচ্ছা করতো না। নদীর দিকে জলের দিকে পাহাড়ের দিকে আকাশের দিকে চেয়েই থেকেছি শুধু। এসেছে কবিতা নয় গল্পই। ক্লাসে নীলু নামের একটা মুসলমান ছেলে ছিল। তার ছিল শ্বাসকষ্ট। হাঁপাতো। সে একবার জামশেদপুরে রায়ট হবার পরে পূর্ব পাকিস্তানে দেশের বাড়িতে ফিরে গিয়ে পুকুরে ডুবে মারা যায়। নীলু ভাল আবৃত্তি করতে পারতো। আমার প্রবলেম শুনে বলল – মেয়েদের দিকে চেয়ে থাকিস, তবেই স্বরচিত কবিতা কাকে বলে বুঝবি। মেয়েদের দিকে চেয়ে তো শরীর ছাড়া বাকি সব বোকা বোকা লাগে। একদিন, বুলা তখন ডাঁশা, তাদের খালি বাড়িতে চেপে ধরে খুব চটকালাম, উদোম করে চেয়ে থাকলাম, কবিতা এল না। ভাবলাম নীলুও গুল মেরেছে। ধুস্‌। নিকুচি করেছে স্বরচিত কবিতার। আমার গল্পই ভাল।


আমার জীবনে সবচেয়ে সুন্দরী মহিলা ছিল আমার দিদিমা। তিনি কবেই। দেখতে, কাজে, ব্যবহারে আজো তার চেয়ে সুন্দরী কাউকে দেখিনি। মার কাছে পড়াশুনো আর সংসারের খুঁটিনাটি কাজ শিখেছিলাম। তবে মা তিনটি সন্তান আর নেফ্রাইটিসের কারণে প্রায়ই শয্যাশায়ী হলে দিদিমা এসে হাল ধরতো। মার মতোই সে সব দিনে আমি সংসারের কাজে ব্যস্ত দিদিমার সঙ্গে ছায়ার মতো লেগে থাকতাম। কাজ করতে করতে সারাক্ষণ গল্প শোনাতো আমাকে। তার বাপের বাড়ি আগরতলায়, শ্বশুরবাড়ি বেতকায়, শুনে শুনে আমার মুখস্ত হয়ে গেছিল ম্যাপ সুদ্দ। কম বয়সেই বিধবা। আমাকে বলতো – বড় হইয়া ল, তরেই বিয়ামু। সে সময় বিয়ামু মানে বুঝি না, আবেগে আমি দিদিমাকে জড়িয়ে ধরতাম। দিদিমা হাসতে হাসতে আদর করতো আমাকে। কতরকমের যে রান্না জানতো দিদিমা সামান্য জিনিস দিয়ে, কতরকমের পিঠা পায়েস, শীতকালে আমার তো উৎসব লেগে যেতো। কলকাতায় পড়ার সময় দিদিমার বাড়িতে গিয়ে থাকতাম মাঝে মাঝে। নিজের নিডি ছেলেমেয়েদের দেখাশুনো করেই ফুরিয়ে গেল দিদিমা। তার একটা ছবি আমি কলকাতার স্টুডিওতে পরিষ্কার করিয়ে বাঁধিয়ে রেখেছিলাম আমাদের বাড়ির দেয়ালে, সে অনেকদিন পরের কথা। হাইস্কুলে প্রথম তিন বছর আমাদের একটা সাবজেক্ট ছিল যার ইংরাজি নামটা মনে নেই, বাংলায় বলা চলে ‘কল্পনা বিকাশের পর্যায়’। আমরা বলতাম ‘কল্পনার বিপর্যয়’। বড় একটা বাঁধানো খাতায় খবরের কাগজ বা অন্যখান থেকে ছবি কেটে, ব্যতিক্রমী সংবাদ-সার কেটে, ছড়া কেটে আঠা দিয়ে সাঁটানো – আর পাতার নিচে বাংলায় দু-চার লাইন লেখা। ছবি সাজানো পাতার শেষ উদ্দেশ্য ছিল একটা বিষয় গড়ে তোলা, আর সেদিকে ছাত্রদের উৎসাহ দেওয়া। এতে মার্কস দেওয়া হতো যা বাৎসরিকের সময় যোগ হতো অ্যাডিশনাল সাবজেক্ট হিসাবে। আমরা খেলোয়াড়দের অ্যাকশন ছবি, স্পোর্টস, কুস্তি, নদী, পাহাড়, ঝর্ণা, পাখি, গাড়ি, বাড়ি, বাগান, ফুল, হিরোইন, ঐ বয়সের নানা মুখরোচক গল্প, ডাকটিকিট – এই সব লাগাতাম। সাবজেক্ট-এর অভাব হতো না। তবে কাউকে দেখানো বারণ ছিল। প্রতি বছর আমার খাতার প্রথম পাতায় থাকতো দিদিমার একটা ছবি। নিচে লিখতাম ‘আমার বউ’। প্রতিবছর নতুন টিচার জিজ্ঞাসা করতেন – ইনি কে বারীন ? আমি বলতাম – আমার দিদিমা। প্রতিবছর টিচার হেসে আমার মাথায় হাত বোলাতেন। খিল্লি ওড়াতেন না। কেবল মাত্র সেই সব টিচারকেই আমি পছন্দ করেছিলাম।


‘বুধসন্ধ্যা’ খুব পপুলার ব্যাপার মনে হচ্ছে। কলকাতায় সুনীল গাঙুলীরা বন্ধুবান্ধব মিলে বুধবার সন্ধ্যাকালে আড্ডায় বসতেন। সেই দেখাদেখি নিউদিল্লীর চিত্তরঞ্জন পার্কে বুধসন্ধ্যা নামে নাচ গান নাটকের কবিতার আড্ডা শুরু হয়েছিল যা এখনো চলে। ভাস্বতী আমাকে জানালো। প্রত্যেক বুধবার সন্ধ্যায় বাবু প্রণব দে আমার টেলকো কলোনির পি-১৪ গ্যালারিতে আড্ডা মারতে আসতো। এসব মনে পড়ল কারণ ভাবছি, টাইম স্পেসে পিছিয়ে সেই স্কুলকালে বুধবার সন্ধ্যায় বিনাকা গীতমালার কথা, যেটা রেডিও সিলোন থেকে আমির সায়ানী তার নাটুকে গলায় প্রেজেন্ট করতো প্রতি সপ্তাহে। এবং ফাইনালি একদিন বছরের শ্রেষ্ঠগুলো। কমপিটিশন হতো। আমাদের উত্তেজনা। বাড়িতে রেডিও নেই, তার চাহিদা বা ক্ষোভও নেই, পাশের বাড়িতে নিয়মিত হতো বিনাকা গীতমালা, বিবিধ ভারতীর গান আর অনুরোধের আসর। আমাদের বারান্দায় বা বাগানে বসে কান পেতে শুনতাম, খাতায় বিনাকা’র ফার্স্ট, সেকেন্ড, থার্ড নোট করে রাখতাম। বছর ফুরোলে বন্ধুদের সঙ্গে বাজি রাখতাম কোনটা পুরস্কার পাবে। কী উৎসাহ! আর সমানে চলছে ফোকোটিয়া সিনেমা দেখা আর ঘরে থাকলে বই পড়া। পড়তে খুব ভাল লাগতো। অন্য বই ফুরিয়ে গেলে পড়ার বই বারেবারে পড়ে ফেলতাম। ফলে রেজাল্ট ভাল হতে বাধ্য। অঙ্কে তো ভাল ছিলামই। ভাল পাশ করে কোলকাতা যাবার লক্ষে অবিচল ছিলাম। এই অ্যাম্বিশনটা আমার নিজেরই তৈরি করা। এ ছাড়া তিনটে আড্ডা-দল ছিল আমার। পাড়ার ছেলেদের সাথে বাইরের খেলাধূলো আর গুলতানি। ক্লাবের ছেলেদের সাথে ইনডোর খেলা, জিম, যোগব্যায়াম, জিমনাস্টিকস, মার্চপাস্ট আর আড্ডা। ক্লাসের ছেলেদের সাথে স্কুলের ক্লাসরুমে বা মাঠে সিনেমার, টিচারের, কারও বোন বা পাড়ার মেয়েদের নিয়ে গল্প করা। তিনটে দলের সঙ্গেই বছরে একবার করে পিকনিক। সাইকেল চালিয়ে চলে যেতাম শহরের জুবিলি লেকের পাশের জঙ্গলে, কখনো ডিমনা লেকের পাশে, কখনো সোনারির জঙ্গল পেরিয়ে দোমোহানীতে। সুবর্ণরেখা আর খড়কাই নদীর সঙ্গমে। নিচে বালুকাবেলায় শতরঞ্জী পেতে বসে তাস, আড্ডা, গড়াগড়ি, রান্না, খাওয়া দাওয়া। সিগারেট দু-একটা। নো মদ।


টাটা কোম্পানি ইংরেজ আমলে ফরেস্টের কাছ থেকে বিশাল এরিয়া লিজ নিয়ে কারখানা আর শহর পত্তন করেছিল। যতটা সম্ভব গাছগুলো অক্ষত রেখেও বহু গাছই কেটে ফেলেছিল বাধ্য হয়ে। তার খানিকটা ফিরিয়ে দিতে শহরের রাস্তার ধারে গাছ লাগাতো, শহরের বাইরের অঞ্চলের গাছগুলো রক্ষনা বেক্ষণ করতো। শহরের পশ্চিমে বিশাল সোনারি নামের শাল জঙ্গলের মধ্যে একটা ওই নামের গ্রাম আর পায়ে চলার সরু বনপথ দোমোহানী পর্যন্ত। জামশেদপুরের প্রাচীন অধিবাসীরা সবাই সাঁওতাল, কোল, মুন্ডা আর পুরুলিয়ার ভুমিজ সম্প্রদায়, গোলানো সংস্কৃতি। বলতে গেলে পুরোটাই অস্ট্রিক। আমাদের বাড়িতে যখন পিঠা পায়েস হতো, ওদের ছিল মাংসা পিঠা। মশলা মাখা মাংসের কিমা শালপাতায় মুড়ে কাঠি দিয়ে আটকে হাল্কা আঁচে গরম করা, তার পর পাতা খুলে মাংসা পিঠা চাটনি দিয়ে খাওয়া। আঃ! তাদের বেশির ভাগ নাচ গানের উৎসব হত মাঠে। পৌষ সংক্রান্তিতে পুরুলিয়া ঘেঁষা আদিবাসীদের হতো তুষু পুজো। তুষু দেবীর মুর্তি বসিয়ে, প্রসাদ দিয়ে, মাইক বাজিয়ে শুধু তুষুর গান আর পুজো তিনদিন, আমাদের লক্ষ্মী পুজোর মতো। বাড়ি বাড়িতে, পাড়ায় পাড়ায়, ক্লাবে ছোট বড় মুর্তি হতো সাধ্য মতো। আদতে তুষু দেবীর একটা গল্প আছে -- জমিদার তনয়া তুষু প্রেমিকের জন্য জলে আত্মবিসর্জন দিয়েছিল। তিনি প্রেমের আর কৃষিসম্পদের দেবী। পুজো শেষের দিন দুর্গা বিসর্জনের মতো দলবল মিলে মুর্তি কোলে মাথায় গাড়িতে নিয়ে নাচতে গাইতে সবাই যায় কাছের পুকুর বা নদীর দিকে দেবীকে জলে ভাসাতে। তুষুর গানের একটা মাদক শক্তি আছে। যে শোনে সেই গলা মেলাতে শুরু করে। বিসর্জনের জায়গায় মেলা বসে যায়। হরেকরকম কেনাকাটার জিনিষ, খাবার, তেলেভাজা, মহুয়া, হাঁড়িয়া, জামা-কাপড়, রেকর্ড-ক্যাসেট, কতরকমের যে জিনিস তার ইয়ত্বা নেই। শহরের মানুষরা দর্শক হিসেবে উপচে পড়তো। আর সেখানে মাঝখান দিয়ে দুলতে দুলতে নাচতে নাচতে গাইতে গাইতে আদিবাসী পুরুষ আর মহিলারা শেষমেশ প্রায় কান্নার সুরে তাদের প্রিয় তুষুদেবীকে জলে ভাসিয়ে এসে মেলায় যোগ দিতো। তুষু গানের সুর বিখ্যাত এখন। গান বাঁধিয়েরা সম্মানি পান। চারপাশের রাস্তাঘাট জ্যাম হয়ে যেত ভিড়ে। আমরা তো প্রতিবার পাড়ার ছেলেরা দল বেঁধে হাজির হতাম মেলার বাহার দেখতে। পরে একবার কবি রঞ্জন মৈত্র এক তুষুমেলার দিন নদীর ঐ বালিয়াড়িতে আমার সাথে হাঁটতে হাঁটতে তার কবিতার বইয়ের নাম আবিষ্কার করে – সুবর্ণরেখা রানওয়ে।


কলোনির সমস্ত পুরুষ মানুষ ছিলেন টাটা কোম্পানির কর্মচারি। ৯০% লোক শিফট ডিউটি করতো। অর্থাৎ, সময়ে ঘুমনো, সময়ে ওঠা, সময়ে চান করা, সময়ে খেতে বসা, সময়ে সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে যাওয়া। এর কোন ব্যাত্যয় ছিল না। রাস্তাঘাট পরিষ্কার করা হতো রোজ। কারখানা আর শহর একটু একটু করে বেড়ে উঠছে চোখের সামনে, যেন বেড়ে ওঠাটাই বেঁচে থাকার প্রধান ধর্ম। এগ্রিকো মেন রোডের পাশে কোম্পানির লাগানো গাছের মধ্যে অনেক কটা ছিল শিশু গাছ। এই গাছের ডাল খুব শক্ত আর তাই আমাদের প্রিয় হয়ে উঠেছিল। একটা বিশেষ শিশুগাছে চড়ে আমরা হুটোপুটি খেলতাম, কারণ, ঠিক কোনাকুণি একটা বাড়িতে থাকতো আমাদের স্বপ্নের নায়িকা যাকে ছোঁক ছোঁক করতো আমাদেরই এক বন্ধুর দাদা, তাই আমাদেরও আকর্ষণ। আমরা আমডুলডুল খেলতাম গাছে চড়ে ডাল থেকে ডালে ঝুলে। একজন আমাদের চেজ করতো। দারুণ মজা পেতাম। ঐ গাছের নিচেই বিকেলবেলা এক ফুচকাওয়ালা দাঁড়াতো খোঞ্চা নিয়ে। আমরা বলতাম গোলগাপ্পা। দু পয়সায় ৫টা। এখন অবশ্য অবিশ্বাস্য মনে হয় আমাদেরও। পরে সেটাকেই ফুচকা বলে জানি কোলকাতায়। বেনারসে বলে পানিপুরি। বড় রেস্টুরেন্টে প্লেটে সার্ভ করে ২০ টাকায় মোটে ৪টা। তো, এই শহরে থেকে বেড়ে উঠে অজান্তেই কিছু ডিসিপ্লিন আমার মধ্যেও ঢুকে গেছিল যা পরে আমার খুব কাজে লেগেছে। ছোটবেলার কথা সহজে ফুরোবার নয়।


ছোটবেলায় দেখেছি শহরে পাব্লিক ট্রান্সপোর্ট বলতে কালো রঙের তেচাকা গাড়ি, কালো রঙের স্টুডিবেকার আর হিলম্যান, চারচাকার ট্যাক্সি, বাক্সের মতো মিনিবাস যার পেছনদিকে একটাই দরজা ওঠা নামার। ভেতরে দুপাশে বসার জন্য লম্বা কাঠের বেঞ্চ। বাকিরা ওপরের রডে হাত দিয়ে দঁড়িয়ে থাকতো। আমরা নাগাল পেতাম না বলে সহজে চড়তাম না। সংখ্যায় সে সব খুবই কম ছিল। ১৯৫৭ সালে টাটা কোম্পানির গোল্ডেন জুবিলি উৎসব জমজমাট হয়েছিল বেশ। শহর সেই প্রথম জুবিলি পার্ক পেল। শহর সাজানো হল। পুরনো গাড়ি বাস সরিয়ে হিন্দ মোটরের ল্যান্ডমাস্টার এল ট্যাক্সি হয়ে। বিহার ট্রান্সপোর্টের লম্বা দু-দরজাওলা বাস। সেই বছরই শুরু হল নয়া পয়সার জমানা। পুরনো পয়সার চল আর হিসাব উঠে গেল ধীরে ধীরে। ছাত্রদের অংকে কনভার্শনের সমস্যা শুরু হল। কোথায় টাকা আনা পাই পয়সা আর কোথায় নয়া পয়সা। আমার সমস্ত মজাই ছিল দিনের বেলায়। রাতে বাড়িতে বই মুখে। সাধারণত কারও সাথে কথা ছিল না একমাত্র মা ছাড়া। আর সপ্তাহে দুদিন বাইরে টিউশন পড়তে যাবার উৎসাহ, সঙ্গে আড্ডাও ছিল, তাই। ক্রমে ইলেভেন, টেস্ট পরীক্ষা হয়ে গেল। স্কুল ফাইনাল দেবার তোড়জোড়। দূরে এক জায়গায় সিট পড়েছে। বন্ধুরা মিলে শেয়ার করে একটা ট্যাক্সি ঠিক করলাম যাতায়াতের। পরীক্ষা ভালয় ভালয় শেষ হল। আমি তো নিশ্চিন্ত। অন্যদের টেনশন, তাদের বাড়ির লোকের টেনশন দেখে হাসি পেত। অনেকেই বাড়ি থেকে সপরিবার দীঘা পুরী বেড়াতে যাচ্ছে দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলতাম। সে অনেকদিন থেকেই। আমরা কখনো সবাই মিলে ট্রেনে চেপেছি মনে পড়ে না। বাবার শখই ছিল না। হয়তো পরিবারের জন্য কর্তব্য পালনের পর তার ইচ্ছা হত না। কেবল মা’র সাথে সেই ছোটবেলায় সীতারামপুর আর আগরতলা মনে আছে। কখনো কলকাতায়। যাই হোক, শেষ পর্যন্ত কয়েকজন বন্ধু মিলে দীঘা যাওয়া হয়ে উঠল। ১৬ বছরের চারজন তরুণের সমুদ্র সেই প্রথমবার। কী যে ভাল লেগেছিল সেই শিহরণ, দৃশ্য, ট্রেন আর বাস জার্নি ! সেই মুগ্ধতা আজও ভুলিনি। এর পরেও বহুবার দীঘা গিয়েছি কিন্তু প্রথমবারের সেই ভাল লাগা আর হয়নি।


খবর এল, ম্যাট্রিকের রেজাল্ট বেরোবে গেজেটে, আর সেটা পাটনা থেকে জামশেদপুরে আসবে ট্রেনে। স্টেশনের নাম ছিল কালিমাটি। বাইরের লোকের কাছে শহরের নাম ছিল টাটানগর। স্টেশনের বড় পাকা বাড়ি ছিল না। আমরা সব স্টুডেন্টরা ধৈর্য ধরতে না পেরে স্টেশনে হাজির ঘন্টা খানেক আগে থেকেই। স্টেশনের ছাদ টালির। অনেকে সেখানে উঠে ট্রেনের দিকে হা পিত্যেশ তাকিয়ে আছে। উত্তেজনা, কারও বুকে ধুকপুক। ট্রেন আসার আগে সবাইকে লাইন করে দাঁড়াতে বলা হল। ট্রেন এলে গেজেট নামিয়ে এক আনা করে বিক্রি করা হল স্টুডেন্টদের। আমি সাগ্রহে গেজেট খুলে আমার রোল নম্বরে দেখি লেখা আছে ফার্স্ট ডিভিশন, ৭০% মার্ক। বারে বারে দেখি আর চোখ জলে ভিজে যায় আনন্দে। জীবনে আমি অত আনন্দ আর কখনো পাইনি। মুক্তি, মুক্তি, মুক্তি। শেষ পর্যন্ত আমি জিতেছি। তখন ভাবি সবটাই আমার জয়। বাবা যে নিঃশব্দে আমার জয় নিয়ন্ত্রণ করেছিল আড়াল থেকে তখন তা বুঝতে পারিনি। ভেবেছিলাম আমারই জয়। বাবা চেয়েছিল এই বোধটা আমার হোক যে চাইলে আর লড়ে গেলে আমিও পারি। মনের আনন্দে আমার স্বাধীনতার পতাকা উড়িয়ে বাড়ি ফিরে এলাম। মাকে প্রণাম করে জড়িয়ে ধরলাম। মা আমার খুশি দেখে চোখের জল মুছলো। আমার একাকী জীবন ঘর ছাড়িয়ে বাইরে চলল এবার।


পর্ব ৭






ঝিক ঝিক ঝিক ঝিক ঝিক ঝিক ঝিক ঝিক --- জামশেদপুর ক্রমশ দূরে চলে যাচ্ছে| পথালো ক্রমে কম| পাওয়া না-পাওয়া, ভাল না-ভালোর স্মৃতি মনের স্লেট থেকে মুছে যাচ্ছে| জানালায় বসে দেখা| ষোলওয়াঁ সাল| শিহরণ| স্বপ্ন| ফ্যান্টাসি| কলকাতা চলেছি একা| ১৯৬০-এর মে মাস আর ফিরবে না|


তখন সত্যিই ঝিকঝিক শব্দ হতো রেলে| কুউউউ| কয়লার ধোঁয়া| রাতে টাটানগর ষ্টেশনে সম্বলপুর প্যাসেঞ্জারের তিনটে কামরা থাকত মূল ট্রেনে জুড়ে দেবার জন্য| আগেভাগে গিয়ে জানালার ধারে জায়গা নিয়ে বসে পড়লাম| সঙ্গে একটা কিট্স ব্যাগ| নো বাবা| পরোয়া ইল্লে| কোন সিনিয়র সঙ্গী থাকলেই বরং বিরক্ত হতাম| বুঝতে পারিনি আমাকে ঠেলা মেরে ভাসিয়ে দেয়া হল যা না বুঝেই তখন তো খুব এনজয় করলাম| আজকাল অভিভাবকরা এতটা ভাবতেও পারবেন না| উত্তেজনায় ঘুম এলো না| সারারাত লাল আকাশের দিকে চেয়ে বসে থাকলাম| টাটা কোম্পানির স্ল্যাগ ডিসপোজালের চ্ছটা লেগে থাকল চোখে|


পরদিন ভোরে হাওড়ায় পা| আমার জন্য রিয়ালি কলকাতায় পা| ট্রেন থেকে নেমেই দেখি মুর্তিমান কাকু দাঁড়িয়ে| জামশেদপুরে ভাল কলেজ ছিলনা বলে বাঙালিদের গতি কলকাতায়| সেই কোন ছোটবেলায় কিছু কিছু দেখেছিলাম| এখন প্রায় অচেনা| কাকু এলো সাপোর্ট দিতে| ভালই হল| কসবা কুমোরপাড়ায় কাকুর এক কামরার ভাড়া বাড়ি| কাকীমা আর চার ছেলে মেয়ে নিয়ে ছজনের সংসারে আমিও ঢুকে পড়লাম| সামনে এক ফালি বারান্দা পেরিয়ে যাতায়াতের গলি| পিছনে এক চিলতে বারান্দায় রান্নাঘর, তারপরই লম্বা এজমালি উঠোন, খাটা পায়খানা, বাথরুম| জলের ক্রাইসিস ছিল মারাত্মক| ছোট দু বালতি জল বরাদ্দ হত মাথা পিছু| তাতেই হাত মুখ ধোয়া, পটি, কাপড় কাচা, চান| সুজনের মতো সব কিছু মানিয়ে নিলাম| একদিন কাকুর সাথে চলে গেলাম সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে| লাইনে দাঁড়িয়ে ফর্ম ফিল আপ করে টাকা জমা দিয়ে একদিনেই ভর্তি হয়ে গেলাম| কত সহজ ছিল কলেজে ভর্তি হওয়া সেসব দিনে| ভাল নম্বর থাকলেই হল| তখন স্কুল ফাইন্যাল পাশ করে প্রি ইউনিভার্সিটিতে অ্যাডমিশন হতো| কলেজে ভর্তি হয়েই হোস্টেলের ফর্ম ফিল আপ করে পাশের রাস্তায় হোস্টেলে চলে গেলাম ওয়ার্ডেনের কাছে| হয়ে যাবে| অভিভাবকের সই চাই| কাকুকে ডেকে নিয়ে গেলাম| কাকু এসেই বলল – ‘স্বপন হস্টেলে থাকবো না| বাসায় থাকবো’| মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ল, স্বপ্নের বুদুবুদ চুরমার হয়ে যায় যে| আমি আর্তনাদ করে উঠলাম –-- ‘নাআআআআ| আমি বাসায় থাকবো না| হোস্টেলে থাকবো’| প্রচুর তর্ক করলাম| সিন ক্রিয়েট হচ্ছে দেখে তখনকার মতো চেপে গেলাম| কাকুর সাথে বাড়ি ফিরে এলাম| চোখে জল| স্বপ্নভঙ্গ হচ্ছে| নতুন শত্রু তৈরি হচ্ছে| চিনে রাখলাম|


কাকু আমার বাবাকে শ্রদ্ধা ভক্তি করতো ছোটবেলা থেকে বাবা তার দেখাশোনা করেছিল বলে| এর উপরেও কৃতজ্ঞতা ছিল বাবা তাকে অর্থসাহায্য এবং চাপ দিয়ে গ্র্যাজুয়েট করিয়েছিল বলে| তাই আন্তরিক দায়িত্ববোধ থেকে আমার দেখাশোনা আর প্রতিপালনের দিকে তীব্র দৃষ্টি দিয়ে আমার বাঁশ করে দিচ্ছে যে সে খেয়াল ছিল না তার| আমাকে বোঝার চাইতে নিজের দায়িত্ব পালন তার কাছে স্বাভাবিকভাবেই বেশি জরুরি ছিল| কাকুর দোষ নেই| ‘দোষ কারও নয় গো মা’ --- আমার গান হয়ে বেরলো| তার পরিবারের সান্নিধ্য ভালবাসা যে আমার অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়াবে সেটা ভাবার কোন কারণ ছিল না তার| আমি তৈরিই হয়েছি অন্য ধাতুতে| কাকু কাকীমার যত্ন আমার গায়ে লাগতো, মনে লাগতো না| জাস্ট কেয়ার করি না| ফলে আমার রুটিন ধীরে ধীরে মনের মতো তৈরি করে নিয়েছিলাম|


সকালে মুখ ধুয়ে কুমোরপাড়া ক্লাবের ছেলেদের সাথে দৌড়তে বেরোতাম| কসবা থেকে বালিগঞ্জ লেক বেড় দিয়ে ফেরার সময় রোজ দেখতাম বড় রাস্তার পাশের হাইড্র্যান্ট খুলে পাইপ লাগিয়ে কিছু লোক তোড়ে জল দিয়ে রাস্তা ধুচ্ছে, কিছু লোক লম্বা ব্রাশ দিয়ে ময়লা সরাচ্ছে| আজো তাই করে কিনা জানি না| বাড়ি ফিরে চান করে মুখে কিছু দিয়ে বই খাতা নিয়ে হেঁটে সোজা গোলপার্ক রামকৃষ্ণ মিশন লাইব্রেরি| বাংলা ইংরিজি মিলেয়ে লাখ খানেক বই ছিল সেখানে| মেম্বার হয়েছি| সকাল সন্ধ্যা মিলিয়ে ৬/৭ ঘন্টা রোজ লাইব্রেরিতে| সেখানে চান করার ব্যাবস্থাও ছিল| চার আনা রোজের কুপন গোটা মাসের জন্য কিনে রাখতাম| চার আনায় একটা পুরো মিল| ঐ লাইব্রেরি ছিল আমার সোনার খনি, কলকাতার শ্রেষ্ঠ উপহার| বই পড়ার অভ্যাস আমার ছোটবেলা থেকে| বাড়ির ছোট লাইব্রেরি, পাড়ার লাইব্রেরিগুলোকে মনে হল কুয়ো, এই সমুদ্রের কাছে| সকালে একসময় খেয়ে দেয়ে দশটার ট্রামে চেপে পার্ক স্ট্রিট| কলেজ|


কলেজে তখন দোতলা বিল্ডিং| কী সুন্দর বড় লোহার গেট| স্কুলের সাথে কলেজের অসাধারণ তারতম্য চোখ আর মন ধাঁধিয়ে দিলো| একেবারে নতুন অভিজ্ঞতা| নতুন বন্ধু সব| আমার স্কুলের সহপাঠী দুজন| কলেজে একটা ছোট লাইব্রেরি, দুটো ল্যাবরেটরি, একটা কমন রুমে খেলার ব্যাবস্থা| পেছনে মাঠের খেলাধুলো| ক্লাসে পড়ানোর স্টাইল| অনেক পাদ্রি ছিলেন| প্রিন্সিপাল, প্রোক্টর| ইংরাজি পড়াতেন একজন, নাম মনে নেই, হয়তো ফাদার বনহোমি, ইংরাজি নাটক আর কবিতাপাঠের রেকর্ড বাজিয়ে শোনাতেন| ইংল্যান্ডে রেকর্ড করা| নিজেও ভাল আবৃত্তি করতেন| তার ক্লাস খুব মনোরঞ্জক ছিল| আমাদের কলেজে কোন মেয়ে পড়তো না, হায় ! সেই মিডল স্কুল থেকেই সে রসে বঞ্চিত| এই নিয়ে আমার ঈর্ষা হতো প্রেসিডেন্সী থেকে বঙ্গবাসী, আশুতোষ পর্যন্ত অন্যান্য কলেজের প্রতি| কেন যে প্রেসিডেন্সীতে গেলাম না !


কলেজে অনেক নতুন বন্ধু হল, তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঘনিষ্ঠতা হল অমিত সরকারের সঙ্গে| শিবপুরে বাড়ি| ওর বাড়িতেও গেছি| আমার ওকে স্পষ্ট মনে আছে| ওর মনে আছে কিনা জানি না| বেঁচে আছে কি না| আমার আর অমিতের মধ্যে একটা কোন কেমিস্ট্রি ছিল, জানি না| কলেজে অফ টাইমে আমরা চলে যেতাম পার্ক স্ট্রিট সেমিটারিতে, সেটা ছিল একটু প্রাচীন| বেশি যেতাম সার্কুলার রোড সেমিটারিতে| বসে থাকতাম মাইকেল মধুসূদনের কবরের পায়ের দিকে ঘাসের জমিতে| গল্প করতাম কত কি ! অমিত খুব ভাল কথা বলতো| গান গাইতো, রবীন্দ্র সঙ্গীত| জামশেদপুরে আমরা বড় হয়ে শুধু হিন্দি সিনেমার গান শিখেছিলাম| বাংলা গান পারতাম না| অমিত খুব সহানুভুতিশীল ছিল| তর্ক ঝগড়া করতো না মোটেই| মাইকেলের পদতলে পথিক হয়ে বসে থাকতাম অবশ্য| দাঁড়িয়ে থাকতাম না| ওই ঘাসের বেডে ঘুমিয়ে পড়তাম কখনো| ক্লাস মিস হয়ে যেত|


কলেজ থেকে ফিরে যাওয়ার সময়টা আমার খুব প্রিয় ছিল| কখনো বাসে ট্রামে না, পায়ে হেঁটে| পার্ক স্ট্রিট দিয়ে সার্কুলার রোড হয়ে ল্যান্সডাউন, দেশপ্রিয় পার্ক, গড়িয়াহাট, গোলপার্ক মিশন লাইব্রেরি| সেটাই গন্তব্য| কখনো পার্ক সার্কাস, সৈয়দ আমীর আলি, গড়িয়াহাট, গোলপার্ক| আবার পার্ক স্ট্রিট ক্যামাক স্ট্রিট গুরুসদয় দত্ত রোড, সৈয়দ আমীর আলি গড়িয়াহাট গোলপার্ক| কোন দিন পার্ক স্ট্রিট চৌরঙ্গি, হাজরা রাসবিহারী, ট্র্যাঙ্গুলার পার্ক, গোলপার্ক| আমি পায়ে হেঁটে কলকাতা আবিষ্কার করছি| মানুষজন দোকানপাট বাস ট্রাম দেখতে খুব ভাল লাগতো| প্রায় গাঁইয়া একটা ছেলে ক্রমশ শহর চিনে শহুরে হবার চেষ্টা করছে| কখনো দাঁড়িয়ে দেখতাম গাছের ছায়া, একটা খাঁচায় বন্দী পাখি, একটা বাচ্চা মেয়ে অ্যালুমিনিয়ামের থালার সামনে বসে আছে, পেছনে তার টাঙানো প্লাস্টিকের তলায় ফুটপাথ পরিবার, মুখে হাসি| দেখি আর ভাবি| গল্প তৈরি হয়| কলকাতায় গিয়ে গল্প লেখা মাথায় উঠেছিল| কলেজের বাকি ছেলেরা বাসে ট্রামে, অনেকে বাড়ির গাড়িতে, কে কতক্ষণে বাড়ি পৌঁছবে| আমি লাইব্রেরিতে| কলকাতাকে চিনছি| এটা কি আমার টাইম পাস ছিল ? কি জানি| আমার ভাল লাগতো এভাবে টাইম পাসে|


এর সাথে আর একটা রিলিফ ছিল আমার| সুভাষের বাড়ি ছিল আলেয়া সিনেমার পাশে| বাবা উকিল, মা টিচার, দিদি ওকালতি পড়ছে| এই দিদিই ছিল আমার রিলিফ| সুভাষ তেমন পছন্দ করতো না ওর দিদিকে, কেন জানি না, ওর পছন্দ ছিল পাড়ায় ব্যাডমিন্টন খেলা দ্যাখা| দিদির সঙ্গে গল্প করতে বসে অন্য একটা আশ্চর্য জগৎ, অন্য চোখে দেখা, খুলে যেত আমার সামনে সিমসিম হয়ে| আমি তো গল্প খুঁজে ফিরি পথে বাজারে জনজীবনে, গড়িয়াহাট রোডের প্রতিটি দোকানে, বালিগঞ্জ স্টেশনের ওভারহেড ব্রিজে, সেমিটারির প্রাচীন বটগাছে, ছুটির দিন ট্রেনে দূরে দূরে, বজবজ, ডায়মন্ড হারবার, লক্ষ্মীকান্তপুর, বনগাঁ সবুজের মাঝখান দিয়ে, নিশ্চুপ, ঘুরে বেড়াই গন্তব্যহীন, উইদাউট টিকিট| রাতে বাড়ি ফিরে যাওয়া| যতটা সম্ভব বাড়ির বাইরে কাটানো আর কি| আর তা কাজে লাগানো| কি কাজে জানি না তখনো|


বাড়িতে থাকি না বলে কাকুর অস্বস্তি| মন বসে না বুঝতে পারলো| কেন বসে না, সেটা বোঝা তার পক্ষে সম্ভব ছিল না| বাবাকে কমপ্লেন করেও সুরাহা হল না| তখন নিজের বুদ্ধিতে একটা উপায় বার করলো কাকু| আমাদের একটা জয়েন্ট বাড়ি উঠছিল এখনকার বাঘাযতীন স্টেশনের কাছে| ১৯৬০ সালে তখনো স্টেশন হয়নি| গড়িয়ার রাস্তায় বাঘাযতীন মোড়ে নেমে কাঁচা পথে এক মাইল হেঁটে জায়গাটা| এক ছুটির দিন কাকু আমাকে নিয়ে গেল সেখানে| বাড়ি তোলার কাজকর্ম চলছে| ব্যাপারটা আমার কাছে একেবারে নতুন| নতুন গল্পের সন্ধানে আগ্রহ হল| কাকু আমাকে হিসাব রক্ষক করে দিলো| কত টাকা আসছে, কত খরচ, কত মাল কেনা হল, কতটা গড়া হল – সেসবের হিসেব রোজ রাখা একটা খাতায়| রোজ রাতে কাকু আমাকে বলতো আর আমি টুকে রাখতাম, জুড়ে রাখতাম| খাতা রাখার কাজও শিখে গেলাম আর কি| জায়গাটা ভিজিট করা আমার আর একটা নতুন কাজ হল| আমি যতক্ষণ বাইরে ততক্ষণ একা| আমার ভালই হল| লাইব্রেরিতে বই পড়া, পায়ে হেঁটে কলেজ থেকে ফেরার পরে আমার আর একটা প্রিয় কাজ হল এটা|


আমার একটাই আলটিমেট গন্তব্য হোস্টেল| আমার স্কুলের সহপাঠী দুজন পড়তো সিটি কলেজে| থাকতো হোস্টেলে| মাঝেমাঝে সেখানে চলে যেতাম| কী যে ভাল লাগতো| পড়াশুনোয় মনযোগ আমার বরাবরের| এবার স্পেশাল ইন্টারেস্ট ছিল জয়েন্ট পরীক্ষার ব্যাপারে| ফর্ম ফিল আপ করলাম| বি ই কলেজ আমার প্রেফারেন্স| শেষে কলেজের ফাইনাল পরীক্ষা হল| জয়েন্ট হল| আমি দুটোতেই খুশি| খুব ভাল দিয়েছি| যেন হয়েই গেছে| আমাকে আর পায় কে ? হোস্টেলে যাওয়া কে আটকাবে দেখি| জয়েন্ট শেষ হয়েছিল ১৯৬১ সাল মে মাসের প্রথমে| তখন আর কলেজ থেকে পায়ে হেঁটে বাড়ি ফেরা নেই| সারাক্ষণ লাইব্রেরি| এক সপ্তাহ ধরে লেকের মাঠে বিশাল ম্যারাপ বাঁধা হচ্ছে, রবীন্দ্রজন্মের শতবর্ষ উদ্যাপন হবে| যখন শুরু হল অনুষ্ঠান আমার চক্ষু চড়কগাছ| মানুষের স্রোত আর ব্যাপক এলাহি কান্ড আমার কল্পনার সীমা ছাড়ালো| ভেতরে ঢুকে বসে গানের এবং অন্যান্য নাচ আর নাটকের প্রোগ্রাম দেখে শুনে মুগ্ধ হই| আমি এতদিন ধরে এত লাইব্রেরি ঘেঁটে পড়াশুনো করলাম, কেউ আমাকে গাইড করেনি রবীন্দ্রনাথকে পড়ার জন্য| ঠিক করলাম এরপর রবীন্দ্রনাথ আর রবীন্দ্রনাথ|


মনের সুখে জামশেদপুরে ফিরলাম| হাওয়ায় ভাসছি| এসে শুনলাম মা সেই মাসেই আগরতলা যাবে| আমার পরীক্ষা শেষ| আমি সঙ্গী| আমি আর মা ১৯৬১ মে মাসের শেষে চললাম আগরতলা, মামাবাড়ি| সেখানে এক নতুন অভিজ্ঞতা অপেক্ষা করেছিল আমার জন্য|


পর্ব ৮






আমার তখন সাত সতেরোর কাল| ১৯৬১| দ্বিতীয় বারের জন্য যাচ্ছি আগরতলা| ছোটবেলায় দেখা ছোট ছোট আগরতলা, জুড়বো কি করে, আমার উত্তেজনা থামছে না| আগেরবার, ৪ বছর বয়সে, হারাতে হারাতে আগরতলায় পৌঁচেছিলাম পূর্ব পাকিস্তান ঠেঙিয়ে| সঙ্গে ছিল একজন চলনদার| এবার আকাশপথে| সেটাই উত্তেজনার প্রধান কারণ| একদিন সকালে দমদম থেকে প্লেনে চড়ে বসলাম মা’র সাথে| ফকার ফ্রেন্ডশিপ-এর ছোট বিমান, কুড়িজনের সিট মাত্র| ছোটবেলায় প্রথমে স্বপ্ন দেখেছিলাম বড় হয়ে বাসের ড্রাইভার হবো| সেসব স্বপ্ন খুব তাড়াতাড়ি বদলে যায়| পরপর ট্রেনের, প্লেনের পাইলট হতে চেয়েছিলাম| আজ স্বচক্ষে পাইলট দেখে চোখ সরে না| সে কেবিনে ঢুকে কি করছে, কিভাবে চালাচ্ছে, দেখার ইচ্ছা থাকলেও উপায় নেই| সিটের বেল্ট বাঁধা যে| প্লেনে চড়ার অভিজ্ঞতা সেই প্রথম| আমি বিস্ময়ে বিমূঢ়| মা’র অবস্থা তথৈবচ| দুজনেরই প্রথম| প্লেন তো উড়ল, আকাশে উঠতেই পেটের মধ্যে গুরগুর পাক| শক্ত করে সিটের হাতল চেপে ধরলাম, যেন পড়ে না যাই| আকাশে পাক দিয়ে সোজা চলল আমাদের প্লেন| নিচে, অনেক নিচে বাড়ি ঘর নদী সবুজ মাঠ দেখে চিনে উঠতে পারি না| পূর্ব পাকিস্তান পেরোচ্ছি| মাকে জিজ্ঞেস করতে গেছি, মা ইশারায় চুপ করে বসে থাকতে বলল| ঘন্টা দুয়েকের উৎকন্ঠার শেষে আবার চক্কর দিয়ে আমাদের প্লেন নামলো সিঙ্গারবিল নামে একটা ছোট্ট এরোড্রামে| গুটি গুটি পায়ে অভিজ্ঞতাটা হজম করতে করতে বাক্স নিয়ে আমরা বাইরে বেরিয়ে দেখি মামা দাঁড়িয়ে আছে| পুরো যাত্রাটা আনন্দে আর ভয়ে কেটেছে| এরোড্রাম থেকে বেরিয়ে হাঁফ ছাড়লাম| এটা নতুন জায়গা| অচেনা| আগের বার আখাউড়া ষ্টেশনে| আমরা দুটো রিক্সা করে মামাবাড়ি চললাম| প্লেনের পরেই রিক্সায় দারুণ মজে লেগেছিল| সারা পথে সবই নতুন, সবই ভাল লাগা| নতুন জায়গায় ভ্রমণের মতো শিহরণ| চোখ দিয়ে গিলছি| মামা স্কুল টিচার| বলল – কি ভাগনা, পরীক্ষা কেমন দিসো ? আমি আকাশ থেকে পড়লাম| মামাকে ভাল লেগেছিল জামশেদপুরে আমাদের সাথে জুবিলী পার্ক বেড়াতে গিয়ে জামশেদজী টাটার মুর্তির সামনে দাঁড়িয়ে হাত জড়ো করে চোখ বুঁজে প্রণাম করতে দেখে| আমি কখনো করিনি, কাউকে করতে দেখিনি| মামা বলেছিল মহাপুরুষ ইনি, এত বড় কান্ড কারখানা, এত মানুষের প্রতিপালনের ব্যবস্থা করেছেন| প্রণাম কর এনাকে| সেই প্রথম শিখলাম যে মহাপুরুষের মুর্তিতেও প্রণাম দেতে হয়|


এবারের আগরতলা নতুন আবিষ্কার আমার| কিছুই আর আগের সাথে মেলে না| মামাবাড়ি গেলাম হাবড়া নদীর পুল পেরিয়ে অরুন্ধতী নগরে, বারদুয়ালি নামের একটা জায়গায়| পথের ধারে অনেকটা জায়গায় মামাবাড়ি, বাগান ঘেরা, কিন্তু পাকা বাড়ি নয়, শুধু মেঝেটা পাকা, বাঁধানো| অনেকগুলো ঘর| বাঁশের ছাঁচের দেয়াল, মাথায় অ্যাসবেস্টসের ছাদ| একটা কুয়োতলা, একটা চাপাকল, একটা খাটা পায়খানা, একটা ছোট পুকুর, আর আম কাঠালের বাগান| পিঠোপিঠি মামাতো ভাই কুমার আমার বন্ধু হয়ে গেল| এছাড়া দুই বোন আর আরো এক ভাই| মামা মামীমাকে নিয়ে এই সংসার| এরকম বৃহৎ সংসারে আমার কোন অসুবিধা হওয়ার কারণ নেই| মামীমা জলপাইগুড়ির মেয়ে| একদিন তার এক দাদা এলেন জলপাইগুড়ি থেকে বেড়াতে| আলাপ হল| এই আলাপ যে দীর্ঘস্থায়ী হতে চলেছে তখন কি আর জানতাম| ভবিষ্যৎ যে কোন পথে যায় ! দাদাকে শান্তিমামা বললাম| বেশ খাতির হল| তাকে মনে থাকবে, কেননা তার এক হাতে ছ’টা আঙুল ছিল| কুমারের সাথে শহর ঘুরে বেড়ালাম| তখনো রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে এই শহরের সম্পর্কের কথা জানি না| রাজপ্রাসাদ দেখলাম, রাজার কাহিনী শুনলাম, মনে বসল না| প্রাসাদ বড় মনোরম অবস্থানে| বিশাল জলাশয়ের গায়ে| ওরকম কোন প্রাসাদ আগে দেখিনি|


আরো দেখলাম তুলসীবতী বালিকা বিদ্যালয়| আমাকে পড়াশুনো শেখানো আমার মা নিজে এখানে পড়াশুনো শিখেছিল| মা তখনকার দিনে, ১৯৪০ সালে, বাংলা বিহার উড়িষ্যার এফ এ বোর্ডের পরীক্ষায় ফার্স্ট হয়ে সোনার মেডেল পেয়েছিল| সেটা আমি বাড়িতে দেখেছি| মুগ্ধ ছিলাম তাই| তার স্কুলটাও দেখলাম| উমাকান্ত অ্যাকাডেমি, যেখানে মামা পড়ায়| আর প্রয়াত অমর ভট্টাচার্যর বাড়ি| তিনি আমার সুন্দরী দিদিমার বাবা ছিলেন, তাই কোথায় আমার দিদিমা আর মার ছোটবেলা কেটেছিল তা দেখার আগ্রহ ছিল খুব| তিনি শুনেছি তৎকালীন রাজার দেওয়ান বা খাজাঞ্চি ছিলেন চাকুরিসূত্রে| এছাড়া নাকি স্বপ্নে পাওয়া একটা সঞ্জীবনী সালসা, নাম – অমর সালসা, বিক্রি করে লক্ষপতি হয়েছিলেন সেকালে| তার বিশাল বাড়ি ও পরিবার তখনো একত্র ছিল| আগেরবার মনে আছে কোন একটা অকেশনে রাজবাড়ির দিঘী-পারের মাঠে আতসবাজি হয়েছিল খুব| ফাঁকা মাঠ দেখে মনে পড়ল| আমরা গেলাম চোদ্দদেবতার মন্দিরে| অসুন্দর, অরক্ষিত| দুই দেবতা মুন্ডুহীন| এ নিয়ে গল্প আছে| আমি কান দিলাম না|


আগেরবারের আগরতলা ছিল গ্রাম| এবার আধা শহর| পথে দু একটা বাস দেখা গেলেও যানবাহন সাধারণত রিক্সা| আমি আর কুমার পায়ে হেঁটে, কখনো রিক্সায় আগরতলা ঘুরে বেড়ালাম| সে চারদিনেই শেষ| তারপর শুধু কাঠাল গাছ আর কাঠাল গাছ| মাঝে সাঝে দু একটা সিগারেট| সন্ধে আর রাতে বোর হতাম খুব, লাইব্রেরি মিস করতাম| এর মধ্যে কুমার একটা নতুন গল্প জুড়ে দিলো| ওর এক মেয়ে বন্ধু ছিল, খুব মাখামাখি| সঠিক অর্থে প্রেমিকা না| সেই মেয়ে আমার জন্যও একটি মেয়ে বন্ধু ফিট করে দিলো| নাম সীমা| আমরা চারজনে সন্ধ্যাবেলা হেঁটে শহর ছাড়িয়ে দূরে চলে যেতাম গল্প করতে করতে| অন্ধকারে জড়িয়ে ধরা চুমু খাওয়া, হাত ধরাধরি করে উন্মুক্তে হাঁটা, এসব প্র্যাক্টিস হচ্ছে| সতেরো বছর বয়সে কতটুকু আর| আরো অনেক কান্ডের মধ্যে একটা ঘটনা স্পষ্ট মনে আছে আমার| হাবড়া নদীর একটু দূরে প্যারালেল রাস্তার পাশে একটা সিনেমা হল ছিল, নাম রূপসী, হয়তো| সেখানে এক সন্ধ্যায় একটা বক্স ভাড়া নিয়ে, তখনো আগরতলায় ইংরেজদের আমলের বক্স সিস্টেম ছিল থিয়েটার সিনেমায়, আমরা চারজন, আমি-সীমা-কুমার-আর তার বন্ধু দুটো সোফায় জোড়ায় বসে ঘন্টা দুয়েক খুব মাখামাখি করলাম শেষ কম্মটি বাদে| কিশোরকালের যৌনতার খেলা| ওই বয়সে অভ্যাস শুরু হলেই না যৌবনে সফল যৌনতা জাগবে| পাড়ার বা শহরের ছেলে হলে সীমা নিশ্চয়ই এতোটা এগোত না| মনে থাকবে সীমাকে| আমাকে চিঠি দিতো কলকাতার ঠিকানায়| একদিন মা’র হাতে| ছি ছি| মা বলল – এসব করার সময় পাবি আরো| এখন শুধু পড়ায় মন রাখ| উত্তর দিস না| আমিও ঠিক করলাম আর না| আগরতলায় সেই সময় ছিল অঢেল প্রাকৃতিক সবুজ| আজ নিশ্চয়ই তা আর নেই| সবুজকে টা টা করে একদিন আমি আর মা ফিরে এলাম কলকাতা হয়ে জামশেদপুর| আকাশ সফরের প্রথমবারের বিস্ময় আর নেই| রেজাল্ট বেরোবার সময় হল| ফিরে এলাম কলকাতায়|


প্রি ইউনিভার্সিটি আর জয়েন্ট দুটোতেই পাশ| কী আনন্দ কী আনন্দ ! গিয়ে বি ই কলেজে ভর্তি হয়ে গেলাম| হোস্টেলের জন্য গিয়ে মাথায় দ্বিতীয়বার আকাশ ভেঙ্গে পড়ল| কি কপাল, আহা ! আমি একমনে জয়েন্ট দিয়েছি বি ই কলেজ মাথায় রেখে| ১৯৬১-তেই আরো তিনটে ভুঁইফোড় কলেজের জন্যও একসাথে পরীক্ষা হয়েছিল, তাই সেটার নাম ওই বছর থেকে জয়েন্ট| দুর্গাপুর, দক্ষিণেশ্বর, জলপাইগুড়ি এই তিনটে অলীক কলেজের জন্যও ছিল ঐ কমন জয়েন্ট| জলপাইগুড়ির ছেলেদের সেখানে পাঠিয়ে দেয়া হল| বাকি দুটো কলেজের ছেলেদের বি ই কলেজে ভর্তি করা হল| ওরা সেখানেই পড়াশুনো করবে| দুর্গাপুরের তবুও বিল্ডিং উঠছিল, তারা পরের বছর দুর্গাপুরে চলে গেল| দক্ষিণেশ্বর আর হল না| ছাত্ররা বি ই কলেজের হয়েই থেকে গেল| আমার বাধা হল যে, সেবার ঠিক করা হয়েছে, দুর্গাপুর আর দক্ষিণেশ্বরের ছেলেরাও বি ই কলেজের হস্টেলে থাকবে| জায়গা অকুলান হওয়ায় আগেকার বাধ্যতামূলক হস্টেলের বদলে অপশনাল করে দেয়া হল| যারা কলকাতা হাওড়া বা আশেপাশে থাকে তারা বাড়ি থেকে যাতায়াত করবে, আর দূরের ছাত্ররা হস্টেলে থাকবে| আমার ঠিকানা লেখা ছিল ‘কসবা’| ব্যস ! কাকু চেপে ধরল -- ‘বাসায় থাইক্যা যাতায়াত করবি| ভালই হইসে’| ঘোড়ার ডিম ভাল হয়েছে| আমার বাঁশ গেছে| কাকু বুঝবে না| আমার তখন পাগল পাগল লাগছে| একবার ভাবলাম উধাও হয়ে যাই| তখন হিপি কালচার এদেশে ঢুকছে| রেস্তহীন ভেসে পড়া হল না শুধু মা’র মুখ মনে প’ড়ে| কসম খেলাম – বাইরে যাবই| দিন কুড়ি পর বি ই কলেজে ক্লাস শুরু হবার কথা| ঠিক করলাম আমি সেখানে পড়ব না| বি ই কলেজে ভর্তি হয়েও অবাধ্য হয়ে ফিরে গেলাম না|


আমি বিনে পয়সায় ট্রেনে চেপে কাগজপত্র আর মার্ক শিট ব্যাগে নিয়ে ঘুরে বেড়াতে থাকলাম বাঁকুড়া-ডায়মন্ড হারবার-নৈহাটি-চুঁচুড়া-হুগলি-সিউড়ি-বর্ধমান-বহরমপুর-কৃষ্ণনগর – যেসব কলেজে হস্টেল আছে সেখানেই গেছি| ছুটে বেড়িয়েছি একা একা| কেউ নেই যার সাথে পরামর্শ করবো| সব কলেজেই ভর্তি হওয়া যাচ্ছে কিন্তু হস্টেল ফুল হয়ে গেছে বা আমার অপছন্দ তার হাইজিন| হুগলি মহসীন কলেজ খুব পছন্দ হল কিন্তু অনেক অনুরোধেও হস্টেল হল না| ওদিকে কাকু রোজ আমাকে বকে| বাবাকে কমপ্লেন করল আমার অবাধ্যতা নিয়ে| বাবা কিছু বলল না| আমার ওপর ছেড়ে দিলো| সেই প্রথম বাবাকে শ্রদ্ধা করলাম| টের পেয়েছিলাম সুপারিশ ছাড়া ওই অবস্থায় হস্টেলে হবে না| অসফল হয়ে ফিরে এসে কলকাতায় মন দিলাম| একাই বিদ্ধস্ত হচ্ছি| পরাজিত হচ্ছি| পরাজয়ের গ্লানি কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছি| স্বপ্নভঙ্গের বেদনা শোনাই নিজেকেই| আর কেউ নেই তো যে কাঁধে হাত রাখবে| চোখের জল গিলে নেমে এলাম আকাশ থেকে মাটিতে| দেরি হয়ে গিয়েছিল| সেন্ট জেভিয়ার্সেও জায়গা পাওয়া গেল না| কি করা যায় ? তখন আমাদের বাঘাযতীনের বাড়ি কমপ্লিট প্রায়| যে কোন দিন শিফট করা হবে| আমি বৈষ্ণবঘাটা দীনবন্ধু অ্যান্ড্রুজ কলেজে ভর্তি হয়ে গেলাম| বাড়ির কাছে হবে|


ফার্স্ট ইয়ার বি এস সি| নতুন বন্ধুবান্ধব| এন সি সি-তে নাম লেখালাম| রাইফেল কাঁধে মার্চিং, ড্রিল চেঁচামিচি, উত্তেজনা, হাতের মুঠো শক্ত হয়ে যায় কার বিরুদ্ধে কে জানে| হা হা হা| যেদিন বাড়ি শিফট হল বর্ষাকালে, মনে আছে কলেজের ল্যাবরেটরি থেকে গেঁড়িয়ে এক বোতল কার্বলিক এসিড নিয়ে এসেছিলাম| আমি একলা লন্ঠন জ্বেলে বাড়িতে প্রথম রাত কাটাবো| যা সাপের ভয়| জায়গাটা জলাভূমি ছিল তো| মাটি ফিল আপ করে ডাঙ্গাজমি হিসেবে বিক্রি হয়েছিল| সাপ কিলবিল করে| রাতে চারপাশে কার্বলিক এসিড ছড়িয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমোলাম| দুটো প্রান্ত ফিক্স হয়ে গেল| দক্ষিণে কলেজ আর উত্তরে মিশন লাইব্রেরি| মাঝখানটা ডাঁয়ে বাঁয়ে টালিগঞ্জ-গড়িয়া-নাকতলা-পাটুলি-যাদবপুর-সন্তোষপুর পায়ে চষে ঘুরে বেড়ালাম| যাদবপুরের আরো বিল্ডিং উঠছে| সহপাঠী স্বপন ঘোষের বাড়ি যেতাম বিক্রমপুরে| মনে আছে কারণ শুনেছি আমাদের আদি বাড়ি ছিল ঢাকার বিক্রমপুরে| লালকার মাঠে আড্ডা মারার অভ্যাস হল ক্লাসের ছেলেদের সাথে| এন্ড্রুজ কলেজে মেয়েরা পড়ত| একজনও চোখে লাগেনি, কাউকে মনে নেই| আমার তখন একটাই লক্ষ্য| কি করে কলকাতা ছাড়বো আর দূরে কোথাও হস্টেলে ভর্তি হবো| একবছর পর আবার জয়েন্ট| আমি ফার্স্ট প্রেফারেন্স দিলাম জলপাইগুড়ি গভঃ ইঞ্জিনীয়ারিং কলেজ| পরীক্ষায় পাশ করলাম| এবার ?


না আঁচালে বিশ্বাস নেই – কথাটা মনে রাখলাম| ফুঁ দিয়ে পথ চলা| সেলাম কলকাতা| বাই বাই| জামশেদপুর ঘুরে কলকাতা হয়ে জলপাইগুড়ি চললাম নতুন জায়গায় নতুন পথে একা সম্পুর্ণ অচেনা দেশে| এখন ভাবি গেলাম কি করে ? কোন তাড়না ছিল ভেতরে ভেতরে ? আমি বেপরোয়া চললাম| পথে একবার শিলিগুড়িতে, তখনো নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন নেই, জলপাইগুড়ির ট্রেনের দেরি আছে, আমি বৃষ্টির মধ্যে ছাতা মাথায় রিক্সা করে শিলিগুড়ির দেশবন্ধুপাড়ায়, মহানন্দার ধারে এক দূর আত্মীয়ের বাড়ি দেখা করতে গেলাম| চা খেয়ে ফেরত এসে ট্রেনে বসলাম| ষ্টেশনে নেমে কাছেই একটা হোটেলে উঠলাম| সেখানে ইন্টারভিউ দেবার জন্য এসেছে আরো অনেকের দেখা পেলাম| পরের দিন কলেজে পৌঁছে একটু হতাশ হলাম| কিছুই নেই| সব কিছুই হচ্ছে| আপাতত কয়েকটা মেশিনহীন শেডে অফিস, ক্লাসরুম, হস্টেল সেপারেটর দিয়ে ভাগাভাগি করে চলছে| ইন্টারভিউ হল| চান্স হয়ে গেল, ইলেকট্রিকাল চেয়েছিলাম তাতেই| আমি খুশ| পরের বছর হস্টেল হবে এই ভরসায় আনন্দে নাচি| অবশেষে আমার স্বপ্নের জয় হল| হাহা হাহা হাহা হাহা ---- আমি গলা ছেড়ে গান ধরলাম --- একদিন সূর্যের ভোর ----


পর্ব ৯






একদিন জলপাইগুড়ি গভঃ ইঞ্জিনীয়ারিং কলেজে ভর্তি হয়ে গেলাম| টিউশন ফি মাসে ১৩ টাকা| অবিশ্বাস্য| জেভিয়রে ছিল মাসিক ৮ টাকা| ভাবতে পারেন এখন কেউ ? কলেজে ক্লাস শুরু হতে একমাস দেরি হবে| অতদিন হোটেলে পড়ে থাকার মানে হয় না| শুনেছিলাম রায়কতপাড়ায় সেই আগরতলার মামীমার বাপের বাড়ি| আমি তো ছয় আঙুলওলা শান্তিমামাকে চিনতাম| খুঁজে পেতে হাজির হলাম| একতলা শরিকি বাড়ি| মাঝখানে উঠোনের চারপাশে ঘর অনেকগুলো| শান্তিমামারা চার ভাই, সবার আলাদা সংসার, কিন্তু কী সুন্দর মিলেমিশে থাকে| দুটো ঘর অতিথিদের জন্য| করোগেটেড টিনের ঢালু ছাদ মাথার ওপর| ঘরে বাঁধানো মেঝে, টানা দাওয়া| দাওয়ায় বসে আড্ডা, খাওয়া দাওয়া| উঠোনের মাঝে কুয়ো, চাপাকল| একপাশে বাথরুম, খাটা পায়খানা| জামশেদপুর থেকে বেরিয়ে আমি এখনো পাকা পায়খানা দেখিনি| তাতে কি ? ময়দানে তো যেতে হয় না| এদের একহাঁড়ি, সদস্য ২০ জন| ভয়ে ভয়ে আবদার জনালাম হোস্টেল না হওয়া পর্যন্ত এখানেই থাকতে চাই| তারা তো এক কথায় রাজি| বড় মামা বললেন – ‘নিরুর পোলা তুমি, থাকবা কই ? এইখানেই থাকবা’| নিরুপমা আমার মায়ের নাম| বললেন –‘আইসা পড়’| আমি বললাম, একবার বাড়ি থেকে ঘুরে আসি, তারপর, কলেজ খুললে| আমার মুশকিল আসান পিছনে পিছনে চলছে| কারও সাথে আলোচনা না করে আমি নিজেই স্থির করছিলাম এসব|


এক মামার ছেলে প্রদীপ, আমার চেয়ে কিছু বড় আর লম্বা, পড়তো আমাদের কলেজের পাশেই ডিপ্লোমা ইঞ্জিনীয়ারিং কলেজে, আমার বন্ধু হয়ে গেল| ওই বাড়িতেই অন্য এক মামার মেয়ে খুকু হল আমার বান্ধবী| খুকু ফর্সা, ছোটখাটো চেহারা, হায়ার সেকেন্ডারি দেবে, ছটফটে| তার চোখের হাসি দেখে মরে যাই আর কি| ভাবলাম দিনগুলো জমবে ভাল| ছোট বড় সব মামীমার সঙ্গেই ভাব হয়ে গেল| আজ ভাবি, বাড়ির অযত্নে বেড়ে ওঠা আমার কথায় ব্যবহারে মানুষ কেন যে সদয় হতো তা নিয়ে তখন ভাবিনি কেন| তুমি যতই বিরূপ হও না কেন, সমাজ সংসার তোমার ভালই চায়| আমাদের বুঝে উঠতে বেলা বয়ে যায়| বাড়ি ঘুরে এসে রায়কতপাড়ায় উঠব ঠিক হয়ে গেল| আমার ১৮ বছর বয়েস| একা একাই এতদূর চলে এসেছি| আমি পারি|


হৈ হৈ করে জামশেদপুরে ফিরে এলাম| প্রায় বিজয়গর্বে ফেরা| জীবনে আর কোনদিন আমি অত আবেগে ভাসিনি| সদ্য তরুণ, ইওটোপিয়ান হ্যালুসিনেশনে ভরে থাকল দিনগুলো| পাড়ার সব মেয়েরাই আমার প্রেমিকা, বাবার আমি প্রিয়পুত্র, আমার বন্ধুদের নয়নের মনি| হঠাৎ করে সবার চোখে ব্যবহারে আমি ভালবাসার ইঙ্গিত পাই| আমাদের দুটো বাড়ির পরেই থাকতো জয়তীরা| একদিন আড়ালে পেয়ে জয়তী আমার একটা হাত মুঠোয় ধরে চেয়ে থাকলো| চোখে জল| বুঝলাম না| এই আনন্দের মুহুর্তে চোখে জল কেন ? ওটাকে যে অশ্রু বলতে হয় তা মনে পড়ল না সেদিন| মায়ের সেই আনন্দে উজ্জ্বল মুখ কখনো ভুলবো না| আমার সমস্ত প্রাপ্তির শ্রেয় আমার মায়ের| যেন তারই সাফল্য| এই কথা লিখতে লিখতে এখন আমারই চোখ জলে ভরে উঠছে| বাবা শুধু আমার পিঠে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলো| আমি বোর হয়ে সরে গেলাম| বন্ধুদের সাথে আড্ডার সময় বয়ে যাচ্ছে| সেদিন ওরা আমাকে খাওয়াবার ব্যবস্থা করেছিল| একপেগ ডিপ্লোম্যাট হুইস্কি দিয়ে শুরু, ক্যাপস্টান সিগারেট, মাংসভাত, আর আড্ডা| আমার জলপাইগুড়ি ভ্রমণ বৃত্তান্ত| রঙ চড়িয়ে গল্পের ছলে সেসব বলার পর খেয়াল হল আমি তো বেশ গল্প বানাতে পারি| আমার হবে| ছোটবেলায় কলকাতার কাগজে গল্প লিখেছি| কলকাতার পথে পথে গল্প কুড়িয়েছি| ভেতরে ভেতরে একজন গল্পকার তৈরি হচ্ছে| সবাই স্পেলবাউন্ড হয়ে আমার গল্প শুনছে| একক বক্তার দারুণ ফিলিং হয় এই অবস্থায়| আরো উৎসাহে গল্প অফুরান হয়ে উঠলো|


ওদের মধ্যে ছিল চিরপ্রেমিক সুভাষ| সুভাষ ভট্টাচার্য| ৬ ফুট, কোঁকড়া চুল, ফর্সা, চোখেমুখে কথা বলে --- সে চুপচাপ আমাকে তার বাড়ির ঠিকানা লেখা একটা চিরকুট ধরিয়ে বলল --- যখন এভাবে মনের মধ্যে কথা জমবে, বলার কথা ভাববি, কাগজে লিখে আমাকে পাঠিয়ে দিবি| কোন পাঠক তৈরি হল আমার সেই প্রথম| পরে এই সুভাষই যে হবে কৌরবের প্রথম সম্পাদক, তখন কি আর জানতাম| আজ মনে হয় যদি জানতেম|


সুটকেস বেডিং আর ব্যাগ গুছিয়ে রওনা দিলাম একদিন| ক্লাস শুরু হতে আর ৫ দিন বাকি| আগস্টের শেষ| বর্ষা প্রায় গত| শিয়ালদা থেকে ছাড়ে দার্জিলিং এক্সপ্রেস, রাতে| তখনো মেল হয়নি| ষ্টেশনে পৌঁছে দেখি কলেজের অনেক ছেলে, সদ্য ভর্তি হওয়া, যাচ্ছে ঐ দিনেই| ভালই হল| গল্পগুজব করে সবাই ঘুমিয়ে পড়লাম| শেষরাতে ট্রেন থামতে নেমে হাঁটাহাটি করলাম একটু| স্টেশনের নাম ‘তিনপাহাড়ী’| নতুন রেলপথের সবটাই অচেনা| সব ভাল লাগছিল| রাজমহল, পাকুড় ছাড়িয়ে তিনপাহাড়ী| তিনটে পাহাড় দেখা যায় তিনপাশে| স্টেশনটা চা-এর জন্য বিখ্যাত| ঠিক যেমন টাটা হাওড়া লাইনে মেচেদা স্টেশন| ভোররাতে সেখানেও ট্রেন দাঁড়ায় চা-সিঙারা খাবার জন্য| জনপ্রিয় সেই খাবার| তিনপাহাড়ীতে প্যাসেঞ্জারের ওঠানামা নয়, চা-পানের জন্য বিরাম| অপূর্ব সেই চা| পাহাড় ঘেরা তিনপাহাড়ী মনে বসে গেল| দারুণ সুন্দর জায়গা| মনে পড়ল জামশেদপুরের কথা| শহর ছাড়ালেই নদী জঙ্গল পাহাড় চারপাশে| সে কি রে ভোলা যায় !


এরপর একঘন্টা চলে আমাদের ট্রেন দাঁড়ালো সাহেবগঞ্জে| এখানে গঙ্গা নদী| পেরিয়ে যেতে হবে ওপারে| ষ্টেশনে প্লাটফর্ম নেই| এখান থেকে আধমাইল বালিয়াড়ি ভেঙে সকরিগলি ঘাট| শুনলাম বর্ষায় গঙ্গায় জল বাড়লে এই ঘাট, কমলে সাহেবগঞ্জ ঘাট| ওপারে মনিহারিঘাট| সেখান থেকে মিটার গেজে আবার দার্জিলিং এক্সপ্রেস| বেশি মাল, তাই কুলির মাথায় চাপিয়ে| একেবারে স্টিমারে চাপিয়ে দিলো কুলি| দেখি একটা লঞ্চও আছে| আগের বারও স্টিমারে গিয়েছিলাম| লঞ্চটা আগে ছাড়লো| ঠিক করলাম পরের বার লঞ্চে যাবো| ভোরে গঙ্গার বুকে অসম্ভব ভাল লাগছে| মিস্টি হাওয়া| কলকাতার গঙ্গার দৃশ্য দেখে অভ্যস্ত চোখে এখানের মুক্ত পাড় অদ্ভুত লাগল| চরাচরে শুধু একটা নদী, পায়ের তলায় ভাসমান স্টিমার ছাড়া আর কিছু নেই| ওপারে নেমে আবার হাঁটা আধ মাইল| তাড়াহুড়ায় পথের পাশের ঝাঁপবন্ধ দোকানগুলো লক্ষ্য করলাম না| পরে দেখেছি সবকিছুই গোয়ালন্দের মতো| পৃথিবীর সমস্ত ঘাটের পথের দুধারে একই দৃশ্য দেখে মনে হয়েছিল একই লোকের দোকান এসব| অবশেষে কাটিহার কিষনগঞ্জ হয়ে ট্রেন এসে থামলো শিলিগুড়িতে| আগেও একবার ইন্টারভিউ দেবার সময় এসেছিলাম এই পথে| উত্তেজনায় কিছুই প্রায় দেখা হয়নি সেবার| হাতে একটু সময় আছে| ঘুরে দেখে নিলাম দাঁড়িয়ে থাকা দার্জিলিং-এর টয় ট্রেন| এই ট্রেনে চেপে একদিন দার্জিলিং যাবো| হাতের কাছে এইসব পেয়ে রোমাঞ্চ হচ্ছিল| এখান থেকে গাড়ি বদলে মিটার গেজের হলদিবাড়ি প্যাসেঞ্জার ট্রেনে জলপাইগুড়ি যেতে হবে| তখনও নিউ-জলপাইগুড়ি স্টেশন হয়নি| ১৯৬২-তে চীন-যুদ্ধের পর উত্তরবঙ্গে ব্রডগেজ লাইন পাতা শুরু হলে নিউ জলপাইগুড়ি, ফারাক্কা ব্রিজ, তিস্তা ব্রিজ, জলপাইগুড়ি রোড স্টেশন হতে হতে ১৯৬৫ হয়ে গিয়েছিল| পাব্লিকের জন্য না, মিলিটারি আর মালপত্র দ্রুত পরিবহনের জন্য ওই সব আয়োজন| মনে হতো ভাগ্যিস চীনারা অ্যাটাক করেছিল| জলপাইগুড়িতে নেমে সবাই নিজের নিজের ব্যবস্থায় থাকার জন্য চলে গেল| আমি রায়কতপাড়ায় শান্তিমামাদের বাড়ি|


সময়মতো কলেজে ক্লাস শুরু হল| ওয়ার্কশপ টাইপের গোল শেডের তলায় লম্বা কাঠের টেবিল, বেঞ্চ আর ঝোলানো ব্ল্যাকবোর্ড, ঠিক স্কুলের মতো --- এভাবেই শুরু হল ইঞ্জিনীয়ারিং-এর ক্লাস| পার্টিশন দিয়ে ক্লাস আর সেকশনের ডিভিশন| গতবছর কলেজ শুরু হয়েছে কিন্তু প্রশাসনের ঢিলেমির জন্য ব্যবস্থা তৈরি হয়ে ওঠেনি এখনো| আমরা সবাই রোমাঞ্চিত তখন| বড় শহরের নামকরা কলেজ থেকে এই অজগাঁয়ের সামান্য অবস্থায় পড়ে চট করে মানিয়ে নিলাম| সবাই পরস্পর পরিচিত হচ্ছি| এদের মধ্যে স্বপন ঘোষ আমার এন্ড্রুজ কলেজের ক্লাসমেট, মেকানিকালে ভর্তি হয়েছে| জামশেদপুরে আমার স্কুলের ছেলে অরুণ দত্ত, জেভিয়ার্স হয়ে এখানেও ইলেক্ট্রিকালে| জামশেদপুরের প্রণব ঘোষ (পিটু), জ্যোতির্ময় মজুমদার (বাচ্চু), আর স্নেহময় রায় এখানে একসাথে| আমরা একটা টিম হয়ে গেলাম|


কলেজে চার পাঁচ ঘন্টা কাটিয়ে বাকি সময়টা আমার মামাবাড়িতে প্রদীপ আর খুকুর সাথে আলাদা আলাদা কাটে| প্রদীপ ঘুরে ঘুরে রোজ একটু একটু করে জলপাইগুড়ি শহর চেনালো| ছোট শহর| তিনটে সিনেমা হল| রূপশ্রী, রূপমায়া আর দীপ্তি| রূপশ্রী ছাড়া শহরে আর একটাই দোতলা বিল্ডিং এল-আই-সি’র| সব বাড়িতে করোগেটেড টিনের চাল| কাউকে বকার জন্য একটা দুষ্টু কথা চালু হয়েছিল কলেজে --- “ঢিল মারি তোর টিনের চালে” --- মিনিং, ঢিলটা কড়মড় করে ডিস্টার্বিং আওয়াজ তুলবে গড়িয়ে পড়ার সময় --- হি হি ! শহরে সরু পাকা রাস্তা| দূরের জন্য বাস চলে| শহরের যানবাহন রিক্সা| একটা কো-এড কলেজ, আনন্দ চন্দ্র কলেজ| পাড়াগুলোর ছিরি ছন্দে কোন বৈচিত্র নেই| রূপশ্রী সিনেমাহলটা আমার খুব পছন্দ হল| প্রতি সপ্তাহের রবিবার সকালে ইংরাজি ছবি হতো| আমার যাওয়া চাই| এই শহরে আমার রিক্রিয়েশন বলতে রবিবার রূপশ্রীর সিনেমা আর লাগোয়া রেস্টুরেন্টে এক কাপ চা| আমি লিখে রাখতাম সিনেমার নাম, যাতে রিপিট না হয়|


পশ্চিমে শহরের লাগোয়া, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের বিশাল ক্যাম্পাস পেরিয়ে ডেংগুয়াঝর চা বাগান, ওরা বলত ডুয়ার্সে বৃহত্তম| আমাদের কলেজের দক্ষিণে এ-সি-কলেজ| মাঝখান দিয়ে শহরকে দুভাগ করে পশ্চিম থেকে পুবে বয়ে গেছে করলা নদী| শিলিগুড়ি থেকে পুবমুখি বড় রাস্তাটাও করলার সমান্তরালে চলে গেছে এ-সি কলেজের সামনে দিয়ে, মাসকলাইবাড়ি, বেগুনটাড়ি, কদমতলা হয়ে রেলগুমটি পেরিয়ে পান্ডাপাড়া ছাড়িয়ে কোথায় যেন| এরই প্যারালেল আরো একটা রাস্তা ছিল চা বাগানের ভেতর দিয়ে গেট ছাড়িয়ে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনীয়ারিং কলেজের সামনে দিয়ে , ভবানী পাঠকের মন্দির, রাজবাড়ি, রায়কতপাড়া, স্টেডিয়াম, হাসপাতাল, উকিলপাড়া হয়ে তিস্তা মোহানার দিকে| এই অঞ্চলটা শহরের মধ্যে কম জনবহুল| প্রদীপ আমাকে চেনালো বেগুনটাড়ি থেকে স্টেডিয়ামের পথে করলা নদীর পাশে দিনবাজার, শহরের একমাত্র বাজার| সেই পথেই বেশ্যাপাড়া, বাংলা মালের দোকান| শহরের সুন্দরীরা কোন কোন বাড়িতে থাকে| তখন পথের পাশে দোকানপত্র কিছুই ছিল না| এই সব চেনাতে প্রদীপ একমাস সময় নিলো| একটাও সিগারেট বা এককাপ চা না খেয়ে| এত ভাল ইঞ্জিনীয়ার ছেলে আমি আর দেখিনি| কথাবার্তায় সে কিন্তু তুখোড় ছিল| তার গল্প শুনে মনে হতো খুব মারকুটে সে| আমার ভাল স্বাস্থ্য আর হাতের গুলি দেখে সমীহ করতো|


এইসব চেনা হচ্ছে আর পাশাপাশি সময় সুযোগ হলেই বেলা থাকতে খুকুর সাথে অপেক্ষাকৃত কম জনবহুল অঞ্চলে পরিভ্রমণ| খুকুও খুব কথা বলতে ভালবাসতো| আমাকে শুনে যেতে হবে| সেই থেকে আমার অভ্যাসই হয়ে গেল চুপ করে মেয়েদের কথা শোনা আর একদৃষ্টে খুকুর মুখের দিয়ে তাকিয়ে থাকা| ভাগ্যিস খুকু সুন্দরী ছিল দেখতে| আমার শিক্ষা হল, চুপ করে মেয়েদের কথা শুনলে আর মানলে মেয়েদের প্রিয়পাত্র হওয়া যায়| আমার স্কুলে কলেজে কোনদিন মেয়েদের সাথে দেখা হয়নি| মেয়েদের চিন্তা ভাবনা যুক্তি তর্ক বায়োলজি আর সেক্সোলজি সব, সব পুরুষের চেয়ে আলাদা| তাদের পৃথিবী আলাদা| আমাকে তো জানতেই হবে সেসব| ভবিষ্যতের একজন গল্পকার তৈরি হচ্ছে যে আমার মধ্যে| তখন কি আর এত ভেবে চিন্তে করেছি ওসব|


খুকুর সাথে বসে গল্প করার প্রিয় জায়গা ছিল পশ্চিমে তিস্তার বাঁধ, ভবানী পাঠকের মন্দিরের বাগান, রাজবাড়ির সামনের দিঘীপাড়, স্টেডিয়ামের মাঠে যখন খেলাধুলো হচ্ছে না, আর পুবে তিস্তার মোহানায় বসে পারাপারের নৌকার দিকে চেয়ে থাকা| একদিন বললাম --- যাবে নাকি ওপারে, চল না| উত্তরে সে যে কেন চিমটি দিলো বুঝলাম না| মোহানার পাড়ে বাঁধ দিয়ে আর একটু এগোলে ডান পাশের ঢালু জমিতে সেই প্রথম লক্ষ্য করি অদ্ভুত কতগুলো বাড়ি| চারটে কাঠের পায়ার ওপর প্ল্যাটফর্ম করে কাঠের বাড়ি, সিড়ি দিয়ে উঠতে হয়| তলাটা ফাঁকা| এসব নাকি বন্যা আর ভুমিকম্পের থেকে সুরক্ষার জন্য করা| বন্যা আমি দেখেছি আগে, জামশেদপুরে সুবর্ণরেখা নদীর| ভুমিকম্পের একটা অভিজ্ঞতা যদি হয় তো দারুণ হয়| এমন বাড়ি গাছের ওপর হয় শুনেছি| লগ হাউস যাকে বলে| খুকুকে বললাম --- ওইরকম একটা লগ হাউস বানাবো| থাকবে আমার সাথে ? একটা চিমটি কেটে খুকু বলল --- আমাদের লেজ গজালে থাকব| বললাম --- পেছনে নিচে আঙুল দিয়ে দ্যাখো, মেরুদন্ডের তলায় খানিকটা হাড়| ওটাই বড় হয়ে যাবে যদি ধরে রাখো| আরো একটা চিমটি খেয়ে বললাম --- না, ভালবাসার এই নমুনায় থাকা যাবে না তোমার সাথে| হায়ার সেকেন্ডারিতে খুকুর জুওলজি ছিল| ঐ ক্লাসে বোধহয় চিমটি কাটা শেখায়|


ভবানী পাঠকের মন্দিরে গেছি| নামেই ভবানী পাঠক| আসলে ছোট্ট একটা কালীমন্দির, হাঁড়িকাঠ আর একটা ফল ফুলের বাগান| ঐ বয়সে দেবী চৌধুরানীর গল্পে ভবানী পাঠকের পরিচিতি| তিনি নাকি বনের ভিতরে থেকে সৈন্য-সামন্ত জোগাড় করেছিলেন ইংরেজ খ্যাদাবার জন্য| সন্নাসী বিদ্রোহ নামে তা বিখ্যাত হয়েছিল| সেই বন যে মালদহ থেকে এতদূর ছড়ানো তা বঙ্কিমচন্দ্রও জানতেন না| আর ডাকাতরা কেবল কালীপুজোই করে কেন সেটা আমিও জানি না| তো সেই মন্দিরের নিরিবিলিতে খুকুর সাথে বসে গল্প করতে করতে আমার উচ্ছাসভরা দস্যিমন শান্ত হয়ে এলো| তাতে আমার সহনশীলতা যেমন বাড়লো তেমনি বাড়লো যৌনতা প্রশমন করার রিপুসংহার প্রবৃত্তি| সচেতন আমি একদিন খুকুকে জড়িয়ে চুমু খেতে খেতে স্তনে হাত রাখলাম| আপত্তি তো করলই না খুকু, বরং সাড়া দিলো ঠোঁট দিয়ে| পরপর কয়েকদিন| অথচ বাড়ির ভেতরে আমাকে দেখেই হাসতে শুরু করে| কী জ্বালা ! অনেক হয়েছে| এবার উঠে জামাকাপড় ঝেড়ে হাত ধরাধরি করে বেরিয়ে এলাম| পথে নেমে বাড়ির দিয়ে এগোচ্ছি, হাত ছেড়েছি, দুটো মেয়ে আসছিল, দাঁড়িয়ে বলল --- কিরে ইঞ্জিনীয়ার দাদা বুঝি ?


দাদা ! বোনের দিয়ে চেয়ে হয়ে গেল আমার !


পর্ব ১০






পুজোর পর বাড়ি থেকে জলপাইগুড়িতে ফিরে শান্তিপাড়ার মেসে উঠলাম| কলকাতার মেসবাড়ির মতো না| এখানে দোচালা ঢেউখেলানো টিনের ছাদ, এল শেপের পাকা বাড়ি, সামনে একফালি বারান্দা আর পেছনে এল শেপের টানা বারান্দা| একজন ওয়ার্ডেন, ইনি আমাদের কলেজের মেশিন ইনস্ট্রাক্টর| চারটি ঘরে ষোলজন থাকব| সামনের দিকে বড় রাস্তা পর্যন্ত ছোট মাঠ| পেছনের বড় উঠোনে বাঁধানো কুয়োতলা চান করা কাপড় কাচার জন্য| কুয়োর জলেই রান্না আর খাওয়া| খাটা পায়খানা একটা| আমরা ষোল জন আর ওয়ার্ডেন, রাঁধুনী, তার অ্যাসিস্ট্যান্ট| একটা পায়খানা মানেই পেট খারাপ হওয়া চলবে না| ক্রমে সাবধান হয়ে গেলাম কি খাই না খাই| উঠোনে কাপড় মেলার তার টাঙ্গানো| একেবারে পেছনে ঝোপঝাড়ের বেড়া| আমার ঘরে চারটে খাট| দুটো দরজা দুই বারান্দায় খোলে, দুদিকেই একটা করে জানালা, প্রায়ই বন্ধ রাখতে হয় চোরের ভয়ে| আমি ছাড়া আমার ঘরে আছে স্বপন ঘোষ, আমার ব্যাচে পড়ত অ্যান্ড্রুজ কলেজে| আর স্কটিশ চার্চ কলেজের গোবিন্দ গাঙ্গুলি (চক্রধরপুর), বার্মাদেশের রেঙ্গুন কলেজ থেকে আসা তপন দত্ত| স্বপন থাকতো যাদবপুরে| ওর বাড়িতে আগে থেকে আমার যাতায়াত ছিল| বাকি দুজন নতুন বন্ধু হল এখানে| আমি, তপন আর গোবিন্দ ইলেকট্রিকালে, স্বপন মেকানিকালে| স্বপন খুব ভাল ফুটবল খেলতো| পরে সে নর্থ বেঙ্গল ইউনিভার্সিটি দলে চান্স পেয়েছিল|


আমরা চারজন বন্ধু হয়ে গেলাম তাড়াতাড়ি| পরিবারের খবর, ছোটবেলার গল্প, প্রেমের কথা, কলেজের গল্প, শরীরের খবর, স্বপ্নের কথা, বন্ধু-শত্রু, ভাল লাগা-মন্দ লাগা, সব জানা হয়ে গেল| সহজ হয়ে গেল মেলামেশা, অকপট| ছোটবেলা থেকে একলা থাকতে চেয়েছিলাম, তাই হোস্টেল| এখন সে জায়গায় মেস-জীবনেই খুশি| শখের প্রাণ গড়ের মাঠ| সবার সবকিছুই তো আর ভাল লাগে না| আমিও কিছু ধোয়া তুলসী পাতা নই| মানিয়ে নেয়া, সইয়ে নেয়া দ্রুত শিখে গেলাম| সহনশীলতা বেড়ে গেল| মানুষের গুণের কথায় প্রশংসা করলে যে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হয় তা শিখলাম| দোষের নিন্দা করলে সম্পর্ক ভাঙে| আমাদের সবার সম্পর্ক টিকে থাকে আমাদের গুণের জন্য, এটা বুঝলে তুমি বয়স্ক হলে| হোস্টেলে আমার প্রথম শিক্ষা এটাই|


মাসকলাইবাড়ি থেকে উত্তরের দিকে যে রাস্তাটা চলে গেছে, করলা নদীর পুল পেরিয়ে তারই বাঁ দিকে ইঞ্জিনীয়ারিং কলেজের গেট| রাস্তাটা ভবানী পাঠকের মন্দিরের পাশে গিয়ে পড়েছে বড় রাস্তায়| আমরা হেঁটেই চলে যেতাম কলেজে| সেই স্কুল থেকে আমার হাঁটা শুরু| তখন তো নিয়ম মতো গেট, বেড়া কিছুই ছিল না কলেজের| ১৯৬১ সালের প্রথম ব্যাচে মাত্র ২৫ জন ছাত্র নেয়া হয়েছিল কেবল সিভিল ইঞ্জিনীয়ারিং-এ| তাদের ঠিকমতো হোস্টেলও ছিল না বলে আমরা র্যাবগিং থেকে বেঁচে গিয়েছিলাম|


মেসে আমাদের ঘর খুব বড় না| চারটে খাট ছাড়া দুটো টেবিলের জায়গা হল বইপত্র রাখার| খাটের তলায় বাক্স, জুতো| ঘরে তার টাঙ্গানো কাপড় জামা রাখার| ভেতরে কাঠের পিলার, কড়ি-বরগা| সেই সব ট্রাসে ছিল পায়রাদের বাসা, আমরা আসার আগে থেকেই| পায়রাদের বাড়িতে আমাদের যেন অনুপ্রবেশ| তারা মেনে নেবে কেন ? সারাদিন চপর চপর, সারারাত গুলতানি| ভাগ্যিস পায়রাদের ভাষা বুঝি না| বুঝলে ওদের গালাগালে পাগল হতাম| পড়াশুনোয় অবশ্য বাধা ছিল না তাতে| আমাদের হাসি-গান-হৈ-হুল্লোড় সমানে চলল ওদের পাত্তা না দিয়ে| তখন দেখলাম ওরা শোধ নিতে ওপর থেকে পটি করে দিচ্ছে বিছানায়| এমনিতেই খুব মশা| আমরা মশারি টাঙিয়ে গুটিয়ে রাখলাম| লক্ষ্য করতাম স্ত্রী পুরুষ ছেলে মেয়ে শান্ত-ভদ্র, নেতা পায়রাদের আলাদা চেনা যায় কিনা| এই দেখতে দেখতে পায়রা আমার মনে বসে গেল| পরে আমার প্রথম উপন্যাস ‘মাটাম’-এর মূখ্য চরিত্র হয়ে দঁড়ালো “রটম” নামের একটা পায়রা|


কলেজের পরে বিকেলে মেসে আমাদের ফেভারিট পাস্টটাইম ছিল সামনের বারান্দায় বসে অনতিদূরে পথের দিকে চেয়ে থাকা| এসি কলেজের ছুটি হলে ছেলে মেয়েরা এই পথ দিয়ে হেঁটে বাড়ি ফিরবে| ছেলেরা মেয়েরা আলাদা দলে| আমরা সতৃষ্ণ নয়নে চেয়ে থাকতাম মেয়েদের দিকে| কেউ কেউ তখনি গায়ক হয়ে পড়তো| একদিন একটা মেয়ে এগিয়ে এসে বলেই ফেলল -– একটু ভাল করে গাইলেই হয়, দাঁড়িয়ে শুনে দুটো পয়সা দিয়ে যাই| তা না, এমন গান যে শুনে পালাতে পারলে বাঁচি, হুঃ| আমরা লজ্জা না পেয়ে হেসে ফেললাম| --- না, এখন গলা সাধছি| একদিন ঠিক গাইবো| মাখামাখি করতে দেখে কলেজের ছেলেরা খচে যেতো|


পুজোর ছুটিতে সবার মতো আমিও বাড়ি গেলাম সেবার| দিন দশেকের ছুটি ছিল| কি জানি আবার আসা হয় না হয়| পুজোর তিনদিন দলবল নিয়ে সাইকেলে সারা জামশেদপুর চক্কর দিলাম রাতের বেলায় প্যান্ডেল টু প্যান্ডেল| ছোটবেলার সেই শহর বেড়াবার সাধ আবার পূর্ণ হল ঠাকুর দেখে| পুজোর পরে যখন জামশেদপুর থেকে ফিরলাম, গায়ে উঠেছিল গয়না| ডান হাতে একটা স্টিলের বালা আর আঙুলে অরণ্যদেব ছাপের স্টিলের আংটি| আর সঙ্গে এনেছি আমার রামপুরি চাকুটা, যেটা হাত দিয়ে টেনে খুললে কড় কড় করে চমকানো ভয়াল শব্দ হয়| দুচার দিন সেটা দেখানোর পর আর আমার গুলি মাসল দেখে মেসের ছেলেরা আমাকে মাস্তান জ্ঞানে সমীহ করতে শুরু করল, যেটা আমি পুরো কলেজ জীবনেই উপভোগ করেছি| ফলে মেসে, কিচেনে, পরে হোস্টেলের ডাইনিং রুমে বা উইং-এ কোন অসুবিধা হয়নি| ছাত্রজীবনে চিরকালই টাকা-পয়সা কম পেতাম আমি| বাবা বোধহয় ছোটবেলা থেকেই টাকা পয়সার ব্যাপারে আমার অভাব-বোধ নির্মূল করার ট্রেনিং দিচ্ছিল আমার অজান্তে| অন্য ছাত্রদের অবস্থারও তেমন ইতর বিশেষ তফাৎ ছিলনা| তাই দারু পার্টি সম্ভব হত না আমাদের| তাতে কী ? হতো কম খরচে ভাঙের পার্টি| সিদ্ধি পাতা আর মাল মশলা এনে লেগে পড়তাম| আমার ওপরই বানাবার ভার পড়তো| সঙ্গে মৈথিলী ঠাকুরটা| মাঝে সাঝে হতো আর কি| রাতে মনে হতো খাটটা উড়ছে ফানুসের মতো| ফিলিংটা অসামান্য| খেতাম চারমিনার সিগারেট, কখনো তামাক বার করে তার সাথে গাঁজা মিশিয়ে ফিল্টার সহ রিফিল করে| এই সমস্ত গোলমাল টের পেয়ে আমাদের ভরসা না করে ওয়ার্ডেন নিজেই কাঁচা বাজার সারতেন পাছে পয়সা সরাই|


ইঞ্জিনীয়ারিং পড়তাম বলে আমাদের জি ছিল একটু হাই| শহরের সাধারণ মানুষরা একটু উঁচু নজরে দেখতো আমাদের, তাই শহরের ছাত্ররা বিরূপ থাকতো| তার ওপর এসি কলেজের মেয়েরা আমাদের পাত্তা দিতো বলেও ছাত্ররা বিরক্ত ছিল| অবন্ধুসুলভ মনোভাব বেশ টের পেতাম| একা কখনো বাজারে যেতো না কেউ| আমার সেসব ভয় ছিল না| আর কোন কুমতলবও ছিল না আমার| এসি কলেজের কয়েকজন ছাত্রর সঙ্গে দোস্তি হয়ে গেল, মেলামেশা, তাদের বাড়ি যাওয়া| পারিবারিক সম্পর্ক হলে মানুষের জীবন সহজ হয়ে যায়| তারা এসে আমাদের মেসেও সবার সাথে বন্ধুত্ব করে গেল| নাম ঠিক মনে নেই, তবে তারা সবাই থাকতো নতুন পাড়াতে|


শীত পড়তে ঠিক হল এবার মেসে পিকনিক করতে হবে| নতুন বন্ধুদেরও নিমন্ত্রণ করলাম| একদিন সকাল থেকে মেসে পায়রা যজ্ঞ শুরু হল| হালকা বাঁশ হাতে চলল পায়রা নিধন পর্ব| প্রতিটি ঘরে| গোটা তিরিশেক পায়রা জড়ো করে রাঁধুনীকে দিলাম তরকারিতে মেশাতে| খেতে বসে দেখি কিছু সরু হাড় ছাড়া আর কিছু নেই| খাওয়া শেষে হাড়গুলো জড়ো করে মাটিতে পোঁতা হল| পুরো প্রসেসটায় আমিই লিডারি করেছিলাম| সেই হাড়গোড়ের স্মৃতি আমার আজও কাটেনি| “মাটাম”এ কিছুটা প্রায়শ্চিত্ত করেছি তার| প্রাণীহত্যা সেসময়ের একটা স্পোর্ট মাত্র|


শীতের ছুটিতে সবাই বাড়ি চলে গেল| লক্ষ্য করলাম, বাড়ি যাবার জন্য সবারই পা রেডি থাকে| এই টানটা আমি কখনো বুঝলাম না| একা থাকার বিড়ম্বনা, যেমন অন্যদের কাছে শুনি, আমি বুঝি না| আমি কি নির্বোধ ? ছ’-দিনের ছুটি মাত্র, পোঁ পোঁ শব্দ চারপাশে, সবাই দৌড়চ্ছে| রাঁধুনী, ওয়ার্ডেন সবাই| বিদ্যুতের অবস্থা বেহাল| সবাই আলাদা হ্যারিকেন আর লম্ফ রাখতাম| কেরোসিনের স্টক| লাইন হোটেলে সকাল সন্ধে চা আর খাওয়া দাওয়া| রায়কতপাড়ার বাড়িতে বললেও যাইনি খেতে| খুকুর সাথে যোগাযোগ করা দুষ্কর ছিল| ওয়ার্ডেন নেই,আমাদের ফোন লকড্‌| ওদের বাড়িতে কুড়ি জন| ফোনে হাত দেবে কেন ? খুকুর কলেজের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে বাজে লাগে| কত ছেলে লাইন মারতে দাঁড়িয়ে থাকে| তাদের সাথে ? রক্ষে কর| ওদেরই বাড়িতে দেখা হয়ে গেল একদিন| চা খেয়ে দুজনে বেরোলাম| ভবানী পাঠকের মন্দিরের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম --- মনে আছে সুমনা ? খুকু বলল --- কী ?


রাজবাড়ির চৌহদ্দির ভেতরে একদিন একটা খাটিয়া পাতা, রাজবাড়ির খাটিয়া বলে কথা, শুয়ে পড়ে খুকু বলেছিল --- আঃ, কী আরাম ! বাড়িতে খাটিয়া কেন রাখে না যে ! সেখানে পৌঁছে বললাম --- মনে আছে, সুমনা ? খুকু বলল --- কী ?


তিস্তার বাঁধে একটা বেঞ্চে বসে মনে পড়ল, এখানে বসে খুকুকে তার পাছার নিচের হাড়টা ধরে রাখতে বলেছিলাম বলে সে আমাকে চিমটি কেটেছিল| আবার আমার হাসি পেল| বললাম --- মনে আছে সুমনা ? ও বলল --- কী ?


মেয়েদের স্মৃতি এত অগভীর হয় মেনে নিতে পারলাম না| পরে ভাবলাম – স্মৃতি তো সে-ই আঁকড়ে থাকবে যার নতুন অভিজ্ঞতার বয়স বা ইচ্ছা নেই| সেটা তরুণের ধর্ম| আমিই বা কেন স্মৃতি আঁকড়ে থাকি ? সে তো যায় না| তার গলা টিপে ধর, কিল| মেমরি মানুষের বড় শত্রু| আমি অকালপক্ক হতে পারি, অকালবৃদ্ধ তো নই| সুমনা বা খুকুর প্রতি একটা আকাঙ্খা তৈরি হচ্ছিল, তাই তার খেলাচ্ছল বড্ড অকরুণ মনে হয়েছিল ঐ সময়| ফাক ইট বারীন| বি স্টেডি| গা ঝাড়া দিলাম| হঠাৎ উঠে -- ‘থ্যাঙ্ক ইউ সুমনা’ -- বলে আর পিছনে না তাকিয়ে রওনা দিলাম সোজা| হয়তো ব্যাপারটা নাটকীয় হয়ে গেল, খুকুর ওপর রুডনেস না দেখিয়ে তাকে বাড়িতে পৌঁছে দেয়া উচিত ছিল| অতিরিক্ত আবেগে বাড়াবাড়ি হয়ে গেল| ছিঃ, বারীন, এরকম করে না| স্মৃতিকে মেরে ফেল, আর অতীতের প্রতি আবেগকে প্রশমিত কর| তবেই নতুন বিস্ময়ের জায়গা হবে মনে| জীবন ! আহা, কতটুকু আর জীবন ! কী বা তার ভাবনা চিন্তা !


এরপর একা একাই ঘুরে বেড়াই শহরে| দিনে আকাশে বেজায় আলো, রাতে টিমটিম তারা| জলপাইগুড়িতেও গোটা কয় বিজলি বাতি, কিছু হ্যারিকেন, অনেক রিক্সার লম্ফ, অজস্র নক্ষত্র আর অগুন্তি জোনাকি দিয়ে আলোকিত আমার জন্য, কারণ আমি, একলা বারীন, ভ্রমিক পথিক, পথ হেঁটে চলেছি| একটু ভাবাবেগ এল| আসুক| আমার ভাল লাগছে| শহরে অনেকেই কাঠের ব্যাবসায়ী| তাদের বাড়ি গুদাম কর্মচারী দেখে ভাবলাম এত কাঠ আসে কোত্থেকে ? কোথায় যায় ? বাকি সবাই মাস্টার, ডাক্তার, সরকারি অফিসের বাবু, ইত্যাদি| একজনকে জিজ্ঞাসা করলাম


--- কাকু, জলপাই গাছ কোথায় দেখতে পাবো ? কীরকম দেখতে হয় ? আমাকে চ্যাংড়া পাগল ভেবে সন্ত্রস্ত তিনি পালিয়ে বাঁচেন আর কি| জলপাইগুড়িতে জলপাই গাছের গুড়ি দেখার খুব ইচ্ছা হচ্ছিল সেদিন| হল না| শেষে রূপশ্রীতে সিনেমা দেখে চা খেয়ে একটা পানের দোকানে বললাম এক খিলি মিস্টি পান দিতে| অন্যমনস্ক আমি সেটা মুখে দিয়ে খুশবু পেলাম আর অদ্ভুত টেস্ট| গলায় যেতেই বমি পেল| রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে বমি করলাম| পানে কিছু একটা গড়বড় হয়েছে বুঝে ফিরে গিয়ে দোকানীকে জিজ্ঞাসা করলাম--- আমাকে কি পান দিলে ? সে বলল --- কেন ? ৩২ আর ৩০০| মানে না বুঝে আবার জিজ্ঞাসা করে জানলাম ওগুলো জর্দা| সেকী ! মদ, গাঁজা, ভাঙ, সিগারেট হজম করা বারীন কিনা জর্দায় হেরে যাবে ? তার কাছে আরো দু-খিলি নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে তারপর সোজা হেঁটে নেতাজীর স্ট্যাচু ছাড়িয়ে তিস্তার বাঁধ|


একদিন বাঁধের বেঞ্চে একলা বসে আছি| নদীর দিকে চেয়ে| একটা-জলের দিকে চেয়ে চোখ একদিক থেকে অন্যদিকে সরে নদীর বুকের ছবি দেখে যায়| অনেক-জলের দিকে চেয়ে থাকলে জলের স্রোত দেখা যায়| এই আবিষ্কার আমাকে অবাক করল| আমি তো কবিতা লিখতে চাইনি ! জলের না নদীর বুকে চার-পাঁচটা নৌকা এদিক ওদিক যাচ্ছে| একটা নৌকা ঘাটে দাঁড়িয়ে লোক তুলছে| একজনের কাঁধের ঝাঁকায় বাসন-কোসন, কয়েকজন ব্যাপারী বোচকা নিয়ে, দুজনের কাঁধে সাইকেল| নানা জিনিষপত্র নিয়ে মানুষজন নৌকায় চাপছে| দেখতে দেখতে নৌকা ছেড়ে দিলো ওপাড়-মুখো| আরে, তিস্তার একটা ওপাড়ও আছে, ভাবিনি তো আগে ! মিনিট পনেরো| নদীর বুকে এত ঢেউ আগে দেখিনি তো ! নৌকা ক্রমশ ছোট হয়ে গেল| ওপাড়ে লোক নামাচ্ছে| সাইকেলওলারা নেমে সাইকেল হাঁটিয়ে নিয়ে চলেছে বালুর ওপর দিয়ে| তিস্তার এপারে যত বালু, ওপারেও তাই হবে| একজনকে জিজ্ঞেস করলাম --- দাদা, ওপারের জায়গাটার নাম কি ?


--- ময়নাগুড়ি| নতুন নাকি ?


--- হ্যাঁ|


আমার নতুন পথের গেট খুলে গেল|


পর্ব ১১






শুনছি চীনা মিলিটারি নাকি ভারতের নাথুলা না কোথায় যেন অ্যাটাক করেছে। আরে হ্যাঁ, মনে পড়েছে, সিকিমে। আবার অরুণাচল দিয়েও নাকি ঢুকছে তারা। সেখানে বমডিলা নামের আরো একটা জায়গায় জোর লড়াই চলছে চীন ও ইন্ডিয়ার মধ্যে। বমডিলা থেকে একজন ইঞ্জিনীয়ারং কলেজে ফার্স্ট ইয়ারে আমাদের সাথে পড়তে এসেছিল। ছেলেটা সবকিছুতেই হেসে গড়িয়ে পড়তো। তাকে আমি বলতাম, ছুটিতে বাড়ি গিয়ে লড়তে হবে কিন্তু। আমার চাক্কুটা নিয়ে যা। কাজে লাগবে। সে তো হেসেই খুন। সবাই সেই থেকে তাকে ‘বমডিলা’ নাম-এ রেফার করতো। তাকে ফোন নং দিয়ে বললাম, দরকার পড়লেই ডাকবি। ছুটে চলে আসব। বমডিলার আটখানা হাসি মুগ্ধ হয়ে এনজয় করতো সকলে। সে অন্য মেসে থাকতো, তাই রোজ পেতামনা সেই অমল হাসি।


আমরা তো হায়ার সেকেন্ডারি পড়িনি তাই পাঁচ বছরের কোর্স ছিল কলেজে। ফার্স্ট ইয়ারে যা পড়ানো হল তা গত বছর বি এস সি-র ক্লাসেই পড়া ছিল। তাই এবার ফাইনাল পরীক্ষায় নো টেনশন। হাসতে খেলতে পার হয়ে গেল। ছাত্র কম। রেজাল্ট গরমের ছুটির আগেই বেরলো। আমরা সবাই পাশ। শান্তিপাড়া মেসে ফিস্ট। গান। বাক্স তবলা। মেসে সেই লাস্ট ফিস্ট হচ্ছে, তখন বুঝিনি। তার পরেই গরমের ছুটি পড়ে গেল। জামশেদপুরের গরমে এত বছর কাটিয়ে এসে জলপাইগুড়ির গরম গায়ে লাগেনি। দুমাসের ওপর ছুটি। সবাই বাড়ি যাবে। মেস বন্ধ থাকবে। অগত্যা আমিও বাড়ি চললাম।


প্রথমে জলপাইগুড়ি থেকেই মিটার গেজ ট্রেনে শিলিগুড়ি কাটিহার হয়ে মনিহারি। শিলিগুড়ি ছাড়াতেই দেখি বিশাল জায়গা জুড়ে রেলের কর্মকান্ড চলছে। শুনলাম নতুন স্টেশন হবে। ব্রডগেজের লাইন বসানো হবে। তখন ১৯৬৩। মনিহারিঘাট থেকে স্টিমার লঞ্চে গঙ্গা পেরিয়ে সকরিগলিঘাট। তারপর সাহেবগঞ্জ থেকে ব্রডগেজে বড় কামরার ট্রেনে শেয়ালদা। মালপত্র সমেত কিছু ছেলে স্টিমারে আসবে। আমি অ্যাডভান্স পার্টির সঙ্গে লঞ্চে। এবার রাতের গঙ্গা। দূরে দূরে নৌকা আর লঞ্চে টিমটিম হেরিকেনের আলো। কিছু তারা, পাড়ের জোনাকি। অন্ধকারে দোদুল্যমান পাড়ি। রোমাঞ্চ। মনে হচ্ছিল এই নৌকা চিরকালের। মনে পড়ছিল মা’র মুখ। হাত শক্ত করে ধরে আছে লঞ্চের রেলিং। কী বিশাল ! একুল ওকুল দুকুল লোপাট। এই যাত্রা যেন অনন্তকালের। কোনদিন ভুলবো না সেই স্মৃতির শিহরণ। অনন্তকালের নৌকার সাথে মা’র মুখের সম্পর্ক যে কী তা আজও জানি না। চন্দ্রোদয়ের মাহাত্ম জানি না। ভোরকেও বলতাম সকাল। ক্ষণের কথা, সেই সংবেদন। জানি না।


সেবার শেয়ালদায় নেমে সোজা জামশেদপুরে না গিয়ে চলে গেলাম বাঘাযতীনে আমাদের কলকাতার বাড়িতে। সেখানে মালপত্র নামিয়ে, তখনো বাঘাযতীন রেল স্টেশন হয়নি, গড়িয়া গিয়ে সেখান থেকে মল্লিকপুরে দিদিমার বাড়ি। আমার ছোটবেলার সেই সুন্দরী দিদিমা তখন মল্লিকপুরে বাড়ি করে থাকে বিধবা মেয়ে আর তার দুই সন্তান নিয়ে। এটাকে সাহস বলে না, বলে হিম্মৎ। দিদিমা নিজে বিধবা বহুদিন। ছেলে আগরতলার প্রতিষ্ঠিত মাস্টার। লক্ষপতি বাবার বাড়ি আগরতলায়। অথচ দিদিমা একলা তার অসহায় মেয়েকে সাপোর্ট দিতে মল্লিকপুরে থাকে। ওঃ ! ভাবা যায় ? সবার সাথে মিলেমিশে থাকে দেবার জন্য। নেবার জন্য না। দিদিমার রোল মডেলটা খুব প্রিয় আমার। জীবনে একা পেয়েছি নিজেকে, কিন্তু একা থাকতে শিখেছি আমি দিদিমার কাছে। এদিকে নিজে অপূর্ব সুন্দরী। বড়লোকের মেয়ে। আকর্ষণের অভাব তো ছিল না, এই যেমন আমি, সেই কবে থেকে দিদিমাকে বিয়ে করার জন্য মুখিয়ে আছি। আর দিদিমা কর্তব্য ও দায়িত্ব পালন থেকে কখনো সরে থাকেনি। কমপ্যাশন নয়, শ্রদ্ধা ভালবাসা দিয়ে তার দেহ মনের সৌন্দর্যের পূজা করেছি আমি। তখন গ্রীষ্মকাল, পিঠে পায়েসের দিন নয়, তার হাতের ভাল ভাল রান্না আর আদর খেয়ে কাটালাম কয়েকদিন। দিদিমা গল্প শোনায় আর গায়ে পায়ে হাত বোলাতে বোলাতে চোখ আমার ছলছল করে। আমি কলেজ আর মেসের গল্প শোনাতাম। দিদিমা হেসে বলতো – মাইয়াগো লগে মিশস না ? দিদিমা টের পেতো আমার একাকীত্ব। চাইতো আমি প্রেম করি। আমার ভার লাঘব করার কথা ভাবতো। ও দিদিমা ! শেষে ফেরার সময় দিদিমার বাক্স-প্যাঁটরা হাটকিয়ে কমবয়সের একটা ছবি চেয়ে নিলাম। গড়িয়াহাটের একটা স্টুডিয়োতে বাঁধিয়ে নিলাম। ছবিটা জামশেদপুরের বাড়িতে আমার ঘরের দেয়ালে টাঙ্গানো ছিল। রোজ ঘুম ভেঙেই ছবিটায় চোখ পড়তো। ভাল লাগতো। ফ্যাচুয়েশন না কি যেন বলে, বাংলাতে বল না। আসলে সেই বয়সে, বা পরেও, আমার প্রেম হল না কেন আজ বুঝি। স্কুলজীবন থেকেই চরিত্রে বিবেকানন্দ আর প্র্যাকটিসে দিদিমার বেঞ্চ মার্ক, এবং ক্লাসে মেয়েদের অনুপস্থিতিই এর কারণ। অভাগা আর কাকে বলে।


পুরনো ক্লাবে জিমের বদলে তাস আর ক্যারম। বাইরে বন্ধুদের সাথে আড্ডা। সুযোগ পেলেই সাইকেল নিয়ে সুবর্ণরেখা, ডেয়ারিফার্ম, জুবিলী পার্ক, ডিমনা লেক, দলমার মুখোমুখি। মেয়েদের পিছনে ঘোরার সময় কোথায় ? বাড়িতে যতক্ষণ, চান খাওয়া শোয়া বাদে শুধু বই মুখে। এক বন্ধুর দাদা লাইব্রেরিয়ান ছিল। তার সঙ্গে লাইব্রেরিতে গিয়ে নিজের পছন্দের বই বিনে পয়সায় নিয়ে আসতাম। হাতে মাসখানেক। তারই মধ্যে বিভুতিভূষণ তারাশংকরের সব বই আরো একবার। সুবর্ণরেখায় গিয়ে ইছামতী, আর গ্রামের হাটে গিয়ে হাটেবাজারের সাথে মিলিয়ে দেখতাম। বাবার সঙ্গে কথাবার্তা মানি-অর্ডারের রিপ্লাই চিরকুটে মাসিক দু-তিন লাইন – শ্রীচরণেষু বাবা, টাকা পেয়েছি, আমি ভাল আছি। তুমি ও মা আমার প্রণাম নিও। -- ব্যাস। মাসে আমাকে ১২০ টাকা দেওয়া হতো। সেবার বললাম – এবছর একটা স্লাইড রুল কিনতে ৪০০ টাকা লাগবে। বাবা বলল – সামনের মাসে পাঠিয়ে দেবো। পাছে পথে খোয়া যায়, বা অহেতুক খরচ হয় কেনার আগেই। কিছু যায় আসে না।


আগে থেকেই দিন ঠিক করা ছিল। সবাই মিট করলাম বৃষ্টির মুখে শেয়ালদায় দার্জিলিং এক্সপ্রেস ধরার জন্য দুপুরে। জেনারেল কামরায় সবাই জায়গা দখল করে বসলাম নিচে ওপরে বিছানা পেতে। ছাত্রদের রোয়াব আলাদা। কোন কথা হবে না। কলকাতার সবাই বাড়ি থেকে খাবার এনেছে, ছুটির গল্প। সেইসব ভাগাভাগি করে উপভোগ। বিকেল পেরিয়ে সাহেবগঞ্জ। আমি আগের দলে, আধমাইল দৌড়ে সকরগলিঘাটে লঞ্চ, তারপর ওপারে আবার সেই দৌড়ে মনিহারিতে ট্রেনে দখলদারি। অবেলার গঙ্গা আর রাতের গঙ্গার রূপই আলাদা। আগেকার রাতের স্মৃতি মনেও পড়ল না এবার। ট্রেনের কামরায় সবগুলো কাঠের বেঞ্চ, তক্তাপোষ যাকে বলে আর কি। শুয়ে বসে সিনেমার গান চলছে। স্টিমারে সবাই এসে পড়লো ঘন্টাখানেক পরে, তখন গাড়ি ছাড়লো। বেঞ্চে জড়াজড়ি করে শুয়ে সেই ঘুম ভাঙলো শিলিগুড়িতে সকাল পেরিয়ে। সন্ধ্যায় মেসে। রান্নার ঠাকুর আগেই এসে গেছে।


চা-টা খেয়ে আমরা কুজন শুরু করলাম। ছুটিতে কে কিরকম প্রেম করেছে। কে কতটা গাঁজা খেয়েছে। আমার মাথায় তখন ইছামতী। যেতেই হবে একদিন। চার রুমমেট ছাড়া আমার প্রিয়বন্ধু ছিল দীপনারায়ণ বাগচি, সুন্দর রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতো। কলকাতায় আর্ল স্ট্রিটে বাড়ি। ইছামতী উপন্যাসের কথা ভাবার জন্য মাথা ব্যথার ভাণে দীপের কোলে মাথা দিয়ে শুয়ে পড়লাম। মাথায় আলতো আঙুল বোলাতে বোলাতে গান গাইতো সে, রবীন্দ্রসঙ্গীত, আরামে ঘুম পেয়ে যেতো। যে ভাবে আসল মাথা ব্যথার উপশম হয়। গুণ ওর। আমার হাইট, রোগা, ফর্সা, হাসিমুখ দীপের কত গুণ ! আর আমার চোখে মুখে কেবল মাস্তানী। ধ্যাৎ শালা। এই জীবন !


কলেজে ক্লাস শুরু হতেই শুনলাম হোস্টেল রেডি। সামনের রোববার শিফট করতে হবে। রুম অ্যালট হলে আমরা চারজন, আমি-স্বপন-তপন-গোবিন্দ তিনতলার রাইট উইং-এ দ্বিতীয় ঘরে জায়গা নিলাম। আমাকে বিশেষ ছাড় দেওয়াতে বাইরের ডান দিকের জানালার ধারের সিটটা দখল করলাম। জানালা দিয়ে সেই প্রথম দেখলাম স্বপ্নের পাহাড় কাঞ্চনজঙ্ঘা। দূরে ঝিকমিক করছে রোদে। অবশ তাকিয়ে থেকে নেশা ধরে গেল। জলশহরে থেকে আমার প্রিয়তম দৃশ্য পেলাম। থ্যাঙ্ক ইউ জলপাইগুড়ি। থ্যাঙ্ক ইউ জলপাইগুড়ি গভর্মেন্ট ইঞ্জিনীয়ারিং কলেজ। এই দৃশ্যের জন্য আমি বছর বছর ফেল করে এই হোস্টেলের এই সিটে জীবন কাটাবো। ভাবলাম তখনকার আবেগে।


তেতলার একটা উইং ছেড়ে দেয়া হল ২৫ জন সিনিয়ার সিভিলের ছাত্রের জন্য। দোতলা তেতলার বাকিটায় আমরা ১৮০ জন। নিচের তলা নতুন ছেলেদের জন্য ফাঁকা রাখা হল। সেই সঙ্গে কিচেন আর ডাইনিং রুম। তলায় একপাশে ওয়ার্ডেন সপরিবারে। কেমিস্ট্রির অধ্যাপক বিপিন বিহারী বাবুর একমাত্র মেয়েটির কেমিস্ট্রি নিয়ে আমরা সবাই ভাবিত। বাকি নতুনরা শহরের মেসে। আর একটা হোস্টেল তৈরি হচ্ছে ডানপাশে, ভবিষ্যতের জন্য। জুলাই শেষের সেই রবিবার, ১৯৬৩, আমার জীবনের একটা স্মরণীয় দিন হয়ে রইলো। আমার স্বাধীনতার দিন। কতদিন ধরে এই স্বপ্নটা দেখে আসছি। উফ্‌ ! আজ সাকার হল। রিয়াল হোস্টেল জীবন শুরু হল আমার। জলপাইগুড়িকী জয়। ইলেকট্রিসিটি নেই, ওয়্যারিং আছে, আর আছে কেরোসিন, হেরিকেন, লম্ফ, যার যেমন। মেস শুরু হয়নি। আছে ক্যাম্পাসের মধ্যেই একটা ঝুপড়ি দোকান, পুরুষ লক্ষ্মীর। ঘরে শুধু চারটে খাট। টেবিল চেয়ার ক্রমশ। বাথরুমে দরজা নেই। উত্তেজনায় কিছুই গায়ে মাখিনি তখন। কেউ না। সবার হাসিমুখ। তৃপ্তি। তার মধ্যেই শুরু হল কলেজ, পড়াশুনো। সেকেন্ড ইয়ার থেকে ইঞ্জিনীয়ারিং কোর্স। ড্রইং। খাটের ওপর বোর্ড পেতে আঁকিবুকি।


বড় রাস্তায় গেট লাগছে, দেয়াল তোলা হচ্ছে, টিচারদের বাড়িঘর। হোস্টেলের বাইরে ঘুরে বেড়াতে খুব ভাল লাগতো। পিছনে বিরাট মাঠ। খেলার গ্রাউন্ড পেরিয়েও অনেকটা জায়গা। তারপর করলা নদী। রোগা, তবে স্রোত খুব। ডানপাশে বেশ দূরে ডেঙ্গুয়াঝর চা বাগান, করলায় পড়া একটা নালার ওপর পুল পেরিয়ে যেতে হয়। উত্তরে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনীয়ারিং কলেজ। এখানে ১৯৬১-এর ফার্স্ট ব্যাচের ক্লাস হতো। তারপরে রাস্তা যেটা চা বাগান থেকে তিস্তা পর্যন্ত গেছে। পুব দিকে কলেজ বিল্ডিং হচ্ছে। তার পরে রাস্তা মাসকলাইবাড়ি পর্যন্ত। সারা জেলা গুড়ি পাড়া আর বাড়ি দিয়ে গড়া। আমার ভাল লাগতো পেছনের মাঠ, নদী, চা বাগান। ঘোরাঘুরি করতাম শুধুই। সঙ্গে দীপ। ধীরে ধীরে সব ফাঁক ভরে গেল। সব কিছু গড়ে উঠল। রপ্ত হয়ে গেলাম নতুন জীবনে।


পর্ব ১২









কারেন্ট নেই। সেকেন্ড ইয়ারে তখনো জেনারেটর আসেনি কলেজে। দিনের বেলাটা কোনরকমে কেটে গেলেও রাতে মশারা খুব বিরক্ত করে। কামড়াবার আগে দেখা যায় না ব্যাটাদের। মশাদের গায়ের রঙ যদি ফর্সা হতো। ছোটবেলায় শীত গ্রীষ্মের বোধ ছিল না। এখন একটু ফ্যান না চললে সন্ধ্যায় ঘরে টেকা দায়। ছিঃ বারীন ! জীবনের না পাওয়াগুলো ছিলই না ভাবতে পারো না ? দুঃখ কিসের ? তার বদলে যা কিছু পেয়েছি, যাদের পেয়েছি, তাই নিয়ে আনন্দ করা যাক না। আমার একটা হেরিকেন ছিল। সেটা ম্যানেজ করার এতগুলো স্টেপ ছিল যে বোর হয়ে যেতাম। আমারটা ছিল পাতি। তপনের ছিল প্রেসার দেয়া মাল। মেড ইন রেঙ্গুন। জ্বলতো দারুণ। সেটাই মাঝ টেবিলে রেখে আমরা ঘিরে বসতাম গুলতানি আর পড়া একসাথে চালাতে। আমার, তপন আর গোবিন্দর এক ক্লাস। ইলেকট্রিকাল। একজন পড়তো আর বাকিরা শুনতো। গোবিন্দ ভাল পড়তে পারে আর আমরা ভাল শুনতে পাই। অতএব। স্বপনের আবার মেকানিকাল। অংক আর দু-একটা সাবজেক্ট ছাড়া বাকিটা একসাথে ওরও।


বর্ষা পেরিয়ে শরতের জলপাইগুড়ি বড় শ্যামল সুন্দর। মশা ছাড়া অবশ্য। হোস্টেলের ত্রিসীমায় ফুলের গাছ নেই অথচ বাতাসে সুগন্ধ। করলা নদীর ওপার থেকে এ সি কলেজের মেয়েদের সুবাস হয়ত। বাইরে থেকে তিনতলা হোস্টেলটার জানালাগুলো সন্ধ্যার পর জানাডুর মতো লাগে দেখতে। যেন ভুতুড়ে একটা অন্ধকার গুহার মধ্যে এখানে ওখানে টিমটিমে আলো কাঁপছে। তখনো “গুহার আঁধারে” ব্যাপারটা শুনিইনি। সে তো আর রোজের দেখা নয়। অন্ধকার আমার ভালই লাগে। যখন সব কিছু মুছে যায়, আমি আলাদা হতে থাকি। একলা। একটা টর্চ আমার চিরসঙ্গী। মাঝে মাঝে রুমের হিজিবিজি হিহিকার থেকে বেরিয়ে আসি। হাঁটতে থাকি সিড়ি বেয়ে ছাদের দিকে। টর্চের আলোয়। আহ্‌হা ! অন্ধকারেই তো ফুটে থাকে আসল নির্জনতা। কী ভাল লাগে যে ! গভীর নিঃশ্বাস নিয়ে ছাদের ওপর পায়চারি করতে করতে টের পেলাম বিল্ডিংটার প্ল্যান। প্ল্যান সাধারণত কারো চোখে পড়ে না। এলিভেশন দেখেই মুগ্ধ হয় সবাই। এখান থেকে চোখ তুলে এলিভেশনের দিকে তাকিয়ে দেখি সব ফাঁকা। চোখে কিছু পড়ছে না। জলপাইগুড়িতে অন্ধকার কত গাঢ় হয় ! ভাল করে দেখার জন্য প্যারাফেট দেয়ালের ওপর লম্বা হয়ে শুয়ে পড়লাম চিৎ হয়ে। নিঃশাসে টের পেলাম অন্ধকার। কানে টের পেলাম। গায়ে। চোখে। চোখ ঘোরাতে ঘোরাতে স্থির হয়ে গেল আকাশে। আকাশ ভরা সূর্য তারা সেই প্রথম দেখতে পেলাম এই শহরে। ছোট বড় দূরে কাছে তারাদের মতো কত সূর্য। সূর্যদের মতো কত তারা। কারা যেন নাম রাখে মঘা, মৃগশিরা, বশিষ্ঠ, অরুন্ধতী – কিছু যায় আসে না। আমি তাদের দেখি। তারাও আমাকে দ্যাখে। ভাল লাগে। এখন আমার উনিশ। দশ বছর আগেকার কথা মনে পড়ল। রাতের বেলা বাগানে খাটিয়া পেতে শুতে বাধ্য হয়ে ভয়ে অভিমানে চোখে জল আসার কথা। তখনও তারারাই আমার বন্ধু, আমার সান্ত্বনা, আমার কল্পনার রাজত্ব। আমি চিনবো না তাদের। নাম জানবো না। সবসময় তারা আমার কাছে নতুন বিস্ময় নিয়ে আসুক।


তারারা যেন বিন্দু বিন্দু। যোগ করে লাইন টানলে নানা ফিগার হয়। অন্য দিয়ে তাকিয়ে আবার দৃষ্টি ফেরালে ফিগার বদলে যায়। আকাশে কিছুই স্থায়ী না। এই একটা কুকুরের মুখ, আবার একটা মাছের মতো। পাখি একটা। অনেকগুলো। বক পাখি। দি ফ্লাইট অফ পিজিয়নস্‌। সিনেমা দেখেছিলাম। প্রথমে একটা ঘুড়ি। তারপর উড়ন্ত ঘুড়ির মেলা। পাহাড়ের উঁচু নিচু লাইন। ঝর্না। সুমনা। না, জয়তী। না, সুমনা। না, সীমা। কে যেন। ভেক্টর লাইনগুলো মনে হচ্ছে অংকের জ্যামিতি। আবার মনে হচ্ছে জ্যামিতির অংক। কী যে হচ্ছে! ছোটবেলায় মনে হতো ওই তারাটার নাম নিরূপমা। পাশেরটা চপলা। আমার মা আর দিদিমা। বাবাকে ওখানে রাখব না। ওই ভিড়ে আমাকেও না। তাহলে দেখব কী করে ? ভিড় দূর থেকেই ভাল। দেখতে দেখতে আমাদের মধ্যে দূরত্ব কমে এল। তারারা ক্রমশ নেমে এল আমার ওপর। না কি আমিই উঠে গেলাম তারামন্ডলে ! আলো-অন্ধকারের ঝামেলায় গড়িয়ে পড়তে পড়তে আঁৎকে উঠে দেখি পড়িনি। প্যারাফেট ওয়ালেই শুয়ে আছি। এই ডেঞ্জারটা উপভোগ করা গেল। দূর থেকে কাদের আওয়াজ ভেসে আসছো--- বারীন, এই বারীন, কোথায় শালা, বারীন --- আওয়াজে ধরমর করে উঠে বসলাম।


--- একটু আরাম করতে দিবি না ?


--- কটা বাজে চাঁদু ? খেয়েছিস ? ডাইনিং রুম বন্ধ হয়ে গেছে।


--- কটা বাজে ? ক্ষমতা নেই, হাতে ঘড়ি নেই। একজন বলল --- এগারোটা প্রায়।


স্বপন বলল --- আবে আগে নিচে চল, তারপর কথা হবে। প্যাঁদানো হবে। আমাকে জড়িয়ে ধরল --- একলা কেন রে ? কি হয়েছে ? ভাল লাগছে না ? স্বপনকে তখন জড়িয়ে ধরলে ব্যাটা নির্ঘাৎ ভাবতো আমি একটা হোমো।


--- চল যাই।


--- কোথায় ?


--- কেন, নিচে খেতে।


--- বন্ধ সব। এখন জল দিয়ে খাবি খা।


আমার তো এই সঙ্গ-বিনাই দেখে দেখে পেট ভরে গেছে। তেতলায় নেমে বাথরুম সেরে মশারি টাঙ্গিয়ে শুয়ে পড়লাম। জলপাইগুড়ি। জল পাই গুড়ি হয়ে গেল।


১৯৬৩। সেবার পুজোয় প্রায় সবাই বাড়ি গেলে আমি একা। মেস বন্ধ। লক্ষ্মীর দোকান ভরসা। চা জলখাবার লাঞ্চ ডিনার সিগারেট। শহরের পুজো দেখার শখ ছিল না আমার। সকালবেলা খুকু, সুমনার সঙ্গে নীরবে বসে থাকা ভবানী পাঠকের মন্দির চত্বরে বটগাছের জটলায়, লোকচক্ষুর আড়ালে, স্পর্শে, আদরে। নীরবে, কারণ আমাদের মধ্যে কোন বুদ্ধি নেই। কোন কমন কফিকাপ নেই। কী যে শুনতে চাই যা সুমনা বলে না, আমিও জানি না। পুজোর সময় মন্দিরে বিশেষ ভিড়। সুমনা সতর্ক। বিকেলে সুমনার সাজগোজ প্যান্ডেল ভ্রমণ ইত্যাদি। জনসমক্ষে ভিড়ে আমার সাথে বেড়াতে ওর দ্বিধা বুঝতে পারি। আড়ষ্ট ভাব। আমার খুব খারাপ লাগল এটা টের পেয়ে যে প্রেম করতেও পয়সা লাগে। প্রেমিকাকে খুশি করতে, নিজের তাচ্ছিল্য দেখাতেও পয়সা লাগে। আমি বিকেলে একলা সিনেমায়। চা। পান। সিগারেট। হেঁটে শহর বেড়ানো। তিস্তার বাঁধে বসে থাকা। রুকরুকা নদীর পুল পেরিয়ে চা বাগানে ঘুরে বেড়ানো। সেই বছরই সুমনার সঙ্গে আমার প্রেম শেষ হয়ে গেল। ১৯৬৩ দুর্গাপুজোর দিনগুলি মনে পড়ে। সুমনাকে কোনদিন নিস্পৃহ দেখিনি। ভালবাসতো মনে হয়। শরীর দিয়ে। মন দিয়ে। কিন্তু না সুমনার দোষ না আমার দোষ, সে মুখ ফুটেও বলেনি। টাকা পয়সার বাহুল্য বা অভাবের কথা উঠলেই আমার মুখ ঘুরে যায়। কখনো ফেরে না। সেই বয়সেই। আমিই দূরে সরে গেলাম এর পর। হীনমন্যতার কারণ থেকে দূরে। ত্যাগ করলাম। হায় সুমনা। হায় জলপাইগুড়ি। প্রেমপর্বে ইতি।


বহু বছর, প্রায় ৫০ বছর পরে, ২০১৩ ডিসেম্বরের শেষে আমি জলপাইগুড়ির অতনু বন্দোপাধ্যায়ের সঙ্গে রায়কতপাড়ায় ঘুরে বেড়ালাম পায়ে হেঁটে সুমনাদের সেই বাড়িটার সন্ধানে। বোধ হয় আশা ছিল আবার দেখা হবে। তাই কি আর হয় ? বিয়ে করে কোথায় চলে গেছে সে। সেটাই স্বাভাবিক। খোঁজাখুঁজি করে জানা গেল মুখোটি পরিবার বিচ্ছিন্ন হয়ে রায়কতপাড়াতেই ছড়িয়ে পড়েছে। যারা আছেন তারা আমাকে চিনবেন না ভেবে সেই বাড়িটি চোখের দেখা দেখে ফিরে গেলাম ভবানী পাঠকের মন্দিরে। দিনকালের স্বাভাবিক পরিবর্তন ছাড়াও আমাদের সেই বট গাছ ঝুরি ঘেরা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এখনো। তলায় পাথরের বদলে এখন সিমেন্ট দিয়ে বাঁধানো। অতনুকে দেখালাম আমাদের প্রেমাসন। সেখান থেকে তিস্তা বাঁধ, রাজবাড়ি, দিঘী, স্টেডিয়ামের মাঠ, তিস্তা মোহানা। কিছুই আর আগের মতো নেই। শান্তিপাড়ার সেই মেস খুঁজে পেলাম না। কলেজের গেট ঘুরে গেছে। করলা নদীর ব্রিজ, শ্মশান, সব। ন্যাশনাল হাইওয়ে থেকে, শহর থেকে বাইরে নিভৃতে ছিল কলেজ আর হোস্টেল। এখন শহর খেয়ে ফেলেছে সেসব। কিছুই মেলে না। না মেলাই ভাল। স্মৃতি বয়ে চলুক আমার মনের সাথে।


পর্ব ১৩









জামশেদপুরের মতো জলপাইগুড়িও সবুজের দেশ। শহর আর আধাশহরের মধ্যে যেটুকু তফাৎ। কিছু যায় আসে না। কিন্তু সুমনার সাথে প্রেমটা কেচাইন হবার পর থেকেই মনটা আমার উড়ু উড়ু। জানালা দিয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘার দিকে চেয়ে থেকে কোনদিন না দেখা হিমালয়ের কথা ভাবি চুপ করে। হিমালয় না দেখেও বেশ ভাবা যায়, শিশুদের মতো কল্পনায়, সেখানে কাঞ্চনজঙ্ঘার মতো ঝকমকে একটা চাঁদের পাহাড় আঁকা যায়। বাস্তবে হিমালয় না জানি কীরকম। জলাধার অনেক তো দেখলাম। জামশেদপুর আর কলকাতার লেক, ডিমনা - খড়কাই – সুবর্ণরেখা – রূপনারায়ণ – গঙ্গা – তিস্তা - দীঘার সমুদ্র দেখেছি। জঙ্গল দেখেছি। কিন্তু পাহাড় তো দেখিনি। শুধু দূর থেকে দলমা। কতদিন ভেবেছি একদিন আসবেই কেউ হাতছানি দিয়ে নিয়ে যাবে দলমায়, হাতিরা আমাকে পিঠে তুলে মিছিল করে চলে যাবে চূড়ার দিকে দুলতে দুলতে আর আমার চোখ ঢুলবে ঘুমে......... গোবিন্দ ঝাঁকুনি দিয়ে তুলে দিলো--- আবে ওঠ, এই বারীন, নে, প্যাকিং সেরে ফেল তাড়াতাড়ি। আটটার ট্রেন ধরতে হবে।


--- ট্রেন ! কেন ? কোথায় ? কটা বাজে ?


--- দার্জিলিং যাবি ? যাবি না ? ছটা বাজে। জলদি কর।


আমি লাফিয়ে উঠে গোবিন্দকে জড়িয়ে ধরি। ভোরের স্বপ্ন সত্যি হয় তাহলে ? একেবারে দার্জিলিং তাই ব’লে! আর কোন প্রশ্ন না করে চটপট তৈরি হয়ে বেরিয়ে পড়লাম চারমুর্তি স্টেশনের দিকে। আমি, স্বপন, তপন, আর গোবিন্দ। তপন গাইগুঁই করছিল --- ছুটি না নিয়ে যাওয়া ঠিক হচ্ছে না রে। --- তুই বরং থেকে যা ছুটি নেবার জন্য। স্বপন বলল, --- গান্ডুমি করিস না, ফুর্তি কর। আমি বলি --- কাল যখন প্ল্যান হচ্ছিল তুই ছিলি না? কাঞ্চনজঙ্ঘা, দার্জিলিং, হিমালয় আমার স্বপ্নে ধরে না। সেখানে যাচ্ছি। ভেবেই উঠতে পারছি না কী জানি দেখব। গায়ে কাঁটা দিচ্ছে। শীতের যা ছিল নিয়ে নিয়েছি। ধারণাই নেই। উত্তেজনায় টগবগ করছি। জলপাইগুড়ি ষ্টেশনে হলদিবাড়ি প্যাসেঞ্জারে চড়ে বসলাম। টি টি আসতেই র‍্যালা মেরে বললাম ইঞ্জিনীয়ারিং কলেজ। ওতেই কাজ হল। টি টি বলল --- ঘুরে আসছি ভাই। গোবিন্দ পানামা সিগারেট বার করল। টানছি, গপ্পো। স্বপন বলল --- টাকা পয়সা নিয়েছিস তো তোরা? আমি বলি --- আমাদের টাকা দেখাতে যাচ্ছি, না দেখতে যাচ্ছি? নে, গান ধর। গান হচ্ছে, টি টি এসে বসল। তার ভাই ইঞ্জিনীয়ারিং এন্‌ট্রান্স দেবে তার প্রিপারেশন নিয়ে সাজেশন..... শিলিগুড়ি প্রায়। টি টি-কে বললাম টয়ট্রেনের গার্ডকে বলে দিতে দার্জিলিং-এ বাইরে পার করে দেবার জন্য। অবশ্য –- বলে টি টি সহাস্যে কাজটা করে দিলো।


টয় ট্রেন। জীবনে প্রথম। ফিলিংটা অদ্ভুত রোমাঞ্চকর। ভেতরে বাইরে চোখ বুলিয়ে যাত্রিদের লক্ষ্য করছি। শিলিগুড়ি ষ্টেশনে দিনের বেলা অতক্ষণ আগে থাকিনি। স্বপনদেরও একই অবস্থা। সবাই উশখুশ করছে। ট্রেন ছাড়লো। শিলিগুড়ি সে সব দিনে ছোট শহর। ছাড়িয়েই গাড়ি স্পিড নিলো। গতি বাসের মতোই। দুলে দুলে চলে। শহরের পেরিয়েই জঙ্গল শুরু। বেশির ভাগই আমার চেনা শালগাছ। ক্রমে সুকনা, রঙ্গীত নদীর ব্রিজ, ট্রেন চলেছে। আবার লিটল রঙ্গীত নামের আরও একটা নদী দেখলাম। তারপর পাহাড় শুরু হল। হিমালয়। একটা জানলার পাশে বসে মাথা কেবল এদিক ওদিক করছি, পাছে কিছু মিস হয়, আর হিমালয় ঢুকে যাচ্ছে মাথায় বুঝতে পারলাম। ওপরে ট্রেন চলেছে শম্বুক গতিতে। দুপাশে পাহাড়ের সবুজ গা ঢেউয়ের পরে ঢেউ খেলানো। পাহাড়ের মাথা দেখা যাচ্ছে না। ট্রেনপথের পাশেই গাড়ির রাস্তা, যেন হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যায় পথিক মানুষদের। পাহাড়ি মানুষের বিচিত্র পোষাক। ক্রমশ শাল গাছ পেরিয়ে আমরা দেবদারু ঝাউয়ের রাজ্যে প্রবেশ করেছি। একটা ছোট ষ্টেশনে ট্রেন দাঁড়াতে আমরা নেমে চা খেলাম পথের পাশের দোকান থেকে। পাহাড়ের গা থেকে ঝর্ণা বেরিয়ে লাফিয়ে নিচে পড়ছে। এগিয়ে ইঞ্জিনের কাছে গিয়ে দেখি কয়লার অগ্নিকুন্ড। কয়লার ছোট ইঞ্জিন আগে দেখিনি তো তাই। ইঞ্জিনের পাশে একটা জায়গায় অনেকটা বালু আর বেলচা রাখা। কী জানি কেন! হুইসিল দিয়ে আবার চলল ট্রেন। এবার পাশের রাস্তা দেখা যাচ্ছে না। সোজা খাদ নেমে গেছে। কী ভয়ানক ! জানলা আঁকড়ে ধরে গোবিন্দদের দিকে চেয়ে দেখি সবার এক অবস্থা। ট্রেন একটু বেশিই দুলছে যেন। বাকি লোকরা মোটামুটি স্থির দেখে ক্রমশ ভয়ের ভাবটা কেটে গেল। রিস্কটা এনজয় করতে শুরু করলাম। এক জায়গায় ট্রেন অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে, কোন স্টেশন নয়। কী ব্যাপার দেখতে নেমে এগিয়ে দেখি দুজন খালাসি বেলচা দিয়ে বালু দিচ্ছে ইঞ্জিনের আগে ট্রেনের লাইনের ওপর। জিজ্ঞেস অরে জানা গেল চাকা স্লিপ করছে বলে বালু দেয়া হচ্ছে। ওরে বাপস্‌ ! খাদ ছাড়াও আরো একটা রিস্ক ছিল ! ভাবি ট্রেনটা ডিরেল হয়ে গেলে ? উফ্‌!


ট্রেনের কামরায় অনেক টুরিস্ট। রঙচঙে জামাকাপড়, সোয়েটার, সুটকেস। সবচেয়ে মজার লাগল মেয়েগুলোকে। সাজগোজের ওপর বিবর্ণ মুখ। ভয়ে আর কি। তখনি আমার ভয় সরে গিয়ে কথার ফুলঝুরি খুলল। তপন আমাকে টিপে বলল --- কথা না বলে বাইরেটা দেখ শালা। জীবনে প্রথম প্রেমের মতো, না? --- এই তপন, রাত্রে আজকে বার্মিজ মেয়ের সাথে তোর প্রেমের গল্পটা চাই। কোনদিন বার্মায় যাওয়া হবে কিনা জানি না। আচ্ছা, শরৎচন্দ্র সত্যিই কি বার্মায় গিয়েছিলেন না কি পুরোটা বানিয়ে লেখা? জানিস? তপন বলল --- সিগারেট খা, বুদ্ধি খুলবে।


আমি আরো অনেকবার গেছি ওই পথে, কিন্তু কোনদিন ভুলতে পারব না বিজনবাড়ি, ঘুম নামের স্টেশন, আর বাতাসিয়া লুপ। এই নামগুলো পরে আমার কবিতায় অনেকবার এসেছে। দার্জিলিং স্টেশনটা ভাল না লাগলেও বাইরে বেরিয়ে অবাক হলাম। পৃথিবী অত সুন্দর আমি আগে কখনো দেখিনি। আমরা খুঁজে পেতে ম্যালের কাছে হিমালয়ান গ্লোরি নামের একটা হোটেলের ফোর-বেড ডর্মিটরিতে জায়গা নিলাম। আমাদের চারজনের দুদিনের থাকা খাওয়া আশি টাকা। একটু চাপ দিতে স্টুডেন্ট কনসেশনে রফা হল চৌষট্টি টাকায়। লেপ বিছানা ওরাই দেবে। তোফা। আমার দুদিনে ষোল টাকা লাগবে। ভাবো! লাঞ্চের পরে সবাই বেরিয়ে পড়লাম। ম্যালে একটা রাউন্ড দিয়ে সোজা নর্থ পয়েন্ট-এর দিকে। ঘোড়াদের পাশাপাশি। ওগুলো খচ্চর রে --- গোবিন্দ বলল। কাউকে যখন খচ্চর বলবি তখন ওগুলোকে ভাববি।


ক্লান্তি নেই আমাদের। হেঁটেই ফিরলাম। ম্যালের বেঞ্চে বসে নিচে রেসকোর্স, দূরে পাহাড়ের ঢেউ খেলানো মাথা বাঁ থেকে ডান দিক পর্যন্ত যতদূর চোখ যায়, সন্ধ্যার মুখে সবুজ থেকে নীল হয়ে কালোয় বদলে যাচ্ছে। আরে! একটা দুটো আলো জ্বলে উঠছে না ? দূরে পাহাড়ে হীরকদ্যুতি দেখে মনে পড়ল জামশেদপুর থেকে দলমার দিকে রাতে চাইলে কেমন আগুনের মালা দেখা যায়। এবড়ো খেবড়ো। বনকর্মীরা ঝাঁট দিয়ে মাটিতে পড়ে থাকা শালের শুকনো পাতা লাইন করে রেখে আগুন জালাতো দাবানল থেকে বন বাঁচাবার জন্য, সেটাকে আগুনের মালা মনে হতো দূরের শহর থেকে। কী যে ভাল লাগতো দেখতে ! এখানেও তেমন হীরকমালা দেখার ভাল লাগা। আমরা চার জন। সবাই একই রকম অনুভব করছি তা তো হতে পারে না। আমার টেস্ট করার ইচ্ছা হল না।


ঠান্ডা বাড়ছে। উঠে আমরা দার্জিলিং-এর উঁচু নিচু পথ, গলি, সিড়ি দিয়ে হাঁটছি, দোকান, হোটেল, সিনেমা, বাড়িঘরের সামনে দিয়ে। হাঁটার জন্য হাঁটা। কিছু খোঁজার জন্য নয়। কথা বলতে বলতে। গোবিন্দ বলল --- একটু টানলে হয় না? আমি চার্মিনার ধরিয়ে বললাম --- পকেটে মাল নেই গুরু। সস্তায় কিছু হবে? স্বপন বলল --- শুনেছি এখানে থুম্বা পাওয়া যায়। কান্ট্রি লিকার, চিপ। শুনতে পেয়ে পাশের একটা ছোট দোকান ডেকেই ফেলল --- আইয়ে স্যার থুম্বা হ্যায় না।


আমরা ঢুকে একটা ছোট প্রায় অন্ধকার কেবিনে বসলে একজন নিয়ে এল চারটে ফুটখানেক লম্বা মোটা বাঁশের চোঙ্গা। তাতে থুম্বা নামের সর্ষেদানার মতো কিছু দিয়ে ওপর থেকে গরম জল ঢাললো। প্রত্যেকটা চোঙ্গায় একটা করে সরু বাঁশের স্ট্র দিয়ে বলল নাড়তে। তারপর সেই স্ট্র মুখে দিয়ে জলটা টেনে খেতে বলল। এই নতুন ব্যাবস্থায় আমরা বিমোহিত। অতি উৎসাহে মুখে স্ট্র দিয়ে টানতে শুরু করলাম। একটু নোনতা স্বাদ। টানছি আর এই আকস্মিকতায় মুগ্ধ হয়ে আলোচনা করছি। ধীরে ধীরে হালকা নেশা হতে শুরু করল। সেকেন্ড রাউন্ড জল টানা শেষ হলে আমরা উঠলাম। হোটেলে ফিরে ভাত খেয়ে লেপের তলে।


পরদিন ভোর না হতেই আগে বলে রাখা জিপে উঠে বসলাম টাইগার হিল-এর জন্য। এই যাত্রাটার বর্ণনা থাক, সবাই জানে। সামনে, আমার চোখের সামনে কাঞ্চনজঙ্ঘা! অবশেষে। আমি তার বর্ণনায়ও ক্ষান্তি দিলাম। পারবো না। উনিশ বছর বয়সে জীবনে প্রথমবার কাছ থেকে দেখা কাঞ্চনজঙ্ঘা চোখে ধরতে হয়। মুখে বা কলমে ধরে না তা। আমি রেলিং ধরে স্ট্যাচু হয়ে বর্ণালীর অতিক্রমণ লক্ষ্য করছি। স্বপন তপন গোবিন্দরও সেই অবস্থা। মনে হল চিরকাল ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকি। কিন্তু হায়। সকাল হয়ে গেছে। রোদ। সবাই সেখান থেকে ফিরে যাচ্ছে। আমরাও আমাদের জিপে। মনের দুঃখে। জীবনের সেরা মুহুর্তগুলো লম্বা হয় না কেন?


সকালে ব্রেকফাস্ট সেরে আবার রোঁদে বেরোলাম। হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইনস্টিচুট-এ গিয়ে তেনজিং নোরগের ছবির পায়ের কাছে দাঁড়িয়ে হিমালয়ের কথা ভাবতে থাকলাম। মনেই পড়ল না আমি হিমালয়ের ওপর আছি। তারপর বোটানিকাল গার্ডেন, জু আর বিকেলে একটা সিনেমা, নাম মনে নেই। পরদিন সকালে বাসে শিলিগুড়ি হয়ে হোস্টেলে ফিরে এলাম। সেই স্মৃতি, সেই বর্ণালীর স্মৃতি জীবনে ভুলব না।






পর্ব ১৪






সেবছর সেকেন্ড সেমিস্টারের পর দু সপ্তাহের ছুটি পেয়ে জামশেদপুরে। আমার আড্ডার দোস্ত সুভাষ, কৌরবের হবু সম্পাদক, বলল – কিরে, গল্প লিখলি আর ? পাঠাস না কেন ?


--- সময় পাই না গুরু।


--- সুমনার সঙ্গে ফিটিং চলছে বুঝি খুব ?


--- নারে, বিলা হয়ে গেছে। কেস শুনে সুভাষ তার প্রেমিকা পালটানোর ইতিহাস খুলে বলল আমাকে উৎসাহ দেবার জন্য। বলল --- কবিতায় ঢোক। শর্ট অ্যান্ড সিম্পল। টাইম লাগে না। মন ভাল হয়ে যায়। আমি তো তাই করি। শুনবি ? ঘরে আয়। কবিতা সম্পর্কে স্কুলের নীলুর পরামর্শ মনে পড়ে হাসি পেল।


সুভাষদের পাশের বাড়িতে থাকত নেপালদা। নেপাল ব্যানার্জী। টেলকোতে চাকরি করে। বডি বিল্ডার। আমারও ব্যায়াম করা মাসল বলে খাতির করত। নেপালদা এছাড়াও ছিল চাম্পিয়ান রক্তদাতা। ব্লাড ডোনার। সোনার মেডেল পেয়ে দেখিয়েছিল আমাকে। বছরে চারবার রক্ত দান করা যেত। সেসময় জামশেদপুরের ব্লাড ব্যাঙ্কে রক্তদানের জন্য মানুষের প্রচুর উৎসাহ লক্ষ্য করতাম। বিশেষ করে টাটা কোম্পানীগুলো তাদের কর্মচারীদের প্রচুর উৎসাহ আর ইনসেন্টিভ দিতো তখন। নেপালদা চাইতো আমিও তার মত ব্লাড ডোনার হই। আমি ইঞ্জিনীয়ারিং কলেজে পড়ি বলে বিশেষ খাতির করত নেপালদা। এছাড়া নেপালদার ছিল সেযুগের পানাগড় ক্যান্টনমেন্ট থেকে নিলামে কেনা একটা ‘নর্টন’ মোটরবাইক। গুমগুম শব্দ করে যখন নেপালদা রোডবাজি করত আমরা চেয়ে থাকতাম। সেটার ওপর আমার আকর্ষণও ছিল। একদিন বিকেলে নেপালদা আমাকে বাড়ি থেকে তুলে নিলো। নর্টনের ব্যাক সিটে বসে গর্বে আমার বুক। মোটরসাইকেলে বসার সেই প্রথম অভিজ্ঞতা। হুউউউউ করে বাতাস কেটে ছুটে যাচ্ছে মানুষজন গাড়িঘোড়া পিছনে ফেলে। রোমহর্ষ। সাকচির ঘনবসতি আর বাজার এলাকা ছাড়িয়ে নর্টন এসে পড়ল জুবিলি পার্কের গেটে। ভেতরে ঢুকে নেপালদা মোটর সাইকেল থেকে নেমে আমার জীবনে প্রথমবারের মতো বিশাল সারপ্রাইজটা ঘোষণা করল --- বারীন, এবার তুমি চালাও।


নেপালদা বলে কী ! আমি তো হাঁ। জীবনে মোটর সাইকেল চালাইনি। এবার বারীন ? হেরে যাবো ? নেভার। আমি গলা খাঁকারি দিয়ে ডন বৈঠক মেরে সিটে বসে হ্যান্ডেল ধরলাম। নেপালদা পিছনে বসে কিক মেরে স্টার্ট দিয়ে দিলো। আমি আইডিয়া থেকে ক্লাচ গিয়ার ব্রেক অ্যাক্সিলেটর ভুলভাল করতে করতে চালাতে শুরু করলাম। কী আশ্চর্য ! গাড়ি সোজাই চলল। কাঁপল না। স্পিডও দিলাম একটু সাবধানে। আধঘন্টা পার্কের মধ্যেই ঘোরাঘুরি করে চালিয়ে থামলাম। নেপালদা অবশ্য প্রথম প্রথম পিছন থেকে হাত বাড়িয়ে হ্যান্ডেলে সাপোর্ট দিচ্ছিল। মন খুশি হয়ে গেল। যাকে বলে দিল বাগ বাগ হয়ে যাওয়া। একটা সিগারেট ছিল পকেটে, তাই ধরালাম উত্তেজনায়। নেপালদা এবার জ্ঞান দিলো


--- সিগারেটটা ছাড়তে হবে বারীন।


নেপালদা জানতো না আমার বাবাও আমাকে পরামর্শ দেবার ভুল করে না। চলো।


এর পর আরো সারপ্রাইজ ছিল। ১৯৬৪তে শহরে সফিস্টিকেশনের হাইট ছিল নটরাজ রেস্টুরেন্ট কাম বার। পুরো এসি। আমাকে সেখানে নিয়ে গেল নেপালদা। ছোট টেবিলে বসে চারপাশটা দেখছি আর ভান করার চেষ্টা করছি এসব আমার জলভাত। হেরে যাবো ? কক্ষনো না। নেপালদা সময় নষ্ট না করে সোজা বিয়ারের অর্ডার দিয়ে বলল --- চলে তো ? --- চলে মানে ? দৌড়ায়। বলে, জল খেলাম। দু বোতল হেওয়ার্ড বিয়ার এনে ওয়েটার দুটো লম্বা গ্লাসে ঢেলে দিলো। পুরো লক্ষ্য করে যাচ্ছি। ছিপি কিভাবে খোলে। বোতল কিভাবে ধরে। গ্লাসে কেমন কাত করে বিয়ার ঢালতে হয় ফেনা কমাবার জন্য। জীবনে সেই প্রথম বিয়ার। চিলড্‌। চুমুক দিতে তেতো লাগল। কিন্তু প্রকাশ করা যাবে না। নেপালদা কথা বলতে বলতে আরামে বিয়ার খাচ্ছে আর আমার পেছন ফাটছে বোকার মতো শুনতে শুনতে। সঙ্গের চাট বলতে বাদাম আর চিকেন পকোড়া। সেসব দিয়েও সামলানো যাচ্ছিল না। একটা গ্লাস কোনরকমে শেষ করেই দ্রুত বাথরুমে গিয়ে বেসিনে বমি করলাম। পারছিলাম না। কিন্তু আমাকে যে পারতেই হবে। কিছুক্ষণ পরে চোখে মুখে জল দিয়ে ফিরে এসে কথা বলতে বলতে মনযোগ সরিয়ে আবার বিয়ার আর পকোড়া। এবার সিপ করে করে। আর দুর্ঘটনা হল না। যাক ! তাহলে ম্যানেজ করা গেল। পুরো সন্ধ্যাটার জন্য নেপালদাকে ধন্যবাদ দিলাম বাড়ির গেটের সামনে নেমে। নেপালদা বলল --- আবার হবে। চলি।


নর্টনের ফিলিং কাটতে কয়েকদিন গেল। আড্ডায় তার গল্প বাড়িয়ে সারিয়ে। একদিন অবশেষে জলপাইগুড়ি ফের। বাড়ির ছেলেটা বাইরে থাকে, কি জানি হাবিজাবি খায়, চলে যাবে, কারও কোন উদ্বেগ নেই একমাত্র মা ছাড়া। সাধে আমি মায়ের আশেপাশে ঘুরি ? আমারও বয়স হচ্ছে, এসব সেন্টিমেন্টকে আমল না দেবার শিক্ষা নিজে নিজে। এখন আর চোখে জল আসে না। মন ভারি হয় না। এই দুনিয়াদারিতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি।


জলপাইগুড়ির রুটিন চালু হয়ে গেল আবার। কলেজ, হোস্টেল, পড়াশোনা, আড্ডা, টাউনে সিনেমা, চলছে। ততদিনে কলেজ বিল্ডিং মোটামুটি একতলা হয়েছে। ওয়ার্কশেডের বদলে পাকা ঘরে ক্লাস। মেশিন শপ বসছে। লেদ আর ড্রিল মেশিন দিয়ে শুরু। আগে হেরিকেন আর লম্ফ দিয়ে হোস্টেলে কাজ সারা হতো। মনে আছে, তখন মাঝে মাঝে মোম জ্বালিয়ে বিছানায় মশারির ভেতর একটা প্লেটে রেখে শুয়ে শুয়ে পড়তাম। ঘুম পেলে ফুঁ দিয়ে মোমটা নিভিয়ে ঘুমিয়ে পড়তাম। একরাতে হল কি, তপন পেচ্ছাপ করতে ঘুম থেকে উঠে দেখতে পায় আমার তোষকে ধিকি ধিকি আগুন থেকে ধোঁয়া বেরোচ্ছে, গন্ধ। আমাকে ডেকে ঝাঁকুনি দিয়ে টেনে তুলল


--- বারীন, বারীন, ওঠ, আগুন আগুন


আমি ধড়ফড় করে উঠে বসে দেখি জ্বলন্ত মোমটা কখন প্লেট থেকে বিছানায় পড়ে গেছে। না নিভিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। অনেকটা পুড়ে গেছে তোষক। স্বপন আর গোবিন্দও উঠে পড়েছে। টর্চ জ্বালিয়েছে গোবিন্দ। স্বপন বেরিয়ে একগ্লাস জল এনে তোষকে ঢেলে দিলো। মশারিও খানিকটা পুড়েছে। বললাম


--- দিলি তো ঘুমের বারোটা বাজিয়ে ? থুথু দিলেই নিভে যেত।


--- হ্যাঁ। হিসি করলেও নিভতো। তপন বলল।


সে রাতে ঘুম আর হল না কারও। রাতের গুলতানি। কি যেন একটা সিনেমা দেখেছিলাম এরকম। বাদলদা দেখিয়েছিল। বাদলদা জামশেদপুরে এসেছিল চাকরি করতে। আমার এক দিদির গৃহশিক্ষক ছিল। তারপর যা হয়। প্রেম দিদির সঙ্গে। সেসময় ভারতে চাকরির অপ্রতুলতা আর বিদেশের হাতছানি যুবকদের তটস্থ করে রাখত। জার্মানি আর ইংল্যান্ডে চলে যাচ্ছিল অনেকে। বাদলদাও একদিন দিদিকে কাঁদিয়ে জার্মানি চলে গেল। রফা হল ওরা চিঠি দেওয়া নেওয়া করবে আমার মাধ্যমে কারণ আমার চিঠি দিদির বাড়িতে সন্দেহ করবে না কেউ। সেই থেকে লন্ডন বার্লিন আমার মাথায় ঘোরে। সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে শেষরাতে একটু শুয়ে নিলাম।


একদিন তারপর জেনারেটর এসেছিল। রোজ সন্ধে থেকে রাত দশটা পর্যন্ত। তার মধ্যেই ডাইনিং হলের খাওয়া দাওয়া সেরে ফেলতে হতো। বছরখানেকের পরে ১৯৬৪ তে ইলেকট্রিসিটি চালু হয়েছে। শহরের কংগ্রেস বিধায়ক খগেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত কলেজের গভর্নিং বডিতে ছিলেন। তাকে ঘেরাও করতে হয়েছিল কয়েকবার। ইলেকট্রিসিটি থাকাতে সারাদিন আলো ফ্যান। মেশিনশপ সেই থেকে শুরু। আর শুরু হল আলোয় ধরে ড্রইং শিট কপি করার কায়দা। আতিশয্যে একদিন বিয়ার উৎসবের প্ল্যান হল। তেতলার ক্লাবে চাঁদা করে বিয়ার আনা হল অনেকগুলো। চারটাকা বোতল। ওপেনার একটা। কম পড়েছে। শীতে ঠান্ডা বিয়ার। ফ্রিজ তো নেই। আমার সদ্য অভিজ্ঞতা। লিডারি করার বাসনা চাপবেই আমার। একটা কায়দা করলাম। আমার ডান হাতের রিস্টে তখন একটা স্টিলের বালা থাকতো। সেই বালা দিয়ে বোতলের ছিপি খুলে ফেললাম। কেউ সিটি দিলো। এরপর দাঁত দিয়ে ছিপি খুলে দিলাম। হাততালি। নেশার ঝোঁকে সবাই কিরকম এনজয় করছে লক্ষ্য করা হল না। আপনা নেশায় আপনি মশগুল। শিশির বিয়ার খাচ্ছে আর গান গাইছে --- আমার মায়ের পায়ের জবা হয়ে ওঠ না কেঁদে মন --- ব্যাটা, বিয়ারকে কারণ ভেবে শ্যামাসঙ্গীত জুড়ে দিয়েছে। আমি গলা মেলাচ্ছিলাম গুন গুন।


পরের দিন ঘুম ভেঙ্গে পুরো ঘটনাটা মনে মনে আবার চালিয়ে হতবাক হলাম আপনা নেশায় আপনি মশগুল-এ পৌঁছে। বিদ্যাপতি না চন্ডীদাস কে যেন লিখেছিল, ঠিক স্মরণে নেই। কি করেই বা থাকবে ? আপনা গন্ধে আপনি বৈরি ? গোলপার্কের লাইব্রেরিটা মিস করছি। এখানে পড়ুয়ারা উল্টোরথ, প্রসাদ, বেতার জগৎ, নব কল্লোল অবদি। আমার সে পয়সাও নেই। ব্যস, কখনো সখনো আট আনার মর্নিং শো আর কয়েকটা চারমিনার। কবিতার ভাবটা নিয়ে কি করি ? সুভাষের কথা মনে পড়ল। কবিতা লেখার পরামর্শের কথা। আর শিশিরের গানটা কান ছাড়ছে না। সেদিন লাঞ্চের পরে আর ক্লাসে না গিয়ে ঘরেই কাগজ কলম নিয়ে বসে পড়লাম কবিতা লিখতে। লিখেও ফেললাম আমার জীবনের প্রথম কবিতা। বারে বারে পড়ে মুখস্ত করে ফেললাম। সুর লাগালাম। শিশিরের গান, শ্যামাসঙ্গীতটা কানে বাজছিলই। সারা বিকেল ছাদে আলসেয় শুয়ে রপ্ত করে ফেললাম কবিতাটা। কিন্তু গান কি কবিতা ? কেন নয় ? ছড়া, পাঁচালী, পদ্য, সবই তো কবিতা বলে সবাই। গানও নিশ্চয়ই কবিতা। কথা হল, সেটা সৃষ্টিছাড়া হল কি না। মনে হয় হল। কোনদিনও কবিতা পড়িনি মন দিয়ে। সেদিনই রাতের আড্ডায় ব্যাপারটা পাড়লাম সবার সামনে। সবাই হৈ হৈ করে উঠল। শুনবো শুনবো রব উঠল। আমি গলা খাঁকারি দিয়ে পরিষ্কার করে নিলাম। বললাম, তাল দাদরা। বাজা তোরা, দাদরা। গুরু সুভাষকে স্মরণ করে সুর লাগালাম –- “হেএএএ, প্যাক করে পাঠাবো বাঁড়া লন্ডনেএএএএ” – সুর – আমার মায়ের পায়ের জবা হয়ে ওঠরে কেঁদে মন ---, দাদরা, সবাই হট্টগোল শুরু করে দিলো --- গুরু, কী বেঁধেছো মাইরি, জম্পেশ, ফাটিয়ে দিয়েছো, কোন কথা হবে না, চুপ কর সবাই --- ব্লা ব্লা --- শুরু করতে সবাই চুপ করে গেল --- তখন শুধু দাদরার ঠ্যাকা আর সুরের মজা ---


আমি প্যাক করে পাঠাবো বাঁড়া লন্ডনে।


আমি প্যাক করে পাঠাবো বাঁড়া লন্ডনে।





বাঁড়া বিলেতে যাবে


বাঁড়া মাগী পটাবে


টেবিলেতে বসে বাঁড়া পাউরুটি খাবে


সে যে কী মহিমা বাঁড়ার বাড়া নাইকো ভুমন্ডলে


প্যাক করে পাঠাবো বাঁড়া লন্ডনে।





তার কী যে পরিত্রাণ


সাদা গুডস্‌-এ ডাকে বান


দেখে কী যে অভিমান


মাথা খারাপ হবার সময় প্যাঁক ডেকে যায় মনে।


তবু প্যাক করে পাঠাবো বাঁড়া লন্ডনে।


আমি প্যাক করে পাঠাবো বাঁড়া লন্ডনে।


ধুম তেরে তাক ধুম তেরে তাক বাজনা আর গানের ধুয়ো থামেই না। ওয়ার্ডেন কেমিস্ট্রির বিপিনবাবু এসে দরজায় ধাক্কা মেরে চলেছে কখন থেকে খেয়ালই নেই আমাদের। একসময় ক্ষান্ত হলে পিটু দরজা খুলেই জিভ কাটল --- স্যার, আপনি? বিপিনবাবু বললেন --- কে গান গাইছিল, মূল গায়েনটি কে?


--- আজ্ঞে, স্যার?


--- না না, খুব ভাল শ্যামাসঙ্গীত গাইছিল। সমবেত কন্ঠে মায়ের গান এত ভাল শুনিনি আগে। কে ?


--- বারীন লিখেছে আর সুর দিয়েছে স্যার।


--- তাই নাকি? খুব ভাল। খুব ভাল। কাল আমার কোয়ার্টারে এসো সন্ধ্যাবেলা। আরো কয়েকজনকে ডাকবো। আমাদের ইঞ্জিনীয়ারিং কলেজে কত পোতিভা তাদের দেখাতে শোনাতে হবে। বারীন, তুমি আমাদের


গর্ব। তোমরাও এসো কিন্তু। কাল সন্ধ্যার চা আমার ওখানে। আসবে তো? এসো কিন্তু।


বিপিনবাবু নিচে নেমে গেলে হাসির হুল্লোড় উঠল। বারীন বারীন বারীন কত রকমের যে আওয়াজ। আর আমার লেজ ঢুকে গেছে। বিপিনবাবুর কেমিকাল মেয়েটার সামনে বসে উপস্থিত তার বাবা মা আর অতিথিদের সামনে এই গানটা গাবার সিচুয়েশন কল্পনা করে কাঁপুনি আর হর্ষ আমাকে আর ছাড়ে না। যাই হোক। গানটা মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ল। রোজ কখনো না কখনো কেউ না কেউ একলা বা সমবেত কন্ঠে গেয়ে চলেছে আমার সামনে বা অসাক্ষাতেই। গানটা ইঞ্জিনীয়ারিং কলেজের জাতীয় সঙ্গীত হয়ে উঠল। ১৯৬৪ শীতে জলপাইগুড়ি ইঞ্জিনীয়ারিং কলেজ থেকে সেটা ছড়িয়ে গেল ধীরে ধীরে অন্যান্য কলেজেও। আমি এর চল্লিশ বছর পরেও কলেজের নবীন ছেলেদের গলায় গানটা শুনেছি। ততদিনে রচয়িতার নাম বিস্মৃত তা হোক। সেটাই স্বাভাবিক। এর তো আর পেটেন্ট করা নেই। “হরি দিন তো গেল, সন্ধ্যা হল, পার কর আমারে” --- গানটা যে কাঙাল হরিনাথের বাঁধা, তাই বা কে আর মনে রেখেছে? “একবার বিদায় দে না ঘুরে আসি” --- গানটা যে পিতাম্বর দাস-এর লেখা সেটা মনে আছে কারও? কী যায় আসে? মজা ইস মজা। এটা কি একটা সৃষ্টিছাড়া কবিতা হল না? সুভাষকে লিখে পাঠালাম। জামশেদপুরে গিয়েও সবাইকে শোনাতে হয়েছিল বছরের পর বছর। সেই বছর সাব্যস্ত হল কলেজের সোস্যালে বারীন এই গানটা গাইবে। তার জন্য একটা ছোট দল গড়ে রিহার্সাল চলবে।


ক্ষেপেছে? ইলেকট্রিসিটি আসার পর কলেজের সোস্যালে তখন বিসমল্লা খাঁ, বিলায়েত খাঁ, রবিশঙ্কর, হেমন্ত, সুচিত্রা মিত্র, ইত্যাদিরা আসেন, সারা রাত গান। সেখানে বারীনের ছাত্রসঙ্গীত! পাগল! ফলে সেবার কলেজের সোস্যালের দুদিন আগে থেকেই বারীন মিসিং


পর্ব ১৫






স্বপনরা থাকতো যাদবপুর বিক্রমগড়ে| অ্যান্ড্রুজ-এর সময় থেকেই ওদের বাড়িতে আমার যাতায়াত ছিল| মাসীমা মেসোমশাই আমাকে স্নেহ করতেন| স্বপনের বাবা ছিলেন স্টেট ইলেকট্রিসিটির অ্যাকাউন্টসে| তিনি এবার পুজোর পরেই ট্রান্সফার হয়ে এসেছেন জলঢাকা প্রোজেক্টে| স্বপন যাই যাই করছে| সেবার শীতে কলেজের সোস্যাল-এর আগেই আমি ঝুলে পড়ি ওর সাথে| আড়ালে চল চল করতে থাকি রোজ| শেষে সোস্যালের দুদিন আগে ভোরবেলা ব্যাগ গুছিয়ে কেটে পড়ি| সবাই সাধারণত রাত জেগে পড়াশুনো করে, আড্ডা মারে, লেট করে ঘুম থেকে ওঠে| কেউ টের পাবার আগেই আমরা শিলিগুড়ির ট্রেনে| ছাত্রসঙ্গীত হোস্টেলে বন্ধুদের সাথে হৈ হৈ করে গান বাজনা করা যায়, তাই বলে কলেজের সোস্যালে! রামো!


শিলিগুড়ি থেকে বাসে পাহাড়ে উঠতে উঠতে একসময় এসে নামলাম ঝালুং-এ| এটা ঝালুং পাহাড়ের লাগোয়া একটা কসবা এলাকা| এখনে মেসোমশাইদের থাকার কোয়ার্টার| আর নিচে বিন্দু পাহাড়ে জলঢাকা প্রোজেক্টের কাজকম্মো| বাস থেকে নেমে এদিক ওদিক দেখে নিতে চোখ আটকে গেল পাহাড়ের গায়ে| ওই রকম কমলা রঙের পাহাড় হয় নাকি! বাঁ থেকে ডান দিক পর্যন্ত পুরো পাহাড়েই কমলালেবুর গাছ| সব গাছে কমলালেবু ঝুলছে| এর আগে একবার ট্রেনে চেপে দার্জিলিং গেছি, গাড়িতেই টাইগার হিল| কিন্তু তা ছিল শুধু চোখে দেখার| ঝালুং-এই আমি প্রথম হিমালয়কে ছুঁতে পারলাম| সেই আবেগময় দিনের স্মৃতি আজো ভুলতে পারিনি| ব্যাগট্যাগ কোয়ার্টারে নামিয়ে পাহাড়ে ফিরে গিয়ে ঘুরে বেড়ালাম কিছুক্ষণ| স্বপন আমার অনেকদিনের বন্ধু| আমাদের ইচ্ছা অনিচ্ছার সংঘাত হতো না| ও ভাল ফুটবল খেলতো, ব্যাকে| কলেজ আর ইউনিভার্সিটির হয়ে খেলতো| নস্যি নিতো| আমিও ওর থেকে চেয়ে| আর আমি সিগারেট খেতাম| চার্মিনার বা পানামা, পকেট পারমিট করলে| স্বপন সিগারেট খেতো না| কমলালেবু গাছের ফাঁকে ফাঁকে হাঁটতে হাঁটতে আমার প্রশ্নের শেষ নেই ----


-- এগুলো খেতে কেমন রে? খেয়ে দেখব? এটা একটা বাগান, না? মালিক আছে নিশ্চয়ই? এক আধটা খেলে রাগ করবে না, না?


-- খেয়ে দেখা যেতে পারে| স্বপন বলল| কারও বাগান থেকে না বলে তুলে নেওয়াতেই তো মজা|


আমরা লেবু খেলাম, পাহাড়ে গড়ালাম, গান গাইলাম, গল্প --- স্বপন কোনদিন ওর প্রেমের গল্প করেনি| বললাম – কোন মেয়েকে ভাল লাগে না তোর? স্বপন বলল – ন্যাকামি জানে না এমন মেয়ের সাথে আলাপ করিয়ে দিস| ...... কেউ কোথাও নেই...... কেউ বাধা দিচ্ছে না| দিন যদি এভাবেই যেতো| স্বপন বলল -- খেতে চল| অগত্যা|


খেতে বসেছি আসন পেতে| খানিক এগোবার পর মাসীমা বললেন -- শুঁটকি খাও তো বাবা? শুনেই আমার বিষম লাগল| কোনদিন তো খাইইনি, আমাদের বাড়িতে এই মাছের নামও কেউ নিতো না| কিন্তু আমার চ্যালেঞ্জ নেবার অভ্যাস| বললাম – হ্যাঁ মাসীমা, খুউব ভাল খাই| মাসীমা তো ভালবেসে আমাকে বেশি বেশি খাওয়ালেন| নিঃশ্বাস বন্ধ রেখে খেতে আমার নাভিশ্বাস ওঠার উপক্রম| গা গোলাচ্ছে| কোনরকমে গিলে মুখ ধুয়ে স্বপনকে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলাম| বাইরে রাস্তার একপাশে পাহাড়, অন্যপাশে ঢাল| একটা পানদোকানের কাছে দাঁড়িয়ে বমি করলাম বেশ কিছুটা| একটা সোডা কিনে মুখ ধুয়ে পান দিলাম মুখে| তবে শান্তি| স্বপন বলল


-- মায়ের সাথে পাঙ্গা নিতে গেলি কেন? অন্য মাছও তো ছিল| তুই না!


-- কিছু করার নেই গুরু| জানিস তো আমার অভ্যাস| ছোটবেলা থেকে বাড়িতে নেগলেক্টেড ফিল করেছি| তাই আমার অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছে সব কিছু পারি প্রমাণ করা| কোনকিছুতেই পিছুপা হবো না| তুই তো জানিস| স্বপন বলল – বেচারা| নে, এবার গড়িয়ে নিবি চল| কোন ভোরে উঠেছি|


বিকেলে হাঁটতে খুব ভাল লাগছিল| বাঁ দিকে কমলালেবুর পাহাড়ে মানুষ তো না-ই, গরু ছাগলরাও ঘরে চলে গেছে| কসবা এলাকায় সামান্য কিছু একচালা বাড়ি ঘর, দুচারজন মানুষ, তারপর সুনসান কাঁচা পথ| মাইলটাক হাঁটার পর পেলাম সেই আশ্চর্য সরোবর, পাহাড় কেটে বানানো, জলঢাকা নামের ছোট পাহাড়ি নদীর জল ধরে রাখার জন্য ব্যারেজ| তুলনায় আমার মনে পড়ল জামশেদপুরের বাইরেই বিশাল ডিমনা লেকের কথা, সেটাও নাকি মানুষের বানানো, দলমা পাহাড় থেকে নেমে আসা ছোট্ট ডিমনা-নালা নামের ঝর্নার জল জমাবার জন্য, যা থেকে জামশেদপুর শহরে খাবার জল সাপ্লাই করা হয়, আমার ছোটবেলার ঘোরাফেরার প্রিয় সরোবর| এখানে লেক ঘিরে রাস্তা বানানো হয়েছে, পুলিস পাহারা, আলো ঝলমল| এখান থেকেই পাইপ লাইনে নিচে বিন্দু পাহাড়ের গায়ে প্রোজেক্টের টারবাইনে জল যাবে| ইঞ্জিনীয়ারিং পড়ছি তো –


দেখি, একটু দূরেই রাস্তার ধারে একটা ঝুপড়িতে কিছু লোক ঘুরঘুর করছে| কাছে গিয়ে দেখি মদের ঠেক| ‘অরেঞ্জ’ নামের ব্র্যান্ডে কমলালেবুর মদ বিক্রি হচ্ছে| খুশবু| লোকে চুর| বলি


– স্বপন, কমলা পাহাড়ে কমলার মদ খাবো না? লোকে কি বলবে? হোস্টেলে ছেলেরা শুনলে বোকাচোদা বলবে মাইরি| স্বপন বলল – চল হয়ে যাক| কিন্তু এক রাউন্ড, ব্যাস|


আর পায় কে| সেই প্রথম খেলাম কমলার মদ| কমলারই রসের মতো, একটু টক যেন| ফার্স্টক্লাস লাগে| এক গ্লাসে হয় না| কাকুতি মিনতি করে আরো একটা গ্লাস| বাবা মা-র জন্য স্বপন একটু ব্রেক মেরে| তারপর ফেরা অন্ধকার পথ দিয়ে| কখনো এখানে জলঢাকার বিদ্যুৎ আসবে| বাড়ির কাছের সেই পানদোকানে আর এক রাউন্ড পান খেয়ে বেশ কিছুক্ষণ রাস্তায় গান গেয়ে বেড়ালাম, সেসব দিনের হিন্দি সিনেমার গান| রাত নটায় স্বপন বাড়ির পথ ধরল| রাতে অবশ্য আমি নিরামিষ খাই বলেছিলাম|


পরদিন প্রোজেক্ট সাইট ভিজিটের জন্য মেসোমশাই জিপ পাঠালেন| বিন্দুতে পৌঁছে দেখি কর্মকান্ড| শ’ খানেক লোক, মাথায় হেলমেট| ডাম্পার, ক্রেন আর কি নাম জানি না যন্ত্রপাতি, রেল লাইন, ট্রলিকার, টানেল খোঁড়া হচ্ছে| সাহেবের গেস্ট বলে একজন আমাদের ট্রলিকারে নিয়ে গেল টানেলের ভিতরে| এই টানেলে পাইপ বসবে ব্যারেজ থেকে জল আনার জন্য| ক্রাশারের বিকট আওয়াজ, অন্ধকার আর ধুলোর গন্ধে প্রাণ যায় আর কি| বাইরে এসে হাঁপ ছেড়ে বাচলাম| স্বপন বলল – তোর ভবিষ্যৎ দেখে করুণা হচ্ছে বারীন| কেন যে ইলেক্ট্রিকাল ইঞ্জিনীয়ারিং পড়তে ঢুকেছিস|


-- আচ্ছা, নিজেই নিজেকে করুণা করতে কেমন লাগবে স্বপন? আমি বলি|


-- শালা ভাগ্যিস নিজের পা নিজের পাছায় পৌঁছোয় না| লাথিয়ে দেখতে পারতি| হাঃ হাহাহাহা! এরপর তিনদিন সকালে পাহাড়ের কমলালেবু, দুপুরে মাসীমার শুঁটকি, বিকেলে জলাধার আর সন্ধ্যায় অরেঞ্জ| তোফা কাটল ঝালুং-এ| ইনফ্যাক্ট, ভেবেই নিলাম, ঝালুং-এই বাড়ি বানিয়ে থাকব| ঝালুং নামটা দারুণ| না?


ফিরে এলাম হোস্টেলে| সবাই ঘিরে ধরল| কোথায় কেটেছিলাম? সোস্যালের গল্প| সামনের পরীক্ষার কথা| পরীক্ষার পর ছুটিতে বাড়ি যাবার জন্য রেলে স্টুডেন্ট কনসেশনের কাগজ, আড্ডা, সিনেমা দেখার প্ল্যান, এইসব আর কি| গোবিন্দ চক্রধরপুর যাবে| তপন রাউরকেলা, ওর দাদা সেখানে চাকরিতে জয়েন করেছে| স্বপন ঝালুং-এই যাবে| আর আমি? কত ধানে কত চাল – এই শিক্ষার জন্য আমার বাবার নীরব দখলদারি যে কতখানি নিষ্ঠুর হতে পারে সেদিকে তাকাতোই না বাবা| আমাকে মানুষ করার জন্য এই নির্দয়তা মুখ বুজে চালিয়ে যেত| মাস গেলে ১২০ টাকা ১৯৬২-তেও, ৬৪-তেও তাই| আমি আর বাবার এই কার্পণ্যের দিকে না তাকিয়ে নিজের মতো পথ চলা শিখে গেছিলাম| ছুটি-ছাটাতে হুট করে বাড়ি চলে যাওয়া বন্ধ করে দিলাম|


সবাই বাড়ি চলে গেলে আমার মতোই আরো কয়েকজন হোস্টেলে রয়ে গেলাম| কিন্তু মেস তো বন্ধ| ফলে বুঝে শুনে বাইরে খাওয়া| ঘুরে বেড়ানো| রায়কতপাড়ার আত্মীয়বাড়ি, নতুন পাড়ার লোকাল বন্ধুদের বাড়িতে বা জলপাইগুড়িরই ক্লাসমেটদের বাড়িতে দু একবার| এক আধটা সিনেমা| আর হোস্টেলে রয়ে যাওয়া ভীম প্রধান আর পরিমলের সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে তিস্তা-দোমোহানিতে চলে যেতাম যেখানে করলা নদী তিস্তায় পড়েছে| কী চওড়া এখানে তিস্তা! মনে হল একমাইল হবে, তার বারো আনাই বালির চড়া| ঘোর শ্রাবণে এসে তিস্তার রূপ দেখতে হবে এবার| বসে চেয়ে থাকতাম সব নদী ঘরে ফেরার দিকে ( তখনো অবশ্য জীবনানন্দের নামই শুনিনি )| আমার ঘরের কথা দীর্ঘশ্বাস হয়ে বেরলো বোধ হয়| হায়! সুমনা যদি পাশে থাকত| জলপাইগুড়িতে তিস্তা মোটামুটি দক্ষিণবাহিনী| পশ্চিমপারে পূর্বমুখী বসে থেকে আশ বাড়তে থাকল| ওই পারেই ময়নাগুড়ি| সে না জানি কেমন| নতুন তো বটেই| বললাম


--- ওপারের জগৎটা দেখে আসি চল| রাজি?


সবাই একবাক্যে রাজি| চল| রওনা দিলো ভীম| বলি


-– এভাবে না| প্ল্যান করে বেরবো| ধর দু-তিনদিন| সাইকেলে যাবো| যেখানে সেখানে থাকা খাওয়া শোয়া| অচেনা দেশ| বেশ অ্যাডভেঞ্চার হবে| না? সেদিন বাঁধের নিচের দোকানে চা খেতে খেতে প্ল্যান হল| তারপর নেমে শহরে ঢোকার মুখে নেতাজীর স্ট্যাচু পেরিয়ে একটা সাইকেলের দোকানে কথা বললাম| দিনে চার আনা ভাড়ায় সাইকেল দেবে, কিন্তু অক্ষত ফেরত দিতে হবে| ইঞ্জিনীয়ারিং-এর স্টুডেন্ট বলে কশন মানি লাগবে না| একটা পাঁইট কিনে তিনজনে খুশি খুশি হোস্টেলে ফিরলাম| ওল্‌ড মঙ্ক দশ টাকা| আর একটু চানাচুর| রাতে ঘুমোবার আগে সাইড ব্যাগে গামছা চাদর সাবান পেস্ট ভরে রাখলাম| সকালে স্নান করে ঘরে তালা মেরে হেঁটেই পৌঁছে গেলাম সাইকেলের দোকানে| উত্তেজনায় গল্পের মধ্যে দুমাইল ফুরিয়ে গেল দেখতে দেখতে| সাইকেলে পাম্প চেক করে চালিয়ে এলাম বাঁধের নিচের চা দোকানে| চা খেয়ে বাঁধের ওপারে চড়ায় নেমে সাইকেল বালুর ওপর হাঁটিয়ে ঘাটে এসে তিনজনেই নৌকায় চেপে বসলাম আরো অনেকের সঙ্গে| চেয়ে থাকলাম দূরের পাড়ের দিকে| একসময় হুঁশ হতে টের পেলাম নৌকা দুলছে আর কুলকুল করছে জলের ঘোলা ছায়া| ময়নাগুড়ির ছায়া| বাই বাই জলপাইগুড়ি| ময়নাগুড়িতে কি অনেক ময়নার বাসা? দেখবো?






পর্ব ১৬






লঞ্চের তুলনায় নৌকাটা অনেক ছোট। ভিড়ও নেই। অনেকে বসে আছে গলুইয়ের ধারে। আমরা দাঁড়িয়ে সাইকেল হাতে। ওপাড়টা এগিয়ে আসছে ঠিকই কিন্তু বালু ছাড়া কিছু চোখে পড়ছে না। অনেক দূরে গাছপালার লাইন টানা দিগন্ত। নদীর ধারেই যেমন জলপাইগুড়ি শহর, তেমন না। নৌকা পাড়ে ঠেকলে সবাই নেমে পড়লাম। শীতে জল কম তাই হাঁটা বেশি। দুদিকেই। গঙ্গাতেও দেখেছি এক ব্যাপার। পদ্মা মেঘনা, সব। নেমে সবাই একদিকে যাচ্ছি। ওদিকেই বোধহয় ময়নাগুড়ি। দশটা বেজে গেল। ব্রেকফাস্ট হয়নি। দোকান খুঁজতে হবে।


আমাদের ওদিকটায় সব জায়গাতেই পুর লাগানো। আর এদিকের সব জায়গাই হয় পাড়া নয় গুড়ি। কাদের ভাষা কে জানে ? লোকাল কারা ? রাজবংশী, মেচ না টোটো কাদের ভাষা যেন। সাইকেল ঠেলে গড়িয়ে নিয়ে চললাম আধ মাইল প্রায়। তারপর পিচরাস্তা। কিছু বাড়ি ঘর, কিছু দোকান পাট। জিজ্ঞাসা করলাম একটা চায়ের দোকানে বসে --


--- এটাই কি ময়নাগুড়ি কাকা ?


–-- না না, ময়নাগুড়ি আরো দূরে, ওই দিকে। তার আঙুলের ইশারায় চেয়ে দেখি কয়েকটা বাস দাঁড়িয়ে। এগিয়ে গিয়ে দেখলাম গন্তব্য লেখা। কুচবিহার, আলিপুরদুয়ার, জয়গাঁও, ফালাকাটা ইত্যাদি। কুচবিহারের নামটা তো শোনা। আর আলিপুরদুয়ারে পরের মাসে আমাদের ক্লাসের এডুকেশন ট্রিপ আছে শহরে অধিবাসীদের ডোমেস্টিক বিদ্যুৎ ব্যবহারের চাহিদা স্টাডি করতে। শিলিগুড়ি থেকে জলপাইগুড়ির পথে আমবাড়ি-ফালাকাটা নামের স্টেশন দেখেছি। এই ফালাকাটা কি সেটাই ? কে জানে ? কিন্তু জয়গাঁও কোথায় রে বাবা ? জয়গুড়ি না, জয়পাড়া না, জয়গাঁও !


--- জয়গাঁও কোন মুলুকে দাদা ? ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করি।


--- ভুটান বর্ডার। ফুনসোলিং। যাইবেন ? অহনই ছাড়বো। উইঠ্যা বহেন। মাথা নাড়িয়ে ফিরে গিয়ে চা দোকানে বসি ভীম আর পরিমলের সঙ্গে। জলখাবারের আশায় এখানে বসা। রুটি বানাচ্ছে। পেঁয়াজ লঙ্কা পাওয়া যাবে। বলি


--- নেপাল ভুটান আলিপুরদুয়ার কুচবিহার কত ভুগোল শিখলাম রে !


--- নেপাল ভুটান মানে ? ভীম বলল। আমি বলি --- আরে তুইই তো নেপাল।


--- শালা। আর ভুটান ?


--- জয়গাঁও। ওই বাসটা যাচ্ছে।


--- যাবি ? খুব সুন্দর জায়গা। আমি গেছি। চল, বাই রোডই চলে যাই, সাইকেলে। ভীম সংবাদ। পরিমল বলল --- আগে খেয়ে নে ব্যাটা। গায়ে তাগদ হলে না সাইকেল চালাবি ?


--- আমরা কোথাও যাবার জন্য বেরোইনি ভীম। কোন গন্তব্য নেই, মিশন নেই, শুধু পথ চলারই আনন্দ। যেতে যেতেই আমাদের লক্ষ্য ঠিক হয়ে যাবে একদিন। দুটোদিন ঘুরে বেড়ানো আর কি। বাড়ি গেলে সেই পুরনো পিকচার। তার বদলে এই নতুন দেশ গ্রাম মানুষ ... আর এই অজানা জায়গায় বসে গরম গরম রুটি, নে খা খা ...


--- কি যে বলিস, বুঝি না। বাংলা করে বল না। পরিমল বলল। প্রেম তাস গান ক্রিকেট মদ সিনেমা এসব বুঝি। ইঞ্জিনীয়ারিং বুঝি। এখনো আমাদের যাত্রাই শুরু হল না, এলেন জ্ঞান দিতে। কি খিটকেল রে বাবা ! তিনটে চা।


রুটি চা খেয়ে রওনা দিলাম। পায়ে জুতো জামা প্যান্ট মাথায় টুপি। পেডালিং পেডালিং। রাস্তা তেমন চওড়া না। বাস রিক্সা গরুর গাড়ি কুকুর ছাগল মানুষ আপ ডাউন একই পথে। ফলে আগু পিছু চলতে হয়, পাশাপাশি চালাতে চালাতে গল্প করা যাচ্ছে না। সত্বর বুঝলাম যাওয়া সেই একা একাই। একপক্ষে ভাল। কথা বলতে গিয়ে অন্যমনস্ক হয়ে পড়ছিনা। অ্যাক্সিডেন্টের ভয় নেই। বেশ কিছুক্ষণ পরে আমরা ময়নাগুড়িতে পৌঁছে গেলাম। এগারোটা বাজে। চা আবার। ছোট জায়গা। ভেবেছিলাম তিস্তা পেরোলেই। কিন্তু হোস্টেল থেকে বেরিয়ে ৫ ঘন্টা হয়ে গেল প্রায়। বিদেশে সাবধানের মার নেই, সাইকেল লক করে দোকানে বসলাম। এরপর কতক্ষণ পরে আবার খাবার পাবো জানা নেই। কেন যেন সবাই সন্দেহের চোখে দেখছে আমাদের। সবাই চেয়ে আছে। তখন হিপি কালচার আমেরিকা থেকে ছড়িয়ে পড়েছে। হিপিরা নাকি ভারতবর্ষে আসছে। অন্যদেশেও হয়ত। বড়লোক বাপের বখাটে ছেলেমেয়েরা, এমনকি দু-তিন বছরের চাকরি ছেড়ে দিয়েও চলে আসছে। তাই বলে এখানেও নাকি ? আর আমাদের দেখতে মোটেও হিপিদের মতো না। ছোটখাটো চেহারার আমি, ভীম তো খাসা নেপালি। তবে ? অমন করে চাও কেন গো তোমরা ? খুনখারাপি, রেপ, ছিনতাই, ঝাড়পিট, কেসটা কি ? পুলিসের ? দোকানিকে শুনিয়েই বললাম পরিমলকে


--- কেসটা কি বল তো। হিপি দেখিসনি নাকি কোনদিন ? অমন করে চেয়ে আছিস যে বড় ?


--- না বাবু। আপনাদের কন্ট্রাক্টরের লোক ভাবিসে। চাকরির আশে চাইয়ে আসে উরা। দোকানি বলল।


--- কন্ট্রাক্টর ! কী ব্যাপার হে ?


--- উই যে বিরিজ হতেসে না ? মিলিটেরির।


এতক্ষণে বুঝলাম। বাষট্টির পরে যে রেলব্রিজের প্ল্যান হয়েছিল তিস্তার ওপর, সেটার কথা বলছে। জলপাইগুড়ি থেকে ময়নাগুড়ি। এই তাহলে ময়নাগুড়ি। কোন রেলা না মেরে চটপট খেয়ে সাইকেল ধরলাম আবার। পরিমল আমার পাশে আসতে জানতে চাইলাম মজা করে


--- আচ্ছা পরিমল, রিয়ালি কখনো হিপি দেখেছিস ? ও, তুই তো আবার কাটোয়ার। সেখানে তো সব মন্দির।


--- তো কি হল ? পরিমল বলে --- ৫০০ বছর আগে দি গ্রেট হিপি নিমাই এসেছিল কাটোয়ায় হিচ হাইকিং করে। তখন না সাইকেল না বাস। পায়ে হেঁটে, গরুর গাড়ি, খচ্চরে, নৌকায় বিনে পয়সার যাত্রা। পারবি ? আমরা কিন্তু হিচ হাইকিং করব। না বলবি না কেউ। যখন যা।


--- যতক্ষণ পারবো সাইকেল চালাবো। থকে গেলে ওসব। আমরা দেশ দেখতে বেরিয়েছি, মানুষ দেখতে। রসে বশে নিজের কান্ডকারখানায় মজে যেতে নয়। আমি বললাম।


--- কেন কেন ? পরিমল বলল। ময়নাগুড়ি জায়গাটা একটু দেখব না ? মানুষের সাথে কথা বলব না ? ওই যারা আশায় আশায় চেয়ে আছে ? এখানে সুন্দরীরা থাকে না ? হেডুর মতো কথা বলিস না মাইরি।


ময়নাগুড়িতে কোন ময়না থাকে না। জায়গাটা ছোট। গঞ্জ শহর। শ পাঁচেক একতলা বাড়ি। একটাই পাকা রাস্তা, যেটা দিয়ে চলেছি। কোন বড়সড় দোকান চোখে পড়ল না। পরিমলের আগ্রহ আবার অন্যরকম। যা দেখল যা শুনল সবকিছু সে বুঝে নিতে চায়। অবাক হয়ে থাকার ধাত নেই। আশ্চর্যকে সে পাস দেবে না। মনে বিস্ময় পুষতে পারে না পরিমল। বলল --- এখানে মেয়েদের স্কুল কলেজ নেই ?


--- এই ছোট জায়গায় অত মেয়ে কোথায় যে স্কুল আবার কলেজ আলাদা করে ? জলপাইগুড়িতে দেখলি না মেয়েরা খাতা বই হাতে নৌকা থেকে নামছে ? চল চল --- একদিন মেয়েদের ভোর আসবেই......


সাইকেল চালাতে চালাতে ভাবি জামশেদপুরে প্রথমে দল বেঁধে তারপর একলাই সাইকেল চালিয়ে ডিমনা লেকে চলে যেতাম। কোন কিছুতে লেগে থাকলে দল আমাকে ছেড়ে যায় দেখেছি। এখনও তো একলাই চালিয়ে যাচ্ছি। জীবনে সহযোগী গোষ্ঠি একসময় দলে ঢিলে পিছিয়ে পড়েই। আমি তো এমন চাইনি। এটাই কি নিয়তি ? বাবার মুখ মনে পড়ে। ভাবি আমার একলা চলতে শেখায় বাধ্য হয়েছি বাবার কলকাঠিতে। সেটা আমার পক্ষে ভাল না খারাপ হল বুঝে উঠতে সময় লাগছে। আমার কোনদিন ছেলে হলে আমিও কি তাকে এভাবে পৃথিবীতে ছেড়ে দেবো ঠেকে শেখার জন্য, নাকি জড়িয়ে ধরে রাখবো ? শৈশবে আমি চেয়েছিলাম আমাকে জড়িয়ে রাখা হোক। এখন বয়েস বাড়লে আর সেরকম চাইছি না। কি জানি।


যত যাই শুধু ধানক্ষেত, পাট আর সব্জি চাষ মাইলের পর মাইল। মাঝে মাঝে পথের ধারে একেকটা গ্রাম। তখন পথের উপর হাঁস মুরগি গরু ছাগল মানুষ আর বাচ্চারা। দু একটা ঝুপড়ি দোকান। কোথাও চাষবাস ছাড়া আর কিছু দেখি না। তেমন বড় গাছও নেই যেমন থাকে পথের ধারে পথিকের বিশ্রামের জন্য। ছিল নিশ্চয়ই। গরীবরা কেটে নিয়েছে জ্বালানীর জন্য। কখনো বা এক দুটো নালার ওপর সেতু। তখনকার দিনে পথের সেতুতে আগে পরে নাম লিখে রাখার চল ছিল না। একটা নালার সেতুতে সাইকেল হেলান দিয়ে রেখে দেয়ালে উঠে বসলাম। বিড়ি ব্রেক। অনেকক্ষণ একা একাই তো চালালাম। ফলে কথা জমে গেছে সবার। ভীম বলল


--- একটু রক্সি হলে জমতো মাইরি। সাইকেলের এনার্জি চাই না ? কি বলিস ?


--- তোর মামার বাড়ি তো ধারেকাছেও দেখছি না ভীম।


--- কার্শিয়াং-এ রাস্তায় বেরোলেই পাওয়া যায়।


--- জামশেদপুরেও পাওয়া যায়। নে চল। আমি বলে সাইকেলে আবার।


আধঘন্টা পর একটা হাট মতো দেখা গেল। ভীম গিয়ে জোগাড় করে নিয়ে এল দুটো বোতল। --- নে রক্সি। মাঠে বসে তিনজনে সেবন করলাম। প্রায় বাংলার মতো খেতে। ভীম বলল --- এই রাস্তাটা ধুপগুড়ি গেছে। সে হাটে জেনে এসেছে। আমরা ধুপগুড়ির দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে ঘুম পাচ্ছিল। বিপদ বুঝে গা ঝাড়া দিয়ে উঠে বললাম --- চল এগোই। এখানে ঘুমিয়ে পড়লে সাইকেল চুরি যাবে নির্ঘাৎ। কশন মানি দিতে পারবো না। পরিমল বলল --- আমি দিয়ে দেবো তোদেরটা। এখন একটু শুতে দে মাইরি। আবার বিপদ। আমি --- ধুপগুড়িতে মেয়েদের একটা ফাটাফাটি কলেজ আছে বলে শুনেছি। আর ঘন্টা খানেকের মধ্যে পৌঁছে গেলে লাইন দেয়া যাবে। পারবো না, ভীম ?


--- পারবো না আবার ? খুব পারবো। পরিমল এবার তুই লিড কর। ভীম বলল। পরিমল চাঙ্গা।


আর মাত্র আধঘন্টা চালিয়ে আমরা একটা নদী পেলাম। ব্রিজ। নাম নেই কোন। একটু দাঁড়ালাম দেখার জন্য। সেই ছোটবেলা থেকেই নদীর কাছে স্থির হয়ে যাই। একজন যাচ্ছিল সাইকেলে মোট নিয়ে। জিজ্ঞাসা করতে জানা গেল নদীর নাম জলঢাকা। সঙ্গে সঙ্গে অরেঞ্জের গন্ধ পেলাম। সেই ঝালুং-এর জলঢাকা ! --- চান করব আয়, বলে নিচে সাইকেল সুদ্দ নেমে এলাম। ওরাও। জুতো জামা প্যান্ট সব খুলে উদোম হয়ে জলে নামলাম। ভয়ে ভয়ে ধারেই কারণ একে সাঁতার জানি না, তায় কী ঠান্ডা জল। মোটামুটি চান করে উঠে রোদ্দুরে নিজেকে মেলে দিলাম শুকোবার জন্য। কী আরাম ! এতক্ষণের সাইকেল-ক্লান্তি ধুয়ে গেল। আঃ ! মনে মনে ঠিক করলাম সাঁতার শিখবোই এরপর। মুখে বিড়বিড় করছিলাম বোধহয়, পরিমল বলল --- কিরে, মন্ত্র আউড়াচ্ছিস ? শখের প্রাণ গড়ের মাঠ একেবারে।


--- না রে। ঠিক করলাম সাঁতার শিখতে হবে ফিরে। জানলে সাঁতার কাটতে কাটতে চলে যেতাম বিন্দু, সেখান থেকে ঝালুং। আর তারপর অরেঞ্জের ঠেক। ঝালুং-এ আমি বাড়ি বানাবো, জানিস ? ওই উত্তরের দিকে, হিমালয়ে।


ভীম বলে --- কি ব্যাপার ? ঝালুং কেন ?


--- আগে বল কে কে সাঁতার জানিস ?


--- সাঁতার জানি। তবে কাটতে জানি না। আমাদের ওদিকে তেমন নদী পুকুর নেই তো। ভীম বলে।


--- আমি জানি। পুকুরে শেখা। পরে গঙ্গাতেও। পরিমল।


আমার ঈর্ষা হল পরিমলকে। এই ব্যাপারটা জানি না। আগে শিখিনি কেন ? জামশেদপুরে নদী পুকুর লেক সুইমিং ক্লাবের তো অভাব ছিল না। কলকাতায় দুবছর থাকলাম। পরিমল জানে আর আমি জানি না। দেখিয়ে দেবো বাঞ্চোৎ। ঈর্ষাটা তখনকার মতো চেপে ওদেরকে এতদিনে আমার আর স্বপনের ঝালুং ট্রিপের গল্পটা শোনালাম রসিয়ে রসিয়ে, যেতে যেতে। পরিমলের মেয়েদের কলেজ বন্ধ না হয়ে যায়, তার তাড়া। অবশেষে ধুপগুড়ি। জলপাইগুড়ির সিকিভাগ প্রায়। একজনকে জিজ্ঞাসা করা হল --- কাকা এখানে মেয়েদের কলেজটা কোথায় ?


কাকা খানিকক্ষণ কটমট করে চেয়ে আমাদের ডাইরেকশন দিলেন। সেইমত পৌঁছে দেখি দেয়াল ঘেরা গেটের ওপর লেখা আছে --- ধুপগুড়ি মহকুমা সংশোধনাগার, জলপাইগুড়ি জিলা।


পরিমলের মুখের দিকে আমি চাইতে পারলাম না। শিক্ষা হোক শালার।


পর্ব ১৭






সংশোধনাগারের গেটে কিছুক্ষণ বিমূঢ় দাঁড়িয়ে থাকার পর হঠাৎ দম ফাটা হাসিতে আমাদের সম্বিত ফিরলে দেখি আমাদের মধ্যে পরিমলই পুরো ব্যাপারটাকে মস্করা ভেবে উড়িয়ে দিলো সর্বপ্রথম।


--- আর কখনো মেয়েদের জন্য পাগলামি করবি বাঞ্চোৎ ? দারুণ দিয়েছে। কী খিটকেল মাইরি ! কোথায় গেলেন স্যার ? একটা প্রণাম করব যে। দেখ না বারীন, একটু ওদিকে দেখ। আর ভীম, তুই এদিকটা।


--- চল তো, খেয়ে নেয়া যাক। ভীষণ খিদে পেয়েছে। তোদের পায়নি ? তিনটে বাজে। তারপর আবার পথ। যা করতে বেরিয়েছি। মাল খাওয়া, মেয়ে দেখা, এসব তো জলপাইগুড়িতেই ছিল। তাহলে বেরোলাম কেন ? আমি বলি।


--- গুরু রাগিস না মাইরি। রাস্তায় একটু দুষ্টুমিও করব না ? ক্লাস নাকি ? ভীম বলে।


খেতে বসে ডাল ভাত পেঁয়াজ লঙ্কা বেগুন ভাজা। তোফা। পরিমল মাছ ভাজা খাওয়াতে চাইলো। আমি বললাম --- নোলাকে বশে রাখতে দে। আচ্ছা, ধানের ক্ষেতকে ধানজঙ্গল বলে না কেন ? বা ডালজঙ্গল। দেখেছিস, যেখানে বড় বড় গাছের জঙ্গল সেখানে ধানগাছ হয় না। এত নদী নালা বলে পাটের জঙ্গল খুব। এখানে কত পাট হয় দেখেছিস ?


--- আবে খা তো। মেলা বকবক করছিস। মাছ না নেওয়ায় পরিমল একটু অসন্তুষ্ট।


--- হাঃ হাঃ হা... হেসে উঠলো একজন। পাশের টেবিলে একটা মাঝবয়সী লোক ভাত খাচ্ছিল, সে-ই হেসেছে। আমি সেদিকে চাইতে বলল


--- ভাল বলেছেন। ধানজঙ্গল, ডালজঙ্গল। বাঃ ! আপনারা শুনেছেন কখনো মুসুর ডালের মেঘ, মাছের ঝোলের মেঘ ?


আমি অবাক হয়ে বলি --- কই, না তো ! সে আবার কি ?


--- ভাবুন না। আছেন একজন কমলকুমার। তিনি লিখেছেন।


--- তাই নাকি ? ভীম আর পরিমল আমাদের কথায় বোর হচ্ছিল। ভীম বলল --- আপনিই সেই পদমপ্রসাদ নাকি ?


--- পদমপ্রসাদ ! হাঃ হাঃ হাঃ... আই গট ইউ। আচ্ছা রসিক ছেলে তো আপনারা। তা কোথায় চলেছেন ? চায়ের জঙ্গল দেখেননি ? কোথায় থাকা হয় ? সাইকেলে ?


--- আমরা জলপাইগুড়ি ইঞ্জিনীয়ারিং-এর ছাত্র। হোস্টেলে থাকি। দেশ দেখতে বেরিয়েছি।


--- উরি ব্বাস ! ডেঙ্গুয়াঝার ? সেতো চায়ের রাজ্য। অত বড় বাগান, চা-গাছের জঙ্গল এদেশে নেই। কোন ইয়ার ?


--- ফোর্থ ইয়ারে উঠব। আপনি আমাদের কলেজ দেখেছেন ?


--- হ্যাঁ, দেখেছি বইকি। আমার একটা ইন্টারেস্ট আছে। আমার মেয়েটাকে ঐ কলেজে ভর্তি করতে চাই। চাঁপা এবারই ফাইনালে। জয়েন্টের জন্য তৈরি করতে হবে। তা আপনারা তো দেশ দেখতে বেরিয়েছেন। চলুন না আমার বাড়ি। আমি মথুরাবাগানে কাজ করি, থাকি। এই মাইল দশেক। ঘন্টা দুয়েক লাগবে সাইকেলে। আমারও সাইকেল। চলুন, কথা বলতে বলতে চলে যাব। সন্ধের মধ্যে পৌঁছে যাবো। রাতে আমার ওখানেই খেয়ে দেয়ে শোবেন খন। আমার ভাল লাগবে। চলুন প্লিজ। পরামর্শ দেবেন। চাঁপার সাথে আলাপ করে জেনেও নেবেন তার কি কি টিউশন প্রয়োজন হবে।


--- আহাহা, অমন করে বলতে হবে না। আপনার মেয়ের উপকার করতে আমাদের ভালই লাগবে। কী বল বারীন ? পরিমল বলল। তার আগ্রহ আমাদের জানা। ভীম পরিমলকে আড়ালে চিমটি কাটতে সে বলল --- কী করিস। খেয়ে দেয়ে আমরা পদমপ্রসাদের সাথে চললাম। আমি বলি --- এই যে দেখছেন পরিমলকে, ও দারুণ কোচিং করে। কথা বলে নেবেন।


--- তাই নাকি ? নমস্কার। আপনার নাম কি ভাই ?


--- পরিমল চক্রবর্তী। আমাকে তুমি বলুন।


--- ব্রাহ্মণ ? চমৎকার। বাঁচা গেল। বলে পদমপ্রসাদ পরিমলের পাশাপাশি গল্প করতে করতে সাইকেল চালাতে লাগল। বাঁচলাম। ওদের আগে যেতে দিয়ে আমি সবচেয়ে পিছনে। ধুপগুড়িতেই দেখলাম সূর্য সেন কলোনি। টিনের চাল দেয়া বাড়ি, ছোট ছোট একচালা দোচালাই বেশি, আটচালাও দু একটা, সরু নোংরা রাস্তা গলি, বিদ্যুৎ নেই, টেলিফোন নেই, নালা নেই, বাচ্চারা খেলছে, পুরুষরা মাঠে কাজ করছে, ধান, ভুট্টা, পাট, কত কিছু। এরা নির্ঘাৎ চট্টগ্রামের রিফিউজি। ধুপগুড়ি ছাড়িয়ে কিছুটা এগোতেই চা বাগান শুরু হল। দুপাশে, বুক সমান উঁচু গাছ। ডেঙ্গুয়াঝারের তুলনায় মাপে সামান্য, ছোট ছোট। নাম আর মনে নেই চা বাগানগুলোর। গোটা বিশেক পেরিয়ে একটা কারখানা দেখা গেল, চায়ের গন্ধ আসছে, পদমপ্রসাদ পেচ্ছাপ করতে থেমে বলল --- চা-এর কারখানা। দেখেছেন কখনো ?


কারখানা থেকে চা বেরিয়ে আসছে ভাবতেই কেমন লাগে। পরে অবশ্য নানা জায়গায় এই কারখানা দেখেছি, গা সওয়া হয়ে গেছে। প্রচুর পাখি উড়ে যাচ্ছে এদিক ওদিক, ছোট উড়ান। চড়াই শালিক কাক মাছরাঙা ছড়াছড়ি। রাস্তার ওপর মুরগী, হাঁস, গরু ছাগল শুয়োর অহরহ। গাড়ি কম। সাইকেল আরোহী অনেক। কোথায় স্কুল আছে। ছেলেমেয়েরা কারো ব্যাগ, কেউ হাতেই বইখাতা নিয়ে ফিরছে। আমাদের পা ঘুরেই যাচ্ছে। ক্রমে পায়ের থেকে চোখ কান বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ল, মনও। ভাবছি। এদেশে এত শাল গাছ কেন ? আমাদের দেশে, জামশেদপুর আর দক্ষিণ বিহারে লক্ষ লক্ষ শাল গাছ, জঙ্গল ভরা, সেখানে তো চা গাছ হয় না। ওখানকার লোকদেরই ধরে নিয়ে এসে এখানে চা বাগানে লাগানো হয়েছে। এই চা গাছ ছাড়া বাকি সব ওদেশের মতো। একটা ঘুঘু রাস্তায় বসে আছে। পাশ কাটিয়ে গেলাম। ক্রমে আমরা সারদাপল্লী, মালাইগ্রাম, গাদাং, পেরিয়ে শালবাড়িতে এসে পড়লাম। ঘড়িতে দেখি দুঘন্টা হয়ে গেছে। পাঁচটা প্রায়। বলি --- পদমবাবু, আর কতদূর ? চলুন চা খাই। হাঁ হাঁ করে উঠল পদমপ্রসাদ। --- আরে এখানে না, এখানে না। আরো একটু এগোলে ফালাকাটায় পৌঁছে যাবো। সেখানে চা খাওয়া যাবে। বোঝা গেল। বাড়িতে কোচ নিয়ে যাবার তালে পদমপ্রসাদ গুল মেরেছে দশ মাইল বলে।


ফালাকাটা শুনেই মনে পড়ল ময়নাগুড়িতে বাসে লেখা ছিল। তাহলে আরো একটা ফালাকাটা আছে। দেখা যাক। হিসি করে সিগারেট। শেষ করে আবার সাইকেল। পদমপ্রসাদ বলল --- যেতে যেতে খাওয়া যায় না ?


--- উঁহু। গুরুজীর বারণ আছে। আমার যোগাগুরু বলেছেন পরিশ্রম করার সময় সিগারেট খেতে নেই। ওটা রিল্যাক্স করে খেতে হয়। পদমপ্রসাদ বলল --- আপনার কোন স্ট্রিম ভাই ? আমি --- ইলেকট্রিকাল। পদম --- তাই এত বুদ্ধি।


ব্যাটা ইয়ার্কি মারলো কিনা বোঝা গেল না। যাই হোক, আরো আধঘন্টা সাইকেল চালিয়ে আমরা ফালাকাটায় এসে পড়লাম। পরিমল একদম তাজা। মনের মতো টপিক পেলে ওর ফুর্তিই আলাদা। চলতে চলতে অনেক ছোট খাটো নদী নালা পেরিয়ে এসেছি। এবার একটা বড় সড়ো নদী দেখলাম, পেরোতে গিয়ে নদীটার নাম জানতে চাই। কি একটা বলল যেন। ধ্যাৎ ! নদীর নাম, পাখির নাম, মানুষের, ফুলের নাম ভুলে গেলে কী খারাপ লাগে। যাক গে। প্রতিবার অবাক হবার জন্য সেটাই ভাল। আমার তো আবার অবাক হতেও খুব ভাল লাগে। হ্যাঁ হ্যাঁ, মনে পড়েছে। আঙরাভাসা। কী সুন্দর নাম না ? গ্রামের লোকেরা কি ভাল নাম রাখে। আঙরাভাসা। আগুন ভেসে যায় এই নদীতে। ওরা এগিয়ে গেছে। আমি খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলাম পুলের উপর। সুবর্ণরেখার কথা মনে পড়ল আমার। এই যে এদেশ দেখতে দেখতে আমার নিজের দেশের কথা মনে পড়ছে, প্রেম জাগছে, মিল খুঁজে পাচ্ছি আমি। ভীম তখন থেকে একলা একলা চালিয়ে যাচ্ছে। ওকে একটু সঙ্গ দেয়া উচিত আমার।


ভীমের পাশে এসে বললাম --- কিরে দাজু ? আমার তো হামরো জামশেদপুর মনে পড়ছে। তোর হামরো খুর্শিয়াং মনে পড়ছে না ? মাইরি, নেকস্ট ট্রিপ টু খুর্শিয়াং। তোর বাড়িতে থাকব।


--- ঠিক আছে। তবে পরিমল গেলে হবে না। আমার বোন আছে বাড়িতে। আমি দুনিয়া কাঁপিয়ে হা হা হা হা করে হেসে ফেটে পড়লাম। --- শালা, দিয়েছিস মাইরি জব্বর। পরিমল আর পদম দাঁড়িয়ে গেল। --- কী ব্যাপার রে ? জিজ্ঞেস করল পরিমল। --- ভেলভেট পোকার চাটনি খেয়েছিস কখনো ? ভীমের বাড়িতে হয়। আমি যাবো খেতে। তুই যাবি ?


--- অ্যা ! পরিমল নাক শিঁটকালো। আমি নেই বাবা। আমি ভীমের দিকে চেয়ে দেখি ও আশ্বস্ত হল।


--- ভেলভেট পোকা ? চাটনি খায় নাকি ? টক হয় বুঝি ? আমাদের ওখানে বিস্তর আছে। চেখে দেখতে হবে তো। ভেলভেট পোকার ট্রেন দেখেছো ? কী সুন্দর জুড়ে লাইন দিয়ে চলতে থাকে। দেখাবো। শুনে টুনে পরিমল নিশ্চিন্ত হল। ছোটবেলায় ভেলভেট পোকা ধরে দেশলাই বাক্সে পুরে রাখতাম। লাল ভেলভেটের মতো চামড়া, ছোট পোকা, গুড়িগুড়ি হাঁটে, ডানা নেই, কি সুন্দর লাগতো হাতের চেটোয় তুলে নিতে। এখন তো বানিয়ে বানিয়ে চাটনির কথা বললাম। পদমপ্রসাদ ভেলভেট পোকার চাটনির কথাটা বিশ্বাস করেছে। দেখা যাক ওকে চাটনি খাওয়ানো যায় কিনা।


ফালাকাটায় এসে পড়েছি। বেশ বড় জায়গা। পথে জয়চাঁদপুর, ভুতনির ঘাট আর কত চা বাগান, লেবার কলোনি পেরিয়ে ফালাকাটা বাস স্ট্যান্ড। একটা বোর্ড দেখলাম, লেখা আছে -- ভাটিখানা বার। আরে শালা ! এখানে বার ! পদমজীকে বললাম বারে যাবার ইচ্ছে। সে আমাদের নিরস্ত করলো বারটা আপকামিং বলে। একটা দোকানে বসে চা খাওয়ালো। বিদেশ বিভুঁই, পদমপ্রসাদকে চটানো যাবে না, যখন তার বাড়িতেই আমরা রাতের অতিথি হচ্ছি। আবার শুরু হল পথ চলা। অন্ধকার হয়ে গেছে। রাস্তায় আলো নেই। পথে কারো বাড়িতেই বিদ্যুৎ নেই। হেরিকেন আর লম্ফ, কুপি ইত্যাদি জ্বেলে বাড়ির কাজ সারছে লোকজন। বাচ্চারা পড়াশুনো করছে। এরকম তো আমরাও করেছিলাম ফার্স্ট ইয়ারে শান্তিপুর মেসে। কিন্তু সেখানে রাস্তায় আলো ছিল। এখানে, লক্ষ্য করলাম, পথের দুধারের ঝোপ ঝাড়ে জোনাকিরা পিট পিট করছে। মোটামুটি বোঝা যাচ্ছে মাঝের জোনাকপথটি। দুই পাশের সেই পিটপিটানির মধ্য দিয়ে সাইকেল চালাতে ক্রমশ অভ্যস্ত হয়ে গেলাম। এর পর থেকে ডুয়ার্সে আমি কখনো আলোর অভাব বোধ করিনি। আমরা কিন্তু পুব দিকে যাচ্ছিলাম শালবাড়ির পর থেকেই। ফালাকাটা ছাড়িয়ে আর কিছু চোখে পড়ছিল না দুপাশে। না বাগান না জঙ্গল।


একঘন্টা সাইকেল চালানোর পর আমরা এসে পড়লাম মথুরাবাগানে। এখানে বাগানের ভিতর কয়েকটা বাড়িতে কারেন্ট আছে মনে হল। পদমপ্রসাদের বাড়িতে আছে। সাইকেলগুলো আমরা তুলে দিলাম তার গ্যারেজে। একটা ল্যান্ডমাস্টার গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। জিজ্ঞেস করি --- গাড়ি থাকতে সাইকেলে এতদূর থেকে ?


--- এই তোমাদের সাথে দেখা হবার ছিল, তাই। দেখো গো কারা এসেছে। এসো এসো ভাই, এদিক দিয়ে। আমরা জুতো ছেড়ে পোটলা হাতে ঘরে ঢুকলাম। চাঁপা এল। ডাগরটি। সাদাসিধে। পরিমলকে বলল --- এই গিয়ে চাঁপা। তোমাকে বলছিলাম না, পড়াশুনায় চটপটে, তবে অঙ্কে একটু কাঁচা। নেরে মা, ইনি তোকে জয়েন্টের ব্যাপারে দেখিয়ে বুঝিয়ে দেবেন। ইঞ্জিনীয়ারিং করছেন। এরা সবাই। ভাগ্যিস দেখা হয়ে গেল ধুপগুড়িতে, সেখান থেকে টেনে এনেছি। কই তোর মা কোথায় গেল ? তাকে একবার ডাক। তোমরা বসো ভাই। চাঁপা আর তার বাবা ভেতরে চলে গেল। বসার ঘর। দুটো চেয়ার আর একটা তক্তাপোশ। তাতে কিছু বই খাতা ছড়ানো। আমি আর ভীম চেয়ারে বসলাম। পরিমল তক্তাপোশে বসে বই খাতা ...


--- গা হাত পা ভেঙ্গে যাচ্ছে পরিমল। তোর মাগীবাজি বেশিক্ষণ চালাস না। আর, আমাদের সামনে পড়াতে বসিস না। ও চোখ পাকিয়ে বলল --- তোদের ঝাঁট জ্বলছে কেন বে ?


--- নারে। ঘুম পাচ্ছে। আর তুই তো মোটে একঘন্টা পাবি। কি আর পড়াবি। একটু আলু কর, ছেড়ে দে।


--- পড়াশুনো নিয়ে ইয়ার্কি মারিস কেন ? মিসেস পদমপ্রসাদ জল আর চা বিস্কুট নিয়ে ঢুকলেন। দোহারা মাঝবয়েসী চেহারা। সঙ্গে পদমপ্রসাদ। আমরা চা জল বিস্কুট খেতে খেতে বললাম --- সাইকেল চালিয়ে খিদে পেয়ে গেছে বুঝতে পারিনি পদমবাবু, বুঝলেন ? আপনি কি এখানে অফিসার টফিসার কিছু ? গিন্নী জিজ্ঞেস করলেন --- পদমবাবু কে ?


আমরা সবাই, পদমবাবু সহ হেসে উঠলাম হো হো করে। গিন্নী অপ্রস্তুত। পদমপ্রসাদ বলল --- আমি এদের কমলকুমার মজুমদারের গল্প করছিলাম, আর ওরা কমলকুমারের নাম পাল্টে আমাকে পদমপ্রসাদ করে নিয়েছে। ঠাট্টা আর কি। আমার নাম স্বপন, স্বপন মুখোটি। আমি এখানের সেকেন্ড অফিসার। আর, এই ছেলেটির নাম পরিমল চক্রবর্তী। আমাদের চাঁপাকে একটু জয়েন্টের পড়াশোনা দেখিয়ে দেবে। ভেতরের ঘরে বসার ব্যবস্থা করে দিও। তোমরা এই ঘরেই শুয়ো। চল তোমাদের বাথরুম দেখিয়ে দিই।


রাতে তাড়াতাড়ি খেয়ে দেয়ে শুয়ে পড়লাম। মড়ার মতো ঘুম। একঘুমে রাত কাবার। ভোরে উঠে বাথরুম সেরে বাগানে নেমে একটা ছোট শাল গাছের ডাল ভেঙ্গে মুখে দিয়ে দু-পা এগিয়েই দেখি মাটিতে লাইন দিয়ে চলেছে লাল ভেলভেট পোকারা। অনেক গুলো। আমি না গুণে চেয়ে থাকলাম ভেলভেট পোকার ট্রেনের দিকে। দুটো শালিক ওদের বিরক্ত করছে। টুক টুক করে মুখে তুলছে। ওদের ভ্রূক্ষেপ নেই, প্রতিবাদ করল না। আমি হাত তুলে চেঁচালাম --- হুউস হুউস ... ...


১৮ পর্ব






আমি আর ভীম মুখ ধুয়ে স্নান সেরেছি, পরিমল কখন শুয়েছে জানি না, তখনো আড়মোড়া ভাঙছে| বললাম -– রাতের আলু বাসী হলে আরো ভাল লাগে, না ? পরিমল সিরিয়াসলি বলল --- নারে, মেয়েটা তৈরি প্রায়| চান্স পাবেই এবার| ভীম ফোড়ন কাটলো --- তথাস্তু বৎস| নে এবার হাত পা নাড়| নাকি থেকে যাবি ফারদার ট্রেনিং দিতে ?


--- থেকে যাও না বাবা| বন্ধুরা ফেরার পথে না হয় তোমাকে নিয়ে যাবে| চাঁপাকে কেমন দেখলে জানা হল না| প্লিজ আরো কয়েকটা দিন থেকে যাও --- পদমশ্বশুর বললেন|


--- থেকে যা পরিমল| এত করে বলছেন| আমরা না হয় এই পথেই ফিরব| আমি বললাম| ওকে ইতস্তত করতে দেখে চা খেয়ে আমি আর ভীম টা টা করে সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম| পরিমলকে বিষণ্ণ মনে হল|


সকালের আলো হাওয়ায় আমি টগবগ করছি, মনে উৎসাহ, ধকলের লেশমাত্র নেই| চললাম মথুরাবাগান থেকে পশ্চিমে পিছিয়ে ফালাকাটার দিকে, সেই ভাটিখানা বার-এ| সকাল সাতটায় বন্ধ থাকারই কথা, তবে এটায় বীয়ার শপ, নোটিস দেয়া আছে| পদমশ্বশুর বুঝেশুনেই আমাদের আবদারে বাধা দিয়েছিল বোঝা গেল| শহরের বাইরে এলেই, সারা পথে, কী অদ্ভুত, সামনে পেছনে, পাশে, সর্বত্র চা বাগান, ফিকে আকাশ আর নিচে বুক সমান শুধু সবুজ আর সবুজ, অজানা একটা বিশেষ গন্ধ, মাঝে মাঝে ঐ চা গাছের মধ্যেই বড় বড় ঝাকড়া গাছ, মনে হয় লাগানো হয়েছে, চা গাছেরও ছায়া দরকার, নাকি পাখিরা বসবে বলে| অনেক পাখি, অনেক সুর তাদের, এত সকালে কোন কর্মচারি বা চা পাতা তোলার মেয়েদের ঘুম ভাঙেনি| মাঝে মাঝে চা বাগানের অফিস, গেট, বস্তি, কারখানা, কোয়ার্টার, বেড়া, আবার চা বাগান, নদী নালা, অদ্ভুত একটা মাদকতা| লাইফটা আরো ভাল করে জানতে হবে| এদের নিশ্চয়ই ফ্যামিলি আছে, ক্লাব, খেলাধুলা, কর্মজগত, প্রোডাকশন সাকসেস, প্রেম| খুব রোমান্টিক, না ? ফালাকাটায় চা খেয়ে আবার| জলপাইগুড়িতে ডেঙ্গুয়াঝাড় চা বাগানে হারিয়ে যেতে এজন্যই ভাল লাগতো আমার| ভীমকে বললাম --- গান গা ভীম| গোর্খা, তোদের ভাষায় গান ধর| এখানে বাংলা মানাবে না| কী ভাল গান করিস তুই| দোকানদারকে জিজ্ঞেস করে উত্তরমুখী হাসিমারার পথ ধরবো, ভীম জানতে চাইল --- হাসিমারা কেন ? --- আরে হাসি মেরেছে না হাসিকে মেরেছে জানার ইচ্ছে হল, ব্যস| নে চল|


সাইকেলে উঠতে যাচ্ছি, পেছন থেকে হুড়মুড় করে এসে পড়ল পরিমল| --- এই বন্ধু তোরা ! ছেড়ে চলে আসতে পারলি ? বলি --- বন্ধু, তুমি একা আলু করবে আর আমরা শুঁকবো, এই পার্মানেন্ট রোলে আমি নেই| কী হয়েছে ? চাঁপা আসতে দিলো ? শাশুমা আটকালো না ? এই তোর দায়িত্ববোধ ? ছিঃ !


--- আর বলিসনা গুরু| আমাকে জুতো তোরা| দেশ দেখতে বেরিয়েছি| কেন যে আমারই এরকম ছোঁকছোঁকানি লেগে থাকে ! আমাকে মার তোরা| তাই বলে ছেড়ে যাস না মাইরি| ভাগ্যিস তোদের পেয়ে গেলাম| কোথায় যাচ্ছিস এবার ?


--- চা খেয়েছিস ?


--- চা আমার মাথায় উঠেছে| পেছনের রাস্তাটা দেখে নিয়ে পরিমল বলল --- চল কেটে পড়ি চটপট|


ভাবগতিক ভাল নয় বুঝে আমরা সাইকেলে আবার| ভারী গাড়ি চলে না বলে রাস্তাঘাটের অবস্থা সরু হলেও ভাল| মিস্টি বাতাসে অক্সিজেন, দূষণমুক্ত, জল পরিষ্কার, আমাদের চোখে তখন রাস্তার বাজারের সব মানুষের নির্মল হৃদয়, সব মেয়েই সুন্দরী| নিজেদের দেশ বাড়ি পরিবার কলেজ বন্ধুবান্ধব ভুলে সম্মুখ পারাবারে সাইকেলে চলেছি, আকাশে উড়ে, মনে মনে ... এই রে, হাত ছেড়ে চালাতে গিয়ে একটা ঢিলে চাকা স্লিপ করতেই কুপোকাৎ| হাঁটু| ভীম বলল --- চল, একটু ব্রান্ডি লাগিয়ে নিলে ব্যথা করবে না| ধুস শালা| মনের জোরে চালিয়ে ঘন্টা দুয়েকে উত্তরদিকে হাসিমারায় পৌঁছে গেলাম| ব্রেকফাস্ট খেতে খেতে দোকানদারকে জিজ্ঞেস করলাম --- কাকা, এখানে মালের দোকানটা কোনদিকে ? লোকটা কটমট করে চাইতেই মনে পড়ল ধুপগুড়ির কাকার কথা| চেপে গেলাম| কাকার কাছে মালের কথা ? মাইরি| লোকগুলোকে নির্মল হৃদয় ভাবছিলাম| কোন বন্ধু কাকা হয় না এদেশে| হয় শ্বশুর নয় অসুর| নিচু স্বরে বললাম --- ভীম, হল না| একটা টোটকা মনে পড়েছে| ছেলেবেলায় কেটে-ছড়ে গেলে মা যার যার হিসি লাগিয়ে দিতো| তাই করে নিই দাঁড়া| দোকানের পেছনে গিয়ে সারলাম|


তারপর সাতালি, মধু, আরো কি সব বাগান পেরিয়ে, ঠিক করলাম এবার থেকে বাগানের নাম ভাল না লাগলে কিছুতেই মনে রাখব না, আমরা এসে পড়লাম কালজানি নদীর পাড়ে| সেই জলঢাকা নদীতে স্নান করার কথা ভাবলাম এখানে এসে, সাঁতার শেখার কথা, হায় ! রাস্তা থেকে একটু দূরে সরে গিয়ে গামছা বার করে জামা কাপড় খুলে নদীতে উদোম হয়ে স্নান করাটাও উৎসবের| কিন্তু ভয়ে ভয়ে, পাড় ঘেঁষে, পাছে ভেসে যাই| স্নান সেরে জামা কাপড় পড়ে সাইকেলের আয়নায় চুল আঁচড়ে ফিটফাট হয়ে গামছা সাইকেলের রডে লটকিয়ে আবার সাইকেল| পুবমুখী চলেছি| ভীমসঙ্গীতও চলছে| পরিমল রবীন্দ্র সঙ্গীত ট্রাই করে চেপে গেল| কালচিনিতে আমার এক দূর সম্পর্কের মামা থাকতেন, অফিসার, চিনি না, শুধু নাম জানি| সেখানে পৌঁছতে হবে, মাথায় আছে| পথে হ্যামিল্টনগঞ্জ পড়ল| নামেই হ্যামিল্টন| আসলে চা বাগানের শ্রমিকদের বস্তি আর দোকান পাট| বাবুদের বাড়িঘর তো বাগানের ভেতরে| চা সিগারেট খেয়ে আবার সেই সাইকেল, এ ব্যাপারে ক্লান্তি নেই| চালাতে চালাতে পায়ের অ্যাকশন মেকানিকাল হয়ে যায়| দুপুরে কালচিনি পৌঁছে মামার অফিসে হানা দিয়ে পরিচয় দিতে তিনি খুশি হলেন| কাকারা ভাল না হলেও মামারা বেশ ভাল| আমাদের নিয়ে চললেন তার কোয়ার্টারে| লাঞ্চ খাওয়ালেন| তার বোনের কথা, পরিবারের কথা জানতে চাইলেন আগ্রহ নিয়ে| সব জানালাম প্রেমসে| তার কোয়ার্টার ছিল কাঠের বাড়ি| এরকম একটা দোতলা কাঠের বাড়ির কথাই ভেবেছিলাম একবার, সুমনাকে বলে চিমটিও খেয়েছিলাম| আহা ! আমি কি ঝালুং-এ থাকব না কালচিনিতে ? যদি কোনদিন সুমনাকে পাই তাকে জিজ্ঞেস করে নেবো|


বেলা তিনটা নাগাদ আবার পথে| ক্রমে মনে হচ্ছে আমিই লিডার হয়ে উঠেছি| সব ব্যাপারেই আমার বুদ্ধি চলছে| এবার প্রথমে ডিমা চা বাগান, তারপর গারোপাড়া| ক্রমশ গ্রামগুলোর দূরত্ব বাড়তে থাকলো| শাল জঙ্গল শুরু| সবাই বলল নাকি বক্সা জঙ্গল| একজন জানতে চাইলো --- কই যান আপনেরা ? আমি বললাম --- কোথাও না| এমনিই পথে পথে| পাগল ভেবে লোকটা আর কথা বাড়ালো না| বিশাল একটা লেকের পাড়ে পৌঁছলাম| ঠিক জামশেদপুরের ডিমনার মতো| এটাই নাকি ডিমা নদী, লোকে বলল| কিন্তু নৌকা তো নেই| কী করা যায় ? অবশেষে জিজ্ঞাসাবাদ করে লেক বেড় দিয়ে দেখি নদীর আসল সরু চেহারাটা| বাঁশের একটা লিকলিকে সাঁকোর ওপর দিয়ে সাবধানে সাইকেল ঠেলে ওপারে এসে পড়লাম| এগিয়ে চললাম| বিকেল হয়ে আসছে| পুরো জঙ্গল| পথে লোকজন প্রায় নেই| কোন গ্রাম নেই| যদি জন্তু জানোয়ার আসে, মানে হিংস্র ? দূরে একটা পাহাড় দেখা গেল| ঠিক জামশেদপুরের দলমা পাহাড়ের মতো| কী আশ্চর্য ! দলমা আর ডিমনার মতো এখানেও ডিমা আর পাহাড় ! ভালবেসে ফেললাম| পাহাড়ের তলায় একটা গ্রাম, কিছু চাষের মাঠ, সামান্য দোকানপাট| এর নাম নাকি রাজাভাতখাওয়া| সেই নাম পাহাড়ের| একটা বাংলা মদের ঠেকও দেখা গেল| বলি --- ভীম, পরিমল, আমরাও আজ রাজার ভাত খাবো| ভাবা যায় ! এই দিকশূন্যপুরের পাহাড়ি গ্রামে বসে রাজার ভাত খাচ্ছি ? কিন্তু না কোন হোটেল দেখা যাচ্ছে আর না আমাদের আছে হোটেলে থাকার রেস্তোঁ| আর এখানেই থাকার বাসনা এখন| সন্ধ্যা হয় হয়| পরিমলের কল্যাণে পড়াশুনো শেখাবার ব্যবস্থাও সম্ভব না মনে হচ্ছে| কি করা যায় ! চায়ের দোকানে চা খেতে খেতে দোকানদারের সাথে আলাপ জমালাম| আর কাকা বলব না| --- দাদা, এখানে স্কুল নাই ? মাস্টারমশাই ?


অতি উৎসাহে দোকানী বলল --- আছে তো| মাস্টাররে পাইবেন ওই মদের ঠেকে| খুব কথা বলার অব্যেস|


--- অ্যাঁ ? মদের ঠেকে মাস্টার ? বলেন কি দাদা ? চিনবো কী করে ?


--- সে সেখানে গিয়ে দাঁড়াইলে তিনিই চিন্যা নিবেন| আপনাদের পোষাক এখানে তো কেউ পড়ে না| তিনি বুঝবেন|


পাছে মাস্টার বেরিয়ে যায় ভেবে তড়িঘড়ি আমরা মদের ঠেকের সামনে গিয়ে সাইকেল লক করে ভেতরে ঢুকলাম| সামনে কাচের আলমারি, মাথায় দরমার ছাউনি, কিছু টেবিল আর বেঞ্চে কয়েকজন বসা, মুখ তুলে দেখল আমাদের| কি চাই --- বলল একজন| আর একজন, বয়স্ক, ওদের মধ্যেই ভদ্র পরিষ্কার ধুতি সার্ট পরা, বলল --- আসুন আসুন, কোত্থেকে আসা হচ্ছে ভাই ? বোঝা গেল ইনিই মাস্টারমশাই| তিনি উঠে একটা খালি টেবিলে বসে আমাদের ডেকে বসালেন| আমি বলি,


--- আজ্ঞে, আমরা জলপাইগুড়ি ইঞ্জিনীয়ারিং-এর ছাত্র| পথে পথে বেরিয়েছি সাইকেলে দেশ দেখতে| রাজাভাতখাওয়া নামটা ভাল লেগে গেল, থেমে গেলাম তাই| আর সুযোগ দেখুন| আপনার সাথেই দেখা হয়ে গেল| কী খাচ্ছেন স্যার ?


--- আপনারা ইঞ্জিনীয়ারিং পড়ছেন, দেশ দেখতে বেরিয়ে একশো মাইল চলে এসেছেন, আর রাজাভাতখাওয়া নামটা ভাল লেগেছে – ব্যস ব্যস, আপনারা আমার গেস্ট| আজ রাতটা আমার সাথে| এখানে না মন খুলে কথাই বলা যায় না কারো সাথে| ও, আমি ছাং খাচ্ছি| চলবে নাকি ?


--- হলে ভাল হয় স্যার| সাইকেল দিনের বেলা ফুর্তি দেয়, রাতে টায়ার্ড হয়ে পড়ি, তাই ছাং তো মহৌষধ, একটু কিছু খেয়ে নিলে হতো| ছাং এল| সঙ্গে কিছু খাবার| স্যারই বলি, নামটা মনে নেই ওনার, আমাদের এক একজনের বংশলতিকা মায় বাড়ি থেকে গ্রাম পর্যন্ত হাঁড়ির খবর জানলেন| এত কথা বলতে গেলে মিথ্যে চলে না| আমি তো আমার কথা বলতে গিয়ে, সেই প্রথম, ভালবাসলাম অতীতের কথা বলতে, মন ভাল হয়ে গেল| জানা ছিল না এমনও হয়| জানি না ভীমদেরও সেই ফিলিং হয়েছিল কিনা| স্যারকে খুব পছন্দ হয়ে গেল| ইনি জানেন কীভাবে শ্রোতাদের মনের অবস্থা কাঁদিদ করতে হয়| খেতে খেতে এসব কথা হচ্ছিল| তিনি নিজের কথাও বললেন| স্থানীয় স্কুলে ইতিহাস পড়ান, বিপত্নীক, নিঃসন্তান, একা থাকেন, লাইব্রেরিহীন নির্বান্ধব এই পাহাড়ের গায়ে থেকে গেছেন আর কোথাও যাবার স্বপ্ন নেই বলে| ভাগ্যিস আমাদের সাথে দেখা হয়ে গেল আজ| অনেকক্ষণ ওসব খেয়ে দেয়ে, রাতের খাবার আর বিশ্রামের জন্য স্যার আমাদের নিয়ে চললেন তার ডেরায়| বাইরে পাহাড়ের কোলে অন্ধকার গাঢ়| খানিক দূরে ডিমা নদী| বক্সা জঙ্গলের মধ্যে হাঁটতে হাঁটতে অদ্ভুত শিহরণ হচ্ছিল| এজন্যই তো পথে বেরনো| আঃ ! ভীম আর পরিমলকেও ধন্যবাদ, একমনা হবার জন্য, একটা টিমই তৈরি হয়েছে| মাস্টারমশাই সাধারণ একটা একচালা ঘরে তালা খুলে ঢুকে লন্ঠন জ্বালালেন| পেছন দিকে খাটা পায়খানা, কাঁচা বাথরুম, জলের বালতি, কলস গ্লাস, সাবান, শোবার চৌকি, সব দেখিয়ে দিলেন| তিনি ভাত আলু সেদ্দ বসিয়ে দিলেন স্টোভে| আমাদের বললেন ঘুরে দেখতে| বেশি দূর যেতে নিষেধ করলেন| ফেব্রুয়ারির শেষ| মৃদুমন্দ শীত গায়ে পাহাড় আর আমরা|


আমরা কিছুক্ষণ হাঁটলাম পাহাড়ের তলা ঘেঁষে| আমার মনে পড়ছিল খুব করে ডিমনা আর দলমার কথা| শুধু শীতের শেষে দলমার বনরক্ষীরা রাতে পাহাড়ের গায়ে লাইন করে রাখা শালের পাতায় আগুন দিলে দূর থেকে যে আলোমালার দৃশ্য দেখেছি, তা নেই এখানে, বনরক্ষীদের সেই ব্যবস্থা নেই| আর কোটরার ডাক, বনকুকুরের, ময়ূরের ক্রেঙ্কার, নেই| আত্মীয় মনে হয় শালগাছদের| আমরা ফিরে এলে খেতে বসে মাস্টারমশাই শোনালেন রাজাভাতখাওয়ার গল্প| সে অনেককাল আগে, কুচবিহার আর নেপালের রাজাদের মধ্যে যুদ্ধ হয়েছিল ভীষণ| এই সব গ্রাম পাহাড় অঞ্চলও আক্রান্ত ছিল| এরা জানতো না তাদের রাজা কে| কোচ রাজাকে বন্দী করে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল নেপালে| পরে তার মুক্তি হলে তিনি সঙ্গীদের সাথে পদব্রজে এই পথ দিয়ে ফেরার সময় এই পাহাড়ের কোলে ক্ষুধিত হয়ে পড়েন পথশ্রমে| তাকে এইস্থানে খাবার দেওয়া হয়| সেই থেকে, গত তিনশো বছর ধরে জায়গাটার নাম রাজাভাতখাওয়া| এটাই এখানকার মিথ| আমরা আলুসেদ্দ আর গল্পটা দিয়ে ভাত খেলাম তোফা| এরপর শুয়ে পড়লাম| পরিমলকে দেখি মাথা তুলে বালিশে তিন টোকা দিলো|


--- কিরে, পিপড়ে ঝাড়ছিস ?


--- না| ভুত তাড়াচ্ছি|


--- ভুত ? হঠাৎ ? আগে দেখিনি তো|


--- রাজার ভুত| আগে শুনিনি তো| শোবার আগে ভুতের গপ্পো| তুই ঘুমো|


--- কাটোয়ার ভুত শালা, বলে শোয়ামাত্র ঘুমিয়ে পড়লাম|


সকালে ঘুম থেকে উঠে কাজকম্ম সেরে বসে থাকলাম মাস্টার ওঠার আশায়, চা খাবো| মাত্র ৫০ টাকা সম্বল করে বেরিয়েছিলাম| দুদিন হয়ে গেল| একবার ভাবলাম ফিরে যাই| কোন বার ভুলে গেছি| কলেজের কথাও| কিন্তু কোচরাজার বাড়ি যাব না ? মাস্টারের ওঠার চান্স নেই দেখে দরজা দিয়ে বেরিয়ে পড়লাম তিনজন| বাইরে এক আধটা দোকান ঝাঁপ খুলেছে| কয়েকজন ব্যাগ হাতে দাঁড়িয়ে দেখে মনে হল বাসস্ট্যান্ড| জিজ্ঞেস করে জানা গেল ঘন্টায় ঘন্টায় কুচবিহারের বাস আসে ফালাকাটা থেকে| মনে হল ভাবলে জামশেদপুরের বাস পাওয়া যেত| ইশ| চা বিস্কুট সিগারেটে গেল আট আনা| কি আর করা যাবে| বাস এলে ড্রাইভারকে বললাম --- মামা, জলপাইগুড়ি ইঞ্জিনীয়ারিং-এর স্টুডেন্ট| কুচবিহারে যাব| নেবেন আমাদের ? ড্রাইভার বুঝে গেল| বলল --- আসো ভিতরে, আমার পাশে আইয়া বস| সাইকেল মাথায় তুইল্যা দেও|


ভীম বলল --- তোর কেসটা কি বল তো| দাদা মামা কাকা বাছিস কি করে ?


--- না জানাই ভাল| তোদের মুখ দিয়ে বেরোলেই ক্ল্যাশ করে যাবে| সাইকেল বাসের মাথায় বেঁধে দিয়ে আমরা গুটিগুটি গিয়ে ড্রাইভারের পাশে, ইঞ্জিনের ওপর, পেছনে সেঁদিয়ে বসলাম| --- হিচ হাইকিং শুরু হল পরিমল, আমি বলি|


--- কি বলছো গো ? ড্রাইভারমামা জিজ্ঞাসা করলেন|


--- আপনার প্রশংসা করছিলাম মামা| এমন মানুষ হয় না| দয়ার শরীর| আপনি চালান মামা| এটা প্যাসেঞ্জার বাস| গ্রামে হাটে থেমে থেমে চলছে| আমাদেরও তাড়া নেই| বাইরের দিকে মুখ ফিরিয়ে| মুগ্ধ চোখ| বক্সা পেরোলে আর শাল বা চা-গাছ নেই| এবার ধান, পাট, পুকুর, নদী নালা| ডুয়ার্সের বাইরে চলে এসেছি| বাস আলিপুরদুয়ারে দাঁড়ালে ড্রাইভার বলল, ১৫ মিনিট দাঁড়াবে| চা, পেচ্ছাপ ইত্যাদি সেরে সিগারেট| ভীম উঠে উঁকি মেরে দেখে এল সাইকেলগুলো ঠিক আছে কি না| জলপাগুড়িরই একটা ছোট সংস্করণ এই শহর| চোখ টানে না| দূরের পাহাড় চোখে পড়ে| সামনের বছর তো আসতেই হবে এখানে লোড স্টাডি করতে| বিদ্যুৎ বড় দরকার| জলঢাকা প্রজেক্ট জোরকদমে চলছে| আবার বাস চলল| বেলা দশটা নাগাদ বাস থামলে ড্রাইভার জানালো কুচবিহারে পৌঁছে গেছি| নেমে আগে সাইকেল নামিয়ে ড্রাইভারকে অনেক ধন্যবাদ জানালাম| নেমে দেখি একটা বিশাল সরোবরের পাশে আমরা| জানা গেল এটা রাজবাড়ির দিঘী, বাঁধানো, পরিষ্কার, সিড়ি বসানো, বেঞ্চ সিমেন্টের, সুন্দর টলটলে জল| পেছনে, রাস্তার উল্টোদিকে একটু পাশে বিশাল রাজপ্রাসাদ| চোখ আটকেই থাকে| এমনটা আগে দেখেছি ত্রিপুরার রাজবাড়ি, আগরতলায়| জলপাইগুড়ির রাজবাড়ি লাগে না এর কাছে| সাইকেলে চেপে শহরটা একটু ঘুরে নিলাম| সুন্দর সাজানো| দেখতে দেখতে অন্যমনস্ক আমরা শহরের বাইরে চলে এসেছি, তখন হুঁশ হল| একটা ধাবা পাওয়া গেল যেখানে বসে দুপুরের খাবার খেয়ে নিলাম| এর মধ্যে কত কথাই নিজেদের মধ্যে শেয়ার করলাম| এবার ফেরার কথা ভাবতে হবে| কি করা যায়| আজকের মধ্যে জলপাইগুড়ি পৌঁছতে হলে এখনই রওনা দিতে হয়| দেখি|


টনক নড়ল| ধাবাতে মাঝে মাঝে ট্রাক এসে দাঁড়াচ্ছে, ড্রাইভার, খালাসী ভাত খাচ্ছে, বেরিয়ে যাচ্ছে কিছুক্ষণ গল্পগুজব সেরে| গুণতে গুণতে একজনকে জিজ্ঞাসা করলাম --- আপনি কি ধুপগুড়ির দিকে যাচ্ছেন মামা ? তিনি ভাগ্নের দিকে কোমল স্নেহের চোখে চেয়ে বললেন --- হ্যাঁ| আপনি ? আমাদের ইতিহাস জেনে তিনি রাজি হয়ে গেলেন আমাদের ধুপগুড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দিতে| নাগরাকাটা থেকে কাটা গাছের গুঁড়ি সাপ্লাই করেন ইনি| এখন খালি ফিরছে| আমরা সাইকেলসুদ্দ ট্রাকে চেপে বসলাম| চলল ট্রাক| তখন পরিমল আর ভীম বলে --- কপাল নিয়ে জন্মেছিলি মাইরি| বললাম --- যদি যাই বঙ্গে কপাল যায় সঙ্গে| ট্রাকের ডালায় ঠেস দিয়ে আমরা ঘুমিয়ে নিলাম| কোন প্যাসেঞ্জার নেবার বালাই নেই| ট্রাক একেবারে ধুপগুড়িতে এসে থামল| এখান থেকে বানারহাট হয়ে নাগরাকাটা যাবে| শহরগুলোর নাম আমার রূপকথার মনে হচ্ছিল| হয়ত কোনদিন দেখতে পাবো| মামাকাহিনী তো ফুরলো| এবার আপনা পাও জগন্নাথ| বিকেল হচ্ছে| চা-টা খেয়ে রওনা দিলাম ময়নাগুড়ির দিকে| আর ছ’ মাইল মাত্র| টেনে চালালে তিস্তা পেরোবার নৌকা পেয়েও যেতে পারি|


ভেবে দেখলাম আজ পর্যন্ত যত বাংলা আর হিন্দী সিনেমার গান ছিল গাওয়া হয়ে গেছে, বাকি কিছু নেই, রিপিট হচ্ছে বরং| এলভিস প্রিসলি, ফ্রাঙ্ক সিনাত্রা যা যা মনে পড়ে, সব সব শুরু করলাম, ফুরিয়েও গেল| শিখলাম গান গাইতে গাইতে সাইকেল চালালে ক্লান্তি লাগে না| ক্রমশ সন্ধে হয়ে গেল| গ্রামের কুপি, লন্ঠন ভরসা, তাও দূরে দূরে, মাঝে মাঝেই বেল বাজাতে হচ্ছে| তার চেয়ে গান ভাল| রাস্তার দুপাশে বাউন্ডারি দেখাচ্ছে জোনাকিরা| জোনাকপথ দিয়ে আমরা থ্রি কমরেডস চলেছি গান গেয়ে| কখন যেন আমরা গাইতে শুরু করেছি সবাই একটাই গান – “আমি প্যাক করে পাঠাব বাঁড়া লন্ডনে” – লোকে দূর থেকে শুনে ভাবছে -- আহা, ছেলেরা ‘আমার মায়ের পায়ে জবা হয়ে ওঠ না কেঁদে মন ...’ গাইছে, কী ভক্তি, কী ভক্তি, এদেরকে রক্ষা করো মা|


প্রায় আটটা বাজে| আমরা এসে পড়লাম ঘাটে| নৌকা আছে| ফিরতি পথে দোকানে সাইকেল ফেরত দিয়ে প্রতিজন মাত্র বারো আনা করে দিলাম ভাড়া হিসাবে| দোকানী তো খুব খুশি ইনট্যক্ট ফেরত পাওয়ায়| কোথায় কোথায় গিয়েছিলাম খোঁজখবর নিলো| চা-টা খেয়ে হেঁটে বাকিটা| হোস্টেল| রাতের খাবার কিনে নিয়ে এসেছি| হাতমুখ ধুয়ে, চান করারও দেরি না করে তাই হাতে হাতে খেয়ে শুয়ে পড়লাম| কারো সাথে গল্প করার স্কোপ নেই| কেউ তো নেই| অতএব ঘুম ঘুম ঘুম|


পর্ব ১৯






সাইকেলে কুচবিহার ভ্রমণ শেষে শরীর সহজ হতে বেশ কিছুদিন লাগল। ছুটি শেষ। ছেলেরা বাড়ি থেকে ফিরে এসেছে। এরপর মে মাসের ফাইনাল পরীক্ষার প্রিপারেশন শুরু হবে। ১৯৬৫ তখন। ফাইনালের পর ফোর্থ ইয়ারে উঠব। এবার সিরিয়াস হতে হবে। শেষ দুটো বছরই আসল। আমাদের শেষ দোল উৎসব হাতের কাছে। ঠিক হল বারীনই ভাঙ বানাবে এবার। সুনাম ছিলই। কলেজ শেষে বাজারে গিয়ে কেনাকেটার জন্য অরুণ সঙ্গী হল। ভাঙের শুকনো পাতা প্যাকেটে পাওয়া যেত। সঙ্গে কিছু কাঁচা সিদ্ধি পাতা আর এক টাকার ১০০-টা পানের কাটা বোঁটা, পাকা কলা, মোদক, ইত্যাদি কিনলাম। অরুণ বলল --- সেকি রে ? হোস্টেল সুদ্দ কৃমি মুক্তি করার কনট্রাক্ট নিয়েছিস নাকি ? বলি --- মানে ? অরুণ বলল


--- ছোটবেলায় পাছা চুলকালে, যেমন বাচ্চাদের মিস্টি খেলে হয় আর কি, মা আমাকে উপুড় করে ধরে পাছার ফুটোয় পানের বোঁটা ঘোরাতো। তাতে নাকি কৃমিরা উঠে আসতো বোঁটায়। আমার আরামও হতো। আমার ভাইবোনদেরও তথৈবচ। শুনেছি সব বাচ্চাদেরই এমনটা হয়। তো আজ তুই বোঁটাগুলো নিয়ে তাই করবি তো ?


আমি হেসে ফেললাম। --- শালা, বাচ্চা পয়দা কর আগে। কেসটা বুড়োদের বেলা খাটে না। যা কিনলাম সবটাই ভাঙ-এ লাগবে দেখিস। পরদিন সকালে ব্রেকফাস্টের পর থেকেই লেগে গেলাম। দোলের দিন কলেজ ছুটি। কাজেই। রান্নাঘর থেকে শিল নোড়া এনে বাঁটতে শুরু করলাম। ঘন্টাখানেকের মধ্যে ভাঙের শরবত তৈরি হয়ে গেল পাউডার দুধ মিশিয়ে। হোস্টেলের জন্য নয়, শুধু আমাদের উইং-এই লিমিটেড এই উৎসব। দুটো হোস্টেলের ছেলেরাই ছোট ছোট দলে খেলবে দোল। আমাদের আবিরও তৈরি। আবির খেলার ফাঁকে ফাঁকে ভাঙ চলল, তারপর গান। সবাই উদ্দাম। ঠিক হল আমরা হোস্টেলের পেছনে মাঠ পেরিয়ে করলা নদীতে স্নান করতে যাব। হৈ হৈ করে বেরিয়ে পড়লাম। আমাদের মধ্যে একজন, সুশান্ত প্রতিহার, মেদিনীপুরের চ্যাম্পিয়ান সুইমার, একগোছা ম্যানিলা রোপ কাঁধে নিয়ে চলল সাথে। আমি এর আগে করলার আশে পাশে ঘুরে বেড়িয়েছি কিন্তু ভয়ের চোটে জলে নামিনি কখনো। শুনেছি পাহাড়ি নদী, কারেন্ট খুব। তবে এখন শীতের শেষে জল অনেক কম। আমাদের মধ্যে উদয় ছিল সবচেয়ে লম্বা। নিজেকে বেঁটে বলার চেয়ে উদয়কে লম্বা বলা বেটার। ওকেও সাঁতার কাটতে দেখেছি। বললাম --- আমাকে সাঁতার শেখাবি উদয় ? --- লিচ্চয় লিচ্চয়। খচরামি করল উদয়। প্রচুর ভাঙ চলেছে, হাসির ফুলঝুরি, হাসিতে হাসিতে অট্টহাসি, তার কি মহিমা, কাউকে ছাড়ে না। আমি আর অরুণ, কৃমির কথা মনে পড়ায় গোপনেও হাসলাম একে অন্যের দিকে তাকিয়ে। তখন সবাই গায়ক। হেলতে দুলতে নাচতে নাচতে গানের কী ধুম।


মাঠে দুটো বিশাল সাইজের লম্বা পা-ওয়ালা পাখি হাঁটছিল, ছাই রঙের, চার ফুট উঁচুতে মাথা। অমরনাথ বলল --- এই পাখিগুলোকে হাড়গিলে বলে, ইন্ডিয়ান বাস্টার্ড। বাস্টার্ড শুনেই থমকে গেলাম, তারপর হো হো করে হেসে উঠলাম সবাই। --- নারে, সত্যি, বাস্টার্ড এগুলো। এবার দৌড়বে দেখ। আমাদের আওয়াজ পেয়ে পাখি দুটো দৌড়তে শুরু করল, দুরন্ত দৌড়, পাখি যে ওই স্পিডে দৌড়তে পারে, না দেখলে বিশ্বাস করতাম না। দৌড়তে দৌড়তে ওরা টেক অফ করল, যেমন এরোপ্লেন করে থাকে। অমরনাথ বলল --- ওরা ট্যাক্সিং আপ করল দেখলি ? আমি বললাম --- তুই ভাঙ খাসনি, না ?


এসে পড়লাম করলা নদীর ধারে। বেশি চওড়া না। পনেরো মিটার হবে প্রায়। এপারে হোস্টেল যতদূর, ওপারে আনন্দচন্দ্র কলেজ ততটাই দূর, দেখা যাচ্ছে। এক একজন করে সবাই জলে নেমে গেল। কেউ কেউ সাঁতার কাটছে, মানে হাত পা দাপিয়ে ভেসে থাকা আর কি। জলের খরস্রোতে পাতা-টাতা ভেসে যেতে দেখে একটা কাঁপুনি, ইতস্তত করছি, উদয় হাতটা টেনে নামিয়ে নিল। নামতেই কোমরজল। শিউরানি। উদয় আমার পিঠে আর হাঁটুর পেছনে হাত রেখে পাঁজাকোলে তুলে ধরলে দেখি জলে দিব্বি চিৎ হয়ে ভেসে উঠলাম। কিন্তু ব্যালান্স পাচ্ছি না। ওর কথামতো হাত পা দাপাতে শুরু করলাম। তখন টের পাচ্ছিলাম না যে নদীর জলের তলায় যে বালুমাটি আছে তা স্রোতের কারণে সরে সরে যায় বলে উদয় ধীরে ধীরে নদীর মাঝখানে ডাউনস্ট্রিমে সরে গেছে। জলের স্রোত স্টেডি দাঁড়িয়ে থাকতে দেয় না। ব্যালান্স করতে আঙুল আর গোড়ালিতে ওজন শিফট করার সময় বালু সরে যায়, তখন পা-ই শিফট করতে হয় আর এভাবেই উদয় পাঁচ মিনিটের মধ্যে একেবারে মাঝদরিয়ায় যাকে বলে। বলল --- বারীন, তুই একটু আমাকে ধরে দাঁড়া, দম নিয়ে নিই। জল তখন উদয়ের গলায়। আমাকে নামাতেই আমি টুপ করে ডুবে গেলাম জলের তলায়। নিশ্বাস নেবার জন্য লাফিয়ে নাকটা জলের ওপরে একবার তুলে সেই যে ডুবলাম, উদয়কে আর খুঁজে পেলাম না। দাঁড়াবার চেষ্টায় হাঁকুপাকু করতে করতে তলিয়ে গেলাম। স্রোত আমাকে শিকড়ছিন্ন ভাসিয়ে নিলো। ওলট পালোট খেতে খেতে আর দম বিষমের ঠেলায় জলের ভেতরেই ভেসে চললাম। জল যে ভেতরে ভেতরে এত সবুজ, বর্ণমালার মাঝখানে, প্রকৃতির মাঝখানে এই সবুজ আমাকে মোহিত করল না। তখন ক্রমশ জন্মলগ্নে ফিরে যাচ্ছি, মার কথা মনে পড়ছে, শুধু মা মা মা ডুকরে ওঠার আওয়াজ, বেরোচ্ছে না, হায়।


নিশ্বাস নেই। শরীর হালছাড়া। জলে উথাল পাথাল ভেসে চলেছি। নাকেমুখে শুধু জল খাচ্ছি। সবুজ জল। হাতের মুঠোয় শুধু জল। হঠাৎ গায়ে একটা কিছু লাগল। আমি আঁকড়ে ধরলাম প্রাণপণে, যেটুকু জোর পাই। আরো কিছুক্ষণ বয়ে যাবার পর মনে হল যা ধরেছি তা কেউ টেনে নিচ্ছে, আমার হাত খুলে যাবে, আমি পারছি না, মায়ের মুখও মনে পড়ছে না তখন ...... হঠাৎ টান লাগল। আমি যা আঁকড়ে ধরেছিলাম তা আমাকে টানতে থাকল, আমার যেটুকু শক্তি, মাগো ...... মনে নেই সেই অতঃপর কথা ...... জ্ঞান হতে দেখি আমাকে চিৎ করে শুইয়ে পেটে চাপ দিচ্ছে কেউ ...... আমার মুখ দিয়ে কাশির সাথে বেরিয়ে আসছে ভলকে ভলকে জল আর জল। বেশ কিছুক্ষণ পরে শ্বাস প্রশ্বাস নিয়মিত হলে দেখতে পেলাম সুশান্ত আমার পেটের ওপর বসে আমার গালে চাপড় মারছে। আমি চোখ চাইতে হৈ চৈ শুরু হল। একটু পরে আমাকে তুলে বসানো হল। দেখি করলার অপর পারে শুয়ে ছিলাম। আমাকে ঘিরে সবাই। মুখগুলো উদ্ভাসিত। পাশে সুশান্তর ম্যানিলা রোপ মাটিতে। আর একটু সুস্থ হয়ে উঠে বসতে মুরারি বলল --- ভাগ্যিস সুশান্ত দড়িটা এনেছিল। তুই ভেসে যেতে সুশান্ত লাফিয়ে জলে পড়ল আর আমি অন্যদিকে দড়ির অন্যদিকটা ধরে এই পাড়ে, সুশান্ত সাঁতার কাটছে আর আমি দৌড়চ্ছি, কতটা এসেছি দেখ, আর একটু হলেই তিস্তায় ... আমাদের খাওয়াতে হবে কিন্তু। আমি তাকিয়ে হোস্টেল দেখতে পেলাম না কোথাও। উস্‌স্‌ ! চোখে তখনো সবুজ জলের ঘোর। বললাম --- বোকাচোদা উদয়টা কোথায় গেল রে শালা ?


আবার জলের ভেতর হারিয়ে যাচ্ছিলাম একা একা। নিঃশ্বাসের জন্য তড়পানিটা এখন আতঙ্কে বদলে গেল। জলের দিকে চেয়ে কেঁপে উঠছি। ওরা আমার হাত ধরে ধীরে ধীরে হাঁটিয়ে নিয়ে এল মাইলখানেক দূরে ডেঙ্গুয়াঝার চা বাগানে। ছোট ব্রিজ দিয়ে নদী পেরিয়ে নিয়ে এল হোস্টেলে। কৃতজ্ঞতা, শুধু কৃতজ্ঞতা। ঘুমিয়ে পড়লাম না খেয়ে। লম্বা ঘুম। ঘুমের মধ্যেই দুলতে থাকলাম জলে। আরাম লাগছিল সবুজ জলের ভেতর শুয়ে। যেন চিরতরে শুয়ে আছি। এমন সময়ে কেউ আমার কপালে হাত রাখলো। চোখ খুলে দেখি সুমনা এসেছে। সুমনার কোলে আমার মাথা। সে বলল --- কেমন লাগছে বারীনদা ? তুমি আমার জন্য মরতে গেলে কেন ? আমি তো বসেই ছিলাম তোমার ডাকের আশায়। আমি সুমনার কোলে উপুড় অবস্থায় দুহাতে আঁকড়ে ধরে – উঁ উঁ উঁ করতে থাকলাম। আমার পাছায় জোরে থাপ্পড় পড়ায় চোখ মেলে দেখি কোথায় সুলতা ? বালিশ আঁকড়ে শুয়ে আছি। স্বপন পেছনে চাঁটি মারছে জাগাবার জন্য।


--- শালা। স্বপ্নটা ভেঙ্গে দিলি তো ? কি সুন্দর ডায়লগ হচ্ছিল সুমনার সঙ্গে...


--- তাই নাকি ? কি কথা হল বল বল ...


--- বাল বাল। উঠে জল খেলাম। অন্ধকার হয়ে গেছে। খিদে পেয়েছে। --- কটা বাজে রে ?


---সাড়ে সাতটা। ডিনারের দেরি আছে। লক্ষ্মীর দোকানে যাবি ? চ’ আমি চা খাবো -- স্বপন বলল।


আমি উঠে বাকি পড়ে থাকা ভাঙটুকু খেয়ে ফেললাম প্রথমে। --- দূঃশালা, কোন মানে হয় ? স্বপন ভ্যাঙালো।


--- নারে, ঘোরে আছি এখনো। কাটাবার জন্য ভাঙটা খেলাম। বিষে বিষক্ষয় আর কি।


পিঠে একটা চাপড় মারলো স্বপন। লক্ষ্মীর দোকানে ফুলকপির তরকারি দিয়ে লুচি আর চা খেলাম। বললাম --- সবারই উচিত জীবনে একবার অন্তত ভেসে যাওয়া, তাহলেই আমার অবস্থাটা বুঝতি।


--- দূর। আমি ভেসে যাবো না। আমি ভেসে থাকতে চাই। নইলে কলেজকে ফুটবলে জেতাবে কে ?


--- সত্যিই স্বপন, ভাগ্যিস তোর মতো ছেলেরা পৃথিবীতে আসে। আজ কলেজকে জেতাবি, কাল ইউনিভার্সিটিকে, পরশু বেঙ্গলকে, তার পরে ইন্ডিয়াকে। আর দ্যাখ আমি সামান্য করলাতে ডুবে গেলাম। এরপর মাংসে রসগোল্লাতে মেয়েমানুষে হাবু আর ডুবু খাবো যখন, কে বাঁচাবে বল ? আমাকে কেন বাঁচাতে গেলি তোরা ? ছোটবেলা থেকেই হারাতে হারাতে ফুরিয়ে যাবার কপাল আমার। পারবি ? তাহলে যন্ত্রণা না, আনন্দ দে। আমার বন্ধু বিশু আসছে জামশেদপুর থেকে। খুব মজার ছেলে, আমরা দার্জিলিং যাবো। বিশুকে ঘুরিয়ে দেখাবো। সঙ্গে চল না। প্লিজ।


--- যাবো। আগে সুমনার কেসটা আবার চালু করবি বল। আনন্দ পাবি। ডুবতে ইচ্ছা করবে না।


--- আওয়াজ দিচ্ছিস ?


--- ভাঙের তাল দোস্ত। ঘুমোবি চল। সলিড ঘুমিয়ে ওঠ, সকালে সেরে যাবে।


পরদিন সকালে খুব ফুরফুরে লাগছিল। চান টান করে ফিট। মন দিয়ে ব্রেকফাস্ট করলাম রুটি তরকারি। গাঁজা আর ভাঙ খাবার পরের দিন এরকম ভাল লাগে। কে যেন বলছিল গাঁজা আর ভাঙ শরীরের পক্ষে উপকারী। কেন যে সবাই সিগারেট আর মদ খায় ! বিশু এসে পড়ল। আসার কথা জানিয়ে চিঠি দিয়েছিল আগে। গোবিন্দ, স্বপন, তপন, সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিলাম। --- বিশু আজ আমার সাথে থাকবে। কাল ভোরে বেরিয়ে যাবো দার্জিলিং। কেউ যাবি ?


--- পড়াশুনো ডকে তুলে দিলি বারীন। কপালে দুঃখ আছে। পরীক্ষা সামনে।


--- ও ঠিক আছে। আমার জন্য চোতা তৈরি করে রাখছিস তো ? তাতেই হবে। কালকের ফিরে পাওয়া নতুন জীবনটা উপভোগ করতে দে মাইরি। দুটো দিন। আমার প্রক্সিটা দিয়ে দিস মনে করে।


--- রংবাজির স্বভাবটা এখনো গেল না শালার। গোবিন্দ বলল। --- সবসময় মাস্তানি। কাল তো গাঁড় মারাচ্ছিলি।


--- নদীতে ভাসাকে গাঁড় মারানো বলে বুঝি ? তোর বিহারি ভাষা এখনো কাটলো না শুয়োর।


পরদিন ব্যাগ গুছিয়ে আমি আর বিশু বেরিয়ে পড়লাম। সেই আগেকার ব্যবস্থা। টি টি, টয় ট্রেন। বিশু উত্তেজিত। গিলছে। সেই হিমালয়ান গ্লোরি হোটেলে স্টুডেন্ট বলে। সেবার ছিল কুড়ি টাকা রোজ চারজনের। এবার কুড়ি টাকা রোজ দুজনের। কোই বাত নেহি। বিশুর পকেটে কিছু পয়সা আছে। হোটেলে ব্যাগেজ রেখে ঠিক করলাম এবার একটু ঘুরে দেখব চারপাশ। প্রথমেই গেলাম বোটানিকাল গার্ডেনে। আমার জীবনে প্রথম। শিবপুরেরটাও দেখিনি। গেলাম চিড়িয়াখানাতেও। কলকাতায় অত বড় চিড়িয়াখানা দেখার কথা মনেও আসেনি। কালো বাঘ আমি জীবনে একবারই মাত্র দেখেছিলাম দার্জিলিং-এ। বিশুর ভাল লাগছে। বলল --- গায়ে রঙ করার সময় বাঘটা হালুম করেনি ? আমি হেসে উঠলাম। বিশু এরকমই মজার কথা বলে সবসময়। খুব ভাল সঙ্গী। তখনো আমি মোমোর খবর রাখি না। একটা দোকানে সস্তার তড়কা রুটি খেয়ে আমরা ম্যালের একটা বেঞ্চে বসলাম নিচে লেবং রেসকোর্সের দিকে মুখ করে। তলায় ভ্যালিতে বিশাল রেসকোর্সে সবুজ মাঠ আর ঘোড়া থাকলেও সাহেব আমলের রেস আর হয় না। ভ্যালি পেরিয়ে দূরে কুয়াশার চাদর গায়ে নীল রঙের পাহাড়। এত মনোরম দৃশ্য আমি আগে কখনো দেখিনি। এর আগের বার উত্তেজনায় এসব দেখাই হয়ে ওঠেনি। নানা কথা শুনি বিশুর মুখে, নাটকের কথা, বিশু নাটক ভালবাসে। ইচ্ছে হয় জামশেদপুরে ছুটে যাই। আমার মস্তির কথা ফুলিয়ে রঙ চড়িয়ে বললাম বিশুকে। নতুন দেখা দেখতে এতকাল আমার ভাল লাগতো। এবার দেখি মুগ্ধতায়। শিখে গেলাম মুগ্ধতার আরাম। আর গল্প বানাবার কায়দা, একদম নতুন শ্রোতার কাছে। সন্ধ্যাবেলা উঠে একটু নিচে নেমে আগেকার দোকানটায় থুম্বা খেতে বসলাম। ব্যাপার স্যাপার দেখে বিশুর চোখ ছানাবড়া। বলল --- বাপরে ! সর্ষের মধ্যে ভুত থাকে শুনেছি। ওর মধ্যে মদও থাকে মাইরি জানতাম না। --- হাহাহা, ওটা সর্ষে নয়-রে, ওটাই তো থুম্বা। দ্যাখ খেয়ে --- বললাম আমি।


ইশ্‌ ! পড়াশুনো করতে এসে কত জ্ঞান হল আমার। একদিন সে সব লিখে যাবো। ভাবলাম। বিয়ার দিয়ে শুরু। সব রকম বিদেশি নামের মদ। গুড়কি কাচ্চি, পাক্কি। বাংলা ধেনো। অরেঞ্জ। রকসি। ছাং। থুম্বা। ভাঙ। মহুয়া। রসি। কপালে আরো কত কি আছে জানি না। তবে এগুলো শুধু বাহাদুরি মেরে টেস্ট করা। রেগুলার হবার পয়সা নেই, ইচ্ছেও নেই। এখন ইচ্ছে হচ্ছে মুগ্ধ হবার। গল্প গুজব করতে করতে বেশ খানিকটা থুম্বা খেয়ে রাতের খাবারও খেয়ে ট্যাক্সি স্ট্যান্ডে গিয়ে কাল ভোরে টাইগার হিল যাবার শেয়ারে কন্টাক্ট করে নিলাম। রাতে হিমালয়ান গ্লোরি। ঘুম।


পরদিন সাড়ে চারটায় কাঁপতে কাঁপতে স্ট্যান্ডে চলে এলাম। জিপে টাইগার হিল। পাহাড় বেড় দিয়ে সরু রাস্তায় ঘুরে ঘুরে ওপরে উঠল গাড়ি। একটা ফ্ল্যাট জায়গায় বাঁধানো বারান্দা, রেলিং, ছাদ। ভোর পাঁচটার পরে ধীরে ধীরে পরিষ্কার হচ্ছে কাঞ্চনজঙ্ঘা। একদৃষ্টে সেদিকে তাকিয়ে রেলিং দুহাতে আঁকড়ে ধরে দাঁড়িয়ে থাকলাম দুজনে। এরপর পাক্কা দু’ঘন্টা প্রতিটি মুহুর্ত আমার মনে চিরকালের ছবি এঁকে দিলো। আলোর সেই বিচ্ছুরণ, ভিবজিওর-এর প্রত্যেকটা কলা একের পর এক উন্মোচিত হল চোখের সামনে। একটা পাহাড় কত ঐশ্বর্য বিলোতে পারে সূর্য সেটা দেখালো। আমি সূর্য আর কাঞ্চনজঙ্ঘাকে প্রণাম করলাম। মুগ্ধ মুগ্ধ মুগ্ধ। কথা বন্ধ হয়ে গেল আমার। দার্জিলিং-এ এসে স্টেশনের কাছে নেমে গেলাম। একটু হেঁটে রাস্তার ওপারে গিয়ে নিচে তাকিয়ে থাকলাম বাতাসিয়া লুপ-এর দিকে। বিশুরও কচকচি-মুখ শান্ত। শুষে নিচ্ছে। আমার তো কোন ক্যামেরা ছিল না। কোন অ্যালবাম নেই তাই।


চা বিস্কুট খেয়ে আমরা তেনজিং-এর নামে হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইনস্টিটিউট-এ গিয়ে ঘুরে দেখলাম। বিশুকে বলি --- পাহাড়ে চড়ার জন্য পড়াশুনো করতে হয় ? শালা, পাঁচ বছর পড়াশোনা করে চাকরি করাটা বোরিং না ? পাহাড়ে চড়া বেশ মজার। সব সময় নতুন পথ, নতুন দেশ, নতুন মানুষ, নতুন অবস্থা, কত আকর্ষণ ! তাই না ?


--- চুপ করবি ? মাছিও নেই যে উড়বে, হাসবো কি ?


--- জুতোবো শালা। চল – ঘোড়ায় চড়ি। চা টোস্ট খেয়ে হাঁটলাম ম্যালের দিকে ওপরে। জলাপাহাড়ের রাস্তায় ঘোড়া নিয়ে অনেকে ডাকছে টুরিস্টদের। আমরা দরদস্তুর করে দুটো ঘোড়া বেছে নিয়ে চড়ে বসলাম, জীবনে সেই প্রথমবার, বলি --- রাণা প্রতাপ লাগছে মাইরি। --- বাল প্রতাপ, বলল বিশু। ---মানে ? আমি। --- বালক প্রতাপ আর কি, বিশু। ঘোড়া চলল। লাগাম হাতে মালিক। তারপর মালিক হাত ছেড়ে দিলো। আমি একটু ঘাবড়ে গেলাম। ঘোড়া চালাতে জানি না। পথ চিনি না। ঘোড়ার ভাষা জানি না। কী হবে ! বিশু পিছনে। অত কথা বলিয়েও ভয়ে সিঁটিয়ে। ঘোড়া একটু টগবগ করছে। বসে নাচছি। এসে পড়লাম জিমখানা ক্লাবে। পাশে নর্থ পয়েন্ট স্কুল। সিংমার নাকি জায়গাটার নাম। লেখা আছে সিংমার। জলাপাহাড় হল এই পাহাড়টা। তাই বল। নেমে কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি, সিগারেট, চা। জিমখানা ক্লাবের দরজা, পাঁচিলের গেট বন্ধ। স্কুলে ছেলে মেয়েরা রঙচঙ্গে পোষাক পড়ে ঘোরাফেরা করছে। স্কুল স্কুলের মতো। আবার ঘোড়া। এবার পেছনে লাগছে। একটু নড়েচড়ে বসলাম। ঘোড়া খালি খাদের দিক ঘেঁষে হাঁটছে। পা দিয়ে ঠুকে পাহাড়ের গায়ের দিকে সরালেও আবার সেই। ক্রমশ এদিক ওদিক করতে করতে ম্যালে পৌঁছলাম। নেমে আর হাঁটতে পারি না। টাকা মিটিয়ে পা ফাঁক করে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে কোন রকমে বেঞ্চে গিয়ে বসলাম। আমার হাঁটা দেখে বিশু হাসলো। বিশুর হাঁটা দেখে আমি। আমাদের দুজনের এক স্টাইল দেখল সবাই হাঁ করে। অথচ অন্য যারা ঘোড়া থেকে নেমে আসছে তাদের তো কোন সমস্যা হচ্ছে বলে মনে হয় না, লক্ষ্য করে দেখলাম। বললাম --- গাঁড় মারিয়েছে রে। বিশু বলল – আমারও। আর ওদের দ্যাখ কোন প্রবলেম নেই। কী হল বুঝতে পারলাম না।


এতক্ষণের মুগ্ধতা চোখ থেকে সরে গেছে। কোনরকমে ঘরে ফিরে চান খাওয়া মাথায় তুলে শুয়ে পড়লাম। বিশুর কাছে মুখে মাখার ক্রিম ছিল। তাই একটু করে পোঁদে লাগিয়ে ---- হি হি হি হি


পর্ব ২০






এবার হাত পা গুটিয়ে পড়তে বসার সময় হল। দুমাস পরেই থার্ড ইয়ারের ফাইনাল। ফুর্তি সরিয়ে সিরিয়াস হতে হবে। আরো একমাস ক্লাস হয়ে পরীক্ষার ছুটি হল। কেউ কেউ বাড়ি গেল। অনেক টিচারও। লাইব্রেরি চালু থাকল। আমি আর অনেকেই হস্টেলে থেকে গেলাম এখানেই পড়াশুনো করবো বলে। ডাইনিং হলও চালু থাকল। ইলেক্ট্রিসিটি আছে, তবুও আমরা মোমবাতি আর কেরোসিন জোগাড় করে রাখলাম। বলা তো যায় না, যদি কারেন্ট চলে যায়। আমরা গল্পগুজব, আড্ডা, টাউনে মেয়েদের সাথে ফস্টিনষ্টি, সিনেমা-রেস্টুরেন্ট, সব শিকেয় তুলে কেবল পড়াশুনো চালিয়ে গেলাম সকাল থেকে রাত দুপুর পর্যন্ত রোজ। দেখে যে কেউ মনে করবে -- আহা, কী পড়াশুনো করে কলেজের ছেলেরা ! ভাগ্যিস তখনো কলেজে মেয়েদের এন্ট্রি হয়নি, নয়তো ওরকম পড়ার বারোটা বেজে যেত। এভাবে পড়তে দেখলে আমাদের বাড়ির লোকেরা সবচেয়ে বেশি খুশি হতো। কোনদিকে হুঁশ নেই। নাওয়া খাওয়া চুলোয়। ইশ্‌শ্‌ ! যদি সারা বছর এভাবে পড়তাম তাহলে এখন চাপ কমে যেত, তাই না রে ? তপনকে বললাম। আমার রুমের স্বপন আর গোবিন্দ বাড়ি গেছে, রয়ে গেছি রেঙ্গুনের তপন দত্ত আর আমি। দুজনে পালা করে ঘুমাই। একসাথে কখনো না। আমরা বইয়ে দেয়া প্রশ্নের উত্তরগুলো, অঙ্ক আর ড্রইং চালাচ্ছি। দেখি পাশের ঘরে শিশির বসে বসে একটা বড় কাগজে কি সব লিখে চলেছে বই দেখে। জিজ্ঞেস করি


–- কি লিখছিস রে ?


-- চোতা তৈরি করছি। শিশির বলল।


-- এত বড় কাগজে ?


-- ছোট ছোট টুকরো করে নিতে পারবো না ?


-- আমাকেও দিস তো ফসে গেলে।


-- অ্যাডভান্স বুকিং করতে হবে। পার পিস ২০ টাকা। রাজি থাকলে বল এইবেলা।


-- বাঞ্চোৎ। বলে বেরিয়ে এলাম।


পরীক্ষার শিডিউল বেরিয়ে গেছে। সবাই বাড়ি থেকে ফিরে আসছে। একদিন পরীক্ষাও শেষ হল। ভালই হল। ভেতরে ভেতরে খুশি খুব। তৃপ্তি। আরামে ঘুমোলাম কতদিন পর। সারাদিন। পরের দিন দলবল মিলে টাউনে টো টো করলাম। যদি সুমনাকে পেতাম এসময়। সেদিন সন্ধ্যায় আবার হুইস্কি চলল প্রাণভরে। পরদিনই সবাই প্রায় আবার বাড়ি ফিরে গেল। আমার সেই পুরনো রুটিন শুরু হল। এবার আমি ছাড়া উইং-এ আর রয়ে গেল দীপ। ওকে আমার সবচেয়ে বেশি ভাল লাগতো ও গান গাইতে পারে বলে। কী সুন্দর রবীন্দ্র সঙ্গীত গায়। আর ব্যথা করলে কপালে হাত বুলিয়ে দিতে পারে ভাল। ঠিক একজন প্রেমিকার মতো মাথাটা কোলে তুলে কপালে আঙুল বোলাতে বোলাতে মৃদু স্বরে রবীন্দ্র সঙ্গীত। এছাড়া গোবিন্দ টাকা বেশি পেতো বলে কয়েকটা পত্রিকা কিনতো পড়ার জন্য। শখ। সেসব ছুঁয়েও দেখিনি। এইবার ঘেঁটে দেখলাম স্টকে আছে নব কল্লোল, উল্টো রথ, প্রসাদ, দেশ, এই সব অনেকগুলো। চেটে পুটে পড়ে ফেললাম। একটা শিক্ষা হল। ডিসাইড করলাম যদি কোনদিন লেখক হই তাহলে কী সব, কী রকম সব লিখব না কোনদিন। ছড়াকে কবিতা বলব না কোনদিন। এসবের মধ্যে, বোধহয় প্রসাদ-এ, শচীন ভৌমিকের শের-ও-শায়েরী পড়ে মুগ্ধ হলাম। ভাবলাম – এ তো আমিও পারি। বিহারে বাস আর হিন্দী শিক্ষার কারণে উর্দু ভাষা খানিক বুঝতে পারি। ঠিক করলাম শের লিখব। তার আগে একটু উর্দু শিক্ষা প্র্যাক্টিস করে নিতে হবে। খুঁজে পেতে দিনবাজার এলাকা থেকে একটা প্রাইমারি উর্দু শিক্ষার বই কিনে এনে রোজ আলিফ বে তে মিন শুরু করে দিলাম। মুখস্ত আর হ্যান্ড রাইটিং প্র্যাক্টিস। জোরসে। এক সপ্তাহের মধ্যেই শের লেখা শুরু হয়ে গেল। একটা খাতায় লিখতে শুরু করলাম প্রথমে বাংলায়, তারপর উর্দু অক্ষর দিয়ে। আমার মুখস্ত ছিল বলে আমি উর্দুতে লেখা শের থেকে পড়তে শুরু করলাম। দীপ চমকে উঠল। প্রায় অবিশ্বাসের ভঙ্গীতে আমার দিকে চেয়ে থাকল দীপ। বলল


--- কী করেছিস মাইরি, তুই এত তাড়াতাড়ি উর্দুতে এক্সপার্ট হয়ে গেলি !


--- আশীর্বাদ কর যাতে বারীনের মুখ উজ্জ্বল করতে পারি দোস্ত। হাতে বাইসেপ ফুলিয়ে বলি।


--- দূর বাঁড়া। তোকেই আশীর্বাদ করতে বলছিস আর মাসল দেখাচ্ছিস। না করলে মারবি নাকি ? দীপ।


--- নারে। ওটা আমার ইস্‌টাইল। হা হা হা হা......


আমি শের লেখা চালিয়ে গেলাম আর দীপের বেঁকা মুখের কাছে শায়েরী শোনাতে লাগলাম। দীপ একদৃষ্টে অপলক চেয়ে থাকতো হাসিমুখে আমার দিকে। সে কিচ্ছু শুনত না। ওর কাছে শিখলাম কি করে কানকে অফ করতে হয়। বাঃ ! থ্যাঙ্ক ইউ শচীন ভৌমিক। ঠিক করলাম আমার এই স্বরচিত কবিতাগুলো জামশেদপুরে দেখাতে হবে নীলুকে। ওরকম হাজির জবাব আর বুদ্ধিমান ছাত্র দেখিনি। স্বরচিত কবিতা নিয়ে আমাকে নীলুর পরামর্শের কথা মনে পড়ল। হাসি পেল। দীপ বলল


--- পাগল হবার আর একটু বাকি আছে তোর।


সতর্ক হলাম। শের-এর খাতা শিকেয় তুলে একদিন আমি আর দীপ প্ল্যান করে বেরিয়ে পড়লাম সাইকেল ভাড়া করে। এবার পশ্চিমে। আপাতত শিলিগুড়ির দিকে। রাস্তার তো নাম লেখা থাকে না। শুনলাম গাজল-ডোবা না তোয়াতুর রোড, ঠিক মনে নেই। ক্রমশ বেলাকোবা, ফাটাপুকুর, আমবাড়ি ফালাকাটা, ভুতনির হাট, আরো কত সব - কোথায় চা, কোথায় সিগারেট, চারপাশে ধান পাট ক্ষেত, চা বাগান, ছোট জঙ্গল, গঞ্জ-বসতি, এদিকে বসতি একটু ঘন ঘন, জলপাইগুড়ি থেকে শিলিগুড়ির পথ বেশ বিজি, সাবধানে চালাতে হচ্ছে। খুব একটা ভাল লাগছে না। দেবগ্রাম বাগানে পৌঁছে বোর হয়ে নেমে পড়লাম।


--- আয় একটু রেস্ট করা যাক। ডুয়ার্সের দিকটা অনেক ভাল লেগেছিল মাইরি। তুই কি বলিস ?


--- সাইকেল চালাতে আমার ভাল লাগে না। দুপাশের দৃশ্য, মানুষজন, গাছপালা ভাল লাগে। এদিকে গাছপালা, মানুষজন, বাড়িঘর, যানবাহন, দোকানপাট সব একঘেয়ে। ভাল লাগছে না। তোর ?


--- আমারও একই ব্যাপার। কিন্তু জীবন তো এরকমই ভাই। একঘেয়ে। প্রতি মুহুর্তের বিস্ময় তো মনের বিশেষ অবস্থা। সুইচ অন করা যাক। এই সব না ভাল লাগারা চোখেই পড়বে না।


--- তুই তো দার্শনিক হয়ে গেছিস রে ! নব কল্লোলে এত জ্ঞান দেয়া থাকে নাকি ? দীপ অবাক।


--- ধুস ! যেমন তুই কানের সুইচ অফ করিস। এমনি একটু পাকামি করতে ইচ্ছা হল। মুড চেঞ্জ হল। নে সিগারেট ধরা। আমাকেও একটা ধরিয়ে দিস -- বলে আমি শুয়ে পড়লাম দেবগ্রাম চা বাগানের দিকে মুখ করে। সিগারেট খেতে খেতে ভাবছিলাম -- কী সব বললাম – কি করে ? ছোটবেলার কথা মনে পড়ল, রামকৃষ্ণ মিশনের গোলপার্ক লাইব্রেরি। বই যে কী মিস করি। ঠিক করলাম চাকরি করে আমি একটা লাইব্রেরি করব বাড়িতে, একদম পার্সোনাল।


--- কি ? পার্সোনাল লাইব্রেরি করবি বাড়িতে ? কি বললি ?


--- কি বললাম ? তুই জানলি কি করে ? আমি তো অবাক। ব্যাটা থট রিডিং জানে দেখছি। স্ট্রেঞ্জ !


--- চল। আবার সাইকেলে। কত দূর এলাম, ক’টা বাজে, কি দেখছি, কোন হিসেব নেই। শিলিগুড়িতে ঢুকে দুজনে পাশাপাশি চালাচ্ছি গল্প করতে করতে। মানুষজন, রিক্সা, গাড়ি, বাস, আমাদের ভ্রুক্ষেপ নেই, কে খিস্তি করছে, হর্ন বাজাচ্ছে, ধাক্কা লাগছে – আমরা নিজেদের জগতে। ক্রমশ হিলকার্ট রোডে। এটা দার্জিলিং-এর রাস্তা মনে পড়ল। শিলিগুড়ি পিছনে রয়ে গেল। কোথায় যে যাচ্ছি ভাবিনি তো। ক্রমশ বড় বড় গাছ, শালগাছ, জঙ্গল, ঘন সবুজ, এই প্রথম পথ চলা ভাল লাগছে এ যাত্রায়। --- আমার জামশেদপুরের কথা মনে পড়ছে দীপ, খুব মিস করছি। সেই রকম শালের জঙ্গল। জুনের গরম এবার মানিয়ে গেল। কী ঠান্ডা, না ?


--- এখানেই তফাৎ। আমার মনে পড়ে না কলকাতার কথা। জামশেদপুরে যাবো। ছুটির সময় মনে করিয়ে দিস তো।


সুকনা নদীর ব্রিজে এসে পড়লাম। দার্জিলিং যাবার পথে এখানের স্টেশনে ট্রেন থামে মনে পড়ল। নাম সুকনা হলেও বেশ ভেজা। ছোট নালার মতো। অথচ ব্রিজটা কী লম্বা ! জুন মাসে জল নেই প্রায়। দুপাশে চর প্রায় ৫০ মিটার। বর্ষাকালে পুরোটা ভেসে যায় নিশ্চয়ই। বললাম --- দীপ, ডেস্টিনেশন সুকনা। চল জঙ্গলে যাই। রাস্তা থেকে নেমে সাইকেল লক করে ভেতরে ঢুকলাম। বোর্ড লাগানো ‘সুকনা রিজার্ভ ফরেস্ট’। বেশ খানিকটা এগিয়ে ফিরে এসে সাইকেলগুলো সঙ্গে নিলাম।


--- কিরে, কথা বলছিস না ? এখনো জামশেদপুরে ? দীপ বলল।


--- কথা বলছি তো। শুনতে পাচ্ছিস না ? গাছগুলোকে জিজ্ঞেস কর। ওরা কেমন হাঁ হুঁ করছে, শোন না।


--- তোর শালা ফুটো চরিত্র। রিয়েলি ক’টা ফুটো আছে রে তোর শরীরে ?


--- না, জিজ্ঞেস করছিলাম – পাশ করব তো ?


--- তো কি বলল ?


--- বললো, না করবে না। তুমি পাশ করে কলেজ ছেড়ে চলে গেলে আমাদের সাথে কথা বলবে কে ?


হাঁটতে হাঁটতে আমরা একটা বড় লেকের ধারে পৌঁছে গেলাম। ঠিক আমাদের ডিমনা লেকের মতো। প্রেমে পড়ে গেলাম। আরো দু একজন ঘুরে বেড়াচ্ছে। জিজ্ঞেস করে জানা গেল এটা উমরাও সিং লেক। বিশাল। বললাম --- এখানে থাকতে হবে গুরু। --- চল, দেখি। লেক বেড় দিয়ে চললাম। একটা বাড়ি। ফরেস্ট রেস্ট হাউস। একজন লোক। কেয়ার টেকার হবে। আমাদের আগমন বৃত্তান্ত জানালাম। অনুরোধ করতে রাজি হয়ে গেল থাকতে দিতে। আমাদের তো পোয়া বারো। নাম সুভাষ প্রধান। সূর্যের দিকে চেয়ে দেখি বেলা পড়ে গেছে, খিদে পাচ্ছে এখন। কেয়ার টেকার জানালো রান্নার জোগাড় নেই। চা দিতে পারবে শুধু। দীপ, আমি আনছি বলে, চলল বাজারে। সে কি এখানে নাকি ! দীপের দেরি দেখে আমি পায়ে পায়ে লেকের ধারে একটা পাথরের ওপর বসে জলের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। জলে বাতাসের রেখানো কাঁপন। দূরে কয়েকটা পাতিহাঁস। পানকৌড়ি, মাছরাঙা, শালিক। ওপারে একটা ছেলে চান করছে। আশেপাশে কোন গ্রাম নেই। ছেলেটা কি আমাদের মতো ভবঘুরে ? শালগাছে এখন ভরা যৌবন। কী সবুজ। বর্ষা নামবে। তার পর ফুল। শালফুলে কী সুন্দর গন্ধ। হঠাৎ নাকে সেই গন্ধ ভেসে এল। জলে আকাশের ছায়া মলিন হচ্ছে। চারপাশে শোঁ শোঁ। কেমন আছিস রে, ভালো ? গাছের ডেসিবেলে কথা ভেসে আসছে সিংভুমের। হাতি যেমন কথা বলে। কানে শুনি না তো কি ? গাছও সেরকম কথা বলে। এবার বুঝলাম আমার কেন ডুয়ার্সে ঘুরে বেড়াতে ভাল লাগে। কথা শুনি আত্মীয়দের। গান। সারাদিনের ক্লান্তির পর সেই গান আমাকে ঘুম পাড়িয়ে দিলো। কতক্ষণ বলতে পারি না, দীপের ধাক্কায় উঠে বসলাম।


--- ঘুমিয়ে পড়েছিস দেখি। নে, আয়, খাবার এনেছি। দীপের মুখে রক্সির গন্ধ।


--- ব্যাটা, মাল টেনে ফিরেছিস। একা একা ? পারলি ?


--- ছি ছি। তোকে ভুলব কেন ? চল, এনেছি তোর জন্য। খেয়ে নিবি চল।


--- এখানে নিয়ে আয় মাইরি। প্লিজ। দেশলাইটা দে তো। কতক্ষণ সিগারেট খাইনি। দীপ চলে যেতে জুত করে একটা সিগারেট ধরালাম। গুড বয়। দীপটা বড্ড ভাল। পাখিরা এতক্ষণে ঘরে ফিরে গেছে। শব্দ নেই। জলে আলো বাতাসের শব্দ নেই। শুধু গাছেদের ফিসফাস। তাও কমে আসছে। আকশের খানিকটা চোখে পড়ে গাছের ফাঁকে। তাহলে যা শুনছি তা কি তারাদের কথা, দীপ ? রক্সি খেতে খেতে দীপকে জিজ্ঞেস করলাম। “আজ যত তারা সব আকাশে”...... দীপ গাইতে শুরু করল। একের পর এক। ... “আকাশ ভরা সূর্য তারা” ...... আরো কত। তুই কবি হয়ে গেলি বারীন আর আমি গায়ক। কে বলবে আমরা ইঞ্জিনীয়ারিং-এর স্টুডেন্ট। চল এবার খাওয়া যাক। সেই সকাল থেকে খাসনি।


উঠে দীপ আর আমি হাত ধরাধরি করে এগোলাম। কেয়ার টেকার একটা লন্ঠন জ্বেলে দিয়েছে। সকালে চা দিতে বলে পাঁচ টাকা দিলাম তাকে। একটা ঘরে মাটিতে মাদুর আর চাদর বিছিয়ে বালিশ দিয়ে গেল। দুটো থালা। একটা গ্লাস। এইই যথেষ্ট। দুজনে খেয়ে নিলাম। দীপ রুটি আর আলুর দম এনেছে। অমৃত লাগল। আঁচিয়ে পেচ্ছাপ করে এসে সিগারেট ধরিয়ে আয়েস করে শুয়ে পড়লাম। গল্প করার আর এনার্জি ছিল না। কখন ঘুমিয়ে পড়েছি।


সকালে ঘুম ভেঙে উঠতেই চা পাওয়া গেল। সিগারেট মাত্র একটাই আছে। আমি ধরিয়ে দুজনে শেয়ার করে খেলাম। সুভাষ প্রধানকে ধন্যবাদ দিয়ে সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম হাইওয়ের দিকে। তারপর আর কি। রোমন্থন করতে করতে চললাম শিলিগুড়ি জলপাইগুড়ির সেই বোরিং পথে। আশ্চর্য, এবার কিন্তু বোরিং লাগল না একটুও। সাইকেল চালাতে যে অত ভাল লাগে জানা ছিল না। আমি সুকনার প্রেমে পড়েছি বোঝা গেল।


--- আমিও। দীপ বলল। আবার সেই থট রিডিং। আমরা দুজনেই হেসে উঠলাম হো হো করে।


পর্ব ২১






সদ্য ফোর্থ ইয়ারে উঠেছি, কতগুলো অদ্ভুত ঘটনায় জড়িয়ে পড়লাম যা ছাত্র হিসেবে মোটেই কাম্য ছিল না। জুন মাসের শেষে কলেজ খুলতেই কেউ বা কারা আমাদের হোস্টেলের পোর্টিকোর ছাদ থেকে এক কাঁদি কাঁচকলা ঝুলিয়ে দিলো। পোস্টার লেখা হল ---“মুখ্যমন্ত্রী, ভাত দাও”। আঁকা হল প্রফুল্ল সেনের কার্টুন ছবি যেখানে তিনি নিজে ভাত খাচ্ছেন, আর অতিথির পাতে কাঁচকলা। ছেলেরা ঢোকার বেরোবার পথে থুতু ছিটিয়ে যেত কাঁদিটাতে। সরকারি কলেজ, প্রশাসনের টনক নড়লো। প্রিন্সিপাল স্বয়ং এসে হুকুম দিলেন কাঁদিটা নামিয়ে নেবার জন্য।


১৯৬৫ সাল। যুদ্ধ পাকিস্তানের সঙ্গে। আকাশে জেটের ডাক। রাত্রে সাইরেন, ব্ল্যাক আউট। হাসিমারায় মিলিটারি এয়ারপোর্ট তৈরি হচ্ছে। চারিদিক থমথমে। পাকিস্তান বর্ডার কাছেই। কলেজের রিডিং রুমে খবরের কাগজ নিয়ে কাড়াকাড়ি। আমার না রেডিও, না ট্রানজিস্টার। অত হৈ-চৈ-এর সময়েও কাগজ পড়া, মুখে মুখে তার চর্বিত চর্বণ, গালগল্প ভাল লাগে না। সবাই তাই আমাকে ইডিয়েট ভাবছে হয়তো। ওদিকে খরার কারণে নাকি বাজারে চালের কাড়াকাড়ি, দারুণ অগ্নিমূল্য। হোস্টেলেও ভাতের বদলে দুবেলা রুটি চালু হল। বাঙালির রেশন থেকে গম কেনা আর রুটি খাওয়ার সেই চলন হল। হাঁড়িমুখে সবাই তা মেনে নিলো অগত্যা। ছেলেরা প্রতিবাদ করলো। প্রিন্সিপালকে বলা হল – আমাদের ভাত দিন, আমরা কাঁদিটা নামিয়ে নেবো।


প্রিন্সিপাল বললেন --- আমাদের ভাত আমরাই উৎপাদন করবো। আমাদের মাঠের বিশ বিঘায় ধান লাগাবো। এই বর্ষায়ই শুরু হবে। আপাতত কাঁদিটা নামিয়ে নাও তোমরা। গভর্ণমেন্ট কলেজ। সাবসিডি নিয়ে ঝামেলা হতে পারে।


কিন্তু প্রবলেমটা হল কেউ আর কাঁদিটায় হাত দিতে চায় না। এই ক’দিনে অন্তত হাজার বার থুতু মেখেছে। নতুন হোস্টেলে সেকেন্ড ইয়ারের ছেলেরা থাকে। তাদেরও খুব উৎসাহ এই থুতু খেলায়। এক সপ্তাহ আগে সেকেন্ড ইয়ারের একটা ছেলে স্বপন মুখার্জি, সবার সাথে করলা নদীতে চান করতে গিয়ে কুয়োর মতো একটা আন্ডারওয়াটার গর্তে ঢুকে আটকে যায়। সঙ্গে সেই সুশান্ত প্রতিহার ছিল। সুশান্ত রোজ নদীতে সাঁতার কাটতে যেতো। সে ছিল চাম্পিয়ান সাঁতারু। জলে কেউ বিপদে পড়লে হেলপ করতে এগিয়ে যেতো। শোনা গেল করলা নদী স্রোতের কারণে একটু একটু সরে যেতে থাকে। বহুদিন আগে একটা গ্রাম ছিল সেখানেই যেখান দিয়ে এখন নদী বইছে। গ্রামের খানা খন্দ, মায় কুয়ো পর্যন্ত জলের তলায়। ওপর থেকে বোঝার উপায় নেই। কোন সতর্কীকরণও নেই। ডাকা হল দমকলকে। ডুবুরি এল। ততক্ষণে সুশান্ত ডুব সাঁতারে টের পেয়ে গেছে স্বপনের অবস্থান কুয়োর ভেতরে। সে দমকলকে জানাতে ডুবুরিরা নেমে পড়ল দড়ির ফাঁস নিয়ে। সুশান্ত কুয়োতে নেমে ফাঁস লাগিয়ে টেনে তোলার ইশারা করলো। স্বপনের বডি থেকে আগাছা সরাচ্ছিল সুশান্ত। সে আর ফিরলো না। আটকে গেল। স্বপনের ডেডবডি বেরিয়ে তো এল, কিন্তু সুশান্ত ফেরে না। কী টেনশন আমাদের ! তখন ডুবুরিরা আবার নেমে খোঁজাখুজি করে সেই কুয়োতেই পেলো সুশান্তকে। তাকেও তুলে আনা হল। স্বপনের মৃত্যু সবাইকে দুঃখ দিয়েছিল, কিন্তু সুশান্ত’র মহান আত্মত্যাগ কাঁদালো সবাইকে। আমি ওকে পায়ে ধরে প্রণাম করলাম। শিহর আমার থামেই না। আমার চোখে তখন করলার সবুজ জলস্রোতে ভেসে যাবার দুঃস্বপ্ন। এই সুশান্তই আমাকে উদ্ধার করেছিল মৃত্যুমুখ থেকে। সবাই তখন, চোখে জল, ঘিরে দাঁড়িয়ে থাকলাম। ঘটনাটা আমাদের আর নেক্সট ইয়ারের ছাত্রদের বন্ধু করে তোলে। ওরা র‍্যাগিং-এর বিরাগ ভুলে আমাদের হোস্টেলের কলাকান্ডে যোগ দিয়েছিল। ফলে বোঝাই যায় কি পরিমাণ প্রলেপ লেগেছে। কাঁদির গায়ে ধূলো লেপে নামানো হয়েছিল টুলের ওপর দাঁড়িয়ে। যে এটা করল সেও কম মহান ছিল না। তার নাম বারীন ঘোষাল। হুঁ হুঁ।


তারপর সবাই মিলে আমাকে চান করাবেই। আমিও হুল্লোড়ে ভেসে গেলাম। হোস্টেলের বাথরুমে একসাথে মাত্র চারজনই ঢুকতে পারে। প্রথমে আমি উদোম হয়ে জামাকাপড় বাইরে রেখে ঢুকলাম। তারপর তিনজন করে বাই রোটেশন আমার গায়ে জল ঢালা, সাবান লাগানো, ঘষামাজা করে গেলো। আর যে জায়গাটায় সাবান জল দেবার উৎসাহ সবার --- হি হি হি ! ভেবে হেসেছি বহুদিন।


আপাতত কলামুক্ত হোস্টেল। দুদিন পরেই এসে পড়ল ট্রাক্টার। সুপারভাইজার, ড্রাইভার, একটা বড় হল খালি করে ডিজেল স্টোর, লাঙ্গল, মুনিষ তিনজন। কলেজের মাঠে নেমে প্রথমেই তারা তুলে ফেলল গোলপোস্ট। আমরা হায় হায় করলাম। কিন্তু ভাত খাওয়ার স্বার্থে মেনে নিলাম তখনকার মতো। মাটি তৈরি করে বীজধান ছড়ানো, জল, সার, এই সব কিছুই আমার অদেখা ছিল। কলকাতায় পড়ার সময় সেই যে লোকাল ট্রেনে যে কোন দিকে যেতে যেতে দুপাশের সবুজ মাঠ দেখেছিলাম, ভাল লাগা, তার বাইরে কিছু জানি না। পড়াশোনার ফাঁকে দিনের অবসর সময়ে আমার কাজই হয়ে গেল চাষের মাঠের ধারে বসে ওদের কার্যকলাপ দেখা। ট্রাক্টার দিয়ে অবশ্য গ্রামে কাজ করার রেওয়াজ ছিল না তখন। আল বানাবারও একটা কায়দা আছে। জলের জন্য পাম্প আর পাইপ লাগানো হল করলা থেকে। একটু একটু করে ধানগাছ বেড়ে উঠছে। মুনিষরা রোজ কি করছে, কিভাবে আগাছা বাছছে, সার দিচ্ছে, মাসের পর মাস। হাওয়ায় কেমন লাগছে ধানগাছের দোলা। ক্রমে ধান, তার দুধ ও সোনালী দোলন। মেশিনে ধান কাটা, ঝাড়া, নিড়েন দেওয়া। তারপর শহরের মিল-এ গেলো। ফিরে এল বস্তাবন্দী চাল। বৃষ্টি পেরিয়ে যেতে আবার চাষ। সে বছর তিন বার চাষ হয়েছিল মনে আছে। আমাদের ভাত খাওয়া শুরু হল। আমরা ইঞ্জিনীয়ার হবো। টাকা দিয়ে চাল কিনবো বাজারে। কিন্তু মাঠের থেকে শুরু করে পায়খানা পর্যন্ত ধানসরণীর কথা কোন ছাত্র ভাবে ?


পড়াশুনো বাদ দিয়ে এই সবই চলছিল কলেজে। পুজো এসে গেল। ক’দিনের জন্য বাড়ি গেলাম। প্রেমিকাটি নেই। জয়তী কোথায় বেড়াতে গেছে ফ্যামিলির সাথে। আমার স্কুলের আর পাড়ার বন্ধুরা অলমোস্ট বাইরে। বাবা মা ভাই বোন আত্মীর স্বজন – এই চক্রে বোর হয়ে গেলাম। পুজো আর আমার জন্য নয়, বোঝা গেল। শেষ হতেই ফিরে এলাম সেবার।


হোস্টেলের ক’টি ছেলে টাউনে পুজোর সময় হিড়িক দিতে গিয়ে ঝামেলায় জড়িয়ে পড়েছিল। তারা এবার টাউনের ছেলেদের কাছে মার খেয়ে কাটা হাত পা মুখ নিয়ে ফিরে এল। সবিস্তারে রঙ চড়িয়ে ইনিয়ে বিনিয়ে কাহিনী শোনাতেই ছাত্রদের মাথা গরম হয়ে গেল। হুঙ্কার উঠল -- চল সবাই টাউনের মালগুলোকে দেখে নিই। নেমে আয় সবাই। পলিটেকনিকে খবর দে কেউ। সন্ধায় হাল্লা আর থামতেই চায় না। পিটু, বক্সী আর বাচ্চুকে ঘিরে সবাই – চল শালা দেখে আসি চল চল চল – রব উঠল। পেছনে যারা দাঁড়িয়ে আছে তারা ব্যাপারটা তেমন জানেও না। হৈ হৈ করতে করতে পলিটেকনিকের ছেলেরাও হোস্টেল থেকে ছুটে এল। সবাই হাতে কিছু না কিছু নিয়েছে। মশারির রড, হকি স্টিক, লাঠি, ছোরা। আমার রামপুরিয়াটা পকেটে নিলাম। এখন খুলবে কিনা জানি না। প্রায় শ’চারেক ছাত্র স্লোগান দিতে দিতে এগোলাম মাষকলাইবাড়ি হয়ে কদমতলার দিকে সোজা পথে। কদমতলায় তিনটে সিনেমা হল থাকার কারণে খুব ভিড় আর চাঞ্চল্য থাকে। ঝাড়পিটটা ওখানেই হয়েছিল রেলগুমটির ওধারের পান্ডাপাড়ার ছেলেদের সঙ্গে।


এই শান্ত শহরে এত উত্তেজনা মনে হয় আগে কেউ দেখেনি। বাড়ি ঘরের দরজা বন্ধ। গোলমালের আশঙ্কায় দোকানপাটের ঝাঁপিও প্রায়ই ফেলা হয়েছে। মিছিলের মুখের দিকে যারা মার খেয়েছিল, পিটু বাচ্চুরা। তার পিছনে স্লোগানীয়াররা। পেছনে বিশৃঙ্খল মিছিল। সবাই চার্জড। একটা কিছু ঘটতে যাচ্ছে। সে সব দিনে রাস্তায় আলোও অপ্রতুল। সরু রাস্তা। পথে পদচারী, সাইকেল বা রিক্সা অদৃশ্য। কোন ছেলেপুলের গ্যাঞ্জাম নেই। স্লোগান উঠছে -- “কোন হারামী মারতে চায় / সামনে আয়, সামনে আয়”। “বন্ধু নয়, শত্রু চাই”। গান উঠল – “ উই শ্যাল ওভারকাম ...” --- এই কথাগুলো ঠিক ফিট করে কিনা কেউ জানে না। প্ল্যান করে তো কিছু করা হয়নি। মনে হচ্ছে জনসমুদ্র। স্রোত। আমি লক্ষ্য করলাম স্লিপ করে পিছনের দিকে চলে এসেছি কখন। ছোটবেলার মারপিট হাঙ্গামা, অ্যাকশন আর ভাল লাগে না। আমি আর অ্যাক্টিভিস্ট নই।


বেগুনটারিতে পৌঁছে দেখি চার কোম্পানি সশস্ত্র পুলিশ হাজির। তারা আমাদের বাধা দেবার চেষ্টা করলো, বোঝাবার চেষ্টা করলো, ফিরে যাবার অনুরোধ করলো, এফ আর আই করার কথা বললো। কে শোনে কার কথা। এসে পড়লেন বিধায়ক খগেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত। তিনিও থামাবার চেষ্টা করে হাল ছাড়লেন। ছাত্ররা কিছুতেই শুনবে না। খুব হাই স্পিরিট আর আবেগ। বহুদিন ধরে এই ফ্রিকশন চলছিল। এবার একটা হেস্ত নেস্ত করতেই হবে। বিধায়ক কলেজের গভর্নিং বডির চিফ। নিজ দায়িত্বে তিনি মিছিলের মাথায় গিয়ে হাঁটতে লাগলেন। লক্ষ্য – তাকে হাজির দেখে মিছিলের মাথার উত্তেজনা যেন রাশে থাকে। মিছিলের সামনে আর দু-পাশে পুলিশ বন্দুক হাতে হাঁটছে, মিছিল যাতে উপচে না পরে। থমথম করছে জলপাইগুড়ি।


কদমতলা ছাড়িয়ে গিয়েও কোন ট্রেস নেই দুর্বৃত্তদের। সঙ্গে স্লোগান শুরু হল – “মেরে বাপের নাম খগেন করে দেবো”। খগেনবাবুর কানে তুলো দেয়া ছাড়া উপায় কি ? গুমটির দিকে আর একটু এগোতেই সামনের গর্জন কমে এল। মিছিলে হল্ট প্রায়। শোনা গেল পান্ডাপাড়ার দিকেও একটা জনস্রোত এগিয়ে আসছে বাধা দেবার জন্য। তাদের চিৎকার আস্ফালন কিছু কম যায় না। পুলিশ তখন দু পক্ষকেই থামাবার চেষ্টায় ক্লান্ত। লাউড স্পিকারে সতর্কতা। হঠাৎ দুম দুম করে বন্দুকের গুলির আওয়াজ এল তখন। তিনবার। চিৎকার চেঁচামেচি হায় হায় শোনা গেল। ওদের ফ্রন্টলাইনে কেউ আহত হয়েছে। মিছিলের চলন শিথিল হয়ে দ্রুত পিছন ফিরলো। ঘোরের মধ্যে হাঁটতে হাঁটতে কখন হোস্টেলে ফিরে এসেছি, হুঁশ নেই। কারো সাথে কথা বলতে একটুও ভাল লাগছিল না। তাহলে কাউকে ঠ্যাঙাবার জন্য মিছিলে গেলামই বা কেন ? একটা অন্যায় থেকে আরো অন্যায়ের জন্ম হয়। খেয়ে দেয়ে শুয়ে পড়লাম।


স্বপন ঘরে ঢুকে বলল –- মশারি টানালি না ? ব্লাড ব্যাঙ্ক খুলেছিস নাকি ?


--- খাটিয়ে দে না প্লিজ। আমি বলি। আজকে কিছু ভাল লাগছে না। কাল কথা বলব।


পরের দিন ঘুম ভেঙ্গে উঠে দেখি হোস্টেলে গুঞ্জন গুলতানি চলছে। খবরের কাগজে নাকি বেরিয়েছে আমাদের কালকের পদযাত্রার গল্পকথা। কাল যে গুলি চলেছিল তাতে নাকি পান্ডাপাড়ার ১৬ বছরের এক ছাত্র, নাম জহর ****, গুলি লেগেছিল পেটে, হাসপাতালে মারা গেছে রাতেই। মনটা বিষণ্ণ হয়ে গেল। সমস্ত উৎসাহ উদ্দীপনা নিভে গেল আমাদের সবার। সবাই নিষ্প্রভ। যেন শোকের ছায়া নেমেছে হোস্টেলে। কৃতকর্মের জন্য সবাই অনুতপ্ত। বোঝা গেল কান্ডজ্ঞানের অভাব আছে আমাদের। তেমন নেতাও নেই যে সঠিক পথ দেখাবে। তাই আবেগের বশে হুজুগে নেমে পড়া ছাত্রদের পক্ষে যে ঠিক নয়, সেটা দেরিতে বুঝলাম। পড়াশোনার বাইরের কাজকর্মে লাগাম থাকা দরকার। আমাদের দৃষ্টিবিভ্রম হলে অন্তত দেরিতে হলেও শুধরে নেয়া দরকার।


ভাবলাম হাসপাতালে গিয়ে খোঁজখবর নেয়া দরকার। জহরের পরিবারের কাছে ক্ষমা চেয়ে সমবেদনা জানানো উচিত। কিন্তু সে পথও যে বন্ধ, অচিরেই টের পেলাম। হোস্টেলগুলোর বাইরে পুলিশ মোতায়েন হয়েছে। সারা ক্যাম্পাসে আর মেন গেটে পুলিশ। তারা কাউকেই ক্যাম্পাস ছেড়ে বেরোতে দিচ্ছে না। শহরেও পুলিশের টহল। কিছুটা স্বচক্ষে দেখা, কিছু কাগজ থেকে। ফিসফাস চলছে। নাকে খৎ দিলাম। জীবনে কোনদিন অ্যাক্টিভিজম এ নামবো না। কারো মৃত্যুর কোন কারণ ঘটাবো না। কিছুদিন পর থেকে পুলিশ উঠে গেলে আমরা কাজ পড়লে গ্রুপ করে শহরে যেতাম, সতর্ক থাকতাম আমাদের ব্যবহারে। সিনেমা বন্ধ। কেবল শহরের বন্ধুবান্ধবের সঙ্গেই আড্ডা। অবশ্য কোন প্রতিক্রিয়ার চাপ পাইনি। আমার মানসিক বেদনা কাটতে সময় লাগল।


এই উত্তেজনা কমে এলে আমাদের ফোর্থ ইয়ারের ফাইনালের টেস্ট পরীক্ষা এসে গেল। পরীক্ষা হয়ে যাবার পরে ক্যাম্পাস ইন্টারভিউ নেবার জন্য এল মিলিটারি সিলেকশন বোর্ডের লোকেরা। আমাদের পরিবারে বা জানাশোনার মধ্যে কাউকে দেখিনি মিলিটারিতে যেতে। আমাদের শহর কারখানার শহর। দেখে অভ্যস্ত। সাধারণ লাইফ থেকে বেরিয়ে যেতে চাই আমি। মনযোগ দিয়ে ইন্টারভিউ দিলাম। শরীর স্বাস্থ্য মজবুত। মেডিকালও হল। খুব সাটিসফায়েড। একমাস পরে চিঠি পেলাম আমার সিলেকশন হয়ে গেছে। ফিফথ ইয়ারে উঠলে আমার অ্যাপয়েন্টমেন্ট হয়ে যাবে সেকেন্ড লেফটেনান্ট (ট্রেনি) হিসেবে। স্টাইপেন্ড পেতে থাকব। জব্বলপুরে ফাইনাল ট্রেনিং-এর পরে পোস্টিং হবে কোন ইউনিটে জয়েন করার জন্য। আমি যেন চাঁদ পেয়েছি হাতে। নিষ্কৃতি এই ঘসটানো জীবন থেকে। আবার একা হয়ে থাকব অন্য পৃথিবীতে। কী মজা !


আমি চিঠি লিখলাম বাড়িতে। কিছুদিন পরেই জবাব এল মায়ের ... স্বপন তোমার বাবার শরীর খুব খারাপ। যত তাড়াতাড়ি পারো বাড়ি এসো। ওনার নড়াচড়া বন্ধ, শুয়ে আছেন, কারখানায় যেতে পারছেন না, তোমাকে দেখতে চাইছেন। আমি মাথায় হাত দিলাম। চিঠি দিলাম, সামনেই ফাইনাল পরীক্ষা। তারপরেই আসছি। পরীক্ষা কোনমতে দিয়ে বাড়ি ছুটলাম। গিয়ে দেখি বাবা বেশ আছে। কারখানা যাচ্ছে। মা বলল --- এখন একটু ভাল। তোর চাকরির খবরে ভেঙ্গে পড়েছিলেন উনি।


আমি বুঝলাম মা মিথ্যে বলছে। আমাকে কখনো মিথ্যে বলেনি মা। তার কথায় কোনদিন কোন চাতুরি ছিল না। বাধ্য হয়ে বাবার কথা নিজের মুখে বসিয়েছে মা। সেদিন বাবা কারখানা থেকে ফিরে আসতেই আমি ঝাঁপিয়ে পড়লাম।


--- কি ব্যাপার ? আমার চাকরি হওয়ায় তোমার তো খুশি হবার কথা, আর সেইখানে ...


--- তুই এখন যে অবস্থায় আছিস সেই পর্যন্ত তুলে দিতে আমাকে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। আমি চাই তুই আমার কাছে থাকবি। অ্যাডভেঞ্চারের জন্য নয় জীবনটা। অনিশ্চিত জীবনে যাবার কথা ভুলে যা। আমি অ্যালাও করব না --- বাবা বলল।


এরপর ঝোঁকের মাথায় যে বিদ্রোহের কথা বলেছিলাম সে সব ভুলে গেছি। শুধু মনে থেকে গেল হতাশা। ভেঙ্গে গেল মনটা। অত ভারি মন নিয়ে অন্যমনস্কের মতো কলেজে ফিরে এলাম। মিলিটারিকে ডিনায়াল চিঠি দিয়ে কাঁদলাম খুব, অনেকদিন লাগল সুস্থ হতে। পরীক্ষার পরে কলেজ ছুটি হয়ে গেলেও বরাবরের মতো হোস্টেলে সামান্য ব্যবস্থা ছিল। দুমাসের ছুটি। আমি বাড়ি গেলাম না ফিরে। মন ভীষণ খারাপ। ১৯৬৬ সালের গরমের ছুটি এত বিষাদময় ছিল যে, শেষে বিষাদকেই এনজয় করা শিখে গেলাম। মন সুস্থ হয়ে উঠল।


(ক্রমশ)

1 comment:

  1. বারীনদা, আমি কিশোর ঘোষাল, জলপাইগুড়ি গভঃ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ৮৩-র ব্যাচ - সিভিল।

    আমরা কলেজের একটা ইতিহাস লেখার চেষ্টা করছি। খুঁজতে খুঁজতে আপনার লেখাটা পড়ে দারুণ লাগল, আপনার লেখার কিছু অংশ আমি ব্যবহার করতে চাই, আমার লেখা ইতিহাসে, অবশ্যই আপনার নাম এবং আপনার এই রচনার উল্লেখ থাকবে সেখানে।

    আপনার অনুমতির অপেক্ষায় রইলাম।

    কোথায় থাকেন, কি করছেন জানলে আরো ভালো লাগবে।

    শ্রদ্ধা নেবেন, ভালোবাসা নেবেন।

    ইতি

    কিশোর ঘোষাল

    ReplyDelete