MOBILE VERSION

popular-recent

Recent Posts
     
 
TranslationTranslation PoetryPoetry ProseProse CinemaCinema
Serialধারাবাহিক
Weekly
Weekly
Visual-art
Art
ReviewReview
Web IssueWeb Issue InterviewInterview Little-MagazineLil Mag DiaryDiary
 
     

recent post

txt-bg




top

top












txt

Pain

আড্ডা, সাবেকী ভাষায় Interview
আমার জীবন থেকে উঠে আসা সুর
এখনো অ্যানাউন্সমেন্ট হয় নাই, আসবে কি না জানা নাই
ব্যথার পূজা হয়নি সমাপন

কবিতায় পরীক্ষা নিরীক্ষা




|                 বাংলা কবিতায় পরীক্ষা নিরীক্ষা ও নতুন কবি -  ভা স্ক র জ্যো তি  দা স
কবি তো ঠিক পরীক্ষার্থী নন... - অনুপম মুখোপাধ্যায়
কবিতা আমার কাছে মাল্টিডায়মেনশনাল অনুভূতি… - উল্কা
একুশ-শতকের কবিতা-নির্মাণ -  রাজর্ষি চট্টোপাধ্যায়
রিকোবিতার্তাথোই - ঋষি সৌরক
কবিতার পরীক্ষা-নিরীক্ষাঃ দেবাঞ্জন দাস
আধুনিক কবিতার দু’চারটে কথা, সময়ের চিত্রপট হাতড়ে – বৈদূর্য্য সরকার
লিখন – কিরিটি সেনগুপ্ত
কবিতার পসিবিলিটি কবিতার টিলিবিসিপ – মৃগাঙ্কশেখর গঙ্গোপাধ্যায়
কিছু কথা (অনেকের কথা )- ১ - সব্যসাচী হাজরা
          পরিশ্রম করুন কবিরা, অরিজিন্যাল হোন, কবিতা বড় হোক --অংশুমান।

বাংলা কবিতায় পরীক্ষা নিরীক্ষা ও নতুন কবি -  ভা স্ক র জ্যো তি  দা স

কোনও ভাবে বাংলা কবিতার আবর্তে প’ড়ে গেলে বা কোনও ভাবে এমন একটা ভাবনা এলে যে ‘কবিতা লিখবো’ বা ‘কবিতা ছাড়া বাঁচবো না’ নিদেন পক্ষে ‘জীবন যাপনের সঙ্গে কবিতাটাও থাকুক’ জাতীয় মনোভাব যখন কাউকে চেপে বসে তখন কবিতা বা সিরিয়াসলি কবিতা লেখার শুরুর সময়; (যখন ইতিমধ্যেই তার কিছু পাঠজাত অভিজ্ঞতা বা সঙ্গজাত অভিজ্ঞতা হয়েছে); সে তার কবিতা লেখার একটা পথ নির্বাচন ক’রে নেয়, যা পরে বদলাতেও পারে; কিন্তু ক’রে নেয়। তার পিছনে তার মূলত তিন ধরণের বিচার বিবেচনা কাজ করেঃ ১. আগে যা লেখা হয়েছে তার চেয়ে নতুন ধরণের কিছু লিখতে হবে --- এটা খুব ভালো লক্ষন। ২. কোনও অগ্রজ বা পূর্ববর্তী কবির প্রভাব বেষ্টিত লেখা লিখবো না --- যদিও বেশিরভাগ সময়েই এটা রক্ষা করা ৯৯.৯৯ ভাগ নতুন কবির সম্ভব হয় না, ক্রমশ সে তার ভাষা (নিজস্ব ধরণ) খুঁজে পায়, কিন্তু তবুও এই চিন্তাটা থাকা দরকার তবেই সে একদিন তার ভাষা আবিষ্কার ক’রে নিতে পারে। ৩. আমাকে যে কোনও মূল্যেই হোক অন্যের থেকে আলাদা হ’তে হবে --- এই শেষ ভাবনাটা কিন্তু ভয়ঙ্কর! এটা তাকে মিথ্যাচারে টেনে নামিয়ে আনতে পারে। এবং এর পিছনে কাজ করে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার ভাবনা, তথাকথিত বানিজ্যিক প্রতিষ্ঠান থেকে হ’তে হবে; পুরষ্কার টুরষ্কার পেতে হবে তা নয়, এক রকমের অ্যান্টি-প্রতিষ্ঠানমূলক প্রতিষ্ঠাও আছে। যা তার প্রেরণা বা তাড়না হিসাবে কাজ করে...
বাংলা কবিতা সমাজে দুরকমের মানে উপরিউক্ত এই দু’রকমের প্রতিষ্ঠান হয়। যে যার পথ বেছে নেয়। প্রথমটিতে প্রতিষ্ঠা ও খ্যাতি আছে পয়সাও আছে, দ্বিতীয়টিতে পয়সা নেই, খ্যাতি আছে। কিন্তু দু’টোই আজ প্রকৃত কবিতা থেকে দূরে চ’লে যাচ্ছে ক্রমশ, এবং তার জন্য দায়ী আমরা, আমাদের মতো এই তরুণ কবিরা যারা খেলনাটাকে নিয়ে আজও প্রথমে ভাংছি খেলতে পারছি না...  যে জন আছে মাঝখানে তার অবস্থা এই পাকে চক্রে প’ড়ে শোচনীয়...
বাংলা কবিতা অত্যন্ত সমৃদ্ধ এ নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই, এমনকি এই মুহূর্তে যদি আলোচনা ক’রে বাংলা কবিতা লেখা বন্ধ ক’রে দেওয়া হয় সেটাই একটা বড়ো পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে, আগামী একশো বছর নতুন কিছু না লিখলেও বিশ্বের দরবারে বাংলা কবিতার বিশ্ময় কমবে না এতোটাই তা সমৃদ্ধ। তাই কি নতুন কবি এতো পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে চাইছে? কারন সে আলাদা হতে চায়, কবি হিসাবে স্বীকৃতি পেতে চায়, চায় তার নামটাও থাকুক...
কিন্তু সত্যি বলতে বাংলা কবিতায় বা কবিতায় কি পরীক্ষা সম্ভব? তার উপাদানে হ’তে পারে, তার ভাষায়, তার ছন্দে ইত্যাদিতে... বরং মূলত এই দু’টিতেই...
বানিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের কবিও পরীক্ষা চালায়, মূলত ছন্দে... সে ‘লাশ টানে’-র সঙ্গে ‘রাস্তা নেই’-এর অন্ত্যমিল দিয়ে পুরষ্কার পেয়ে যায়। কিন্তু নতুন অনুভূতি জোগানোর মতো কবিতা ওই পুরষ্কৃত বইটিতে হাতে গোনা চারটে কি পাঁচটা থাকে... রবীন্দ্রনাথ একটা আস্ত ছন্দ তৈরী ক’রে ফেললেন,  মাত্রাবৃত্ত। তখন পরীক্ষা না করলেও প্রতিষ্ঠিত হওয়া যেত, এখন পরীক্ষা ছাড়া চ’লে না, তবু এখন এই গবেষনাগারে নতুন কিছুই জন্ম নেয়না তেমন।  
দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠানের কবি সব বদলে দিতে চায়, চাইলে কবিতা থেকে কবিতাটুকুও উধাও ক’রে দিতে পারলে বেঁচে যায়। আগে একে প্রভাবিত করতো বৈদেশিক কিছু ইজম, যেমন পোষ্টমর্ডানিজম, যা এমন এক বাদ যার কিছু তত্ত্ব আছে , যা প’ড়ে নিয়ে তার পর কবি কবিতা লিখতে বসবেন। যেমন এমন এক কবিতা যার মধ্যে থেকে একটা লাইন তুলে নিলে কবিতার ক্ষতি হয় না, অনেকটা ঘাসের মতো, একটা ঘাস ছিঁড়ে নিলে যেমন কিছই ক্ষতি হয় না, অর্থাৎ বিকেন্দ্রীকরণ, ভাষার অনির্দিষ্টতা, প্রতীক বর্জন, বহুরৈখিকতা, বিনির্মান ইত্যাদি (পল হুভার এর সম্পাদনা ‘পোস্টমর্ডান আমেরিকান পোয়েট্রি’ এবং সুজিত সরকার এর ‘বিশ্বকবিতার সহজ পাঠ’)। বাংলায় দীর্ঘদিন একভাবে একটি পত্রিকা এই নিয়ে তাদের পরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছে, বহু তরুণ কবিও উৎসাহিত হয়েছেন, এবং এই পত্রিকার প্রান পুরুষের পরীক্ষার ফলজাত একটি কবিতা (!) আমি তুলে ধরছিঃ
   
     মেরুণ রঙের প্রতি যাদের পক্ষপাতিত্ব আছে, তাঁরা প্রকৃতই
     ভাগ্যবান, কিছুকাল পরে তাদের ভাগ্যরেখার ওপর দিয়ে
     ছুটে যাবে মনোরেল, আর আয়ুরেখার পাশ দিয়ে চক্ররেল,
     মেরুনরঙের প্রসঙ্গে  মনো এবং চক্ররেলের কথা উঠে আসলো,
     ঠিক এইভাবেই হলুদ রঙের প্রসঙ্গে এসে যেত
     ই এম ইউ, বেগুনিরং ডেকে আনবে গুডস ট্রেন,...... (ইত্যাদি)
এর মধ্যে পোস্টমর্ডানিজমের অনেক বৈশিষ্ট্যই বর্তমান, কিন্তু কবিতা কই? এরকম লেখা আমার মনে হয় সবাই ই লিখতে পারবে। বস্তুত এটা একটা প্রলাপ, বাংলা কবিতার সাম্প্রতিক পরীক্ষা কি কবিতাকে কিভাবে প্রলাপ বানানো যায় বা প্রলাপকে কবিতা তার পরীক্ষা চালাচ্ছে?
আমি প্রশ্ন করেছিলাম কবিতায় আদেও কি পরীক্ষা হয়? আলবাত হয়। একশোবার হয়। কিন্তু তার মধ্যে কবিতা না থাকলে তা ব্যার্থ হয়। ব্যার্থ হতেও ক্ষতি নেই, কিন্তু লক্ষ্যটা কবিতা তৈরীর লক্ষই হতে হয়, কেউ সফল হয় কেউ বিফল তাতে কী এসে যায়? কিন্তু বর্তমানে তরুন কবিদের লক্ষ্যটাই বদলে যাচ্ছে। পরীক্ষা যে একটা পূর্ণাঙ্গ বস্তু তা উপলব্ধি না ক’রে টুকরো টুকরো ক’রে তাকে নষ্ট ক’রে ফেলছে আর একগাদা বাজে বকানিতে কাগজ নষ্ট হচ্ছে। শ্রুতি, হাংরি এসবই পূর্নাঙ্গ পরীক্ষা, বাংলায় হাইকু লিখতে চাওয়া পরীক্ষা, মধুসূদন পরীক্ষা ক’রে গেছেন সবাই জানি, পরীক্ষা নতুন নয়। কিন্তু আমরা ভাবছি ‘অহেতুক’ বাংলা শব্দের জায়গায় ঢুকিয়ে দিই ইংরেজি বা হিন্দী, বেশ নতুনত্ব হবে, এও তো ঠিক ছিলো, জীবন এর বদলে লাইফ বা জিন্দেগি লিখছিলাম, কিন্তু আমার এক বন্ধু পর্তুগিজ ভাষা জানতো ব’লে লাইনের এখানে সেখানে প্রায়ই পর্তুগিজ ভাষা ঢুকিয়ে দিতো এবং আলটপকা ভাবে, অর্থাৎ জীবনের বদলে জিন্দেগির মতো অর্থ প্রতিস্থাপন নয়, শুধুমাত্র শুনতে ভালো লাগতো ব’লেই! লাইনের অর্থের সঙ্গে সামঞ্জস্য না রেখেই, ও বলতো শব্দের অর্থ নেই। পাঠকের যা অনুভব হবে সেটাই অর্থ ওই শব্দটার। এটাও যদি মেনে নিই তাহলে কোনও পর্তুগিজ ভাষার লোক যে বাংলা জানে যদি ওই কবিতাটা অনুবাদ করতে যায় তার কাছে তো শব্দটার মানে থাকবে সে বেচারা কি করবে? কিংবা অহেতুক গালিগালাজ ঢুকিয়ে দিলেই কি কবিতায় শক ইফেক্ট আসে? ভারতের দলিত কবিদের লেখাগুলো পড়া দরকার, বোঝা যাবে গালিগালাজ কি ব্যাঞ্জনা পূর্ণ হয়। ভাষা বড়ো পবিত্র, যতোদূর কোনও শব্দ কিছু প্রকাশ করে সে অশ্লীল নয়, কিন্তু যখন শুধুই চমক বা আন্তাবড়ি ব্যাবহার হয় তখন আমাদের ভাবতে হবে আমরা তো ভাষা কর্মী, ভাষা তৈরীর সঙ্গে ভাষাটাকে পরিষ্কার রাখাটাও তো দরকার। তাছাড়া এতো যে পরীক্ষার কথা বলি আমাদের বাংলা কবিতাতো ৯৫ শতাংশ ক্ষেত্রে এখনও মেয়েদের যৌনাঙ্গ আর ইনফ্যাচুয়েশন কাটিয়েই উঠতে পারেনি, এই তো তার বিষয় বস্তু শেষমেশ, সেই যখন আলুভাতে ভাত রাঁধবে, তখন এতো মশলা পাতি দিয়ে কি লাভ? বরং সহজ সরল স্বাদ টাই নষ্ট হবে। লিখলে বিনয়ের মতো ভুট্টা সিরিজ লেখো। যৌণতার পরম অনুভূতি টুকু অন্তত হবে, বিকৃতি তৈরী হবে না। আরে ভাই কারবারটা যখন মদ নিয়ে এসো তরুন, দেখি পরীক্ষা আর পরিশ্রম ক’রে যদি মদের স্বাদটা কিছু বদলানো যায়, তা না ক’রে সস্তায় শুধু বোতলগুলোর আকার বদলে আর তার গায়ে মেদের বৃত্তাকার স্তন আর ত্রিভূজাকার যোনি এঁকে কতোদিন পাঠক টানা যাবে? একবার। তারপর তো সে পালাবে, হাসবে, কবি মানে তো এখন সমাজে তাই, অপৌরুষেয় কিছু একটা, বন্ধুরা হাসে, বাব মা কাকা জ্যাঠারা হাসে... আমাদের জীবন যাপনটা বদলানো দরকার। কবিতায় বলবো প্রতীক চাই না, শব্দের অর্থ চাইনা অথচ মেরুদন্ডহীন হয়ে একটা খাপে খাপ মধ্যবিত্ত জীবন যাপন করবো তাও হয়? না অবশ্য সকলেই মধ্যবিত্ত নয়, কেউ কেউ কবিতা শেখানোর নামে বন্ধুদের যথেচ্ছ বাঁশ আর মেয়েদের যথেচ্ছ বিছানা উপহার দিতে পারে, আচ্ছা এটাকি এক ধরনের পরীক্ষা? বাউল জীবন? আমি ঠিক জানি না কি না...
যারা লিখতে আসবে নতুন তাদের শুধু বলি, অনেক কিছু বলার আছে, এই ছোটো পরিসরে তাড়াহুড়োয় হ’লো না, কিন্তু একটা কথা, নিকোনার পাররা বলেছেন লেখো যা তোমাদের খুশি শুধু সাদা পাতার চেয়ে উৎকৃষ্ট হ’তে হবে। আমি একটু এগিয়ে বলি, এই লেখার পাতার জন্য প্রতিদিন কতো গাছ মরে, কতো নষ্ট হয় পরিবেশ, কতো জীব ক্ষতিগ্রস্থ হয়, আমি জানি আমাদের কবিতা তার একভাগ উপকারও করতে পারে না পৃথিবীর, তবু এতোকিছুর মূল্যে পাওয়ে কাগজগুলোকে হঠকারিতার নামে নষ্ট করবেন না, আগে মদ তৈরী করুন, তারপর বোতলে পুরে বাজারে ছাড়ুন, মদের জন্য বোতল, বোতলের জন্য মদ নয়, ওই মদটা নিয়ে পরীক্ষা করুন আগে, আর তারপর বোতলটাতেও যদি নতুনত্ব আনতে পারা যায় দু’য়ে মিলে সত্যিকারের কিছু একটা ঘ’টে যাবে... পায়খানায় বসে থাকলে লোকে ভাববে পায়খানা করছে, কিন্তু আমি জানি আমার পেয়েছে কিনা, না পেলে যতোই ব’সে থাকি হবে না, কবিতাতো এর চেয়েও অনেক বেশি গোপন... আর হ্যাঁ, বাংলা কবিতায় জীবনানন্দ একটা বড়ো ক্ষতি ক’রে গেছে, কেউ পাত্তা না পেলেই সে নিজেকে আগামীর জীবনানন্দ ভেবে নেয়, ভাবে আমাকে কেউ বুঝছে না, এতে লড়াই ও টিকে থাকার জোর পাওয়া যায় ঠিকই, তবে সকলেই ভুল বলে না, জীবনানন্দ নিজেই ব’লে গেছে তার শ্রেষ্ঠ কবিতার ভূমিকায় সমালোচকের সমালোচনা কবিকে পথ দেখাতে পারে, সেটা ভাবুন, উদাসীন হয়ে নিজের পিঠ চাপড়ানোর মধ্যে বাহাদুরী বা পরীক্ষা কিছুই নেই... প্রত্যেকটা কবিতার সামনে সাধারন বিশুদ্ধ পাঠক হয়ে বসি আমি, পরীক্ষা নিরীক্ষা ভাষা তত্ত্ব মাথাতেই থাকে না, যেন এই প্রথম আম কবিতা পড়ছি, দেখি প্রতিটা কবিতাই একটা বিশেষ অভিজ্ঞতা, ভ্রমন... সে ঠিক বা ভুল, ভালো বা মন্দ যাই হোক...
২১.০২.১৩
রাত ১২:১৩  
   

কবি তো ঠিক পরীক্ষার্থী নন... - অনুপম মুখোপাধ্যায়


কবি তো ঠিক পরীক্ষার্থী নন পরীক্ষা তিনি দেন ঠিকই , তবে নিজের প্রশ্নপত্রে কিছু কবিযশোপ্রার্থী অবশ্যই আছেন , যারা নিজেদের কলমচর্চায় ধারাকবিতার প্রতি নিজেদের আস্থা এবং আনুগত্যের পরীক্ষা দেন এঁরা দেখিয়ে দিতে থাকেন প্রচলিত ছন্দে কত পারঙ্গমতা অর্জন করেছেন , কত ভালভাবে রপ্ত করেছেন অগ্রজ কবিদের , বিশেষ করে প্রতিষ্ঠিত কবিদের সিন্ট্যাক্স ও ব্যাকরণবিধি এঁরা বড় কাগজেই সচরাচর দেখা দেন , কারণ এঁদের ‘সামাজিকতা’ নিয়ে কোনো সন্দেহের সুযোগ থাকে না এঁরা কিছু সময় চোখের সামনে থাকেন পরে আর দেখা মেলে না কোথায় যেন চলে যান মাঝেমধ্যে আসেন খ্যাতনামা কবিদের মৃত্যুর পর পত্রিকার পাতায় তাঁদের স্মৃতিকথা লিখতে

কবি যেমন শিক্ষক নন , তিনি ছাত্রও নন একমাত্র একজন গুরুই রাখেন কবি হবার স্বাধিকার গুরু ... তাঁর কাজ অবশ্যই কবিতা শেখানো নয় তাঁর কোনো অনুগামী থাকলে তাকে একলব্য হতে হয় এই একলব্যরা এগিয়ে নিয়ে চলেন কবিতার কবিতাকে অর্জুনরা কবি হতে পারেন না কর্ণরাও নয় তাঁরা বড্ড রাজকীয় তাঁদের পতন এবং স্খলনগুলোও ক্ল্যাসিকাল ট্র্যাজিডির মতো

তবে গুরু হবার আগে শিষ্য তো হতেই হয় রবি যেমন বিহারীলালের , শেকস্পীয়র যেমন মার্লোর , সুকুমার রায় যেমন লুইস ক্যারোলের , বিনয় যেমন জীবনানন্দের প্রমোশন পাবার লোভে এই চেলাগিরি নয়প্রশ্নপত্রের প্রতি সমর্পণও নয় দ্রোণের দাঁওপ্যাঁচগুলি একলব্যের সর্বস্ব ছিল না দ্রোণের সঙ্গে একলব্যের দ্বৈরথ হলে , আমার ধারণা , দ্রোণাচার্য নাস্তানবুদ হতেন , আবার হতে পারে একলব্যের পরাণপাখি খাঁচায় থাকত না তাঁদের রণকৌশল অভিন্ন ছিল বলে মনে হয় কি ? বিবেকানন্দ কি পুরোপুরি রামকৃষ্ণের ভাষায় কথা বলতেন ?

একজন শিক্ষক এবং গুরুর এই হল পার্থক্য এই হল ভাষার আড়াল এই আড়ালে একজন শিষ্যের যাপন

একজন কবিতা লেখক কবি হয়ে ওঠেন স্বকীয়তার দমে নিজের জিভ যাঁর নেই , তিনি কবি নন আবার এটাও সত্যি , আমাদের সমসময়ে নিজের জিভ থেকে কবিতা লিখলে আপনি ‘বড়ো পত্রিকা’-এ স্থান পাবেন না বিবিধ কবিসম্মেলনে আপনার ডাক আসবে না কলার তুলে ঘুরে বেড়ানো আপনার হবে না ফেসবুকে কবিতা পোস্ট করলে শতাধিক like আপনি পাবেন না ঢের অবজ্ঞা এবং অবহেলা আপনাকে সইতে হবে এমনকি এমন হতে পারে , কোনো অকবি আপনাকে কবিতা শেখাতে চাইতে পারেন কিছু উপদেশ দিতে পারেন

আমি কবিতা লেখার প্রারম্ভ থেকে জানি অনেক লোক আমার কবিতা পড়বেন এমন আশা করে লাভ নেই আমার আমি যে লেখা লিখতে চেয়েছি , তাতে লোকের সুনজরে আসা সম্ভব নয় কিছু লোক অবশ্যই আমার সঙ্গে থাকবেন। তাঁরা নিজেরাও আমার মতোই নির্বাসিত নিজেদের জিভের আড়ালে তাঁরাও আমার মতোই শিক্ষকহীন , অরক্ষিত ... এবং অনেকের কাছে আপত্তিকর ও বিপজ্জনক। পাসমার্ক জোটানোর কপাল সকলের হয় না নিজের মুদ্রাদোষেই শিক্ষায়তন থেকে আলাদা হয়ে যেতে হয় সেই রিস্ক নিতে প্রথম থেকেই আমি তৈরি ছিলাম , আজও আছি




কবিতা আমার কাছে মাল্টিডায়মেনশনাল অনুভূতি… - উল্কা



কবিতা আমার কাছে মাল্টিডায়মেনশনাল অনুভূতি, যার নির্দিষ্ট অর্থ নেই বা কোন অর্থই নেই সেখান থেকে নিজের মনের সাথে মিলিয়ে বুঝে ফেলার মায়াময় আনন্দএক চিমটে বিমূর্ততা থেকে ভাব সম্প্রসারণের দায়িত্ব পাঠকের হাতে সঁপে দেওয়া।ছেড়ে যাওয়া কিছু প্লবতা সুত্র, কেউ ভেসে বেড়াবে কেউ ডুবে যাবে কারোর জলাতঙ্ক সেন্টার শক দেবে গ্রে ম্যাটারে।প্রথমেই বলি কবিতা আমার কাছে ব্যক্তিগত বিষয় আর এখানে যা বলব তাও সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত ধারনা।
তাই যেকোনো কবিতার ক্ষেত্রেই প্রচুর রূপক, প্রচুর হিজিবিজি সিম্বল, প্রচুর রিয়েল কাটা ছেঁড়া দুর্গন্ধের পাশাপাশি সেসব পাওয়ার আশা রাখি- যা ভাবি অবচেতনে বাস্তবের কামড়ে জর্জরিত সৌন্দর্যের বৈপরীত্য উত্তাপ।বর্ণমালার (স্বর বা ব্যাঞ্জন) বর্ণগুলিকে পরপর সাজিয়ে মুখস্থ বর্ণপরিচয় যখন ‘ক’ এর পরে ‘ল’ বসতে পারে এমন স্বাধীনতার গল্প জানান দিল, জানিয়ে দিল নতুন মানে সেখান থেকেই শুরু হল কিছু ভেঙে বেরোবার পরিকল্পনা।‘জল পড়ে পাতা নড়ে’ বা ‘কুমোর পাড়ার গরুর গাড়ি’ থেকে ধীরে ধীরে এভাবেই ক্রমাগত আসছে নতুন করে কিছু বলবার কিছু ভাববার মানসিকতা।পরিণত হয়েছে মানুষের মন তারা চেয়েছে নতুন ভাবনার সান্নিধ্য।হাতড়ে বেড়িয়েছে মরা পোড়ানোর ছাই থেকে জীবিত স্মৃতি কাঠামো।মৃত্যু প্রেম বিরহ যৌনতা প্রকৃতি সব ক্ষেত্রে নতুনের খোঁজ চলেছে।এই খোঁজে যেমন রয়েছেন পাঠক তেমন রয়েছেন কবিও। চিত্র শিল্পী পাব্লো পিকাসো বলেছিলেন “I paint objects as I think not as I see them.” শিল্পীর এই ভাবনার সাথে মিলে যায় কবিতা ভাবনাও।আমরা যা দেখি তা কবিতা নয় আমরা যা অনুভব করি সেটি প্রকৃত কবিতা।
কবিতা বললেই উঠে আসে কিছু টেকনিক্যাল কথা যেমন ছন্দ, মাত্রা, অন্ত্যমিল, বানান ইত্যাদি।এগুলি অবশ্যই কবিতার এক একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ কিন্তু বর্তমানে সব কিছুকেই ইন্‌টেনশনালি ভেঙে বেরোবার চেষ্টা চলছে।সজ্ঞানেই তোলপাড় করে দেওয়া হচ্ছে ছন্দ, দুমড়ে দেওয়া হচ্ছে মাত্রা, অন্ত্যমিলে আসছে তুমুল প্রাচুর্যের জলোচ্ছ্বাস, বানানকে নিয়ন্ত্রন করছে কবিতার টেম্পারেচার।দরকার ছিল কি ছিল না এসব প্রশ্ন এক্ষেত্রে নিষ্প্রয়োজন। শুধু বুক ভরে হাওয়া টেনে কবিতার শৈশব, কৈশোর, যৌবন, বার্ধক্য উপভোগ করা- কবিতার গভীরে পৌঁছানোমানুষের ইচ্ছা থাকলে সে বিশ্ব সুন্দরীর খুঁত টেনে বের করতেই পারে।তবে কবিতা কোন টেকনিক্যাল বিষয় নয়।প্রতিবার নতুন ভাবের সাথে উপভোগ এবং অনুভব করলেই সেই কবিতা শ্রেষ্ঠ।
আবার শোনা যায় কবিতা লিখতে গেলে অন্য কবিদের কবিতা পড়া জরুরী।এই বিষয়টি আমার কাছে যথেষ্ট অস্বস্তির বিষয় ছিল কিছু দিন আগে পর্যন্ত।কিন্তু বইমেলার মাঠে সৌরভ চট্টোপাধ্যায়ের (প্রতিষেধক) সাথে আলোচনা করায় ব্যাপারটা স্বাভাবিক হয়েছে।কবিতা লিখতে গেলে সত্যি কোন কবির কবিতা পড়তে হয় না।তবে কবিতাতে নতুন কিছু করতে গেলে অন্যের কবিতা পড়ে দেখে নিতে হয় কি কি কাজ হয়ে গেছে তাহলে ভাবনার ক্ষেত্রটা আরও স্পষ্ট হয়ে যায়।এটার জন্য কিছু নির্দিষ্ট বই পত্র পড়ার দরকার হয়না তবে ভাল কিছু নতুন ধরনের লেখা পড়া দরকার।এবার আসি আমার ব্যক্তিগত ধারনায়।অন্যের কবিতা ঠিক ততটাই পড়া উচিৎ যতটা পড়লে নিজের অস্তিত্ব লোপ না হয়।প্র্যাকটিসের ফল আমরা প্রত্যেকেই জানি এবং আমরা যা অবজার্ভ করি তাই বুমের‍্যাং হয়ে ফিরে আসে।এক্ষেত্রে সাবধানতা অবলম্বন শ্রেয়।কবিতা অশ্লীল হতে পারে না।আদিম মানুষ থেকে আজকের মানুষের রাতের বেডরুমের চেহারাটা প্রায় একই রকম বদলেছে কিছু স্টাইল এসেছে কিছু শর্ত সামাজিকতার অহেতুক বেড়া।কবিতায় যদি সেই সত্যিটা ছিটে ফোঁটাও আসে ক্ষতি কি? প্রিকশান তো আছেনই আমাদের কবিগুরু...



একুশ-শতকের কবিতা-নির্মাণ -  রাজর্ষি চট্টোপাধ্যায়


কবিতার নির্মাণ প্রসঙ্গে বলা যায় কবির অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানের পুনর্নির্মাণ একমাত্র কবিতাতেই হয়, যখন কবির সম্প্রসারিত চেতনার রূপ-রস-বর্ণ-গন্ধ-স্পর্শ অর্থাৎ, ইন্দ্রিয়জ গুনগুলি কবিতায় ব্যবহৃত শব্দে আরোপিত হয়।
সময় অতিক্রম্য যা কিছু তা শাশ্বত, চিরন্তন—এসব আখ্যা পেয়ে থাকে। কবির এ নিয়ে কোন দায় থাকা উচিত নয়। কবি যে কোন একটা মুহূর্তে দাঁড়িয়ে একমাত্র তার কবিতাতেই অনন্ত রচনা করতে পারেন। সেখানে নৈঃশব্দ, অস্থিরতা কোন বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়, কবিতার উপাদান সমগ্রেরই অন্তর্গত। তখন সুন্দর সন্ত্রাসের-ও সূচনা হয়ে উঠতে পারে।
যে ভাষায় কবি কবিতা লেখেন তার একটা ইতিহাস থাকে। সেই ভাষায় লিখিত যা কিছু অর্থাৎ, সাহিত্যের সমান্তরাল একটা ভাষার ইতিহাসও তৈরি হয়। এই দুটো ইতিহাসই জরুরী কারণ তারা কবিকে স্মৃতির দাসত্ব করতে শেখায়। এই অনুক্রমের দাসত্ব থেকে শেখা কবিতা কেবলই উপমা, রূপক, প্রতীক, বা অলঙ্কার- এই ধারণা বর্জন করতে কবি নিজেকে deleam  করেন। তারপর তার কবিতাকে নিরাভরণ করে তোলেন, যখন তার অভিজ্ঞতালব্ধ  জ্ঞানের পুনর্নির্মাণ ঘটে গেছে।
কবিতার ভাষা ভয়ঙ্কর ভাবে শব্দের ভাষার সঙ্গে কবির শরীরী ভাষার সমন্বয়। কবিতায় asexual  বলে কিছু হয় না।
কবিতায় অস্তিত্ব বা রহস্যের সন্ধান গতশতকীয় ধারণা। কবিতা আমার কাছে আমার-ই নিজের being and becoming…, ও তার ফলিত প্রয়োগ।
আমার মনে হয়, পুঁজি ও প্রযুক্তির দাসত্ব যদি আধুনিকতা হয়, তাহলে উত্তর-আধুনিকতা হল তার অর্ন্তনিহিত স্ববিরোধ ও অনন্বয়ের নিদারুণতম সঙ্কটের তীব্র প্রতিক্রিয়া। তবে, স্থাপত্য বিদ্যায় বা ভিস্যুয়াল শিল্পে উত্তর-আধুনিকতা স্পষ্টতর হলেও সাহিত্যে নয়।
গত শতকের ষাটের দশক থেকেই ‘autotelic art’-র বিরুদ্ধে একটা বিশ্ব জোড়া ধারণা তৈরি হয়েছে। এই প্রসঙ্গে বিনির্মাণের কথা উল্লেখ করা যায়।
পরিবর্তিত কবিতা পরিবর্তিত শৈলী ও বিষয়কে আশ্রয় করে নেবে। উল্লেখযোগ্য, শৈলীর জন্য বিষয় ও বিষয়ের জন্য শৈলীর গুণগত পরিবর্তন ঘটবে। এই প্রসঙ্গে logocentrism  এবং phonocentrism – দেরিদা প্রবর্তিত বিরোধকে আমি স্বীকার করি এবং স্মরণ করাতে চাই যে, Language is an endless chain of play of difference which logocentric and phonocentric discourses try vainly to fix to some original and final term that can never be reached.
কবির কোন সামাজিক দায়বদ্ধতা নেই। কবির নির্মাণের আকাঙ্ক্ষাই তার কবিতার একমাত্র দায়বদ্ধতা।
প্রযুক্তিভাবনা মানুষের প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই ছিল। মার্কসিস্টরা মনে করতেন শ্রমের হাতিয়ারের মধ্যে দিয়েই মানব সভ্যতার বিবর্তন। সুতরাং এটি একটি প্রক্রিয়া যার মধ্যে দিয়েই যুগের বিবর্তনের সাথে মানুষের মূল্যবোধেরও পরিবর্তন হয়েছে। তার স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষাও পরিবর্তিত হয়েছে। কবি এটি লক্ষ্য রাখেন এবং তার নিরন্তর সন্ধান করে যান।
দুঃখ-বিরহ-ব্যর্থতা-বিষাদ — কবি যখন ব্যক্তি মানুষ তখন এসবের ঊর্ধ্বে নন। কিন্তু যখন তিনি কবিতা রচনা করেন তখন তিনি এই অনুভূতির অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান ও তার পুনর্নির্মাণ প্রক্রিয়াটিকে জরুরী করে তোলেন, যা আমি আগেই বলেছি।
প্রেরণা কবিতার উৎস, তার নির্মাণ তার গন্তব্যে যাওয়ার প্রক্রিয়া। এই শতকের কবিতার সচেতন নির্মাণ হওয়া উচিৎ বলে আমি মনে করি। আজ তার autotelic  বলে কিছু হতে পারে না। Sponteneous  poetry’র ধারনাকেও আজ নির্মূল করতে হবে। এর সঙ্গে, প্রেরণা যতদূর আত্মগত, তার কোন সম্পর্ক নেই।
নতুনের কোন সংজ্ঞা হয় না। যেমন, tomorrow never comes.  নতুন সেই আগামী যে আজই তার সম্ভবনার বীজ বপন করে যাচ্ছে। আমি তাই ‘নতুন কবিতা’-র থেকে ‘কবিতার নতুন’-এ বিশ্বাস করি। জীবনানন্দ অনিবার্য ভাবে গত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি হয়েও এই স্পেসে বিলং করেন না।
আর বিষয় নয়। কবিতা যদি কবির ‘diversified autobiography’- ও হয়, সেখানেও তার বয়ানটি (discourse)-ই শৈলী হয়ে উঠবে। বিষয় থাকলেই না তার হীনতা! তার পূর্বাপর অভিজ্ঞতার মধ্যে বিষয় ছিল, তারপর কবি নিজেকে deleam করেছেন। তার আত্ম-অবলোকনকে ধ্বংস করেছেন। এবং বিনির্মাণের মধ্যে দিয়েই তার অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানের পুনর্নির্মাণ ঘটিয়েছেন।
একতার থেকে এখানে বহুতাই জরুরী। কবি তার ভিশানকেও নন-ভিশানে পরিবর্তন করেছেন। এই নন-ভিশান শব্দের মধ্যে দিয়ে তার কবিতায় ট্রান্সপ্ল্যান্টেড হবে। শব্দ তার প্রচলিত অর্থ হারাবে। পাঠক তখন ভিন্ন অর্থবহতাটিকে তার অভিজ্ঞতার আলোয় পাঠ করবেন। এভাবেই একাধিক পাঠক কবির কবিতাটির একাধিক স্রষ্টা হয়ে উঠবেন।
ঐতিহ্য শব্দটাই গণ্ডগোলে। স্মৃতির ভারবাহী দাস। কবি কখনই কবিতা লিখবেন বলে তার কবিতাকে সচেতন ভাবে ঐতিহ্যবাহী করে তোলেন না। বরং তার নির্মাণের মধ্যেই এই দাসত্ব থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা থাকে। থেকে যায়।
কবিতায় space ভাষ ও নির্ভাষের মধ্যবর্তী প্রতিবেদন। যার মাথায় কবিতার নতুন রয়েছে তিনি এই স্পেস্‌কে সচেতন ভাবেই ব্যবহার করবেন। Sound of silence একটা ধারণা ছিল, silence of sound নিয়ে এবার ভাবা যাক।
কবিতা প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত অখণ্ড উপলব্ধির। কবির বিনির্মিত লব্ধজ্ঞান তার কবিতার উপকরণ। তিনি প্রত্যক্ষ দোলাচল লিখবেন কেন? তিনি ক্ষরণটাই লিখবেন।
আজকের কবিতা implied music বা picture হতে পারে না। বিষয়াশ্রিত শ্রাব্য-দৃশ্যকে কবি ধ্বংস করে তার কবিতায় পুনর্নির্মাণ করেন।
সুতরাং, কবির বা, কবিতার বেজে ওঠা শুধু ধ্বনি-মাধুর্যে বা বাক-চাতুর্যে নয়। গীতিকবিতার subjectivity বা মন্ময়তা আজকের কবি লেখেন না। কোন একটা সময়ে speech from soul to soul, spontaneous overflow of powerful feelings, বা , choicest words in the choicest order সঙ্গত ছিল। আজ নেই। আজকের বেজে ওঠা কবির নয়, কবিতার instinctive এবং impulsive বেজে ওঠা। একে বাদ দিয়ে কবিতা সম্ভব নয়।
কবিতা তার বাহ্য রূপ অরূপকে ধ্বংস করে অপরূপের দিকে যায়। এটাই কবিতার গন্তব্য। সুন্দর ও সৌন্দর্য এক নয়। সুন্দর সন্ত্রাসের-ও সূচনা করতে পারে, মর্ষকাম নয়। কিন্তু কবিতার সৌন্দর্য তার আকাঙ্ক্ষায়। একমাত্র আকাঙ্ক্ষায়।



 

রিকোবিতার্তাথোই - ঋষি সৌরক

কবিতা খুবই মজাদার খেলা।
এই যে বাক্যটি সেটি একটি সরলবাক্য, যাকে জটিল করলে সম্ভবত হবে
১। কবিতা একটি খেলা।  এই খেলাটি খুব মজাদার
২। কবিতা একটি মজাদার খেলা।  এই মজার পরিমাণ খুব ব্যাকরণের নিয়ম মেনে একে যৌগিক বাক্যও করা যায়।
তাহলে এখনো অব্দি আমাদের বকমবকমে যে কটি শব্দ এলোঃ
১। কবিতা ২। খুবই ৩। একটি ৪। মজাদার ৫। খেলা ৬। এই ৭। যে ৮। বাক্যটি ৯। সেটি ১০। একটি ১১। সরলবাক্য ১২। যাকে ১৩। জটিল ১৪। করলে ১৫। সম্ভবত ১৬। হবে ১৭। ব্যাকরণের ১৮। নিয়ম ১৯। মেনে ২০। একে ২১। যৌগিকবাক্যও ২২। করা ২৩। যায়
হাঁফিয়ে গেলেন?ওরকম একটু হয়, কবিতা নিয়ে আলোচনায় ওরকম একটু হয়।
এই যে ‘খুব’ এই শব্দটি, এর দিকে লক্ষ্য করুন।  একা আছেন? খানিকক্ষণ চোখ বন্ধ করে লক্ষ্য করুণ।  কিরকম না? খু...ব, কতবার এই শব্দটাকে আমরা ইউজ করেছি আমাদের কথায় এবং কাজে অথচ একা এই শব্দটাকে কখনো অনুভব করেছি? ঠিক এখান থেকেই একটা ধাঁধাঁর জন্ম হয়, এই যে কোটি কোটি শব্দ আবিষ্কার হয়েছে এতদিন সে চেতন অবচেতন হাবিজাবি, প্রভাবিত হয়ে জিভের আকৃতিগত পোজে এসে একটা গঠন নিয়েছে বা বলা ভাল নিয়ে ফেলেছে। এই যে ‘দুধ’ এই ‘দুধ’ দেখে কারোর দুধ বলতেই ইচ্ছে হয়েছিল সেই আদিমকালে।  কি অদ্ভুত না? ‘দুধ’ না বলে সে যদি বলত ‘দদু’ তো কি হত? এই সব কিছুর জন্য দায়ী আমাদের জিভ আর আবহাওয়া, কখন কিভাবে কোথায় জিভ ঠেঁকে কি আওয়াজ হল, ব্যাস জলে ঢিল পড়ার মত একটা শব্দ উৎপত্তি হল। অবাক কাণ্ড কি না? (এখানে বলা অর্থে লেখাও)
এবার হচ্ছে এই যে এত শব্দ, মানে টুকরো টুকরো খেলনাপাতি এদের নিয়ে খেলতে চাই তো খেলবো কি করে? না সব খেলার কিছু বেসিক নিয়ম থাকে, আমাদের ‘শব্দ শব্দ খেলা’-র বেসিকাবলীতে আমরা যে নিয়মটা রাখবো সেটা হল বেসিক্যালি কোন নিয়ম থাকবেনা।  (আমরা বলতে ক’জন আছি!) একটা র্যা ন্ডম খেলা চলবে।  প্রচুর শব্দ আগুপিছু জুড়ে টুরে একটা কম্পিউটার- একটা অন্ধকার- একটা সমুদ্র- একটা স্তন- একটা লণ্ড- একটা কবিতা বানাবো।  এখানে একটা জরুরী কথা বলবার র্যাশন্ডম খেলাটি যেন র্যাকন্ডমই হয় ওয়ান্নাবি র্যা ন্ডম না হয়ে যায়।  মানুষের মাথা যখন আছে অনুভূতির ফ্লুইড কিন্তু সেখান থেকেই গড়িয়ে পড়বে, ঘটনা বা সিচ্যুয়েশনের ইনটেন্সিটি বলে দেবে কতটা রস গড়াবে আর কতটা ফসকাবে।  এই যে হরমোন বা ফ্লুইডগুলোর সিক্রেশন হচ্ছে তা মানুষের সমগ্র শরীরে এক অদ্ভুত জ্যামিতির জন্ম দেয়।  সঙ্গমের পোজগুলো সেইসব জ্যামিতির প্রকাশ।  দুঃখ- আনন্দ- বিহ্বলতা- হতাশা- সেন্সেশন- ফাস্ট্রেশন এইসব সময় গুলোতে মানুষের কিছু একটা করতে ইচ্ছা হয়, কেউ খুন করে, কেউ যোগাসন করে, কেউ কবিতা লেখে তো কেউ কান্নাকাটি করে, গান করে, সাঁতার কাটে ইত্যাদি।  তাকে কিছু একটা করতে হবে।  এই করার মধ্যে র্যা ন্ডমনেস আসুক বা না আসুক মানে নট স্ট্রিক্ট টু এনি পয়েন্ট যা কিছু হতে পারে কিন্তু হবার মত একটা স্পার্ক দরকার হয়, নাহলে যেটা হয় সেটার ভিতর বা বাহির বলে কিছু থাকে না।
এই প্রসঙ্গে বলি এই যে ভেতর-বাহির, জোরে-আস্তে, আলো-অন্ধকার, শূন্য-অশূন্য এই কন্ট্রাস্ট গুলো মাথার জন্য খুব আরামদায়ক তাই দামি।  এই যে আরাম এই আরাম কিন্তু সর্বদা পরম ভোগ না বরং যা চাইছি, সেটা কতটা পাচ্ছি টার পার্সেণ্টেজ।  কেউ কষ্ট পেতে চাইছে এবং কোনোকিছু করে সে কষ্ট পাচ্ছে এটাই আরাম।  তাই ‘চরমত্যাগ’ ও মাঝে মাঝে কিছু করার তালিকায় পড়ে।
ভাবসম্প্রসারনঃ
সর্বমোট নাড়ানচাড়ান থেকে রচনার অন্তিমে বলতে পারি একটা প্যাশন আমাকে ছুটিয়ে বেড়াচ্ছে রেস্টলেস কখনো উঁচু কখনো নিচু জেনিথ ও নাদিরের আনতাবড়ি সুতো বেয়ে ছুটছি, এই উঁচু নিচুত্বগুলোকে।
সমান করতে পারার মধ্যে একটা আরাম আছে একটা তৃপ্তি আছে একটা স্যাটিসফ্যাকশন আছে এই অবিমূর্ত আরামগুলো স্ট্রাকচারড বা আনস্ট্রাকচারড ওয়ে তে বেরিয়ে আসছে, কখনো মুত্র কখনো বীর্য আর ভাইব্রেশনের দায় কর্তৃপক্ষ নিচ্ছেন না... অগত্যা কবিতা কবিতাই।




কবিতার পরীক্ষা-নিরীক্ষাঃ দেবাঞ্জন দাস

পায়রা শুধুমাত্র পায়রা ছাড়াও আরও অনেককিছু হয়– লক্কা, লোটন, গেরোবাজ- কত আদুরে নাম তাদের। ব্যান্ডেলে আমি একটা বাড়িতে গিয়েছিলাম। ফৌজি মানুষ। বাড়িতে পায়রা পোষেন। চা খেতে চে খেতে আমি তাদের কসরত দেখছিলাম। উনি বলে যাচ্ছেন কোন পায়রার কত দাম, কোথা থেকে এনেছেন, কত দামে বিক্রি হবে .. ইত্যাদি। আমি অবাক হয়ে শুনছিলাম- মোরগ লড়াই হয় জানি, তাবলে পায়রাও ! জিজ্ঞেস করলাম, এত দাম দিয়ে কেনা সব পায়রা, যদি পালিয়ে যায় ? সামাজিক মন লাভ-লসের হিসেব খুঁজছিল ... অনিশ্চিত দেখে সে একটু থমকায়, দেখে নেয় বনবাদাড় ঘন হচ্ছে কিনা। রাস্তা কাটতে হবে। দুপাশে জলনিকাশী, মাঝেমাঝে জলসত্র। সকলের গঙ্গাস্নান যেন নির্বিঘ্ন হয়।
        
ফৌজি জানালেন .. কখনও ক্বচিৎ এ’রকম ঘটেও যায় .. হয়ত ফিরল না একটা পায়রা। সে তখন কি করে ? নতুন আকাশ, নতুন ওড়া। কিন্তু গেরোবাজের এই এক্সপিডিশন তাকে নিশ্চয় এক নতুন সঙ্গী,  আস্তানার দিকে নিয়ে যায়। নাহলে আকাশের হালকা নীলও একদিন ভারি হয়ে যায়। একঘেয়ে হয়ে যায় তার বিন্যাস। তাহলে কি যেকোনো এক্সপেরিমেন্ট/এক্সপিডিশন শেষমেশ সামাজিক সম্পর্কযুক্ত হয় ? কোথাও তাকেও সকলের বিরাদরীতে পংক্তিভোজ সারতে হয়।
        এ’বিষয়ে কবিরা কি বলেন ? সমাজে স্বাধীনচেতা বলে সর্বাধিক সুনাম ও দুর্নাম আছে তাদের। প্লেটো তাঁর রাজ্য থেকে কবি ও কবিতাকে প্রায় নির্বাসিত করেছিলেন। প্লেটোর এই উষ্মার যুক্তি ছিল এবং তার অন্যতম একটা  কারণ হতে পারে যে কবি সচারচর কনফর্মিস্ট নয়। সম্প্রতি শূন্য দশকের কবি নবেন্দু বিকাশ রায় লিখেছে, “আমি যদি স্বতন্ত্র না হই, মার্ক মাই ওয়ার্ডস, আমি কবিতা লেখার চেষ্টা করবো  না।” [‘আমাদের নতুন কবিতাগুলি’/নবেন্দু বিকাশ রায়/জার্নি90s]
কবি বলতেই হয়ত এই স্পর্ধিত অহঙ্কারের কথা মনে আসে। কিন্তু প্রকৃত প্রস্তাবেই কি তাই ? যদি তাই হত তাহলে রাজকবি, সভাকবি, প্রতিষ্ঠানের কবি- কবির এত বিশেষণ থাকত না। কারণ এইসব ক্ষেত্রে কোন একটি নির্দিষ্ট ধারা, ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, সমাজব্যবস্থার অনুসারে কবিতার reproduction চলতে থাকে। একার্থে ভাবতে গেলে সেটা স্বাভাবিকও। কোন একটি কবিতা-ধারা যখন প্রবর্তিত হয় তার সমস্ত এক্সপ্লোরেশন একদিনে শেষ হয় না। একদিনেই সে বোরিং হয়ে যায় না। তাই সেই পায়রার মত এক নির্দিষ্ট পথে, হয়ত বা ভিন্ন ভঙ্গীতে, দানার টানে, সঙ্গীদের টানে, টাকরার ওই আওয়াজের অভ্যাসে প্রতিদিন আকাশ থেকে চিলেকোঠায় ফিরতে থাকে। এই ফেরা নিশ্চিত, অনায়াস- তাই আমরা অবাক হতেও ভুলে যাই। আর কে না জানে মাধ্যম হিসেবে কবিতা সর্বাধিক কম পরিশ্রমলব্ধ। কবি বারীন ঘোষাল লেখেন- “গত পঞ্চাশ বছরে লেখা কবিতা স্ক্যান করলে বোঝা যায়, বেশিরভাগ কবি পরীক্ষা নিরীক্ষার ধার ধারেন না। গতকালও না, আজও না।” [“পরীক্ষা নিরীক্ষা’’/ ‘কবিতার অধিকার’/বারীন ঘোষাল/নতুন কবিতা/কলকাতা/ ২০০৯]  
        
কিন্তু এতদিনের বাংলা কবিতাচর্চাকে একটা ওয়ান-লাইনারে বেঁধে ফেলা মুর্খামি। এবং বলা-বাহুল্য বারীনদাও সেকথা বলেননি। আমরা চেষ্টা করব সেই মাঝে মাঝে একদিন না ফেরা পায়রাগুলোর দিকে তাকাতে। যাদের জন্য বৃত্ত বড় হয়। চলতি গ্রাফে উল্লম্ফন-বিন্দু সৃষ্টি হয়। বাংলা কবিতায় যেমন হয়েছে ষাটের দশকে। নব্বুইয়ের প্রথমদিকে। ছন্দ, সমাজ-বাস্তবতা, বিষয়বস্তু নির্ভর, মনোরঞ্জনী, জীবনানন্দ অনুসারী কবিতার যে ধারা, যাকে মূলধারা বলা হয়- তার পৌনঃপুনিক অনুসরণে বিরক্ত হয়ে ষাটের দশকে একের পর এক আন্দোলন তৈরি হয়। বাংলা কবিতা পায় হাংরি, শ্রুতি, শাস্ত্রবিরোধী আন্দোলন। কি ছিল সেই আন্দোলনগুলিতে?
        
প্রতিটি আন্দোলনের আলাদা আলাদা আলোচনা এই গদ্যে নিষ্প্রয়োজন। সামগ্রিকভাবে বলা যায় প্রত্যেকেরই ম্যানিফেস্টো ছিল। ছিল dos and don’ts। আর এর মাধ্যমেই ছিল পূর্ববর্তী কবিতাভ্যাসের অস্বীকার, ছাঁচ-বদল। আর এই বদল করতে গিয়েই আসে পরীক্ষার প্রয়োজনীয়তা। যেমন পরীক্ষাগারে trial and error method-এর মাধ্যমে কোন নতুন আবিষ্কারে উপনীত হওয়া যায়। কবিতার ক্ষেত্রেও তেমনই। তা হঠাৎ করে স্বপ্নে বা নেশার ঘোরে পাওয়া যায় না। রীতিমত সঙ্কল্প করে, কি করতে চাই, কেন করতে চাই তা স্থির করে নতুন কবিতাভ্যাসে উপনীত হতে হয়। ষাটের দশকের এই আন্দোলনগুলির প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছিল তৎকালীন বিশ্বব্যাপী পরিস্থিতি, সাহিত্যধারা । এবং পরীক্ষা ও নিরীক্ষাকে পৃথক করে দেখতে গেলে, মনে হয়, এই সময়ে অধিকতর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল পরীক্ষাকে। নিরীক্ষা উপেক্ষিত থেকে গিয়েছিল।
        
এখন প্রয়োজন নিরীক্ষা বলতে আমি কি বুঝছি তাকে একটু স্পষ্ট করা। আবারও ফিরে যাই পায়রার গল্পের ওই আধো-রূপকে। ওই যে একদিন পায়রাটি দলচ্যুত হল। হয়ত স্বেচ্ছায় হল। তারপর কি হল ? যদি সে বাকি জীবনটা একা থেকে যায় তার একলা থাকা থেকে সমাজকে ঘুরেফিরে দেখবেই। বহুর নিরিখে নিজেকে দেখবে। আবার কখনও বা নিজের নিরিখে বহুকে। এখানে নিরীক্ষা লুকিয়ে থাকে। নিশ্চিত অভ্যাসের জীবন থেকে exploration-এর সঙ্কল্পে সে একদিন পৃথক হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা নিয়ে সে একদিন ফিরে আসে, আসতেই হয়, বহুর কাছে। অভিজ্ঞতাকে বহুর নিরিখে মিলিয়ে নেয়, হয়ত বা আর এক exploration-এর প্রস্তুতিতে।  
        
এ’প্রসঙ্গে হাংরি আন্দোলনের কথা মনে পড়ে। হাংরি সময়ের আগে সমাজকে অস্বীকার করে গড়ে ওঠা এক আন্দোলন। আর বলা যেতে পারে সেখানেই তার ব্যর্থতা। কবিতা আর সমাজের চিরাচরিত বাইনারি যদি আমরা সরিয়ে রাখি তাহলে এই অনুভবের গভীরতা বোঝা যাবে। আসলে বিদেশী  আন্দোলনের অনুকরণে গড়ে ওঠা একটি আন্দোলন আমাদের সমাজ-সংস্কৃতিতে যখন খাপ খায় না... হারিয়ে যায়। তখনই নিরীক্ষার অভাবের কথা ওঠে। তাকে আর ম্যানিফেস্টো দিয়ে বেঁধে রাখা যায় না।
        
নব্বুইয়ের দশকের প্রথমভাগে গড়ে ওঠা আর এক পরীক্ষা-পথ- “নতুন কবিতা’’।  কোন স্বঘোষিত ম্যানিফেস্টো নেই, নেই আন্দোলন হিসেবে নিজেকে মার্ক করার প্রচেষ্টা। বরং বারবার চেষ্টা করা হয়েছে  আন্দোলন উপাধী  থেকে দূরত্ব তৈরি করার। চেষ্টা করা হয়েছে ম্যানিফেস্টো যেন তাকে সীমায়িত না করে। তার চলা যেন হয় ‘চিরন্তন’। সে মনোযোগ দিল কবিতা-ধারাকে বদলানোর এক নিবিষ্ট পরীক্ষায়। কেমন ছিল তার পরীক্ষা-পথ ? ফিরে যাওয়া যাক “নতুন কবিতা” কয়নেজটি যার দেওয়া সেই কবি বারীন ঘোষালের লেখায়, “আবহমান বাংলা কবিতার সমস্ত অলংকার, ব্যাকরণ, ছন্দ ও কাব্য-ভাষা বিসর্জন দিলাম। বিষয়কে কবিতা থেকে বহিষ্কার করলাম। উপমা, রূপক, প্রতীক, চিত্রকল্প সজ্ঞানে বাদ দিয়ে নিজের চেতনা-বিন্দুটি আবিষ্কারে মন দিলাম। নিজের বিমূর্ত কাল্পনিক অভিজ্ঞতার উপর আস্থা রাখলাম।” [“নতুন কবিতা ক্যাম্পাস”/ ‘কবিতার অধিকার’/ নতুন কবিতা / কলকাতা/ জানুয়ারি ২০০৯]
সুতরাং এখানেও প্রাথমিক-স্তরে dos & don’ts ছিল। “নতুন কবিতা” ধারাকে স্পষ্ট শেপ দেওয়ার জন্য এই বিধিনিষেধের হয়ত প্রয়োজন ছিল। এবং এই পরীক্ষা বাংলা কবিতায় নতুন জান এনে দেয়। শূন্য দশকের শুরুতে বাণিজ্যিক কবিতার একঘেয়েমিতে বিরক্ত, প্রতিষ্ঠানের স্বজনপোষণ আর পিঠচাপড়ানিতে বীতশ্রদ্ধ তরুণ কবিদের মধ্যে যারা ধারা বা প্রথা-কবিতা লিখছে তারা অন্য কিছুর সন্ধান করছিল । তাদের  কাছে “নতুন কবিতা” হয়ে ওঠে স্বপ্নের হাইওয়ে। “নতুন কবিতা”র পরীক্ষালব্ধ ফসল তারা প্রায় উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়ে যায়। যে’ভাবে cumulative knowledge সঞ্চারিত হয়, ঠিক সে’ভাবে। শূন্য দশকের মূল কাজটা হয়ে দাঁড়ায় সেখানে নিরীক্ষা-দান করা।    
        
ছন্দ, গীতিময়তা, বিষয়বস্তু, ন্যারেটিভ, কবিতা সৌকর্য - ধারা কবিতার যেসমস্ত চিহ্নগুলিকে সচেতনভাবে দরজার ওপারে রেখেছিল “নতুন কবিতা” সেগুলিই পুনরায় ব্যবহৃত হল শূন্য দশকে। “নতুন কবিতা”র পরীক্ষালব্ধ টুলস প্রয়োগে চিহ্নগুলি স্বকীয় হয়ে ওঠে। এর প্রয়োজন ছিল। পরীক্ষামূলক ভাষা ও ফর্মের মাধ্যমে এক উল্লম্ফন বিন্দু তৈরি হয়েছিল গ্রাফে। এই বিন্দু কেন্দ্রিক যে নব তরঙ্গের সূচনা, আবহমানতার গ্রাফ থেকে তার অবস্থান ভিন্ন। কিন্তু এই দুই তরঙ্গের/গ্রাফের পারস্পরিক দেওয়া-নেওয়া অবশ্যম্ভাবী। একসময় জরুরী হয় নিজের আয়ত্তকে আবহমানতার নিরিখে বাজিয়ে দেখার... তারপর প্রয়োজনে ভিন্নতর প্রয়োগ। শূন্য দশক হল নিরীক্ষার সেই উদাহরণ।  তাহলে “নতুন কবিতা” ধারায় এর আগে কি নিরীক্ষামূলক কাজ হয়নি ? নিশ্চিতভাবেই হয়েছে। কবি বারীন ঘোষালের কাব্যগ্রন্থগুলিকে পরপর সাজালে বোঝা যাবে কিভাবে কবি পরীক্ষা এবং নিরীক্ষা – এই ক্রমে সাজিয়েছেন তাঁর কাব্য-ভুবনকে। শূন্য দশক মনোযোগ দেয় নিরীক্ষার উপর ... তাকে ব্যাপকতর করে।  
        
কেমন করে সূচীত হয় সেই ব্যাপকতা ? না আর বুকনি নয়। এবার একটু কবিতার কাছে যাওয়া যাক। ঘুরে দেখা যাক শূন্যের রান্নাঘর। প্রথমে পরিশ্রম না করে সহজ, নিরাপদ উদাহরণ- নিজের লেখায় আসি।  
ভাত মাখার শব্দ থেকে
                       তোমাকে পাওয়া
এই যে আমি ভাবতাম
কিছু রোদ হেলে গেলে
জানলার ঘুঙুর নড়বে
                     তখনও কোরাপুট আসেনি
                     সদ্য স্টার্ট নিচ্ছে যাবতীয় স্টিমার,
                     শব্দ লাগছে জলে,
                     ট্যুইডে-ট্যুইডে শব্দ।
... / ... / ... / ...
দ্যাখো, রোদ পোয়ানোকে দ্যাখো
ফ্রি-তে পিয়ানো পড়ছে কলে
আর মুনগুন মুনগুন ...
সলিলে সন্ধ্যা লেগেছে।
[“নোটেশন্‌”/ ‘চেনা আনফ্রেম’/ বৈখরী ভাষ্য/কলকাতা/২০০৯]
অতি সাধারণ, প্রায় না-কবিতার জায়গা থেকে শুরু হয় কবিতাটা। বাকিটা শব্দবিন্যাস। নেই পরীক্ষার পৌরুষ। ভাষাকে আক্রমণ নেই, নেই শব্দজোড়, শব্দভাঙ্গা, শব্দ-খেলার ঝড়। সামান্য থেকে শুরু করে ছোট ছোট কবিতা মুহূর্ত/বিন্দু তৈরি করা হয়েছে। রচনা করা হয়েছে সচেতন শ্রুতিমাধুর্য। এই মাধুর্য পাঠককে বিচলিত করে না, আকর্ষিত করে। যেখানে পরীক্ষার অন্যতম শর্তই হল প্রাথমিকভাবে পাঠকের ভাল লাগাকে সন্দেহ কর ... সে পথ মাড়িও না। কিন্তু ফেলে আসা পথের অনেককিছুই যে কুড়িয়ে রাখি আমরা।  
         জাহানারা একদিন মেঘ হবে। তুমি দেখে নিয়ো। যমুনা,
        চিস্তির দরগা ছাড়িয়ে এ মোমবাতির আলো অনেক,
         ভুল করবে, বালিকা ভাববে, তবু হাওদা চ’ড়ে যে
        সাঁঝ এলো তার পেছন নিয়ে কেউ ভাববে না।
[“জল ও জাহানার - ৪”/ ‘চেনা আনফ্রেম’ / বৈখরী ভাষ্য / কলকাতা / ২০০৯]
কাহিনী কবিতাকে ভারাক্রান্ত করে। তাই কবিতা থেকে কাহিনীকে, ঘটনা পরম্পরাকে বাদ দেওয়া হয়েছিল। আর তাছাড়া কবিতার চাঁদও নেই, চরকাও নেই, খামোকা বুড়ি সেজে বসবে কেন। কিন্তু এই কবিতায় অনুভব ও কল্পনার সাথে সিউডো-ন্যারেটিভের ধরতাই মেশানো হল। অসম্ভাবনাকে ঘটনা পরম্পরার আদলে যুক্তি-বিন্যস্ত করা হয়েছে যেন।  
        
অমিতাভ প্রহরাজ যেমন ছন্দের এক বুদ্ধিদীপ্ত প্রয়োগ করে তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘চলো, সিঙ্গলহ্যান্ড’-এ। একই সাথে আক্রমণ করে কবিতার প্রচলিত গঠন প্রক্রিয়াকে। মোট কুড়িটি কবিতা। ক্রমানুসারে কবিতাগুলি একে অপরের মিরর ইমেজ। তবে – “নিছকই উল্টে দেওয়া গিমিক নয়। প্রতিটি কবিতা খুব সচেতনভাবে ক্রিয়েটেড উলটোপথে আরেকটা প্যারালাল কবিতার কথা ভেবে। মানে আয়না রাখছি আর প্রতিবিম্বের বদলে প্রতিবস্তু তৈরি হচ্ছে।” [“চলো, সিঙ্গলহ্যান্ড”/অমিতাভ প্রহরাজ/বৈখরী ভাষ্য/কলকাতা/২০০৬]  
ছন্দ ও গঠন প্রক্রিয়ার পরীক্ষার সাথে কল্পনা, বীক্ষণ ও অনুভবের স্বাতন্ত্র্যে শব্দের চমকপ্রদ  ব্যবহার করে অমিতাভ –
“গাছের ভদ্রতার কাছে হেগে যায় রোদ”
[অমিতাভ প্রহরাজের কবিতা/ বৈখরী ভাষ্য/ ষষ্ঠ বর্ষ, বইমেলা সংখ্যা/ কলকাতা / ২০০৬]
এখানে অন্যতম লজিক মনে হয় সেই আকর্ষণ সৃষ্টি করা। ল্যাটারাল থিংকিং-এর প্রয়োগ চমক তৈরি করে। আবার কখনও দেখা যায় উপমার সিমপ্লিস্টিক  ব্যবহারে তাকে গুরুত্বহীন করে দেওয়া -  
                দু মিনিটে
                ম্যাগীর মতো
                রক্তজল করতে পারে একমাত্র চোখ
                একমাত্র চোখ মানে জলদস্যু
                মেখে ফেলছে আমাকে ...
[বেবি পার্টস (মাঝারী) – ৪/ অমিতাভ প্রহরাজ]  
ধ্বনির উৎসব, যুক্তির পারম্পর্য বরকরার রেখে, কনসেপ্টের লিঙ্ক রেখে আর্বিট্রারি শব্দ প্রয়োগ শূন্যের সিগনেচার টিউন হয়ে ওঠে। কলকাতা বইমেলা ২০১৩’য় প্রকাশিত ‘র’ পত্রিকায় সুপ্রকাশ ঘোষের “হকার জংশনের র্যা প”  সিরিজ দেখা যাক। শব্দ-স্রোত বয়ে যায় যেন। পাঠককে স্থিতু হতে দেয় না।  
মদহৌস কিছুটা সিমিলির মতো, বলে রোয়াক পড়ল ল এর কাছে
তা এই ষাট পাওয়ার বালাই; সাঁট বদলাতে রেলিসে পাও আর ভাজি না
নাকি দন কিহোতের তৃপ্তিদায়ক টোপ ? ঐ জিনস্‌ বসে থাকি
সাংকোর বেসাতিতে, কেননা ল্যাং খেলে টেরিফিক ফিরে এস
যে কিভাবে মায়াবী গাইছো হে কামিজ, নোয়াহ্‌ এক নাও
[“হকার জংশনের র্যা প - ৬”/সুপ্রকাশ ঘোষ]  
এই শব্দ-খেলাকে পরীক্ষার পর্যায়ে ব্যবহার করে ইন্দ্রনীল ঘোষ। তার ‘জুলাইওয়ালা’ কাব্যগ্রন্থের বাকি অংশের থেকে সম্পূর্ণ পৃথক এক প্রস্তাবনা যেন।  
ক্রিপলানো মেয়েদের লাচকাই সুন্দরী
আর পেটের ভেতর গুড়িবদন
মেয়েভাবের দ্বিতীয়ভাগে শিশির
শিরাদানীতে পেন রাখো
কলম বললেই যা ভালো শোনায়
কুনিক কুনিক, ডাক ডানালো শরতের
দাঁড়ালো না
শব্দের পিক পয়েন্টে
আলো যার জ্বালবার সময়
আপাতর রিদম পালানো সেই বেবি
আপেলক দেখেছিলো
কত লক
ডকডকুম ডকডকুম
রূপসার মোড়ানো ফোরাম
ঘাট-পা ফেরানো বালিশিক
সব স্পেসেই পাবলিক শুয়ে
প্রভু কিছুতো একটা করো
গ্লাভসের ছায়া ফাঁসলো নুসরতে
[“লচক”/ ‘জুলাইওয়ালা’/ইন্দ্রনীল ঘোষ/ নতুন কবিতা/ কলকাতা/ জানুয়ারি ২০০৯]
ধ্বনির টানে, এক থেকে আরেক ধ্বনিতে ছড়িয়ে পড়ার কবিতা। যুক্তি বা কনসেপ্টের ট্রিগার হয়ত ছিল কিন্তু সেটা কবিতার অবলম্বন নয়। বরং এখানে উপভোগ্য হল শব্দের আর্বিট্রারিনেস, তার খেলা, বীক্ষণ এবং সেই বীক্ষণের এক নির্লিপ্ত সেন্ট্রিফিউগ্যাল বিচ্ছুরণ।
        
চমক এবং বিরক্তি আরোপণ থেকে বরাবরই ইন্দ্রনীলের অবস্থান স্বতন্ত্র। তার প্রথম বই ‘রাত্রে ডেকো না, প্লিজ’ (২০০৬) এবং ‘জুলাইওয়ালা’ র বাকি অংশেও এই স্বাতন্ত্র্য খুঁজে পাওয়া যায়।
        একসঙ্গে ডাকার নাম কোডাক
        পাখিদের সমাজ থেকে উঠে এলো আমার ঘরে
        আসবাবে, পায়চারীর ছাপে –
        যেভাবে অনন্ত হলো ডাকার আগে ঠোঁট ..
        .../.../.../.../...
        এমনই বসন্ত হতো
        যেভাবে বিজন, ঠোঁট ডাকবার কাছাকাছি এসে
                        [“হারবার”/ ‘রাত্রে ডেকো না, প্লিজ’ / ইন্দ্রনীল ঘোষ / নতুন কবিতা / মৌকাল / ডিসেম্বর, ২০০৫]  
সকাল সকাল
                          পাখি অজন্তা দিচ্ছে ডিমে
তা থৈ, তা থৈ ডাকছে
রূপে ঘুঙুর
আসলে তো আমাদের ছেলেবেলা
বুড়িরা ম্যাজিক ক’রে
নাতি নাতি গন্ধ ছেটালো চারপাশে
রূপে গল্প
যেখানে রাজকুমার জাগতে পারছে না
                                 একটা নামের অভাবে
আর আমি সেই নামটা খুঁজছি
রঙিন কুমার
কিন্তু কী রঙ!
ক্রমশ আলো জ’মে যাচ্ছে দুই পায়ে
আমার পায়ের গল্পে, আমি নায়ক নই
সেখানে শুধুই চাঁদ উঠছে
ডিমটির ক্রিয়াপদ হয়ে ...
[“ট্যুরিস্ট”/ ‘জুলাইওয়ালা’/ ইন্দ্রনীল ঘোষ/ নতুন কবিতা/ কলকাতা/ জানুয়ারি ২০০৯]
বীক্ষণ ও কল্পনাকে ঘিরেই ইন্দ্রনীলের কবিকৃতি। সে তার দেখাকে সম্প্রসারিত করে কনসেপ্ট বা শব্দের লিঙ্ক ধরে। ফলে তা দেখাকে মুক্তি দেয়, তাকে সম্পূর্ণ অনুভবের বিষয় করে তোলে। আর এই বিষয়হীন, কেন্দ্রাতিগ কবিতাকারির জন্য ইন্দ্রনীল ভাষা বা কবিতাকে আক্রমণ করে না। উইট দিয়ে কবিতায় দার্শনিকতা, কনসেপ্টকে নির্ভার করে দেয়। ধারাকবিতা আবেগ, বিষয়, দার্শনিকতা, আর্থ-সামাজিক বক্তব্য নিয়ে কেন্দ্রাভিমুখী যে  বদ্ধ-দশায় ছিল ইন্দ্রনীল মৃদু টোকা দিয়ে তার অভিমুখ ঘুরিয়ে দেয়। সিমপ্লিসিটি  ও শব্দার্থের প্রাথমিক শর্ত বজায় রেখেও যে কবিতাকে কল্প-অভিজ্ঞতা, ল্যাটার্যালল  থিংকিং-এর নিরিখে সম্প্রসারিত চেতনার দিকে নিয়ে যাওয়া যায় তা বোঝা যায় ‘রাত্রে ডেকো না, প্লিজ’ ও ‘জুলাইওয়ালা’ -তে।
কাহিনী, বর্ণনা, রূপক, বক্তব্য ব্যবহার করেও কল্পনা, কল্প-অভিজ্ঞতা এবং উইটের মাধ্যমে কবিতাকে কোন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া যায় তা দেখতে পাওয়া যায় অনির্বাণ চট্টোপাধ্যায়ের কবিতায়। অনির্বাণের বই বেরিয়েছে ২০১৩ বইমেলায়, ‘লোডশেডিং’ । কিন্তু ‘লোডশেডিং’  নয়, ওর লেখা “ইন্দ্রনীল ও পা”  সিরিজ থেকে লেখা শোনাব –  
দুধের মতো ইন্দ্রনীলের পা ফেটে গেছে
এমা ডাকছে বাছুর ওর স্মৃতি থেকে
যেন বুট হতে বেরিয়ে এল রক্ত ফোঁটাফোঁটা।
রক্ত লিখতে বড় সংকোচ হয়। খারাপ
অথচ ইন্দ্রনীলকে ডাক্তার প্রতিদিন
আপেল খেতে বলেছে। কাশ্মীরে প্রায়
ছয় রকমের আপেল হয়
ছোটবেলায় ইন্দ্রনীল বাবা-মা’র সাথে
কাশ্মীর বেড়াতে যায় এবং
প্রতিভাবশত- সেই ছ-রকমের চিনে ফেলে।  
লালা দিয়ে ইন্দ্রর পা ভাগ হয়ে গেল
এখন ইন্দ্রনীলের অল্প পা জুড়ে দিচ্ছে লালন-
ধর্মের মত।।
[“ইন্দ্রনীল ও পা - ১”/ অনির্বাণ চট্টোপাধ্যায়/ বৈখরী ভাষ্য/ দ্বাদশ বর্ষ, প্রথম সংখ্যা/ কলকাতা/ জানুয়ারি ২০১২]  
যাইহোক, এই আলোচনা আরও দীর্ঘ করা যায়। আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ উল্লেখ করা হল না। বক্তব্যের পরিসর আর দীর্ঘায়ত করতে চাই না।  পরীক্ষা-নিরীক্ষা মাধ্যম হিসেবে কবিতার এক্সিস্টেন্সকেই দৃঢ় করে। তা নাহলে পুনরাবৃত্তিতে কবিতা বদ্ধ জলা হয়ে যায়। পরীক্ষা-নিরীক্ষা, একটা অনুশীলনের মাধ্যমে অর্জন আর একটা সেই অর্জনের প্রয়োগ। এবং দুটোই সমান গুরুত্বপূর্ণ। এই আলোচনায় দশক এসেছে বারবার। আলোচনা প্রসঙ্গে বাংলা কবিতা ইতিহাসের দুটো কালখণ্ডকে উল্লেখ করতেই দশক এবং কবিতায় পরীক্ষা-নিরীক্ষার ভূমিকা বলতে যা বুঝি তা স্পষ্ট করতেই বর্তমানের গুরুত্বপূর্ণ প্রভাববিস্তারকারী কবিতা-ধারা “নতুন কবিতা” এবং তার পরবর্তী extension- এর প্রসঙ্গ নিয়ে আসা।  
                                        


আধুনিক কবিতার দু’চারটে কথা, সময়ের চিত্রপট হাতড়ে – বৈদূর্য্য সরকার

পদ্য হল আদি, সমুদ্রের মতো শতেক তার ঢেউ তার ব্যাপ্তি ।গদ্য এলো আনেক পরে...বাঁধা ছন্দের বাইরে তার আসর জমাল।গল্প বলার এ দায় গদ্যের কাঁধে চাপিয়ে  নিজেকে ভাঙতে শুরু করল কায়াহীন হতে হতেও কিন্তু রয়ে গেল ফিনফিনে এক ফাঁসের মতো, যাকে বোঝা বা জীবনের মতো করে বয়ে বেড়ানো শুধুমাত্র কিছু মুহূর্তের ভাললাগায়, অহঙ্কারে।প্রাথমিক কবিতাকে মহাকাব্য, নাট্যকাব্য আর ছন্দকাব্য-র চেনা তিনধরণে ভাঙা গেলেও ক্রমশ মহান দার্শনিকদের ছোঁয়ায় এসব ব্যাকরণ অপ্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে বরং কবিতা অনেক বেশি হয়ে উঠেছে হৃদয়ের ।রামায়ণ-মহাভারত বা ইলিয়াড-ওডিসি বা তিব্বতের ‘epic of king Gesar’ প্রাচীনতম নমুনা হিসেবে ধরা হলেও কবিতা তখনও মুলত গল্প narrate  র জন্যে ব্যবহৃত হচ্ছে।পরবর্তীতে কালিদাসের নাট্যকাব্যে মূলত সেই একই ব্যবহার।প্রাচীনতম কবিতা হিসেবে ৪৫০০বি.সি-তে ‘Tale of the ship’-wrecked sailor ধরা হয়,যদিও সামগ্রিকভাবে কবিতা নানা রূপান্তরের মধ্যে দিয়ে গিয়ে আধুনিকতায় আসতে পেড়েছে।
১৭৯৮এর ‘lyrical ballad’ র পর থেকে বহুব্যবহৃত কবিতার সংজ্ঞা “spontaneous overflow of powerful emotion ” র তত্ব romantic generation র কবিতায় দেখা গেছে খুব স্পস্টভাবে...
“And such too is the grandeur of the dooms
We have imagined for the mighty dead;
An endless fountain of immortal drink,
Pouring unto us from the heaven's brink.”          ---John Keats
এই রোমান্সের জয়যাত্রার কিছুদিন পরে ১৮৭০ র দশকে ফ্রান্স এ  “A Season in Hell”  লিখে হইচই ফেলে দেওয়া কবি Arthur Rimbaud সামাজীক ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার  প্রতি ক্ষোভে ছেড়ে চলে যান কবিতার পৃথিবী কিন্তু রেখে যান ছিন্নভিন্ন কিছু লাইন, যে লাইনগুলো পরবর্তী কবিতাজগতে স্থায়ী একটা ছাপ ফেলে যায়—
“I saw that all beings are fated to happiness: action is not life, but a way of wasting some force, an enervation. Morality is the weakness of the brain. ”--Arthur Rimbaud
কবিতার আধুনিক আঙ্গিক ও বক্তব্যের সাথে দর্শন বা বিশ্বজনীনতার স্বাদ বাংলা কবিতায় প্রথম রবীন্দ্রনাথের হাত ধরেই আসে—
“আমার চেতনার রঙে পান্না হ’ল সবুজ
 চুনি উঠল রাঙা হ’য়ে”।
ঠিক একই সময় স্পেকট্রামে Rainier Maria Rilke লিখছেন
“Again and again, however we know the landscape of love
and the little churchyard there, with its sorrowing names,
and the frighteningly silent abyss into which the others
fall: again and again the two of us walk out together
under the ancient trees, lie down again and again
among the flowers, face to face with the sky.”
এর কাছাকাছি সময়ে বাংলার কেরানি শিক্ষার প্রবর্তন, সামাজিক টানাপোড়েন আর পরাধীনতার যন্ত্রনায় কবি নজরুল গাইতে হয় তুলনায় কম আধুনিক
দেশের মানুষকে জাগানোর গান---
 “মোরা ঝঞ্ঝার মত উদ্দ্যম
মোরা ঝর্ণার মত চঞ্চল,
মোরা বিধাতার মত নির্ভয়
মোরা প্রকৃতির মত স্বচ্ছল।। “
ঠিক একই জীবনবোধের কথাই দেখা যায় অকালমৃত কম্যুনিস্ট কবির  কৈশোরের জবানীতে--
“অবাক পৃথিবী! অবাক করলে তুমি
জন্মেই দেখি ক্ষুব্ধ স্বদেশভূমি। “
৪০’র পরের দিকের কবিতায় সামাজীক ও রাজনৈতিক টানাপোড়েনের সাথে অনিশ্চিত জীবন বা স্বাধীনতা উত্তর হতাশার একটা সুর শোনা যায়--
“প্রিয়, ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য
ধ্বংসের মুখোমুখি আমরা,
চোখে আর স্বপ্নের নেই নীল মদ্য
কাঠফাটা রোদ সেঁকে চামড়া।”
অথচ সময়ের সব নৈরাজ্য বা প্রতিদিনের ছককাটা জীবনের বাইরে বেরিয়ে বোধের এক সামগ্রিকতা বহুভাবে আনুকৃত হয়েও অনুসৃত  না হওয়াই বোধহয় জীবনানন্দের পরিণতি। ডায়েরিতে পাওয়া নোট থেকে জীবনানন্দ জানিয়ে যান ‘exile, anguish, ignomity & misery’ এর মধ্যে থেকে যাওইয়াই জীবন।মৃত্যু র পরে আবিষ্কৃত ও পাঠিত হয়েও বাংলা কবিতার জগতে মহাবিশ্বের ঈশারা থেকে উৎসারিত সময় চেতনা বা রিলকে অনুরাগী তিনি তুচ্ছ সব চিত্রকল্পকে নিয়ে গিয়েছিলেন আবহমানতায়,তাই সচেতনভাবেই তাকে দশকের ঘেরাটোপে রাখা যায় না--
“সব পাখি ঘরে আসে - সব নদী - ফুরায় এ জীবনের সব লেনদেন;
থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন।“
এর পরবর্তী দশকজুড়ে গোটা পৃথিবীতে প্রচলিত সমাজের নিয়ম বা প্রাতিষ্ঠানিকতা ভাঙতে চাওয়া বিট আন্দোলন বা বিটলসের গানের ভাষায় মানুষ বেরিয়ে আসছে শিল্পের সুললিত ভাব বা শ্রুতিমধুরতা থেকে, জীবনের হাতাশা না পাওয়া কিম্বা ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করে লেখা হচ্ছে কবিতা। নেশা-যৌনতা-সমকাম বা প্রাতিষ্ঠানবিরোধিতা সব মিলে মিশে হয়ে উঠছে কবিতা।  
“I saw the best minds of my generation
destroyed by madness, starving hysterical naked,
dragging themselves through the negro streets
 at dawn looking for an angry fix,
angelheaded hipsters burning for the ancient
heavenly connection to the starry
 dynamo in the machinery of night . . .”         --Allen Ginsberg, "Howl"
ঠিক কাছাকাছি সময়ে বাংলা কবিতায়ও লেখা হচ্ছে একই রকম জীবনের কথা,জীবনযাপনের গল্প ডিলন গাইছেন- “Blowin' In The Wind”.....
এই সময়টাতেই সম্ভবত একসাথে অনেকজন শক্তিশালী কবির আবির্ভাব সবথেকে উল্লেখযোগ্য ঘটনা...সিনেমা বা গানের মতো এই সময়কে অক্লেশে বাংলা কবিতার সোনার সময় বলা যায়।ছেলেমানুশী রাগ অহংকার বা দুঃখের কথা। শক্তি লিখছেন --“রাতের কল্লোল শুধু বলে যায় আমি স্বেচ্ছাচারী”
পৃথিবীর ইতিহাস এর কাছাকাছি সময়ে জোন বায়াসের গলায় মানুষ শুনছে
“The machine guns are roaring
The puppets heave rocks
The fiends nail time bombs
To the hands of the clocks
Call me any name you like
I will never deny it
Farewell Angelina
The sky is erupting
I must go where it's quiet.”
সময়ের বোধহয় একটা নিজস্ব দাবি থেকে যায় ।একের পর এক আন্দোলন রক্ত বা দিগভ্রান্ত জীবনের শেষে তবু ফিরে আসতে হচ্ছে কবিতার কাছে,প্রেমের কাছে সুন্দরের কাছে যৌনতার সুগন্ধে চঞ্চলমতি যুবকেরা আমাদের অমরতাকে তাচ্ছিল্য করার  স্পর্ধায় বলতে শিখিয়েছে ---
“বাসস্টপে দেখা হল তিন মিনিট
অথচ তোমায় কাল স্বপ্নে বহুক্ষণ”
 কিম্বা
“এই হাত ছুয়েছে নীরার মুখ
আমি কি এ হাতে কোন পাপ করতে পারি?”
আবার একই সময়ের কবি শঙ্খ লিখছেন
“চিতা যখন জ্বলছে
তোমরা চাও আমি তখন আলোর কথা বলি
বলব আলোর কথা । ”
অথচ এই সত্য বা সুন্দরের ছবিটা ঠিক মিলছে না রবীন্দ্রনাথ বা রোম্যান্টিক কবিদের ধারণার সঙ্গে।প্রতিটা সময়েই আরও পরিস্কার করে বললে প্রতিটা দশকের কবিতার চরিত্র পালটেছে একটু একটু করে। এই সময়েই প্রথম বাংলা সাহিত্যের বাজারে বিট আন্দোলনের পদাঙ্ক আনুসরন করে বাংলায় শুরু হচ্ছে hungry generation র আন্দোলন, সুললিত বাংলাকাব্যকে কাঁপিয়ে লেখা হচ্ছে , তথাকথিত প্রাতিষ্ঠানিকদের মুখে মুখোশ পরানোর ছেলেমানুসিতে কোর্ট-এ উঠছে কবিরা, সেটাও বোধহয় কবিতার জন্যেই শুধু।ফাল্গুনি  সগর্বে লিখছেন---রবীন্দ্রনাথ বা রঘু ডাকাত নয় ফাল্গুনি রায় হতে চাই। কেননা তখন সময়টা ‘বড় সুখের ন্য়’...কিছু পরে  তুষার লিখছেন ‘ব্যান্ডমাস্টার’ অথবা বিনয় বলছেন এক অজানা আঙ্গিকে- ‘ফিরে এস চাকা’ কিমবা আশ্রয় নিচ্ছেন এক ভার্চুয়াল রিয়েলিটি গায়েত্রির কাছে। কিছু পরে ভাস্কর লিখছেন নাগরিক জীবনের কোলাহল থেকে পালানোর মানিফেস্ট—‘এসো সুসংবাদ এসো’,আসছেন আলক সরকার। একটু একটু করে বাংলা কবিতায় দেখা যাচ্ছে পোস্টমডার্ণ প্রভাব।
রাজনৈতিক পটবদল বা আস্থিরতা তুলনামুলক কেটে যাওয়া ৭০’য়ে জয়ের কবিতায় যেন এক নীরব পালাবদলের ডাক। ছোট শহর-প্রান্তিক মানুষ-তাদের ভাললাগা-যন্ত্রনা ঢুকে পড়ছে তথাকথিত এলিট সমাজে---
“বেণীমাধব, বেণীমাধব, লেখাপড়ায় ভালো
শহর  থেকে বেড়াতে এলে , আমার রঙ কালো
তোমায় দেখে এক দৌড়ে পালিয়ে গেছি ঘরে
বেণীমাধব, আমার বাবা দোকানে কাজ করে
কুঞ্জে অলি গুঞ্জে তবু,ফুটেছে মঞ্জুরী
সন্ধেবেলা পড়তে বসে অঙ্কে ভুল করি
আমি তখন নবম শ্রেণী, আমি তখন ষোলো
ব্রীজের ধারে, বেণীমাধব,লুকিয়ে দেখা হোলো”
৮০’তে সামগ্রীক ভাবে সিনেমা,গান বা কবিতার জন্যে খুব বন্ধ্যা সময়, হয়ত সমকালীন মধ্যমেধার সামাজীক প্রতিফলন, পৃথিবীতে শুধুমাত্র মাইকেল জ্যাকশন ছাড়া ৮০’র হাতে কিছু বলার  মত নেই। কবি বা ছাপা হরফ থাকলেও দশকের reflection বা শ্রেনীচরিত্র বোঝবার মত কবি বা কবিতার দেখা মেলে না।
৯০’য়ে এসে গোটা পৃথিবীর সাথে আমাদের ওপেন মার্কেট বা বিশ্বায়নের মত বিষয়গুলো ইন্টারনেট বা কেবিল টিভির মাধ্যমে ছেয়ে ফেলছে, তাই এসময়ের লেখায় ঘুরেফিরে এসব আসছে কিন্তু কথাও গিয়ে বিশ্বাসটা আটকে থাকছে জীবনের কিছু শাশ্বত বিষয়েই। “তোমাকে চাই” বলে একটা গান, একটা প্রেম বা একটা অদ্ভুত টানাপোড়েনের ছাপ পড়ছে... একই সাথে লক্ষণীয় হচ্ছে একটা স্মার্টনেস ।একই সময়ের কবি পিনাকি লিখছেন “ফিরিয়ে দাও ফিরিয়ে দাও আঙ্কে যত শূন্য পেলে”
আবার এই সময়েই বিনায়ক লিখছেন---
“ডাস্টবিন থেকে একটা কুপন কুড়িয়ে আনব সেটা হয়তো আসলে ঠিকানা
যেখানে দাঁড়ালে তুই পেয়ে জাবি আমাদের কুশপুত্তলিকা ।”
অদ্ভুতভাবে মজার ভঙ্গিতে লেখা হছে জীবনের যন্ত্রণার কথা স্রীজাতের কলমে, হয়ত আপাত সহজবোধ্যতার কারনেই কবিতা কিছুটা হলেও তুলনায় কিছু বেশি মানুষের কাছে পৌছনো অসম্ভব বলে মনে হচ্ছে না---
“আঁশ বটিতে কুচিয়ে নেওয়া চাঁদ
আড়াইশো গ্রাম লালনীল আহ্লাদ
( নুন আন্দাজমত )
গরম-গরম পরিবেশন করি
সুস্বাদু আর মুচমুচে সব শরীর
টাটকা কিছু কষ্ট ”

পরবর্তী সময়ে শূণ্য দশকের কবিতা হয়ে যাচ্ছে কিছুটা বেলাইন কিছুটা ঊণ্মণা, হয়তো জীবনযাপনের জটিলতা বা frustration ঢেকে ফেলছে কবির চিন্তাতরঙ্গ। যথেষ্ট  পরিণতিবোধ বা  সুযোগ না থাকায় একটা ছোটো গণ্ডীর বাইরে অপরিচিত থেকে গেলেও বাংলা কবিতার আশ্বাসের জায়গা এই অপরিচিত কবিরাই হয়ত ।
 তাই শেষে একটা কথাই বলতে ইচ্ছে করে বাল্মিকির ‘মা নিষাদ’ থেকে যে অক্ষরযাত্রা, ফর্ম আঙ্গিক বা চিত্রকল্প বাদ দিয়েও কোথাও থেকে গেছে সময় এবং হৃদয়ের খুব কাছের হয়ে।

 (স্কুলের পাঠ্যবইয়ে পরিচিত অনেক কবির নাম সচেতন ভাবেই বাদ দেওয়া হল, যথেষ্ট আধুনিক বলে মনে না হওয়ার কারণে, যথেষ্ট পরিচিত বা জনপ্রিয় অনেককে  বাদ দিতে হল সময়ের তুলনায় যথেষ্ট ইউনিক না মনে হওয়ায় , অন্তত সময়টাকে ধরতে না পারার জন্যে।মত ব্যক্তিগত বলে গালাগালির দায়িত্ব আমারই)




লিখন – কিরিটি সেনগুপ্ত

তোষামোদ করে চলা কেবল বাঙালী’র বিশেষত্ব বলে যারা আঙুল তোলেন, বলব আরেকটিবার ভেবে বলুন। যুগ-যুগ ধরে তোষামোদ করে চলেছেন সব ভাষাভাষী কবি। কবির সংবেদনশীলতার প্রতি সম্পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখেই লিখছি। “পোয়েট্রি রিমেইনস্ দি কুইন অফ লিটারেচর্”। এ হেন সম্রাজ্ঞীর তোষামোদ কোন্ দেশে, কোন্ সময়ে, কোন্ কবি করেননি সেটা বলা একরকম অসম্ভব। কবি তার লিখিত কবিতার একরকম পূজো করেন বলা যেতে পারে। খানিক ধর্মের গন্ধ এসে গেল মনে হচ্ছে। গন্ধ যখন এলো তখন জানিয়ে রাখা ভাল যে একটু আধটু ধর্ম আলোচনা আমার মন্দ লাগেনা। যোগীরাজ লাহিড়ী মহাশয়ের কথা হঠাৎ মনে আসছে। বলছেন, “তুমি যার মাথা খাবে, সেও তোমার মাথা খাবে”। দোহাই আপনাদের, ‘মাথা খাওয়া’র কথা জেনে আমার মাথার ব্যাপার নিয়ে ভাবতে বসবেন না যেন। যা বলছিলাম, কবিতার রূপ-রঙ-শব্দ-স্পর্শ-গন্ধ নিয়ে অতি রক্ষণশীল কবিও বোধ হয় কখনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। বলা যায় ‘মাথা খেয়েছেন’। আর তার ফল ? যা অনিবার্য ঠিক তাই, ‘স্বয়ং ভগবান’-এর বক্তব্য মিথ্যা হওয়ার নয়তো।
আশি’র দশক, ১৯৮৫-৮৬ সালের কথা। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তথ্য-সংস্কৃতি দপ্তর এক তরুণ কবি’র হাতে তুলে দিলেন “শ্রেষ্ঠ যুব কবি”র স্মারক। ২০০৬ সাল - কবি বিনয় মজুমদার তখন ঠাকুরনগর মানসিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। ছুটে গেলেন সেই কবি। কিছুটা অবসন্ন মন নিয়ে ফিরে এলেন। কবি বিনয় মজুমদারের মৃত্যুর পর কবি লিখলেন, “গায়ত্রী মন্ত্র”। ঝলসে উঠল কবি রণদেব দাশগুপ্ত’র কলম:
“আমি জানি আমি ছিলাম দূরে,
তুমি জানো আরো অনেক গান;
চাকা গড়ায় সময় ধুলো মেখে –
সন্ধ্যানদী কবিতাসাম্পান”।
প্রচলিত শব্দে তৈরি এক অদ্ভুত কবিতা-ভাষা। আজ ২০১৩তে বসে খুব সেকেলে লাগলোনা কিন্তু। সুদীর্ঘ তিরিশ বছরের কাব্য-সাধনা। কবি রণদেব তৈরি করলেন নিজের ‘ঘর’(পড়ুন, ঘরানা)। লিখছেন,
“যে হাওয়া তোমাকে ছোঁয়
সেই হাওয়া তোমাকে জড়ায়।
যে বৃষ্টিতে ভিজে গেছি আজীবন
সেই জল তুমিও জেনেছো”।
কবিতার যুগ-সন্ধিক্ষণে অভিমানী রণদেব নতুন পথে হাঁটলেন, অর্জিত ঐশ্বর্য ছুঁড়ে ফেলে ‘অন্য পথ’ নিলেন:
“এইবারে শান্ত হও,
হে অস্থির ছন্দের চিত্রণ।
হে বাক্যবিন্যাস, তরঙ্গমুখর বালুচর –
এইবারে ধ্যানমগ্ন হও”।
পাথেয়হীন নতুন রাস্তায় হোঁচট খেতে খেতে আবার বেঁচে উঠলেন কবি। নিজের সাথে বোঝাপড়া খুব সহজ কাজ কী ? ‘কথাবার্তা’য় বললেন,
“চল্ সেখানে শূন্য প্রাণের
ডাক
চরৈবেতি ধুলোর মতো
থাক
পদ্মবনের কাঁটার যত
প্রেম
আসলে সব খাদবিহনে
হেম
ভিড়ের মুখর রাত্রিদিনের
গান
মনে পড়ায় রক্তজোড়া
টান
আকুল শ্রাবণ এই দু-পায়ে
বাঁধা
ভাঙা বাসর তবুও সুর
সাধা
কথার পরে বার্তা যদি
আসে
রোদেলা মন পা রেখেছে
ঘাসে
বসন্ত তোর উড়িয়ে দেওয়া
চুলে
কাব্য লিখি কি জানি কোন্
ভুলে|
যতিচিহ্নের তোয়াক্কা না করে সুঠাম ভাষায়, সাবলীল ঢঙে, নিজের মেজাজে। বাহ, তথাকথিত গদ্য-কবিতা এবং অন্ত্যমিল-অন্ত্যমিল বলে নাক কুঁচকে থাকা কবিদের বুড়োআঙুল দেখিয়ে কবি রণদেব ‘মাটি’র হিসেব নিলেন:
মাটি তার সহজাত বোধে
চিনে নেয় সর্বদা সঠিক
কোনটা লাঙল আর কেই বা শিকড় ;
একটিকে খাজনা দেয়, অপরকে রসের নির্ঝর|
`````````````````````````````````বিরতি`````````````````````````````````
‘হাইওয়ে’তে ওঠার আগে গলাটা ভিজিয়ে নিলাম। শুকনো হয়ে এসেছিল। তখন থেকে বকে যাচ্ছি। আর আপনারা কেউ পপকর্ন হাতে বা জিরো-ক্যালরি পানীয় মুখে। ডট্ কম’এর যুগ। স্পীড না বাড়ালে আপনারাই যে আমাকে গাল দেবেন। হঠাৎ কেন যে আজ ‘ববি’ সিনেমাটার কথা মনে আসছে বুঝছিনা। সেই, ‘হম তুম এক কামরে মে.....’। তখন বাজার ভর্তি ববি প্রিন্টের শাড়ী। আসমুদ্রহিমাচল নায়িকা ডিম্পল্ বেশী ভারতীয় নারী....আর শিফন শাড়ী। শুধু ডট্। .................। ছোট-বড় নানা রকম। এহেন ডট্ আবার.....নতুন রূপে – নতুন ঢঙে। বাৎস্যায়নের হাত ধরে.....কন্ডোমে। আর অনুপম রচনা, কবিতায়। অনন্তযৌবনা সম্রাজ্ঞীও আজ কতো স্বাস্থ্য-সচেতন!! আপনারা ডায়েট করেন, এরোবিক্স, স্টিম-সনা করে প্রয়োজনের বেশী মেদ যদি ঝরিয়ে দেন, তাহলে রাণী’ই বা বাদ যাবেন কেন ? নিযুক্ত করলেন তাঁর অতি-বিশ্বস্ত পার্ষদ। নিজেকে নতুন করে গড়লেন। আ কমপ্লিট মেকওভার। অলংকার নয়, একরকম নো-মেকআপ লুক্.......ছোট টিপ, হাল্কা লিপস্টিক ....। অনন্য কারিগরি দক্ষতায় একদম সামনের সারিতে উঠে এলেন অতুলনীয় কবি অনুপম মুখোপাধ্যায়।
শূণ্য দশকের কবি অনুপম। তার কবিতার দুটি মূল বিশেষত্ব নজরে এলো। ১. স্পেস, ২. শব্দ প্রক্ষেপণ।
কী ভাবছেন ? আমি আবৃত্তির গুণগত বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা করছি ? আদপেই তা নয় – দেখুন:
“আগুনে                নিকোটিনে
বেড়ে
ব্রেনে
বেদনার কথাগুলো লঘু থাকছে না”
একই কবিতায় (শ্রীমতী হে) কবি অনুপম লিখলেন:
“তবু
হানিকর
মধুকর
তুমি এসো
হে
মালা
থালা
জ্বালা
মার ডালা”
অভূতপূর্ব শব্দচয়ন, পঙক্তি বিভাজন – সর্বোপরি, ‘দি ওয়ান এন্ ওনলি স্পেস’। এই কবিতায় শুয়ে থাকা যায়, নিঃশ্বাস বন্ধ করে চেয়ে থাকা যায়, অর্গাজম লাইক পেশী সংকোচন হয় !!
পথের ‘কাঁটা’ তুলে রুলফো’র জবানীতে লিখলেন, “জানতে চাই। আবার চাইও না। কত লক্ষ কোটি বছর সূর্যের পেটের ভিতর গুতোগুঁতি করে একটা ফোটন কণা রোদ হয়ে পৃথিবীতে আসে সেটা জানলে এই ডিসেম্বরে কি রোদ পোহাতে একটু বেশী আরাম হয় তোমার”? পাথরকুচি গাছের কথায় এই কবিতায় (‘কাঁটা’) পাথর ছুঁড়লেন আমার দিকে, আমাদের দিকে – ডাক্তার কে ছেড়ে কেউ কথা বলেছে ? আর ছাড়বেই বা কেন ? ভগবান তো নই... অনুপম লিখছেন, “অসুখের দুয়ারে কাঁটা বিছিয়ে দেয়। নরম কাঁটা। ভেষজ তো ... রক্তাক্ত করে না অসুখকেও এমনকি অ্যালোপ্যাথদের মতো”। আরে !! নচিকেতার সেই জীবনমুখী গানটা না.... ‘ও ডাক্তার ....’।
‘হাইওয়ে’তে তিনটে স্পীড-ব্রেকার। পরপর। দুরন্ত গাড়ীর মধ্যে হাত-পা নেড়ে-চেড়ে বসার এই তো সুযোগ। আপনাদের – সাথে আমারও। সিলভারলাইনে নির্মাণ করলেন দুর্গ:
“আমাদের বাড়ির রং সাদা।
আমাদের বাড়ির রং সাদা।
বিশ্বাস করো” !!
আপনাদের উদ্দেশ্যে বলছি – এবার চোখ বন্ধ করুন, ভিসুয়ালাইস করুন... একটা দুর্গ, ঠিক যেন সূর্যের মাঝখানে....অনুপম।
কী বললেন ? কাম আগেইন – ওহ, এই কথা ? মন্দ বলেননি কিন্তু। প্রশ্নটা আমারও – আমরা আটপৌরে বাঙ্গালী এই জিরো ফিগার রাণীকে তাঁর ভিক্টোরিয়ান সিংহাসনে দেখতে রাজী কী ? যা: মোটে তিনটে হাত উঠলো !! আপনারা না হয় আরেকটু ভাবুন, এই ফাঁকে আমি ওদের বক্তব্য জেনে আসি …




কবিতার পসিবিলিটি কবিতার টিলিবিসিপ – মৃগাঙ্কশেখর গঙ্গোপাধ্যায়

একটা কবিতা নিয়ে কথা হচ্ছিল। একবছর আগের কথা বলছি। কথা শুরু করেছিলাম। একপাতা। তারপর কথা বন্ধ। বোবা স্রেফ বোবা। কি হয়েছিল? মাথামোটা। একটা বাক্যের সাথে পরের বাক্যের বা একটা শব্দের সাথে পরের শব্দের কি সম্পর্ক হতে পারে আমি বুঝতে পারছিলাম না। চেনা সম্পর্কগুলো নিয়ে ভাছিলাম। বা তাদের পারমুটেশান কম্বিনেশান। তার বাইরে গিয়ে ভাবতে পারি নি।
কে?
তোমাকে
ট্রনিক ক্রনিক
আগাছা
...
কবিতাটি চলেছেন। শরীর নিয়েছেন নিজস্ব। যাকে ভিসুয়াল পোয়েট্রিও বলা যায়। পুরো কবিতাটা দেখে আমার মনে হয়েছে, একটা ছেলে ঘুড়ি ওড়াচ্ছে। অথচ শব্দ ধরে পড়লে কিছু বুঝতে পারছি না। এরকম একটা বছর। চেষ্টা করছি হচ্ছে না। কি বাহবে কথা বলা যায় এই কবিতাদের সাথে! ভাবা চলছে। তার মধ্যে হাতে এসেছে আরো একটা বই।
 ‘ছুঁ         ছুঁ রুণ চিল / লো লো তোর দিল’
 ‘(বীনু+বাবনের) মা প্রতিদিন রাতে + হয়’
        ধূ         লি
ধূ        ধূধূ         ধূলি
লি        ধূলি         লিলি
আমি বুঝতে পারছি না। কথা শুরু করি কি করে! একটা অচেনা মানুষ বা একজন অন্য ভাষার মানুষের সামনে বসে আছি! এই নিয়ে একটা ধন্দে ছিলাম। কিন্তু অনেক সময় এটা হয়, ভাষা জানা সত্ত্বেও কথা বোঝা যায় না। তখন বলা হয় পাগল বা ওয়েভ লেংথে মিল নেই। আমি কি সেই তরঙ্গ দৈর্ঘ্যে পৌঁছতে পারছি না। আমার অভিজ্ঞতা কম। এরকম কবিতার অভিজ্ঞতা নেই। আগে কখনো পাই নি। কবিতার এরকম শরীর দেখি নি। কিছু কিছু শব্দ নতুন। শব্দের বসা অন্যরকম। বুঝিতে পারছিলাম না, কি বলব।
অনেকক্ষণ ডাকাডাকির পরও সাড়া নেই। কমিউনিস্ট কবিকে দেখি সাউথ সিটিতে বাজার করতে। মোবাইল টাওয়ার অনেক উঁচু থাকে। একটা লোক উঠে থাকে। কচুর ডাঁটি দিয়ে লাইন ড্রয়িং চলে প্ল্যাটফর্মে। দাঁড়ি জট। জামা ময়লা। ছেঁড়া। স্টেশানেই শুয়ে থাকে। বাবা তখন পিঠে এসে একটা আঙুলের খেলা চালায়। যেটা হতে পারে হ্রররররর বা তথত্থথথ। এটা আমি বুঝতে পারছি। পুরোপুরি পারছিও না। মনে হচ্ছে। বাইরের কারো বোঝা সম্ভব নয়। বাবারও না। চমকে উঠছি। মাছের ফিকফিক হাসি গলে যাচ্ছে জলের ভেতর বা ফলস গাছের ভেতর দিয়ে। ব্লব ব্লব বুদবুদ। জল নামিয়ে নিয়ে ওহা ওহা ওহা। কাঁপছে দদ্দদ্দদ্দ। পাশ দিয়ে একটা ক্রিং চলে গেল।
মটর গাছে লম্বা বেঁটে বা গিনিপিগের সাদা কালো হবার পসিবিলিটির মতো শব্দ তৈরিরও। এইভাবে তাথৈতাথৈতাথৈ। বিজ্ঞানের ল্যাবটরির মতো, কবিতাকেও ফেলা হবে না কেন মিয়াক্রস্কোপের নীচে! এখন সম্পর্ক টা কেমন শব্দ বা বাক্যে থাকছে না। মুড টাচ্‌ ফিলিংসের শব্দ বসানো হচ্ছে। বাবার সেই আঙ্গুল চালানোর শব্দ, আমি ধরতে চাইছিলাম। ব্রায়ের ফোলার সাথে তাজমহল বা ভিক্টরিয়ার গম্বুজের মিল পাচ্ছেন। কিন্তু একটা কাক এসে ঠোঁট ঠেকালে সেই টাচের যে ফিলটা সেটা কি করে বলবেন? এই যে ফসল , সফল, ফলস অক্ষরের বসা বদলে গেলে কি সব হয়ে যাচ্ছে।
আমার বন্ধুরা বলছে পাগল, ধাপ্পাবাজ, কবিতা নিয়ে ছ্যাবলামি। কিসসু পারে না। কি বোঝাবো, যে ছেলে ত্রিকোণমিতি জানে না, সে কি জানে সেক্সি মানে 1/cos c। এখানে কবিতার প্রতিটা শব্দে থাকতে হয়। পরের শব্দে গিয়ে বসতে হয়। আলাপ জমাতে হয়। তারপর দুই বাড়ির মধ্যে সম্পর্ক। বা দুটো শরীর নিয়ে ভাবুন। শরীর ছুঁয়ে ফেললেই যদি বসত হত, তাহলে কি আর আমি উদবাস্তু হয়ে এখনো ঘুরে বেড়াই!
উৎসঃ কবি সব্যসাচী হাজরা





কিছু কথা (অনেকের কথা )- ১ - সব্যসাচী হাজরা


                          

পরিশ্রম করুন কবিরা, অরিজিন্যাল হোন, কবিতা বড় হোক --অংশুমান।

        প্রথমে হাত রাখলেই ভালো লাগে। মানুষের হাতের উষ্ণতা এক অদ্ভুৎ এক্সটেন্টের। তবে কিছুক্ষণ পর মিলিয়ে যায় যে হাতটা রাখা ছিল। কারণ থার্মাল ইকুইলিব্রিয়ামের সাথে আমাদের নার্ভাস সিগন্যালিং ও স্যাচুরেট করতে থাকে। তখন অনুভব করতে গেলে হাতটাকে বুলিয়ে দিতে বলতে হয়। কিছুক্ষন পরে সেই আরামও নতুন অনুভুতি দেয়না। তখন ভালোবাসার মানুষটিকে আঙুল দিয়ে খেলা করতে বলুন আপনার শরীরে। ভালো লাগবে। এখানেই তো ক্লাইম্যাক্স আসছেনা। আবার খুঁজছি নতুন উত্তেজনার পথ। বরং নখ দিয়ে প্রথমে আলতো ও পরে হালকা আঁচড় দিয়ে তীব্রতা বাড়ানো‌ হোক। এরপর কামড়। তারপর কিছু বিমূর্ত স্পর্শের কথা চলে আসতে পারে। ও তার পরদিন নতুন কিছু এক্সপেরিমেন্ট, আলাদা কিছু।
        প্রথমে কিছু কবিতা পড়লে হাত রাখার মতো অনুভুতি হত, তারপর কিছু কবিতা পেলাম তার মাথায় বিলি কেটে দিলো আঙুল দিয়ে। এইভাবে সব কবিতারা ধীরে ধীরে কোথাও 'আরো চাই' অ্যাংজাইটি দিতে লাগলো। তারপর খুব কম কারোর কারোর কবিতায় নখের আঁচড় ও কামড় পেয়েছি। তারপর কী? পাঠকের এই অ্যাংজাইটি নিয়ে কবিরা কী ভাবেন? কে জানে! কিন্তু কবি যেহেতু পাঠকের জন্য লেখেন তাকে ক্লাইম্যাক্স দেওয়ার দায়িত্বও নেওয়ার কথা ভাবার প্রয়োজন আছে। পাঠককে কোথাও উত্তরণ ঘটানোর প্রয়োজনীয়তাও আছে। একই গতের মাল ছাড়লে তো কবিও থেমে গেছেন আর পাঠকও বাসি খাবারের ঢেকুর তুলে এলিয়ে যাচ্ছেন। পুরোনো শৈলীতে লেখাগুলো লিখতে পারাতো কোনো ক্যালির কথা নয়, ওগুলো ওই লতা-কণ্ঠী আশা-কন্ঠী রফি-কন্ঠী বা কিশোর-কন্ঠীর মতো ক'দিনের অর্কেষ্ট্রায় আটকে থাকা। তাহলে ক্যালির কথাটা হল 'নতুন' কিছু লিখতে পারা। নতুনত্বটা বুঝতে গেলে আগে প্রচুর পুরোনো কবিতা ও নতুন কবিতা পড়ে ফেলতে হবে। অর্থাৎ রিসার্চ করার দরকার আছে। অনুশীলন, অনুকরন, গবেষনা ও নতুন সৃষ্টি এই চারটে পর্যায় রাখবো সর্বমোট। যেখানে প্রথম দুই স্টেজে যেন পাবলিশিং-য়ের শখ না থাকে। 'মনের খেয়ালে লিখেছিনু দেয়ালে'-এর মোটের উপর কোনো মূল্য নেই; পাড়ায় মেয়েদের ইম্প্রেস করার মতো কিছু বিষয়ে কাজে লাগলে লাগতে পারে।
        পরীক্ষা-নিরীক্ষায় যাওয়ার আগে কিছু কথা বলে নিই। কিছুক্ষণ আগে বললাম কবির পাঠকের প্রতি দায়িত্ব আছে। এখানে অনেকের মতবিরোধ থাকতে লক্ষ্য করা যায়। অনেকে বলেন কবির কোনো দায়িত্ব নেই। অনেক কবির কবিতা পাঠকের খারাপ লাগলেও তাঁর নিজের ভালো লাগে। তাহলে সেই কবিতা শুধু কবিরই। কিন্তু কোনো আর্ট যা সত্যের প্রতিনিধিত্ব করে তা কি স্রষ্টার একার হতে পারে? হতেও পারে। কিন্তু কবি কবিতা প্রকাশ করতে চান মানেই ধরে নেওয়া যায় তিনি পাঠকের কাছে পৌছতে চান। নিজেকে কানেক্ট করতে চান। কন্‌‌সাশ্‌‌‌নেসের কন্টিনিউয়ামে মিশে যেতে চান। ঐ বিমূর্ত সব ছোঁয়াগুলোর আদান-প্রদানের মধ্যে যেতে চান; যা আসলেও ঐ কবিতার পাঠক আশা করছেন। যিনি কবিতা লেখেন, লেখেন মানে তা লেখা তাঁর জীবনযাপনের অংশ, কবিতা লেখাকে ব্যবহার করে আংশিক ভাবে বেঁচে আছেন, দুনিয়ার দু:খ, ফ্রাস্ট্রেশন, ইগো সব চ্যানেলাইজ করতে কবিতাকে ব্যবহার করেন, জ্ঞানও দেন, অনুভুতিকে গেঁথে রেখে অদৃষ্টের সাথে শেয়ার করেন, আমি দাবী করি তাঁর কবিতা শিল্পের প্রতি দায়িত্ব বর্তায়। দায়িত্ব মানে কবিতাকে যত্ন করা, বড় করা, নতুন মাত্রা দেওয়া, নতুন দিশা দেওয়া, নতুন করা। অর্থাৎ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাটা একপ্রকার দাবী হিসেবেই রাখছি পাঠকের হয়ে এবং কবির জায়গা থেকেও অথবা সার্বিক স্বার্থে।
        ফিলোজফি ও ফেনোমেনা, তাদের সম্পূর্ন বা আংশিক রূপ- এগুলোর তো শেষ না থাকারই কথা তবু কবিতা কীভাবে লিমিটেড হয়ে যায় বোঝা দুষ্কর। এক-একটা ফিলোজফিকে লেয়ার বাই লেয়ার উলঙ্গ করে দেখুন নেড়েচেড়ে কত যে ফেনোমেনার পথ খুলতে পারে তার ঠিক নেই, আবার প্রতিটি ফেনোমনার ঘুপচিতে লুকিয়ে আছে হাজার ফিলোজফি। ঠিক করে ভেবে দেখলে সাধারন মানুষ বা সাধারন কবির দেখা বোঝা অনুযায়ী মসজিদ অবদি যেগুলো রাস্তায় পড়ে(মৃত্য ও ঈশ্বর চেতনা থেকে প্রেম প্রকৃতি নষ্টালজিয়া সম্পর্ক যৌনতা ইনসেস্ট আরো তাবড় তাবড় বিষয়) সেগুলো সব এক্সপ্লোরড্‌‌‌। তাহলে কী করা যায়? আরো ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর অংশে ভেঙে ফেলা যায় বা কম্বিনেশনে খেলা যায় অথবা সাহায্য নেওয়া যায় অ্যাবস্ট্রাকশন-এর। কতটা অ্যাবস্ট্রাক্ট তার সীমা নির্ধারন করবে কবিতার স্পেস। কবিতার স্পেসের বাইরের কোনো এলিমেন্ট পাঠকের ভ্রূ কুঁচকে দেবে। কিন্তু কবিতার স্পেসের কোনো সীমা নাই থাকতে পারে। সেটা ঠিক করে কবিতার ইন্ডিভিডুয্যালিটি।
        একটা ইন্ডিভিডুয্যাল(ইন্ডিভিডুয্যাল কথাটার উপর গৌর করুন) কবিতা বলতে তার বক্তব্য বোঝাতে পারে বা একটা ছবি বা কল্পনার টুকরো বা বহুস্তরীয় কিছু নির্মাণ। শব্দের ব্যবহার, শব্দের সঠিক ব্যবহার, নতুন শব্দ তৈরী এগুলো জরুরী। শব্দ ব্যবহার স্পেস-এর সীমা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। শব্দের নতুন ব্যবহার করতে গেলে নতুন পরিস্থিতি তৈরী করতে হয় অথবা নতুন শব্দ তৈরী করতে হয়। প্রথমটা অতিক্রম করে গেলে কেউ দ্বিতীয়টা ব্যবহার করেই থাকেন। নতুন শব্দ। উদাহারণ দেবনা। কিন্তু প্রচুর তৈরী হয়। হওয়া ভাল। কিন্তু প্রথমটা দরকার পড়লে কবির পক্ষে চাপে পড়া স্বাভাবিক। অন্তমিল, ছন্দ নিয়ে আজকাল কারোর আগ্রহ খুব একটা নেই বললেই চলে। কিন্তু আভ্যন্তরীন ছন্দ, মাইক্রো বিট নিয়ে কাজ চলে ও তার মাহাত্ম রেখে আরো চলবে তার ব্যবহার। তারপর আসে কবিতার ভাষা। অন্য ভাষার শব্দের আমদানী এখনকার কবিতায় যথেষ্ট লক্ষ্যনীয়; বিশেষ করে ইংরাজী, হিন্দী ও উর্দু ভাষার ব্যবহার বহুল। পরীক্ষা-নিরীক্ষার খাতিরে এইগুলো বেশ ভালো ভাবে গ্রাহ্যও হয়েছে। কথ্য বাংলা ভাষায় যেমন হিন্দী ও ইংরাজী শব্দ হুড়মুড়িয়ে ঢুকে পড়েছে তার প্রভাব কবিতাতেও পড়েছে স্বাভাবিক ভাবেই। ভাষার ক্ষেত্রে সমসাময়িক পরিবর্তিত ভাষার অসামান্য প্রয়োগ কবিতাকে নতুন রূপ দান করতে পারে। পুরোনো শব্দ অর্থাৎ চলতি ভাষায় স্বল্প ব্যবহৃত কঠিন ও দীর্ঘ শব্দের ব্যবহার না করাই ভালো বলে অনেকেরই ধারনা কিন্তু এই বিষয়টা এখনো খুঁড়ে দেখার জায়গা তো আছেই। পড়ে থাকে আরো টেকনিক্যাল জায়গা যেমন দুটি বা তিনটি শব্দ জুড়ে নতুন শব্দ তৈরী, বিশেষ্য এর নতুনরকম বিশেষন প্রয়োগ, দুরত্বের শব্দকে পাশাপাশি আনা, সম্পূর্ন নতুন শব্দের আবিষ্কার, শব্দকে ভেঙে ফেলা ইত্যদি সবই অভিনব উপায়ে কবিতাকে প্রকাশ করার জন্য দরকার। কবিতার শরীরকে সাজানোটাও একটা বিশেষ গুরুত্ব রাখে। চোখের ক্ষেত্রে নরম হতে হবে অথবা প্রপার হতে হবে, লাইন ও স্পেসের ব্যবহার ছন্দের বাইরে কবিতার স্থিতি ও গতিকে নিয়ন্ত্রণ করে। বিভিন্ন উদ্দেশ্যে অক্ষরের ব্যবহার দেখা যায় কবিতার শরীরে। কখনো গতি নিয়ন্ত্রণ করতে, কখনো চিত্রকল্পে বিমূর্ত রঙ ছোঁয়াতে অথবা রিল্যাক্সেশন পয়েন্টেও ব্যবহার করা হয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষার জায়গা থেকে আরো একটা জায়গা হল কবিতার রঙ। কবিতার পাঠের সাথে কিছু রঙ জড়িয়ে থাকে ব্যাকগ্রাউন্ড সাবকনশাসে সেই রঙের তীব্রতা পাঠকের কাছে কাম্য। কবিতার শরীর ও কথার কম্বিনেশন ইমোশনাল ড্র্যাগ, অসাধারন জায়গায় এমফ্যাসিস এই রঙের কনসেন্ট্রেশন বাড়ায়। তেমনই কবিতার সাথে জড়িত সাউন্ড অর্থাৎ ধ্বনি নিয়ে গবেষনার যথেষ্ট জায়গা আছে অনেকে করেও চলেছেন। পাঠকের মস্তিষ্কের না ছোঁয়া জায়গা গুলো ছুঁয়ে ফেলা যায়। পাঠক অজান্তেই জড়িয়ে পড়েন এটাকেই খুঁজছিলাম-এর আনন্দে। 'অজান্তেই' কথাটা বললাম কারন কবিতা লেখার মধ্যে প্রয়াসটাকে আড়াল করতে পারা কবির কৃতিত্বের মধ্যে পড়ে। স্মুদনেস অর্থাৎ মসৃনতা নিয়ে যথেষ্ট ভাবনা-চিন্তা করার জায়গা থাকে কবিতায়। দীর্ঘ কবিতা লেখা মহান কাজ কিন্তু বেশিরভাগ পাঠকের কাছেই কিন্তু তা বিকর্ষন তৈরী করে। কাহিনীধর্মী না হয়ে যদি বিশেষ করে যদি দীর্ঘ কবিতা অ্যাবস্ট্রাক্ট হয়। সুক্ষ্ম সম্পর্কযুক্ত বা বেশি মাত্রার অ্যাবস্ট্রাকশন কল্পনা করতে অনেক মানসিক বলপ্রয়োগের প্রয়োজন পড়ে ও কিছুক্ষন পড়ে কল্পনার বুনোটগুলো শিথীল হতে শুরু করে। পাঠক খেই হারান ও কবির বক্তব্য ধীরে ধীরে অস্পষ্ট হতে শুরু করে। এই ক্ষেত্রে কবিতার স্থানে স্থানে সঠিক স্থিতি ও কাল্পনার ছবি রঙ শব্দ ও দর্শনগুলোকে দফায় দফায় আত্তীকরনের স্পেস নিয়ে কাজ করতে হবে। ফেনোমেনার দিক থেকে যেগুলো নিয়ে ভাবা যায় সেগুলো হলো কবি(কথক) ও পাঠকের অবস্থান, সামাজিক ও ব্যক্তিগত সত্যের গভীরতা ও তাদের প্রকাশ ভঙ্গিমা ইত্যাদি। এই ক্ষেত্রে নিজস্ব প্রবৃত্তিগত সত্যকে(যেমন যৌনলালসা ও যৌনতার অভাব, পারভার্সন, বিকৃত প্রেম-পাপ, মানসিক মন্দন, নেশা ও আসক্তি, হত্যা ও আত্মহত্যা ইত্যাদি) নিয়ে কথা বলা একটা বিশেষ দিক যা নিয়ে অনেকেই লিখে চলেছেন। এই ধরনের লেখায় গদ্যধর্মীতা বিশেষভাবে লক্ষ্যনীয়। এছাড়াও কবিতার ক্লাইম্যাক্স ও পান্চ্‌‌ নিয়ে যথেষ্ট সৃষ্টিশীল ভাবনার কাজ দেখা যায়। এতকিছু এলিমেন্ট থাকার মানে একটাই নতুন কবিতার সম্ভাবনা খুব শুধুমাত্র সহজে কিছু করে ফেলার প্রবণতাটাকে বর্জন করতে অনুরোধ করবো কবিকে। এর বাইরে আরো অনেক ফ্যাক্টর নিয়ে ভাবনার জায়গা আছে ও পরে আবিষ্কৃত হবে। আজ থেকে কুড়ি বছর পরের কবিতার রূপকে যদি দেখতে পাওয়ার চেষ্টা করি তবেই সে স্বাতন্ত্রে আসবে পাঠক বসে থাকবে কবিতার পথ চেয়ে। কবিতা বড় হবে আরো সমৃদ্ধ হবে অরিজিন্যাল্‌‌সে, অল্টারনেটিভে ভারাক্রান্ত নয়। প্রেজেন্টেশন পাল্টাবে আরো স্মার্ট হবে কবিতা, কবিতা থ্রি-ডি হবে। দরকার পড়লে ফন্টের স্টাইলাইজেশন, সিম্বলের ব্যবহার যেমন আসছে, আসছে কম্পিউটার টার্মিনোলোজির ব্যবহার, তেমনি একটা কবিতার মিরর ইমেজ হয়ে যাচ্ছে আর একটা কবিতা। এইসব হোক ধ্বনাত্মক অনুভূতি রেখে। কবিতার প্রাথমিক ধারনা ও ভিত্তি পাল্টে গেলে কী হবে? কবিতা আর অকবিতার পার্থক্য মিটিয়ে দিলে কী ক্ষতি হবে? কয়েকটা চিহ্নকে সাজিয়ে কবিতা লেখা হলেও হোক। শুধু ভাস্করজ্যোতির থেকে একটা শোনা কথা বলে রাখি, টেকনিক্যাল অতি-কচকচানিতে যেমন নৃত্য জিমন্যাস্টিকে পরিণত হয় তেমনি কবিতা যেন সাদা পাতার উপর অক্ষর, শব্দ, চিহ্ন ও স্পেসের আর ডটের স্তুপ না হয়। সেক্ষেত্রে অ্যাবস্ট্রাক্ট বলে দিলে মেনে নেবনা কবিবন্ধু। প্রতিটা কবির কবিতা নতুন, অরিজিন্যাল ও অভিনব হোক। অবশ্যই হোক। ধন্যবাদ।
|

No comments:

Post a Comment