MOBILE VERSION

popular-recent

Recent Posts
     
 
TranslationTranslation PoetryPoetry ProseProse CinemaCinema
Serialধারাবাহিক
Weekly
Weekly
Visual-art
Art
ReviewReview
Web IssueWeb Issue InterviewInterview Little-MagazineLil Mag DiaryDiary
 
     

recent post

txt-bg




top

top












txt

Pain

আড্ডা, সাবেকী ভাষায় Interview
আমার জীবন থেকে উঠে আসা সুর
এখনো অ্যানাউন্সমেন্ট হয় নাই, আসবে কি না জানা নাই
ব্যথার পূজা হয়নি সমাপন

কার গান? কার সুর? – সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়



প্রবন্ধ

কার গান? কার সুর? – সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়

শিরনামটা হয়তো অনেকেরই চেনা লাগছে। গত শতাব্দির সাতের দশকে আনন্দবাজার পত্রিকার পাতায় এই শিরোনামে একটি প্রতিবেদন লিখে রীতিমত বিতর্কের ঝড় তুলে দিয়েছিলেন- ‘স.ক.ঘ.’ ওরফে সন্তোষকুমার ঘোষ। আপাত-প্রতিকূল সেই লেখাটি ছিল মূলত এক যুগবরেণ্য রবীন্দ্রসংগীত-গায়কের রবীন্দ্রসংগীত পরিবেশনের বিরুদ্ধে। এই নিয়ে সেই সময়কার কাগুজে কাদা-ছোঁড়াছুঁড়ি ও  বিতর্কের জায়গাটাকে যদি পাশে সরিয়ে রাখি তাহালে ‘স.ক.ঘ.’-র মূল প্রতিপাদ্যটাকে এক কথায় এই ভাবে ধরা যেতে পারে-

রবীন্দ্রনাথের গানের বাণীতে রবীন্দ্রনাথেরই দেওয়া সুর অক্ষুণ্ণ রাখছেন না রবীন্দ্রসংগীত-গায়ক। আর অনেকক্ষেত্রেই যেসব গানের সুরের সন্ধান নেই অথবা স্বরলিপি লভ্য নয় সেগুলির ওপর নিজস্ব সুরারোপ ঘটিয়ে সেগুলিকেও রবীন্দ্রনাথের নামের মোড়কে শ্রোতাদের মধ্যে প্রচার করছেন তাঁরা।

অভিযোগটি গুরুতর। কারণ ললিতকলার ধর্ম অনুসারে ব্যাক্তির নামে পরিচিত সংগীতের সর্বস্বই হবে সেই ব্যাক্তিরই সৃষ্টি। তাছাড়া একজনের নামের আড়ালে অন্য একজনের সৃষ্টি যদি আশ্রয় পায় তাহালে দ্বিতীয়জনের কৃতির খ্যাতি-অখ্যাতি – দু’য়েরই দায় প্রথমজনের উপরই বর্তাবে। সেটাও কাম্য নয়। রবীন্দ্রনাথ সারাজীবনে যত গান ( সংখ্যাটা বিতর্কিত হলেও আনুমানিক দ্বিসহস্র) রচনা করেছিলেন, তার প্রায় সবগুলিতেই সুরও তাঁরই দেওয়া। এর মধ্যে আমরা সংগত কারণেই গণ্য করব সেই পঁচিশটি গানকেও, যেগুলি আসলে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ-রচিত সুরকে ধরে রাখবার জন্য কথা তৈরী করে বেঁধেছিলেন কবি।১ রবীন্দ্রনাথ চাইতেন তাঁর এইসব গান তাঁর সুরেই গাওয়া হোক। স্রষ্টার পক্ষে এমন চাওয়া খুব অসঙ্গতও ছিল না। কারণ সৃষ্টি সব সময়ই অন্তরঙ্গে বহন করে স্রষ্টার একান্ত আত্মবিক্ষেপকে। সুতরাং সেই সৃষ্টিতে অন্য কারো হস্তাবলেপ আসলে স্রষ্টার সত্তায় আঘাত হানারই নামান্তর।  কিন্তু রবীন্দ্রসংগীত প্রসঙ্গে আমাদের বহু বিতর্কিত ‘রক্ষণশীলতার’ সপক্ষে এটাই একমাত্র যুক্তি নয়। রবীন্দ্রনাথের সংগীত-রচয়িতৃ-প্রতিভার সমতুল(সর্বাথেই) দৃষ্টান্ত গোটা পৃথিবীর সংগীত-চর্চার ইতিহাস ঘাঁটলেও যে খুব বেশী মিলবে না এটা মোটের উপর আজ একটি অধ্যুষিত সত্য। কারণ রবীন্দ্রনাথ সুরের রসের সঙ্গে কথার রসকে মিশিয়ে এমন এক সংগীতের জন্ম দিয়েছিলেন, যা কেবল নিছক উপভোগের সামগ্রী মাত্র হয়ে থাকেনি। তা আমাদের প্রতিনিয়ত উত্তরীত করেছে এক অন্যতর উর্দ্ধলোকে। এ গানের সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছে আমাদের অনেকদিনের হাসি কান্নার নির্যাস। এ গান হয়ে উঠেছে আমাদের অনেকেরই নিভৃতযাপনের, আত্মযাপনের অবলম্বন। আর এটা সম্ভব হয়েছে অনেকটাই রবীন্দ্রনাথের অসামান্য পরিমিতি-বোধের জন্য, যা তাঁর গানকে দিয়েছে এক অদ্ভুত ভারসাম্য। অন্য কারো সামান্যতম হস্তাবলেপ ( তা সে যিনিই হোন এবং যেভাবেই করুন না কেন) এই ভারসাম্যের ভিতকে টলিয়ে দিয়ে বিপর্যয় ডেকে আনবে। সম্ভবত রবীন্দ্রনাথ নিজেও এটা জানতেন। আর জানতেন বলেই ১৯২৬ সালে কপিরাইট আইনের আশ্রয় নেন তিনি। বিংশ শতাব্দির প্রথম দশক থেকেই রবীন্দ্রনাথের গান পেশাদার গায়ক-গায়িকাদের কণ্ঠে ধ্বনিমুদ্রিকায় প্রচার পেতে শুরু করে।  কিন্তু ‘রবীন্দ্রসংগীত’ হিসেবে সেগুলিকে চিহ্নিত করা ছিল দুষ্কর। অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথ যে চেয়েছিলেন তাঁর গান তাঁর মতোন করেই গাওয়া হোক, সেই ইচ্ছেটা মর্যাদা পাচ্ছিল না। অধিকাংশ রেকর্ডেই রবীন্দ্রনাথের গান মিশে থাকত অন্য পাঁচরকম গানের ভিড়ে। গায়কেরা বেশিরভাগই জানতেনও না, কার গান তাঁরা গাইছেন। স্রষ্টার নামের পরিবর্তে গানের পাশে উল্লেখ থাকত রাগ-তালের। রবীন্দ্রদত্ত সুরটিও যথাযথ রক্ষিত হত না। বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই যথেচ্ছ সুরালাপ করতেন গাইয়েরা, গানের বাণীতেও অবাঞ্ছিত হস্তাক্ষেপ ঘটত। এই সবের হাত থেকে নিজের ‘সবসেরা’ সৃষ্টিকে বাঁচাতে স্বত্ত্বাধিকার আইন ছাড়া অন্য পথ ছিল না রবীন্দ্রনাথের। রবীন্দ্রসংগীতাচার্য শান্তিদেব ঘোষ এ প্রসঙ্গে জানিয়েছেন-

“বিশ্বভারতী হবার পর ১৯২৬ সালে গুরুদেব প্রথম এদিকে দৃষ্টি দিলেন। ইচ্ছামত সুরে ও ঢং-এ গাওয়া পুরানো রেকর্ডগুলির বিক্রি বন্ধ করতে নির্দেশ দিলেন। কোম্পানীর সঙ্গে স্থির হলো; যিনিই গান করুন, তাঁকে সুরটি ঠিকমতো শিখে গাইতে হবে।”২

আমাদের দেশে রবীন্দ্রনাথই প্রথম গীতিকার যিনি রেকর্ড কোম্পানির তরফে সম্মানদর্শনী বা ‘royalty’পেতেন।৩ পুরানো রেকর্ডগুলির বিক্রী বন্ধ হয়েছিল কি না জানা নেই। কিন্তু নিশ্চিতভাবে নতুন রেকর্ডের ক্ষেত্রে গাইয়েদের যথেচ্ছাচারের সুযোগটা অনেকখানি সংকীর্ণ হয়ে গিয়েছিল। এই সময় থেকে যাঁরা রবীন্দ্রনাথের গান রেকর্ডে গাইলেন, তাঁদের সকলেই উপযুক্ত উৎস থেকে যথাযথ সুর ও গীতরূপটি আয়ত্ত করতে হ’ত। তারপর রেকর্ড প্রস্তুত হয়ে গেলে তার নমুনা বা ‘sample disc’ চলে যেত শান্তিনিকেতনে, বিশ্বভারতীতে।  বিশ্বভারতী থেকে অনুমোদন মিললে তবেই সে রেকর্ড বাজারে প্রচারের জন্য আসতে পারত। রবীন্দ্ররচনার স্বত্ত্ব লোপ পাবার আগ পর্যন্ত এই ব্যবস্থাই চালু ছিল। এখানে বলে রাখা ভালো, সেই যুগে, অর্থাৎ কবির জীবদ্দশায়, বিধিমত রবীন্দ্রসংগীত শেখানোর ব্যবস্থা ছিল একমাত্র শান্তিনিকেতনেই। তার বাইরে যে শেখানো হ’ত না তা নয়, কিন্তু তখন যাঁরা যথাযথভাবে রবীন্দ্রসংগীত শেখাতে পারতেন, তাঁরা সকলেই ছিলেন কোনো না কোনোভাবে শান্তিনিকেতন অথবা ঠাকুরবাড়ীর সঙ্গে যুক্ত, জড়িত। কাজে কাজেই সেই পর্বে যাঁরাই রবীন্দ্রসংগীত রেকর্ড করতেন, তাঁদের সে গানের যথার্থ গীতরূপের জন্য অনেকটাই নির্ভর করতে হ’ত এই উৎসের উপর।
যতদিন রবীন্দ্রনাথ জীবিত অর্থাৎ ১৯৪১ সাল পর্যন্ত রেকর্ড অনুমোদনের বিষয়ে তিনি ছিলেন শেষ কথা। ১৯২৬-১৯৪১-এই সময়পর্বের যাবতীয় রবীন্দ্রসংগীত-রেকর্ড তাঁরই অনুমোদন-স্বাক্ষরিত। অবশ্য কবির আয়ুষ্কালের শেষ কয়েকটি বছরে তাঁর শারীরিক অশক্ততা হেতু এই কাজে তাঁর প্রতিনিধিত্ব করেছেন তাঁর ঘনিষ্ঠ সাংগীতিক-সান্নিধ্যে থাকা কেউ কেউ। তবু এককথায় এইযুগটিকে আমরা রবীন্দ্রসংগীতের রেকর্ড প্রকাশের ইতিহাসে ‘রবীন্দ্র-অনুমোদনের যুগ’ বলেই চিহ্নিত করব। আর এখানেই এই যুগটির তাৎপর্য। এই পর্বে যত রেকর্ড প্রকাশিত হয়েছে, সেগুলির প্রত্যেকটিই এই হিসেবে প্রামাণ্য বলেই গণ্য হবে। কারণ সেগুলির সবই রবীন্দ্রনাথের অনুমোদিত। এই রেকর্ডগুলির সবকটিতেই যে গানের যথার্থ গীতরূপ রক্ষিত হয়েছে এমনটা কিন্তু নয়। কবি নিজেও সেটা জানতেন। অনেক সময়ই অনেক গানের রেকর্ড শুনে সংশয় প্রকাশ করেছেন। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই স্নেহের দাবীতে এই সব রেকর্ডে কবির অনুমোদন আদায় করে নিয়েছেন সংশ্লিষ্ট গায়ক অথবা সংগীত-পরিচালক। ছায়াছবির ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক বিপন্নতার কথা মাথায় রেখে কবি নিজেও অনেক সময় অনুমতি দিয়েছেন। কিন্তু তবু মোটের উপর একটা শৃঙ্খলা রাখতে এই অধ্যায়টিকে আমাদের বিতর্কের উর্দ্ধেই রাখতে হবে।

সমস্যাটা ব্যাপক আকারে দেখা দিল প্রয়াণের পরে। বিশ্বভারতীকে তিনি তাঁর যাবতীয় রচনার স্বত্ত্ব দিয়ে গিয়েছিলেন। স্বভাবতই এর আওতায় গানও ছিল। বিশ্বভারতী রবীন্দ্র-গানকে বিকৃতির হাত থেকে রক্ষা করবার জন্য কিছু পদক্ষেপ নিলেন। কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নেতৃত্বে গঠিত হ’ল ‘বিশ্বভারতী সংগীত সমিতি’ বা ‘ Visva-Bharati Music Board’। ইন্দিরা দেবী চৌধুরাণী, শান্তিদেব ঘোষ, শৈলজারঞ্জন মজুমদার এবং অনাদিকুমার দস্তিদার ছিলেন এর সদস্য। এই সমিতির উপরেই দায়িত্ব বর্তাল রবীন্দ্রসংগীত-রেকর্ড অনুমোদন করার। ১৯৪৫ সালের ১৯ জুন গ্রামোফোন কোম্পানির সঙ্গে সমিতির যে চুক্তিপত্র স্বাক্ষরিত হ’ল- “MR. RATHINDRANATH TAGORE is the sole owner and proprietor  of the mechanical reproduction  rights in the works composed his father late Dr. Rabindranath Tagore and has appointed the Visva-Bharati Music Board to administer and control the said mechanical reproduction right on his behalf…”
এই চুক্তির ‘৭’নং দফায় বলা হ’ল – “ The  Visva-Bharati  Music Board shall have the sole right over the selection  of items to be recorded…”
- এই চুক্তিপত্রে সই করেছিলেন রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছাড়াও সংগীত-সমিতির কর্মসচিব ডঃ প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ।
কিন্তু শুধু সংগীত-সমিতি তৈরী করাই যথেষ্ট ছিল না। ১৯৪১ –এ রবীন্দ্রনাথের প্রয়াণ পর্যন্ত তাঁর গানের চর্চা ও প্রচার মূলত সীমায়িত ছিল শান্তিনিকেতন আশ্রম, কলকাতার ঠাকুরগোষ্ঠী ব্রাক্ষ্মসমাজ ও কিছু শিক্ষিত অভিজাত পরিবারের বৃত্তেই। কিন্তু ১৯৪১-এর পর থেকেই বেতার, চলচ্চিত্র ইত্যাদি প্রচারমাধ্যমের দ্বারা ও আরো নানা কারণে রবীন্দ্রসংগীত জনসাধারণের মধ্যে প্রচার পেতে ও ছড়িয়ে যেতে শুরু করে। অর্থাৎ -“বাংলাদেশকে আমার গান গাওয়াবই।”-কবির এই আত্মপ্রত্যয় বাস্তবায়িত হতে শুরু করে। এবং তা দ্রুত এক জোয়ারের রূপ নেয় ১৯৬১ তে রবীন্দ্র-জন্মশতবর্ষে। এই মধ্যবর্তী কুড়ি বছরে কলকাতা ও আরো নানা জায়গায় এমনকি প্রবাসেও স্থাপিত হয় একাধিক রবীন্দ্রসংগীত শিক্ষাকেন্দ্র। নিত্যদিনের ব্যবহারে চলে আসে রবীন্দ্রসংগীত। কিন্তু এই ছড়িয়ে পড়ার পথে প্রধান অন্তরায় হয়ে সেদিন দেখা দিয়েছিল সুরের প্রামাণ্য স্বরলিপির অপ্রতুলতা। রবীন্দ্রনাথ পৃথিবীর সেই বিরলতম সংগীতস্রষ্টাদের একজন যিনি স্বীয় সৃষ্টির যথাযথ সংরক্ষণ নিয়ে ভাবিত ছিলেন। নতুন গান রচনার পরেই দ্রুত তার স্বরলিপি করিয়ে রাখার আগ্রহ কবির ছিল। তাঁর জীবদ্দশায় এই সব স্বরলিপি বিক্ষিপ্ত ভাবে  ব্রাক্ষ্মসমাজ ও ঠাকুরবাড়ির তত্ত্বাবধানে প্রকাশিত হওয়া কিছু সংগীত-পত্রিকায় এবং ব্রক্ষ্মসংগীত ও নানা ধরণের বাংলা গানের স্বরলিপি-সংকলন-গ্রন্থে মুদ্রিত হ’ত। ১৩১৬ বঙ্গাব্দ থেকে শুরু হয় রবীন্দ্রসংগীতের একক স্বরলিপি-গ্রন্থের প্রকাশ। ‘রবীন্দ্রসংগীত’ অভিধাটি তখন অবশ্য ছিল না। বিশ্বভারতী রবীন্দ্রসংগীতের স্বরলিপি প্রকাশের দায়িত্ব পান ১৯২৩ সালে। রবীন্দ্রনাথের-ই ইচ্ছায়। কবির জীবিতাবস্থায় ১৩৪২ থেকে ১৩৪৬ বঙ্গাব্দের মধ্যে প্রকাশিত হয় স্বরবিতান গ্রন্থমালার প্রথম চার খণ্ড। কিন্তু এগুলি ছিল বিক্ষিপ্ত কিছু কাজ। বইগুল সহজলভ্যও ছিল না। এইসব কথা মাথায় রেখেই সেই সব মানুষ যারা যথাযথভাবে রবীন্দ্রসংগীত শিখতে চান, অথচ নানা কারণে উপযুক্ত শিক্ষকের সান্নিধ্যে আসতে পারছেন না তাদের কাছে অবিকৃত রবীন্দ্র-সুর পৌঁছে দেবার লক্ষ্যে এবং সেইসব শিক্ষক যারা রবীন্দ্রসংগীত শেখাবেন বলে মনস্থ করেছেন, তাঁদের কাছে যথাযথ পথ-নির্দেশ তুলে ধরার উদ্দেশ্যে বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষ দ্রুত এবং নিয়মিতভাবে রবীন্দ্রসংগীতের স্বরলিপি প্রকাশের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। শান্তিদেব ঘোষ, অনাদিকুমার দস্তিদার, শৈলজারঞ্জন মজুমদার এবং ইন্দিরা দেবী চৌধুরানী- এই চারজনকে সদস্য করে তৈরী হয়েছিল স্বরলিপি-সমিতি। ১৩৫৪ সনের ভাদ্রমাসে প্রকাশিত স্বরবিতান প্রথম-খণ্ডের দ্বিতীয় সংস্করণের ভূমিকায় চারুচন্দ্র ভট্টাচার্য লিখলেন–“ রবীন্দ্রসংগীত চর্চার জন্যে সম্প্রতি দেশব্যাপি যে আগ্রহ পরিলক্ষিত হইতেছে, গত কয়েক বৎসরে মুদ্রণকার্য সংক্রান্ত নানা বাধায়, নিয়মিত স্বরলিপি সংগ্রহ প্রকাশ করিয়া সে আগ্রহ পরিতৃপ্ত করিবার আয়োজন বিশ্বভারতী করিতে পারেন নাই। রবীন্দ্রসংগীত-স্বরলিপি-সংগ্রহ যাহাতে ভবিষ্যতে নিয়মিত প্রকাশিত হইতে পারে, সম্প্রতি সেই বিষয়ে যথাসাধ্য ব্যবস্থা করা হইয়াছে। সাময়িক পত্রিকায় প্রকাশকালে, গ্রন্থের পূর্বতন সংস্করণে বা লোকমুখে যে সকল ভ্রান্তি প্রবেশ করিয়া ছিল তাহার সংস্কার; গ্রন্থাকারে অপ্রকাশিত স্বরলিপি সংগ্রহ; নূতন স্বরলিপি রচনা এবং সেগুলি সাময়িক পত্রে ও গ্রন্থাকারে প্রকাশ; এই সকল বিষয়ে ব্যবস্থা করিবার জন্য বিশ্বভারতী গ্রন্থন-বিভাগ একটি সমিতি গঠন করিয়াছেন; শ্রী ইন্দিরা দেবী চৌধুরাণী,  শ্রী অনাদিকুমার দস্তিদার, শ্রী শৈলজারঞ্জন মজুমদার ও শ্রী শান্তিদেব ঘোষ এই সমিতির সদস্য নির্বাচিত হইয়াছেন। এই সমিতির তত্ত্বাবধানে যে সকল স্বরলিপি প্রকাশিত হইবে, আশা করি সকলে তাহার অনুসরণ করিবেন।

    সেই শুরু। এ যাবৎ স্বরবিতানের প্রায় ৬৬ টি খণ্ড প্রকাশিত হয়েছে। রবীন্দ্রস্বত্ত্ব অতিক্রান্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত এইগুলিই ছিল রবীন্দ্রসংগীত-চর্চাকারীদের একমাত্র অবলম্বন। এমনকী স্বত্ত্ব উঠে যাওয়ার পরেও যখন বাজার ছেয়ে গিয়েছে ছোট বড় নানা প্রকাশনীর অসংখ্য রবীন্দ্রসংগীত স্বরলিপি-সংকলনে, তখনও বিশ্বভারতীর আদি অকৃত্রিম স্বরবিতান-এর উপরেই নির্ভর করেছেন ৯০ % মানুষ। আজও করেন। কারণ স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের আস্থা ছিল বিশ্বভারতী প্রকাশিত স্বরলিপির উপর। এখানে বলে রাখা প্রয়োজন, অনেকের ধারণা আছে যে রবীন্দ্রনাথ স্বরলিপির ধার বড় ধারতেন না। স্বরলিপি নিয়ে কড়াকড়িও ছিল তাঁর না-পসন্দ। এ ধারণা সম্পূর্ণই ভ্রান্ত। একথা ঠিক যে রবীন্দ্রনাথ সুরের ব্যাপারে স্মৃতিধর ছিলেন না। ফলে অনেক গানের সুরই তাঁর স্বকণ্ঠে অন্য রকম হয়ে যেত প্রচলিত স্বরলিপির থেকে। কিন্তু সেও তাঁর নিজেরই সৃষ্টি। অন্যের মুখে নিজের গান যাতে বিকৃত না হয়, সে জন্য স্বরলিপিই যে সব চেয়ে নির্ভরযোগ্য তা জানতেন রবীন্দ্রনাথ। ১৯৩৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে শ্রীযুক্ত কিরণশশী দেকে রবীন্দ্রনাথ এক ঘরোয়া আলোচনায় জানিয়েছিলেন                                      গান গাইতে গিয়ে সব সময় স্বরলিপি হুবহু মেনে চলাটা সম্ভবপর হয়ে ওঠে না- বিশেষ করে আমাদের দেশের গানগুলিতে। তার কারণ, আমরা সাধারণত গান শিখি কানে শুনে, - চোখে দেখে নয়।... তবু ভাল যে, স্বরলিপিতে গান বাঁধা থাকলে গানের সুরের কাঠামোটা অর্থাৎ ছকটা অন্তত বদলে না কখনো, হারায়ও না ওটা কোর্টের দলিলের মত খাতাপত্রে পাকা হয়ে থাকে। অপরদিকে এমনকি ওস্তাদ গায়কদেরও চোখের সামনে এই স্বরলিপি মেলে ধরলে যথেচ্ছাচার প্রকাশের অসুবিধা হয় বিস্তর। আসলে স্বরলিপিকে সাক্ষী রেখে গান গাওয়া একটা বিশেষ রকমের সংযম ও সাধনার ব্যাপার। ...স্বরলিপি মেনে না চললে কোন পুরানো গানেতে কোন পরলোকগত সুরকার প্রদত্ত বাঁধা সুর সম্পর্কে গায়কের যদি কখনো স্মৃতিভ্রম ঘটে এবং তা সঙ্গে সঙ্গে সংশুদ্ধির না জুটে কোন উপায়, তখন ঐ বিশেষ গানের সুরটি কিন্তু গায়কের কণ্ঠে অধিকাংশ সময় বিকৃত ভাবেই প্রকাশ পাবার সম্ভাবনা থাকে এবং গায়কের ব্যাক্তিত্ত্বের ও কণ্ঠগুণের প্রভাবে ক্রমশ তা সেইভাবেই সর্বত্র প্রচারিত হয়ে পড়ে- এর পরিণতি বড় বেদনাদায়ক। সেই আশঙ্কায় আশ্রমের ছাত্রছাত্রীদেরও আমি প্রায়ই বলি, স্বরলিপিটা শিখে নিতে। শুধুতো মাত্র একটা নয়; আমার অনেক গানের সুরই একজনের গলা থেকে আরেক গলায় যেতে যেতে বেশ একটু এদিক সেদিক হয়ে গেছে বলে মাঝে মাঝে আমার কানে আসে। ...আমার গানের সুরের তালের যাবতীয় রূপ স্বরলিপিতেই বিধিসম্মত ভাবে স্থিরীকৃত হয়ে আছে তা গাইতে গায়ে যদি অসাবধানতায় কারো সুরের একটু এদিক সেদিক হঠাৎ হয়ে গেলেও, সাধক মনের একাগ্রতা নিয়ে ইচ্ছা এবং চেষ্টা করলে ঐ স্বরলিপিরই সাহায্যে সেটা পুনরায় শুধরে নেওয়া যায় ঐ সমস্ত ভেবেই আমি বলব, গান শেখাবার কালে যদি আমার দেওয়া সুরের প্রতি নিষ্ঠা ও আনুগত্য থাকে তাহলে বিশ্বভারতী কর্তৃক মুদ্রিত স্বরলিপিগুলিকে নির্ভুল ভাবে অনুসরণ করাই তোদের পক্ষে বিধেয়।
গভীর প্রত্যয়ে বিশ্বভারতী-কে নিজের সৃষ্টির ন্যাসরক্ষক করে গিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তাঁর প্রয়াণ-পরবর্তীতে ছয় দশক বিশ্বভারতী সেই অধিকার ভোগ করেছেন। আর আমরাও গুরুই সত্য বলে নিশ্চিন্ত থেকেছি এই ভেবে যে আমাদের পরমপ্রিয় রবিঠাকুর, আমাদের প্রাণের আরাম, আত্মার শান্তি তাঁর গান বিশ্বভারতীর নিশ্চিন্ত আশ্রয়ে অবিকৃত স্বরূপে তোলা রয়েছে, রইল আমাদের আর আমাদের ভাবি প্রজন্মের জন্যে। কিন্তু সত্যিই রইল কী? রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পূর্বেই বিশ্বভারতীর বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল নানান আবিলতায়। কবি নিজেও সেটা অনুভব করেছিলেন। তাই ১৯৩০ সালের ২০ নভেম্বর প্রতিমা দেবীকে চিঠিতে লিখেছিলেন –“কি পাপ করেছিলুম? বিশ্বভারতী? প্রায়শ্চিত্ত করে বিদায় নিতে পারলে বাঁচি।৬ কিন্তু এই আবিলতার ভারী বাতাস যে ছেয়ে ফেলছিল তাঁর গানের ভুবনকেও সে খোঁজ সম্ভবত রবীন্দ্রনাথের জানাছিল না। যাঁদের হাতে তিনি দিয়ে গিয়েছিলেন তাঁর গীতভারতীর উত্তরাধিকার, তাঁর মৃত্যুর পর সেই সব রথী-মহারথীদের ব্যাক্তিগত অহং এতদূর গগনচুম্বি হয়ে উঠল যে তার আড়ালে ঢাকা পড়ে গেলেন স্বয়ং স্রষ্টা। ব্যাক্তিগত অপছন্দ আর অসন্তোষ গোষ্ঠীগত দলাদলির চেহারাই যে শুধু নিল তা নয়, শান্তিনিকেতনের গায়ন-ধারাতেও তৈরী হয়ে গেল নানা গোষ্ঠী যা কিনা গুরু-শিষ্য-পরম্পরায় ছড়িয়ে গেল শান্তিনিকেতনের বাইরেও। আর এই গোষ্ঠীগুলি যে সকল সময় পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল রইলেন তাও নয়। রবীন্দ্রসংগীতাচার্য শান্তিদেব ঘোষ ১৯৬৪ সালের একটি চিঠিতে লিখছেন প্রত্যেক রবীন্দ্রসংগীত গাইয়ে মনে করে যে সে ছাড়া আর কেউ রসিয়ে গাইতে পারছে না। এ দ্বারাই একজনের সঙ্গে আর এক জনের বিরোধ। এক প্রতিষ্ঠান আর এক প্রতিষ্ঠানকে ঈর্ষা করে। এই করে প্রবল একটা পাঁক সৃষ্টি হয়েছে।

এই পাঁক কলঙ্কিত করল বিশ্বভারতী মিউজিক বোর্ড এবং স্বরলিপি-সমিতিকেও। একের করা স্বরলিপি অন্যে প্রামাণ্য বলে মানতে চাইলেন না। সম্পাদনার নামের আড়ালে রবীন্দ্রনাথের জীবদ্দশায় প্রকাশিত স্বরবিতানে মুদ্রিত স্বরলিপিও যথেচ্ছ ভাবে পরিবর্তিত হতে লাগল কবির প্রয়াণ-উত্তর সংস্করণগুলিতে। একই গানের একই সুরের তিন চার রকম চেহারা দাঁড়িয়ে গেল এর ফলে। যুক্তিহীন বদল এমন জায়গায় পৌঁছল যে রবীন্দ্রনাথের সাংগীতিক সৌষ্ঠবটাই বিপর্যস্ত হয়ে পড়বার উপক্রম ঘটল। রবীন্দ্রসংগীতজ্ঞ ব্যাক্তিরা জোরালো ভাষায় বললেন স্বেচ্ছাচারিতা যদি কেউ করে থাকেন, তবে বিশ্বভারতীর গ্রন্থনবিভাগের স্বরলিপি- দপ্তরই তা করেছেন।

 বিশ্বভারতীর স্বরলিপি-ব্যাভিচার নিয়ে এর আগেও অনেকেই সরব হয়েছেন। এদের মধ্যে আছেন শ্রী কিরণশশী দে, শ্রী শান্তিদেব ঘোষ, শ্রী সৌম্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো ব্যাক্তিত্ত্ব। এ নিয়ে অধিক বলবার অবকাশ তাই আর বর্তমান পরিসরে নেই। কিন্তু ব্যাভিচারের হাত এড়াতে পারেনি তো সংগীত সমিতিও। সেখানেও তো প্রায় একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে সমান তালে। রবীন্দ্রনাথ ভীত ছিলেন আজ বাংলাদেশে গানে একটা খেলোভাব এসে পড়েছে। কারণ গান নিয়ে দোকানদারি প্রবল হয়ে পড়েছে। আমি তো ভীত হয়ে পড়েছি। দোকানের মালেতে দর অনুসারে বাঁকাচোরা করে তার রস চেপেচুপে চলেছে আমারই গান।

আর এই বাঁকাচোরার হাত থেকে নিজের গানকে বাঁচাতে চেয়ে কবির   সানুনয় অনুরোধ ছিল আমার গান যাতে আমার গান বলে মনে হয় এইটি তোমরা করো।  আরো হাজারো গান হয়তো আছে-তাদের মাটি করে দাও না, আমার দুঃখ নেই। কিন্তু তোমাদের কাছে আমার মিনতি-তোমাদের গান যেন আমার গানের কাছাকাছি হয়, যেন শুনে আমিও আমার গান বলে চিনতে পারি।এখন এমন হয় যে; আমার গান শুনে নিজের গান কিনা বুঝতে পারিনা। মনে হয় কথাটা যেন আমার, সুরটা যেন নয়।১০
          তার গানের গায়ক আর শিক্ষকদের প্রতি ছিল তাঁর এই অনুজ্ঞা--
“আমি ঠিক যেমনভাবে গাইছি এইটিই গেয়ো আর শিখিয়ো-দেখো এ থেকে যেন সরে যেয়ো না।”১১
           কিন্তু কবির প্রয়াণ-পরবর্তীতে এই দায়িত্ব যাঁদের উপর ছিল তাঁরা ঠিক কী করলেন, শুনে নেব এক বিশিষ্ট রবীন্দ্রসংগীত-ভান্ডারীর কন্ঠে-
“যারা রবীন্দ্রসংগীতের শিক্ষক ও শিল্পী বলে নিজেদের জ্ঞান করেন,তাঁরা কবির এই অনুরোধের মুখরক্ষা করবেন কি?
            বিশেষ করে একটি গুরুদায়িত্ব রয়েছে রবীন্দ্রসংগীতের রেকর্ড পাশ করার দায়িত্ব যাঁদের উপর বর্তেছে তাঁদের। এই বিষয়ে বিশ্বভারতী মিউজিক বোর্ডই কর্তা।তাঁরা নিম্নমানের ত্রুটিযুক্ত গনের রেকর্ড মঞ্জুর না করলে তা কোনো উপায়েই বাজারে বার হবা উপায় নেই। এই মিউজিক বোর্ড যাঁদের নিয়ে,তাঁরাও কৃতি শিল্পী,রবীন্দ্রসংগীতেরও গুনমান সম্পর্কে তাঁদের যথেষ্ট জ্ঞান আছে বলেই ধরতে হবে।কিন্তু,তাঁদের শৈথিল্যের দরুন বা উদাসীনতার দরুনই হোক অথবা অন্য যে কারণেই হোক অরাবীন্দ্রিক রবীন্দ্রসংগীতের রেকর্ডে আজ অনায়াসেই বিশ্বভারতীর মোহরাঙ্কিত ছাপে বাজার ছেয়ে আছে।সর্ষের মধ্যেই যদি ভূত থাকে ত অন্যে পরে কা কথা?”১২

           এই বিশিষ্ট বক্তা নিজে ছিলেন একসময় বিশ্বভারতী সংগী-সমিতির একজন।সর্ষের মধ্যে থাকা ভূতের চেহারাটা ঠিক কেমন ছিল তাঁর বচনেই তুলে দিলাম-
“অনুমোদনের ব্যাপারে আমি কঠোর ছিলাম,তাতেও নানা সমস্যা দেখা দিল।কিছু অসন্তুষ্টির কারণ ঘটল।...নিয়ম হল,যে কোনো একজনের মত নিলেই কাজ চলবে।* প্রসঙ্গত বলে রাখি,তারপর থেকে যতদিন আমি বিশ্বভারতীর সঙ্গে যুক্ত ছিলাম,একটি স্যাম্পেল রেকর্ডও অনুমোদনের জন্য আমার কাছে পাঠানো হয়নি।...শান্তিনিকেতন থেকে অবসর গ্রহনের পর থেকে অবশ্য পুরোপুরিই আমাকে পাশ কাটানো হত।হয়তো আমার অপরাধ রবীন্দ্রসংগীতের শুদ্ধতার ব্যাপারে আমি অত্যন্ত ঋজু।রেকর্ডের এখনকার গানকে একেবারেই প্রামাণিক বলা চলেনা।কারণ রবীন্দ্রকন্ঠে যে গানগুলি রেকর্ড করা হয়েছে,সেগুলিও অন্যের রেকর্ডে অন্যরকম হয়ে গেছে।মূল রেকর্ডের দাম এখন নেই।”১৩
                    
            রেকর্ড অনুমোদনের ক্ষেত্রেও সেই দলাদলি।নিজের গোষ্ঠীকে সুবিধে পাইয়ে দেওয়া।১৯৪১ এ কবির প্রয়াণের পর থেকে ২০০১ পর্যন্ত এমন অনেক সুর রেকর্ডে রবীন্দ্রনাথের নামে ছাড়পত্র পেয়েছে যার সঙ্গে বিশ্বভারতী প্রকাশিত স্বরলিপির ফারাক বিস্তর।এমন অনেক অনেক সুর অনুমোদন পেয়েছে যেগুলি আদৌ রবীন্দ্রনাথের দেওয়া কি না তার কোনো প্রমাই নেই। সেই সময়কার ৭৮ ঘুর্ণনের অনেক ধ্বনিমুদ্রিকা আমার বক্তব্যের সাক্ষ্য দেবে।আর সেইসব ধ্বনিমুদ্রিকায় কন্ঠদান করেছেন কারা? বিশ্বভারতী সংগীতভবন থেকে স্নাতক হয়ে আসা রবীন্দ্রসংগীতের কিংবদন্তী গায়ক-গায়িকারা ও তাঁদের শিষ্য-প্রশিষ্যেরা! অথচ এদের সামনে রবীন্দ্রনাথের অনুজ্ঞা আর বিশ্বভারতীর স্বরলিপি – দুইই ছিল।
*তখন মিউজিক বোর্ডের সদস্য ছিলেন চারজন ।

তবুও কোন অধিকারে এরা তাকে লঙ্ঘন করে গান করলেন আর কোন অধিকারেই বা বিশ্বভারতী সেগুলিকে রবীন্দ্রনাথের নামে ছাড়পত্র দিলেন,সে প্রশ্নের উত্তর কে দেবে? ১৯৪১ এর পর রবীন্দ্রসংগীতে সামান্যতম পরিবর্তনের অধিকারই বা কার আছে?
 ‘বিমল আনন্দে জাগ রে’, ‘কে বসিলে আজি’, ‘হৃদয়-বাসনা পূর্ণ হল’, ‘কিছুই তো হলনা’, ‘এরা পরকে আপন করে’, ‘এ পরবাসে রবে কে?’- এইরকম গানগুলির ক্ষেত্রে তান-বিস্তার সহযোগে প্রায় বিকল্প সুর ও গীতরীতি তৈরী হয়ে গেল।সাফাই দেওয়া হল এই বলে যে রবীন্দ্রনাথ নিজেও নাকি এইভাবে ওস্তাদি খেয়ালের ঢং-এ তাঁর গান পরিবেশন করবার অধিকার দিয়েছিলেন যোগ্য প্রতিভাধরদের।প্রশ্ন হল,রবীন্দ্র-প্রয়াণ-পরবর্তীতে কে যোগ্য আর কে অযোগ্য সে বিচারের ভার বা যোগ্যতা কার আছে? আর যদি ধরেও নিই যে রবীন্দ্রনাথ এই জাতীয় গানের অনুমোদনে কার্পণ্য করতেন না,তাহলেও প্রশ্ন এই যে রেকর্ডে ১৯২৬ থেকে তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত একটিও এ জাতীয় গান কি প্রকাশিত হয়েছে? ইতিহাসের উত্তর ‘না’রবীন্দ্রনাথ জীবিত থাকাকালীন এ জাতীয় একটিই রেকর্ড প্রকাশিত হয়েছিল।সালটা ১৯১৫।১৪ অর্থাৎ কবি তখনও কপিরাইট আইনের আশ্রয়ে যাননি।শৈলজারঞ্জন মজুমদার লিখছেন-
“রবীন্দ্রনাথের গান আলাপ তান লাগিয়ে অনেকেই গাইত।রেকর্ড করে বাজারে ছাড়ত।তো গুরুদেব বুলাবাবুকে একদিন বললেন, ‘হ্যারে বুলা যারা এ ধরনের গান করে বিক্রি করছেন তাঁদের রাজি করাতে পারিস যে আমাকে একটু শুনিয়ে যদি বাজারে ছাড়ে।যদি রাজি হয় তবে আমি একটু বোঝাতে চেষ্টা করব।”১৫

          কী বোঝাতে চেষ্টা করতে রবীন্দ্রনাথ?উত্তরটা বলাই বাহুল্য।শান্তিদেব ঘোষের সাক্ষ্যও অনুরূপ-
“ আগের দিনের খ্যাতনামা গুণীরা গুরুদেবের গানে যা করেছেন তা সম্পূর্ণ তাঁদেরই ইচ্ছামত তাঁরা করেছেন।সংগীতাচার্য রাধিকাবাবুর দ্বারা গীত গুরুদেবের হিন্দীভাঙা দুটি বাংলা গানের রেকর্ড আছে।সে গান দুটি গুরুদেবের মুখেও বহুবার শুনেছি।কিন্তু রাধিকাবাবুর গাওয়া তানালঙ্কার বহুলতা অনুরূপ কোনো পরিচয় গুরুদেবের কন্ঠে একবারও শুনিনি।তাঁর গাইবার ঢং ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন রকমের।”১৬
             
          এই সম্পূর্ণ ইচ্ছামত গাওয়ার ধারা,যা রবীন্দ্রনাথ আটকাতে চেয়েছিলেন,তাঁর প্রয়াণের পর বিশ্বভারতী তাকেই অকাতরে ছাড়পত্র দিয়ে গেলেন।যে গায়কের কন্ঠে তানালাপ সহযোগে গীত নিজের একট ব্রহ্মসংগীতের রেকর্ড রবীন্দ্রনাথ প্রকাশিত হতে দেননি,সেই গায়কই অনুরূপভাবে তানবিস্তার সহযোগে রবীন্দ্রসংগীত গেয়ে রেকর্ড প্রকাশ করলেন কবির প্রয়াণের পরে।কোন মায়াবলে এমনটা সম্ভব হল?দুঃখের বিষয়, বিশ্বভারতীর বাইরে থেকে যারা রবীন্দ্রনাথের গান নিয়ে কাজ করেছেন তাঁদের স্খলন-পতন-ত্রুটি নিয়ে আমরা সোচ্চার হয়েছি অথচ বিশ্বভারতীর অন্দরে এভাবে নিঃশব্দে ছড়িয়ে পড়া দূর্নীতির খোঁজ রাখিনি।রবীন্দ্রসংগীতের যে বিশেষজ্ঞ তথা প্রবাদপ্রতিম গুরু মন্তব্য করেছিলেন-
“রবীন্দ্রকন্ঠে যে গানগুলি রেকর্ড করা হয়েছে,সেগুলিও অন্যের রেকর্ডে অন্যরকম হয়ে গেছে।”
সেই তাঁরই সংগীত পরিচালনায় ১৯৬৪, ১৯৭৪, এবং ১৯৭৯ সালে তিনটি ভিন্ন ভিন্ন রেকর্ডে ‘ তবু মনে রেখো ‘ গানটি রবীন্দ্রসংগীতের তিন প্রবাদপ্রতিম গায়িকার কন্ঠে প্রচারিত হয়।তিনরকম সুর এবং এর একটিও রবীন্দ্রনাথের স্বকন্ঠে “ তবু মনে রেখো ‘র সঙ্গে মেলেনা, স্বরলিপির সঙ্গেও নয়।প্রসঙ্গত বলে রাখি,এই তিন গায়িকাই ছিলেন ওই প্রশিক্ষকের অধ্যক্ষতাকালীন বিশ্বভারতী সংগীতভবনের স্নাতক আর এদের মধ্যে দুজন ছিলেন তাঁর সাক্ষাত ছাত্রী ও বিশেষ স্নেহপাত্রী।বিচারের বাণী যে এরপরে নীরবে নিভৃতে কাঁদবার জায়গাটুকুও হারাবে,তাতে আর সন্দেহ কী?
       এইভাবে বিশ্বভারতীর কীর্তি-চর্চা করতে বসলে ঠক বাছতে গাঁ উজাড় হয়ে যাবে।বর্তমান পরিসরে এইরূপ দুটি গান নিয়ে বিশ্বভারতীর দুটি অসামান্য কীর্তির কথা জানিয়েই আমাদের বক্তব্য শেষ করব।
       প্রথমে যে গানটির কতা বলব সেটি হল ‘আনন্দধারা বহিছে ভুবনে’১৩০০ বঙ্গাব্দের রচনা।কবি তখন বত্রিশ বছরের যুবক।এটি একটি খেয়াল ভাঙ গান।মালকোষ-ত্রিতালে নিবদ্ধ সদারঙ্গ রচিত ‘লাগি মোরে ঠুমক’ গানের আদর্শে এই গান রচনা করেন কবি।এখানে বলা দরকার,হিন্দুস্থানী সঙ্গীতে ধ্রুপদ গান সাধারণভাবে হয় চার তুকের আর খেয়াল দুই তুকের।রবীন্দ্রনাথের গান চারিত্র্য ধর্মে ধ্রুপদভঙ্গিম অর্থাৎ স্থায়ী অন্তরা সঞ্চারী আভোগ-এই চার-তুকবিশিষ্ট।কিন্তু ঘটনাচক্রে রবীন্দ্রনাথ এমন অনেক ধ্রুপদাঙ্গ গান রচনা করেছেন যা দুই তুকের।আর এমন খেয়ালাঙ্গের গানও তাঁর আছে যা চার তুকের।’আনন্দধারা বহিছে ভুবনে’ তেমনি একটি চার তুকের খেয়ালঙ্গ গান।মূল গানটি অবশ্য দুই তুকের ছিল রবীন্দ্রনাথ তার গানে নিজে থেকে সঞ্চারী এবং আভোগ রচনা করেছিলেন অবশ্যই স্থায়ী এবং অন্তরার সঙ্গে সাযুজ্য রেখে ১৩০০ বঙ্গাব্দে কলকাতার আদি ব্রাহ্মসমাজ মন্দিরে মাঘোৎস উপলক্ষে এই গানটি গীত হয়১৭

             রবীন্দ্রপ্রয়াণ পরবর্তীতে বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষ রবীন্দ্রসংগীত স্বরলিপি প্রকাশের যে উদ্যগ নিয়েছিলেন সেই কার্যক্রমে ১৩৬৩ বঙ্গাব্দের বৈশাখে ইন্দিরা দেবী চৌধুরানীর সম্পাদনায় প্রকাশিত ৪৫ নং স্বরববিতানে এই গানটির স্বরলিপি প্রকাশিত হয় রাগ-তালের নির্দেশ হিসেবে বলা থাকে ‘মিশ্র মালকোষত্রিতাল’ এই স্বরলিপিটি কার করা? নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে এ বইয়ে বই এর শেষের দিকে ‘চৈত্র ১৩৮৫’ তারিখ সমন্বিত একটি বিজ্ঞপ্তিতে বলা আছে--

        স্বরবিতানের  এই খন্ডে রবীন্দ্রনাথের ত্রিশটি ধর্মসংগতের স্বরলিপি সংকলিত ইহার মধ্যে ২, ৪-৬, ৮-১১, ১৩, ১৪ , ১৬, ১৮-২৩, ২৬, ২৭, ২৯ ও ৩০-ংখ্যক গানের স্বরলিপি পান্ডুলিপি হইতে সংগৃহীত; ১৭ সংখ্যক গানের স্বরলিপি বীণাবাদিনী পত্রিকার ১৩০৪ পৌষ সংখ্যা ইতে গৃহীত হইয়াছে----এই সমুদয় স্বরলিপি ইন্দিরা দেবী চৌধুরানী কৃত"১৮
           আনন্দধারা’ গানটি এই বইয়ের সংখ্যক গানসুতরাং ধরেই নেব যে এই স্বরলিপিটি তাহলে ইন্দিরাদেবীর করা অথচ এই বইয়েরি পৃষ্ঠা একাশি বিরাশি জুড়ে রচনাকাল/প্রকাশকাল শিরনামাঙ্কিত যে একটি দীর্ঘ তালিকা রয়েছে সেখানে এ গানের স্বরলিপিকার বলা হয়েছে অনুল্লিখিত এই তালিকাটি হল আসলে স্বরবিতানের এই খন্ডে প্রকাশিত ত্রিশটি গানের ও সেগুলির স্বরলিপির প্রকাশস্থান প্রকাশকাল এবং স্বরলিপিকারদের নামের একটি বর্নানুক্রমিক তালিকা এই তালিকায় এই বিশেষ গানটি সম্পর্কে জানান হয়েছে যে এর স্বরলিপি প্রকাশিত হয় ‘বীণাবাদিনী’ পত্রিকার ১৩০৪ বঙ্গাব্দের শ্রাবণ মাসেস্বরলিপিকারের নামের জায়গায় বলা থাকে ‘অনুল্লিখিত’ এখন  প্রকৃত ঘটনা হল এই যে স্বরবিতানের ৪৫নং খণ্ডে আনন্দধারা গানের যে স্বরলিপি মুদ্রিত সেটি আর বীণাবাদিনী পত্রিকার উক্ত সংখ্যায় প্রকাশিত স্বরলিপিটি এক নয় বীণাবাদিনী পত্রিকায় প্রকাশিত স্বরলিপিটি হল এ গানের এ যাব প্রাপ্ত সবচেয়ে প্রাচীন স্বরলিপি বীণাবাদিনী পত্রিকাটি রবীন্দ্রনাথের ‘নতুন দাদা’ জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের তত্ত্বাবধানে শ্রাবণ ১৩০৪ থেকে অগ্রহায়ণ ১৩০৫ এর মধ্যে ভারত সংগীত সমাজ থেকে প্রকাশিত হত এর প্রথম সংখ্যাতেই আনন্দধারা গানটির স্বরলিপি প্রকাশিত হয় সেখানে এই গানটিকে বলা হয়েছিল পারমার্থিক সংগী এই বিষয়-নামও জ্যোতিরিন্দ্রনাথেরই দেওয়া অনেকের মতে এই স্বরলিপিটি জ্যোতিরিন্দ্রনাথ কৃত কিন্তু স্বরলিপিকার হিসেবে তার নামের উল্লেখ ছিল না এখানে বলে রাখা ভালো যে ই সংখ্যাতেই প্রকাশিত ‘অয়ি ভুবনমনোমোহিনী’ কিংবা ‘লাবণ্যে পূর্ণ প্রাণ’ এর মত গানের ক্ষেত্রে কিন্তু স্বরলিপিকার হিসেবে  জ্যোতিরিন্দ্রনাথের স্পষ্ট নামোল্লেখ রয়েছে১৯ সেক্ষেত্রে স্বরলিপিকারের নামের উল্লেখহীন এই স্বরলিপির রচয়িতা  জ্যোতিরিন্দ্রনাথ-- এটা এক কথায় বলা যায় কিনা সে প্রশ্ন মনে জাগবেই

            ১৩৬৩ বঙ্গাব্দে ইন্দিরাদেবী চৌধুরানীর সম্পাদনায় ৪৫নং স্বরবিতানের প্রকাশকালে এই স্বরলিপিটি গ্রন্থভুক্ত হল না কোনো অজ্ঞাত কারণে ইন্দিরার নিজের করা একটি স্বতন্ত্র স্বরলিপি পান্ডুলিপি থেকে সরাসরি প্রকাশ করা হল এই বইয়ে অবশ্য এটি একমাত্র নয় রবীন্দ্রনাথের অনেক গানেরই জ্যোতিরিন্দ্রনাথ-কৃত স্বরলিপি ইন্দিরার সম্পাদনায় স্বরবিতানে ঠাঁই পায়নি জানিনা কী কারণ কিন্তু প্রশ্ন হল, ইন্দিরার প্রয়াণের অনেক পরে ভাদ্র, ১৩৮০ তে যখন ৪৫ নং স্বরবিতানে উক্ত গ্রন্থভুক্ত সমুদয় গানের পাঠভেদ থেকে প্রকাশকাল সম্পর্কে এ যাবৎ সংগৃহীত তথ্য সন্নিবিষ্ট হল, তখন কেন এ বিষয়ে বিদে জানালেন না বিশ্বভারতী কর্ত্তৃপক্ষ? যে স্বরলিপিটিকে তারা ঠাঁইই দেননি, সে সম্পর্কে আধখানা তথ্য সরবরাহ করে ঠিক কী বার্তা তারা দিতে চেয়েছিলেন? আনন্দধারা সম্পর্কে যাবসংগৃহীত তথ্যের মধ্যে এগুলি কি পড়ে না? ভাবতে অবাক লাগে, যে এই তথ্যাদি সংগ্রহ ও সঙ্ককলন” করেছিলেন শ্রী প্রফুল্ল কুমার দা বর্তমান প্রবন্ধ- লেখকের হাতে রয়েছে ওই ভাদ্র, ১৩৮০ সংস্করণের চৈত্র, ১৪১৩র মুদ্রণটি এতদিনেও তথ্যের এই অসম্পূর্ণতার কোনো সংস্কার ঘটেনি এই বইয়ে প্রসঙ্গত উল্লেখ্য ইন্দিরাদেবীর করা স্বরলিপি আর বীণাবাদিনীতে প্রকাশিত স্বরলিপি দুটিকে পাশে রাখলে দেখা যাবে দুটির সুরে পার্থক্য র‍য়েছে অনেকখানি

            সুরের কথা যখন উঠলই, তখন এই বিষয় নিয়েও দুটি কথা বলা যাক রবীন্দ্রনাথ নিজের গানের ক্ষেত্রে রাগ রাগিণীর উল্লেখ রাখাটা বড় বাঞ্ছনীয় বলে মনে করতেন না ইন্দিরাদেবীকে একটি চিঠিতে একবার লিখেছিলেন--

" গানের কাগজে রাগ-রাগিণীর নাম নির্দেশ না থাকাই ভালো নামের মধ্যে তর্কের হেতু থাকে, রূপের মধ্যে না কোন রাগিণী গাওয়া হচ্ছে বলবার কোনো দরকার নেই কী গাওয়া হচ্ছে সেইটেই মুখ্য কথা, কেননা তার সত্যতা তার নিজের মধ্যেই চরম নামের সত্যতা দশের মুখে, সেই দশের মধ্যে তের মিল না থাকতে পারে"২০

            পরে অবশ্য ১৩৪৩ এর একটি অন্য চিঠিতে বলেন-     
ধূর্জ্জটিকে দিয়ে নামকরণ করিয়ে নিস"২১

             আসলে রবন্দ্রনাথ নিজের গানের সুর রচনায় ভারতীয় রাগ-ংগীতের ভাণ্ডারকে অকাতরে ব্যবহার করলেও রাগ-রাগিণীর প্রশ্নে প্রথাগত শুদ্ধতাকে সবসময় যে মেনে চলেছেন তা নয় অনেকসময়ই অনেক মিশ্রণ, নতুনতর সংযোজন, অসহজ সুর-বিন্যাসের পরিবর্তন তিনি করছেন ফলে তার গান প্রায়শই প্রথাচিহ্নিত পথকে অতিক্রম করে গেছে হয়ত সে কারণেই এ জাতীয় উল্লেখে কবির কিছু অনীহা ছিল কিন্তু তা সত্ত্বেও স্বরবিতানের নানা খন্ড মিলিয়ে প্রায় ৫০০ গানে রাগ-নামের উল্লেখ পাওয়া যায় রবীন্দ্রনাথের আশঙ্কা যে নিতান্ত অমূলক ছিল না তা পরবর্তীকালে আমরা দেখেছি  বহু গানেই ‘আনন্দধারা’ তার ব্যতিক্রম নয় ইন্দিরাদেবী কৃত যে স্বরলিপিটি স্বরবিতান '৪৫' নং খন্ডে মুদ্রিত তাতে রাগ-তালের নির্দেশ দেওয়া আছে-                                                              
মিশ্র মালকোষত্রিতাল
আর বীণাবাদিনীপত্রিকায় প্রকাশিত স্বরলিপিটিতে বলা আছে-
মালকোষ/ কাওয়ালি

জ্যোতিরিন্দ্রনাথ সম্পাদিত 'বীণাবাদিনী' তে মালকোষ রাগ সম্পর্কে যা বলা হয়েছিল তা এখানে তুলে দিলাম - "ইহা অতি গম্ভীর রাগ- খেয়াল অপেক্ষা ধ্রুপদে অধিক প্রশস্ত ইহাতে জ্ঞ- সুর, দ-সুর ও ণ-সুর এই তিনটি কোমল লাগে কোনো কোনো গানে কোমল রিখাবও ব্যবহার হইতে দেখা যায় ইহা ঔড় জাতীয়,-- অর্থাৎ, ইহাতে পাঁচটি সুর মাত্র লাগে-- দুই সুর (র ও ) বর্জিত ম-সুর ইহার ‘জান’ অর্থাৎ প্রাণ এই রাগ এই সুরে স্থায়ী হইতে ভালো বাসে আরম্ভকালে, তিন চারিটি সুর পরপর উচ্চারিত হইলেই রাগবিশেষের চেহারা ফুটিয়া উঠে...... ম- সুরটিই মালকোষের প্রাণ কখন কখন অলঙ্কারের হিসাবে একটু-আধটু কড়ি-মধ্যমও  লাগে২২
"বীণাবাদিনী'তে মুদ্রিত প্রাচীন স্বরলিপিটির সুরে শুদ্ধ গান্ধার (গা) এবং পঞ্চমের (পা) ব্যবহার রয়েছে ইন্দিরা-কৃত স্বরলিপিটিতে কিন্তু তা নেই সেখানে 'পঞ্চম' এর ব্যবহার একবার দেখি না, শুদ্ধ গান্ধারের স্থলে রয়েছে কোমল গান্ধারের উপস্থিতি সুতরাং বীণাবাদিনীতে প্রকাশিত সুরকে এককথায় মালকোষ বলে দিলে একটু তর্কের অবকাশ ঘটে না কি? বিশ্বভারতী কর্ত্তৃপক্ষের এ দিকেও দৃষ্টি দেওয়াও উচিত তাছাড়া তালের বিষয়টিও তো তর্কাতীত নয় 'বীণাবাদিনী'তে এ গানের তাল বলা হয়েছে 'কাওয়ালি' অথচ এ স্বরলিপিতে এর চলন ত্রিতালের মতই


এখানে দেখছি রয়েছে ১৬টি
মাত্রা কাওয়ালি কিন্তু ৮ মাত্রার তাল বিভাগ দুটি প্রতি বিভাগে ৪টি করে মাত্রা ২টি তালি (১ ও ৫ মাত্রায়) খালি নেই অন্যমতে ১টি তালি ১টি খালি অবশ্য কারো কারো মতে বিভাগ ৪টি ১টি খালি আর ৩টি তালিপ্রতি বিভাগে ‘৪’টি মাত্রা ।মোট মাত্রাসংখ্যা ‘১৬’ ।-তালি, তালি, খালি, তালি।২৩ ত্রিতালেরও এই চলন কিন্তু বাদনশৈলী একেবারেই আলাদা মোটের উপর কাওয়ালির সঙ্গে কাহারবার সাদৃশ্যই বেশী রবীন্দ্রসংগীতে কাওয়ালি বললে অধিকাংশ স্থলেই ৮ মাত্রার তালই বোঝায় যেমন ‘ওই আসনতলের’ বা ‘তোমার পতাকা যারে দাও’ ইত্যাদি ফলে বিভ্রান্তি ঘটবার অবকাশ থেকেই যায়
রবীন্দ্র-স্বত্ত্ব অতিক্রান্ত হওয়ার পর ১৪১০ এর বৈশাখে প্রকাশিত হল '৬৪' নং স্বরবিতান ১২ টি রবীন্দ্রসংগীতের স্বরলিপি এর অন্তর্ভুক্ত হল "আনন্দধারা" নিয়ে বিশ্বভারতীর এক নতুন প্রহসন এখানে উপহার পেলাম আমরা '৪৫'নং স্বরবিতানভুক্ত ইন্দিরা কৃত স্বরলিপিটির পাশে এই প্রথম বিশ্বভারতী স্বরবিতান গ্রন্থমালায় স্বীকৃতি দিলেন বীণাবাদিনীতে প্রকাশ পাওয়া এ গানের প্রাচীনতম স্বরলিপিটিকে বইয়ের শেষে এর স্বরলিপিকার হিসেবে নামোল্লেখ হলো  জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবশ্য ১৩৬৩ থেকে ১৪১০--বিশ্বভারতী কর্তৃআনন্দধারার স্বরলিপি প্রকাশের এই ৪৭ বছরের মধ্যপর্বে গানটি নিয়েও তো রাজনীতি কিছু কম হয় নি কিন্তু এবারে নতুন চমক পূর্বোক্ত দুটি স্বরলিপিই এই নতুন খন্ডটিতে ঠাঁই পেল সুরান্তর হিসেবে আর সূচনায় রইলো প্রবাদপ্রতিম রবীন্দ্রসংগীত গায়িকা কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কণ্ঠে প্রচারিত এ গানের অন্য একটি সুর অবলম্বনে ভি.বালসারা কৃত একটি নতুন স্বরলিপি বিশ্বভারতী জানালেন-
          "১৯৫৬ সালের অগস্ট মাসে কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কণ্ঠে গ্রামোফোন রেকর্ডে (N 82711) গানটি প্রথম প্রচারিত হয় বিষ্ণুপুর ঘরানার রমেশন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্দেশিত সুরে ১৯৭২ সালে ‘বিগলিত করুণা  জাহ্নবী যমুনা’ চলচ্চিত্রে ব্যবহারের জন্য তিনি গানটি আবার রেকর্ড (7 E P E 1175) করেন কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কণ্ঠে গীত ক্যাসেটের (S T H V 842373) সুর অবলম্বনে শ্রী ভি. বালসারা- কৃত স্বরলিপি বিশ্বভারতী পত্রিকার ১৪০৩ বঙ্গাব্দে কার্তিক-পৌষ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়, এবং এই প্রথম স্বরবিতানের অন্তর্ভূক্ত হল এইসঙ্গে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং ইন্দিরা দেবী চৌধুরানী কৃত স্বরলিপিও পাঠকের সুবিধার্থে সুরান্তর হিসেবে বর্তমান গ্রন্থে সন্নিবেশিত হল"২৪

-- অর্থাৎ ইন্দিরা দেবী এবং জ্যোতিরিন্দ্রনাথের করা স্বরলিপি দুটির সুর হল বিকল্প সুর আর কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কণ্ঠে প্রচার পাওয়া সুরটিই মূল সুর? সেটির স্বরলিপিকেই সর্বাগ্রে স্থান দিয়ে বিশ্বভারতী কি তেমনই কোনো ঈঙ্গিত দিতে চেয়েছেন?

ইতিহাস বলে কণিকা-কণ্ঠে প্রচার পাওয়া সুরটির সঙ্গে ১৯৫৬ সালের আগে পরিচিতই ছিল না কেউ শান্তিদেব ঘোষ, অনাদিকুমার দস্তিদার, সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রফুল্ল কুমার দাস প্রমুখ রবীন্দ্রসংগীতের তাবৎ ভান্ডারিরা কেউ-ই ও সুর এর আগে কোনোদিন কানেই শোনেন নি এই না শোনাদের দলে পড়তেন সংগীতাচার্য শৈলজারঞ্জন মজুমদারও; রবীন্দ্রনাথের নির্দেশ-ক্রমে আবাল্য এর কাছেই কণিকার সংগীতশিক্ষা এবং উত্তরজীবনেও কণিকা এঁকেই তাঁর সংগীতগুরু বলে চিরকাল মেনেছেন এই সুর জানা ছিল না ইন্দিরা দেবীর মতো রবীন্দ্রসংগীত-প্রবাহের প্রথম পর্বের বিশিষ্ট বাহকেরও তাহলে স্বভাবতই প্রশ্ন জাগবে যে এ সুর এলো কোথা থেকে? শান্তিনিকেতনের সংগতগুণীরা, রবীন্দ্রনাথের ঘনিষ্ঠ সাংগীতিক সান্নিধ্যে থাকা মানুষেরা যে সুরের অস্তিত্ব নিয়েই অবহিত ছিলেন না, অর্থাৎ যে সুর কবির জীবদ্দশায় শান্তিনিকেতন কিংবা কলকাতা-- কোথাওই একবার গীত হয়নি, রবীন্দ্র-প্রয়াণের ১৫ বছরের মাথায় সেই সুর কি তবে হাওয়ায় জন্ম নিল
বিশ্বভারতীর বিজ্ঞপ্তি দেখুন-

"রমেশন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্দেশিত সুরে"

          কে এই রমেশন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়? বিষ্ণুপুর ঘরানার প্রখ্যাত সঙ্গীতগুণী গোপেশ্বর বন্দ্যোপাধায়ের পুত্র রমেশন্দ্র নিজেও ছিলেন বিষ্ণুপুর-ধারার উচ্চাঙ্গ গানের এক বিশিষ্ট নক্ষত্র বিশ্বভারতের স্বরবিতান সম্পাদনার কার্যক্রমে এবিশেষ অবদান ছিল, বিশেষত রাগ-তালের নাম নির্দেশের ক্ষেত্রে প্রশ্ন জাগে, রবীন্দ্রনাথ নিজে যখন লিখিত চিঠিতে এ কাজের জন্য ইন্দিরা দেবীকে ধুর্জ্জটিপ্রসাদের নাম সুপারিশ করেছিলেন, তখন তাঁর পরিবর্তে রমেশচন্দ্রকে কেন কাজের জন্য বেছে নিলেন বিশ্বভারতী? কিন্তু এসব অনেক পরের কথা রমেশচন্দ্রের সঙ্গে রবীন্দ্রসংগীতের যোগ ঠিক কবে থেকে? শান্তিদেব ঘোষ জানাচ্ছেন-

        "১৯৩১ সালে গুরুদেবের ৭০ বৎসর জন্মোৎসবের কথা আজো মনে পড়ে উৎসবটি হয়েছিল কলকাতায়... কলকাতার নানা প্রকৃতির গাইয়েরা এই অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন... পুরুষ ও মহিলা মিলে ৭৫ জনের মত গাইয়ে নিয়ে দলটি গঠিত হয়...গুরুদেব দিনেন্দ্রনাথ এই গানের দলের অনেকেরই গান আগে শোনেন নি অনুষ্ঠানের আগে-- গুরুদেবের কাছে তো নয়ই, দিনেন্দ্রনাথ বা ইন্দিরা দেবীর কাছেও তাঁরা গান শেখেন নি... ৭০ বৎসরের জয়ন্তী উৎসবে যাঁরা গান গেয়েছিলেন, উল্লেখিত তাঁদের নামগুলিতেই আমার বক্তব্যটি পরিষ্কার হবে বলে আমি আশা করি নামগুলি হলঃ-
গায়কগণ--
| শ্রী গোপেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায়
| শ্রী সত্যকিঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
| শ্রী রমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
| শ্রী উমাপদ ভট্টাচার
  ... .. ..."২৫

          গোপেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায়ের গানের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের পরিচিতি ছিল রমেশচন্দ্রের জন্ম আনুমানিক ১৯০৫ সালে সুতরাং এই সময় তিনি ছিলেন ২৬ বরের যুবক তাহলে প্রশ্ন জাগে, একজন সদ্য যুবক যার রবীন্দ্রসংগীতে হাতে খড়ি হচ্ছে কবির ৭০ বছর বয়সে তাঁর পক্ষে ৩৮ বছর আগেকার একটি গানের সুরের সাক্ষী হওয়া কতখানি সম্ভব? তাও এমন সুর যা কবির জীবদ্দশায় দূরে থা তাঁর প্রয়াণ-পরবর্তী এক দশকেকেউ শোনেন নি এ কথা, ঠিক রবীন্দ্রনাথ নিজ গানের সুর প্রায়ই বিস্মৃত হতেন একই গান ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন মানুষকে শেখাতে গিয়ে এই বিস্মৃতিপরায়ণতার ফলেই সুর একেকবার একেকরক্সম হয়ে যেত কবির স্বকণ্ঠে ফলে একেকটি গানের একাধিক সুর দাঁড়িয়ে গেছে অনেক ক্ষেত্রেই এবং সেগুলি গণ্য হয়েছে সুরান্তর হিসেবেই বহুক্ষেত্রে পৃথক স্বরলিপিও প্রকাশ পেয়েছে কিন্তু এই জাতীয় সুরান্তরের ধারক কারা? শান্তিদেব ঘোষ, শৈলজারঞ্জন মজুমদার, দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর, ইন্দিরা দেবী চৌধুরানী, অনাদিকুমার দস্তিদারের মত মানুষেরা, যাদের জীবনের একটা বড় অংশ নিষ্ণাত হয়েছে রবীন্দ্রনাথের ঘনিষ্ঠতম সাংগীতিক সান্নিধ্যের উষ্ণতায়, যারা রবন্দ্রসংগীত শিক্ষা করেছেন স্বয়ং কবির কাছে, তাঁর তত্ত্বাবধানে গান গেয়েছেন, শিখিয়েছেন, যাঁদের উপর কবির গভীর আস্থা ছিল তাঁর সংগীতের ন্যাস-রক্ষা সম্বন্ধে রমেশচন্দ্র গুণী সংগীতজ্ঞ সন্দেহ নেই, কিন্তু রাবীন্দ্রিক অধিকারের প্রশ্নে এদের সমপর্যায়ে তিনি পড়েন কি? রবীন্দ্রনাথের কাছে তিনি গান শিখেছেন কবে? এই বিশেষ গানটির এই বিশেষ সুরটি যে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথই তাঁকে শিখিয়েছিলেন, এমন কোনো পাথুরে প্রমাণ কি তিনি দিয়েছিলেন? এ বিষয়ে রমেশবাবুরই একদা ছাত্র শ্রীযুক্ত প্রফুল্ল কুমার চক্রবর্তী তাঁর ‘গীতবিতানের একটি গান’ শীর্ষক প্রবন্ধে জানাচ্ছেন-
        রমেশবাবুর ধ্যান-ধারণা একটু সেকেলে ছিল তাঁর পূর্ববর্তী গায়কদের কেউ কেউ তানালাপ করতেন এবং রাগচিহ্নকে রবীন্দ্রসংগীতে বহাল রাখতে চাইতেন আনন্দধারা বহিছে ভুবনে’ গানটির বিশুদ্ধ মালকোষের যে সুর (মূল গানের বন্দিশ 'লাগি মোরি ঠুমক' অনুযায়ী) কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রেকর্ড মাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে তা রমেশবাবুরই সৌজন্যে ওই সুরটির কোনো অস্তিত্ত্বই ছিল না-- মূল গান ছাড়া এমন কি ইন্দিরা দেবী, শৈলজারঞ্জন মজুমদার, শান্তিদেব ঘোষ, সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় , প্রফুল্ল কুমার দাস--- এরা কেউ ই আনন্দধারাসুর সম্পর্কে অবহিত ছিলেন না এ বিষয়টি নিয়ে গীতবিতান’এর শিক্ষাগুরু নীহারবিন্দু সেনের সঙ্গে রমেশবাবুর কথোপকথনের (বিতর্ক) সাক্ষী ছিলাম আমি রমেশবাবুর হাতে তেমন জোরালো তথ্য-প্রমাণ ছিল বলে মনে হয় না"২৬

            তাহলে? খো রমেশচন্দ্রর হাতেই যেখানে প্রমাণ অপ্রতুল, সেখানে বিশ্বভারতী কোন ভরসায় এই সুরটিকে প্রামাণ্য বলে ছাড় দিলেন? শুধু যে ধ্বনিমুদ্রিকায় ছাড়পত্র দেওয়া হল তা নয় এ নিয়ে তৈরি হওয়া যাবতীয় বিতর্কের মুখে ধামাচাপা দেবার জন্য এর স্বরলিপি প্রস্তুত করিয়ে প্রথমে ৭/৯/১৪০৩ তারিখে বিশ্বভারতী পত্রিকায় পরে বৈশাখ ১৪১০ এ স্বরবিতান গ্রন্থমালায় একে অন্তর্ভূক্ত করা হল কেন? কার মুখ চেয়ে এতবড়ো একটা অপকীর্তির কলঙ্কে চিহ্নিত হতে হল রবীন্দ্রনাথের গভীর প্রত্যয়ের ন্যাসরক্ষক বিশ্বভারতীকে?




         ধৈর্য ধরুন, ন্দধারা নিয়ে প্রহসন আর চমকের এখনো বাকী আছে এবার দেখব সেই স্বরলিপিটিকে যা বিশ্বভারতী কণিকা কণ্ঠে প্রচারিত সুরের অনুসরণে করা বলে প্রকাশ করেছেন তাদের মোহরাঙ্কিত করে স্বরলিপিটি প্রস্তুত করেছেন শ্রীযুক্ত ভি. বালসারা মহাশয় বিশিষ্ট সঙ্গীতগুণী ভি. বালসারা প্রাচ্য-পাশ্চাত্য- উভয় ধারার সংগীতেই কৃতি মানুষ S T H V 842373-- এই ক্যাসেটের অন্তর্ভুক্ত কণিকা-কণ্ঠের ‘আনন্দধারা’ অনুসরণে তিনি স্বরলিপিটি প্রস্তুত করেছিলেনআনন্দধারা বহিছে ভুবনে’ নামাঙ্কিত এই ক্যাসেটের গানটি আসলে ১৯৭২ সালে ছায়াছবির প্রয়োজনে গাওয়া কণিকার এ গানের দ্বিতীয় রেকর্ডিংটি যার জন্য সে বছর তিনি সেরা নেপথ্য-গায়িকার পুরস্কার লাভ করেন ক্যাসেটের পাশে এই স্বরলিপিটি মিলিয়ে দেখুন ভুলে ভরা স্বরলিপি! সুরের সমস্ত সূক্ষ্ম অলঙ্করণ ও মারপ্যাঁচ এ স্বরলিপিতে সযত্নে বর্জিত বলা যায় এ স্বরলিপিটিতে তৈরী হওয়া সুরটি আসলে কণিকা-কণ্ঠে প্রচারিত সুরের একটি সরলীকৃত রূপ আমাদের বক্তব্যের প্রমাণ হিসেবে এখানে আমরা প্রথমে ভি. বালসারা কৃত স্বরলিপিটি ও পরে কণিকা-কণ্ঠের ক্যাসেট অবলম্বনে অন্য একটি স্বরলিপি পরপর ছাপিয়ে দিলুম
 ভি. বালসারা কৃত স্বরলিপিটি
কণিকা-কণ্ঠের ক্যাসেট অবলম্বনে অন্য একটি স্বরলিপি

  
দুটি স্বরলিপি এভাবে পাশাপাশি পড়লেই মালুম হবে বিকৃতির ভূত কোথায় এবং কতখানি।ভি.বালসারার মত সংগীতগুণীর হাতেও কেন যে স্বরলিপিটি এতো কাঁচা রইলো তার কারণ আমরা জানিনা। কিন্তু বিশ্বভারতীর স্বরলিপি-দপ্তরে যারা ক্ষমতাসীন তারা সেদিনও নিদ্রা যাচ্ছিলেন, আজ নিদ্রা যাচ্ছেন স্বরলিপিকারের নাম ভি. বালসারা বলেই কি তে হাত ছোঁয়াতে সাহস হয়নি তাদের?

       চমকের আরেকটি পর্দা তুলি এবার বিশ্বভারতীর বিজ্ঞপ্তি থেকেই জানা যায় যে এ গানটি কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় দুবার রেকর্ড করেছিলেন ১৯৫৬র রেকর্ডটি রমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্দেশনায় হয়েছিল কিন্তু ৭২ সালে ‘বিগলিত করুণা জাহ্নবী যমুনা’ ছায়াছবির জন্য গানটি যখন আবার রেকর্ড হয় রমেশচন্দ্র তখন পরলোকে এই ছবির সংগী-পরিচালক ছিলেন শ্রীযুক্ত পঙ্কজকুমার মল্লিক, রবীন্দ্রগানের ভুবনে আর এক বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব তবে কণ্ঠদান যেহেতু আমাদের পরম শ্রদ্ধেয়া 'মোহর দি', রবীন্দ্রসংগীতের প্রবাদপ্রতিম কিন্নরী, স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের স্নেহধন্যা কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তখন এ সম্পর্কে নতুন করে কোনো প্রশ্ন স্বাভাবিক ভাবেই জাগবে না জনমানসে কিন্তু ১৯৫৬ থেকে ১৯৭২ - এই ষোলো বছরের কালপর্বে এই নতুন সুরটিতেও যে এক পশলা বিকৃতির প্রলেপ পড়ে গেছে তা কি তাঁরা জানতেন? সিনেমার গানটির পাশে পুরোনো গানটি মিলিয়ে দেখুন-- 'স্থায়ী' তে 'আনন্দধারা' কথার প্রারম্ভিক সুরটাই বদলে গেছে এখানে '৫৬ সালের রেকর্ড অনুসরণে গানটির শুধু স্থায়ী অংশে একটি স্বরলিপি করে দেওয়া গেল

বিকৃতির নজির হিসেবে হয়তো খুব বড় কিছু নয় কিন্তু তবু তো বিকৃতি! একই গায়িকা
, একই গান, অথচ সুরে পরিবর্তন! কার নির্দেশে? এও কি তবে প্রামাণ্য? বিশ্বভারতী নীরব
   বহু বিতর্কিত রবীন্দ্রসংগীত-গায়ক দেবব্রত বিশ্বাস বিশ্বভারতীর সঙ্গে তাঁর সংঘাত-পর্বে মন্তব্য করেছিলেন -
" বর্তমান কালের অথরিটিরা বলে থাকেন আমি ভুল গাই
আমি একলাই কি ভুল গাই? অনেকেই ভুল গান করেন"২৭

         দেখেশুনে সত্যি মনে প্রশ্ন জাগে রবীন্দ্রসংগীতের রেকর্ডে বিশ্বভারতীর ছাড়পত্র দেওয়ার অধিকার নিয়ে বিশিষ্ট রবীন্দ্রসংগীত-শিক্ষিকা তথা গ্রামোফোন কোম্পানীর রবীন্দ্রসংগীত-ধ্বনিমুদ্রিকার নির্দেশক শ্রীমতী মায়া সেন কবার মন্তব্য করেছিলেন-
“একটা রেকর্ড একবার বেরিয়ে গেলে সেটাও কিন্তু authentic হয়ে যায়-- এটা অবশ্যই মনে রাখতে হবে’’
এই কি ‘authenticity’-র নমুনা? কে এর দায় নেবে? এর দায় কেবল একলা বিশ্বভারতীর? এই বিরাট কুকার্যটির নেপথ্যে থাকা প্রত্যেকটি মানুষেরই কি দায় নেই? তাঁরা সকলেই তো কোনো না কোনো ভাবে রবীন্দ্রনাথের উত্তরাধিকার বহন করেছেন প্রফুল্ল কুমার চক্রবর্ত্তী মন্তব্য করেছেন-
“বিশুদ্ধ মালকোষের আনন্দধারা এখন অবশ্য সংশয়মুক্ত।”
    
           কি ভাবে সংশয়মুক্ত? বিশ্বভারতীর স্বীকৃতিই যথেষ্ট?রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের একদা ডিন রমেশচন্দ্রের হাতে শ ‘আনন্দধারা’ নয়  আরো অনেক রবীন্দ্রসংগীতেরই এ জাতীয়  বিকৃতি ঘটেছে রাজেশ্বরী দত্ত, মালতী ঘোষালদের গাওয়া রেকর্ড শুনলেই দেখা যাবে-- ‘এ মোহ আবরণ’, ‘এরা পরকে আপন করে’, ‘পিপাসা হায় নাহি মিটিল’, ‘এ পরবাসের মত গান কীভাবে তানালাপ যুক্ত হয়ে উচ্চাঙ্গ গানের চেহারা নিয়েছেরমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের তত্ত্বাবধানে হওয়া এই সব রেকর্ডও তবে বিশ্বভারতীর ছাড়পত্রের গুণে প্রামাণ্য? অথচ এই জাতীয় পরিবর্তন বা ‘উন্নতিসাধন’(?) নিয়ে রবীন্দ্রনাথের স্পষ্ট মন্তব্য ছিল-
“আমার গান তাঁর ইচ্ছামত ভঙ্গি দিয়ে গেয়ে থাকেন তাতে তাদের স্বরূপ নষ্ট হয় সন্দেহ নেই গায়কের কণ্ঠের উপর রচয়িতার জোর খাটে না, সুতরাং ধৈর্য ধরে থাকা ছাড়া অন্য পথ নেই আজকালকার অনেক রেডিয়ো-গায়কও অহঙ্কার করে বলে থাকেন, তাঁরা আমার গানের উন্নতি করে থাকেন মনে মনে বলি পরের গানের উন্নতি সাধনে প্রতিভার অপব্যয় না করে নিজের গানের রচনায় মন দিলে তাঁরা ধন্য হতে পারেন সংসারে যদি উপদ্রব করতেই হয় তবে হিটলার প্রভৃতির ন্যায় নিজের নামের জোরে করাই ভালো২৯
     
       কার গান? কার সুর? কারই বা নামের জোর? ১৯৮৯ সালে বিশ্বভারতী স্বরলিপি সমিতির তরফে শ্রীযুক্ত জগদীন্দ্র ভৌমিককে সংগীতাচার্য শৈলজারঞ্জন মজুমদার একটি চিঠি দিয়েছিলেন সেই চিঠিতে বলা হয়েছিল,-
“আমার যতদূর মনে পড়ে বিশ্বভারতী মিউজিক বোর্ডের একটা সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল যে যে যে রবীন্দ্রসংগীতের স্বরলিপি প্রকাশিত হয় নি তা রেকর্ড করতে দেওয়া হবে না। সেই অবস্থায় যদি কোনো শিল্পী কোনো রবীন্দ্রসংগীতের রেকর্ড করে থাকেন যার স্বরলিপি আজও প্রকাশিত হয় নি, ও সেই রেকর্ড বিশ্বভারতী মিউজিক বোর্ড কর্ত্তৃক অনুমোদিত হয়ে থাকে, তা সঙ্গত কাজ হয় নি এখন সেই সব গানের সুরান্তর বা পুরো গানের স্বরলিপি সংগ্রহ করে তাদের সেই প্রচেষ্টাকে যদি বৈধ করার চেষ্টা করা হয় তবে তা ঠিক হবে না বলে মনে হয় তাছাড়া যে সকল রবীন্দ্রসংগীতের স্বরলিপি আজও অবধি অপ্রকাশিত বা প্রচারিত হয় নি, সে
সক গানের স্বরলিপি করে শিল্পীরা জমা দিলে সেগুলো নির্ভরযোগ্য বা প্রামাণ্য কিনা তারই বা বিচার হবে কী করে?

   
       প্রসঙ্গত জানাই ৪৫নং স্বরবিতানে প্রকাশিত ও ইন্দিরাদেবী কৃত ‘আনন্দধারা বহিছে ভুবনে’ গানটির স্বরলিপির বহু পূর্বে ১৩০৩ সালে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর সম্পাদিত তত্ত্ববোধিনী পত্রিকায় ঐ গানটির অন্য একটি স্বরলিপি প্রকাশিত হয়েছিল
        আপনারা যখন অপ্রকাশিত স্বরলিপির সন্ধানে আছেন ও তথ্যের খাতিরে সেই স্বরলিপিটির প্রকাশ ও প্রচার বাঞ্ছনীয় বলে মনে করি
 
        অশীতিপর আচার্যের অনুরোধক্রমেই কিনা জানিনা, এই চিঠি লেখার ১৪ বছর পরে বীণাবাদিনী পত্রিকায় প্রকাশিত প্রাচীন স্বরলিপিটি স্বরবিতানভুক্ত হতে পেরেছিল এখানে জানাই, সম্ভবত বয়সের কারণেই শৈলজারঞ্জ এ চিঠিতে পত্রিকার নাম ও স্বরলিপি প্রকাশের বছর ভুল লিখেছিলেন ‘তত্ত্ববোধিনী’ পত্রিকায় কস্মিনকালেও আনন্দধারার কোনো স্বরলিপি প্রকাশ পায় নি কিন্তু এই বক্তব্যের প্রথমাংশ পড়লে আনন্দধারা'র কণিকা-কণ্ঠের ধ্বনিমুদ্রিকাটির অনুমোদন প্রাপ্তি পরবর্তীতে সেই সুরটিকে বৈধ করবার মানসে বিশ্বভারতীর তরফে বিকল্প স্বরলিপির প্রকাশ- এ দুয়েরই যৌক্তিকতা নিয়ে মনে প্রশ্ন জাগবেই তাছাড়া স্বরলিপি সঙ্কলন তো কালক্রম অনুসারে হওয়াটাই বাঞ্ছনীয় রমেশচন্দ্র নির্দেশিত সুরের স্বরলিপিটি বয়ঃকনিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও সেটিকেই প্রধান সুর হিসেবে সর্বাগ্রে স্থান দিয়ে পূর্বতন স্বরলিপি দুটিকেই সুরান্তর হিসেবে পিছনে ঠেলে দেওয়া কি সে দুটির গুরুত্বকে হ্রাস করবারই অপচেষ্টা নয়? ঘটনাচক্রে ইন্দিরা কৃত ‘আনন্দধারা’র স্বরলিপি আর কণিকা-কণ্ঠে ‘আনন্দধারা’র প্রথম ধ্বনিমুদ্রিকা একই বছরে প্রকাশ পেয়েছিল
 
        একদা সতী দেবী তাঁর একটি গান বেশী মীড় দেওয়ার কারণে বাতিল হয়ে যাওয়ায় কবির কাছে অনুযোগ করায় রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন,-
“তোমরা কাছের মানুষ হয়েও যদি আমার কথা না বোঝো তাহলে ভরসা করব কার ওপর?”৩০

         সত্যি কার উপরই বা ভরসা করতেন বা রবীন্দ্রনাথ? আমরা জানি কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় আবাল্য শান্তিনিকেতনের আশ্রমকন্যা। তাঁর পরিবার, পিতা, মাতা রবীন্দ্রনাথেই নিবেদিত ছিলেন। শান্তিনিকেতনের আশ্রম-প্রকৃতির আলো বাতাস আর তাঁর সঙ্গে মিশে থাকা গানকে ভেতরে নিয়েই কণিকার বড় হয়ে ওঠা স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের সস্নেহ আশ্রয়ে। নিজের তত্ত্বাবধানে গান শেখানো, অভিনয় শেখানো সঙ্গে করে গান গাওয়ানো এমন কী একসঙ্গে গাওয়া-- সবই করেছেন রবীন্দ্রনাথ। তাঁর ভালো নামটিও কবিরই দেওয়া। ‘আনন্দধারা’ রেকর্ডের মুহূর্তে কণিকা কি ভুলে গিয়েছিলেন তাঁর গান তাঁরই মত করে গাইবার জন্য দেশের গাইয়েদের প্রতি রবীন্দ্রনাথের অনিঃশেষ আকুতি? তা নইলে রবীন্দ্রনাথের নিজের দেওয়া সুরের দুটি প্রামাণ্য স্বরলিপি (যর একটি কবির জীবদ্দশায় ৪৪ বছর ধরেই প্রচারিত ছিল) থাকা সত্ত্বেও কেন তিনি রমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্দেশনায় একটি উৎস-পরিচয়বিহীন সুরকে রেকর্ডে প্রচার করলেন? দ্বিতীয়বার গাইবার সময় কেনই বা বদলালেন মুখের সুরটুকু? এর দ্বারা উত্তর প্রজন্মকে কণিকা কতখানি বিভ্রান্ত করলেন তা কি তিনি নিজে জানতেন? জনপ্রিয়তা আর ভক্তি এমনই দুটি জিনিস, যা কোনো প্রমাণ, কোনো যুক্তিকে মানে না। কোনো সন্দেহ নেই রবীন্দ্রসংগীতে কণিকা জনপ্রিয়তার শিখর স্পর্শ করেছিলেন। সেখানে তিনি সুচিত্রা মিত্রের নিঃসপত্ন রাজসিকতারই ভাগীদার। তাঁর কণ্ঠের মাদকতা আজও হাজার হাজার রবীন্দ্রমোদিকে মুগ্ধ করে রাখে। আর তিনিই তো প্রথম গানকে রকর্ডে প্রচার করেছিলেন। ফলে জনপ্রিয়তার ভেলায় ভাসতে ভাসতে তাঁর কণ্ঠে গান ইতিহাস হয়ে গেছে। আজ আনন্দধারা বললেই কণিকার কণ্ঠই আমাদের কানে ভেসে আসে। শান্তিনিকেতনে কণিকার বাড়ির নাম আনন্দধারা। জীবনের উপান্ত-বেলায় পৌঁছে লেখা তার আত্মকথার নাম ও আনন্দধারাএখানে বলে রাখা প্রয়োজন, তাঁর কণ্ঠে এ গান নিয়ে কোনোদিনই যে কোনো প্রশ্ন ওঠে নি তা কিন্তু নয়। কিন্তু কী বলেছেন কণিকা সে নিয়ে?-
“অনেককাল আগে বছর চল্লিশ হবে বোধহয়, রেকর্ডে গেয়েছিলাম ‘আনন্দধারা বহিছে ভুবনে’মালকোষ রাগ নির্ভর গান...সে সময় কেউ কেউ সংশয় প্রকাশ করেছিলেন গানটির ওই সুর যথার্থ কিনা তাই নিয়ে। স্বরবিতানে এ গানের সুর মিশ্রমালকোষ। মালকোষ আর মিশ্রমালকোষ নিয়ে বিদগ্ধজনদের তর্ক যদি চলে চলুক সে তর্ক ভেতরে নিলে গান থেমে যাবে আমার

    এই কি উত্তর? মনে রাখতে হবে কণিকা নিজে ছিলেন বিশ্বভারতীর সংগীতভবনের শিক্ষিকা। কী তবে শিখিয়েছিলেন তিনি তাঁর ছাত্রছাত্রীদের? জানিনা। তবে এটা সকলেই আমরা জানি যে কণিকার কণ্ঠে এ গানটি ইতিহাস হওয়ার পরে সাহস করে আর কোনো গাইয়েই জনপ্রিয়তার উল্টো পথে হেঁটে রবীন্দ্রনাথের দেওয়া সুরে এ গানকে প্রতিষ্ঠা দিতে যান নি। সম্ভবত জনতার দরবারে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ভয়ে। ব্যতিক্রম সেকালে প্রখ্যাত গায়ে অশোকতরু বন্দ্যোপাধায় এবং একালের আশিস ভট্টাচার্য দুজনেই কণিকার সতীর্থ। অশোকতরু ইন্দিরাদেবী কৃত স্বরলিপির সুর মোটের ওপর অনুসরণ করে এ গান রেকর্ডেও গেয়েছিলেন। কিন্তু কণিকার বিভায় সে গান বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে গেছে। এছাড়া আর যাঁরাই এ গান গেয়েছেন, সেকাল থেকে একাল অবধি,সকলেই কণিকার প্রদর্শিত পথেই হেঁটেছেন।
       এখানে আর একটি সাক্ষাৎকারের উল্লেখ করব।১৯৯৬ সালে প্রকাশিত বিশ্বভারতীর প্রাক্তন ছাত্রী ক্রিষণা দাসগুপ্তের আমার এই পথ চলাতেই আনন্দ গ্রন্থে মূদ্রিত একটি সাক্ষাৎকারে দেখি যে লেখিকাকে কনিকা জানাচ্ছেন –
                     “আনন্দধারা বহিছে ভুবনে গানটি নিয়ে একসময় অনেক আলোচনা হয়েছিল,এরকম গান যেগুলির দুটি সুর বা ছন্দ আছে সে সব স্বরবিতানে ছাপিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।”
প্রশ্ন হচ্ছে একটি গানে একাধিক সুর বা ছন্দ নিশ্চয় রবীন্দ্র-দত্ত সুর-ছন্দই গণ্য হবে।তাহলে কনিকা কি ইঙ্গিত দিতে চাইলেন?তার কন্ঠে প্রচার পাওয়া সুরটির স্বরবিতানে অন্তর্ভূক্তির পিছনে কি তবে অন্য কোনো প্রভাব ছিল?
         কণিকা আমাদের পরম শ্রদ্ধেয়া। কিন্তু সময় তার এই আত্মবিস্মরণকে ক্ষমা করবে তো?
        এ প্রসঙ্গে একটি কথা আরো জানাই। গত শতাব্দীর সাতের দশকে রবীন্দ্রসংগীতের জনপ্রিয় গায়িকা ঋতু গুহ একটি সাক্ষাকারে জানিয়েছিলেন,-
“মনে আছে ১৯৪৫তেই বোধহয় কাকা ছাদে বসে আনন্দধারা বগিছে ভুবনে গানটি শিখিয়েছিলেন।...তখন ওই গানটির খবর কেউ জানতেন না। মোহরদির রেকর্ডও তখন হয় নি। কাকাই শান্তিনিকেতনে গিয়ে ধুলোমাখা রোল করে পড়ে থাকা তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা ও আনন্দসঙ্গীত থেকে ‘আনন্দধারা বহিছে ভুবনে’ ও জ্যোৎস্নারাতে সবাই গেছে বনে গান দুটি আবিষ্কার করেছিলেন। পরে মোহরদি ঐ গান দুটি রেকর্ড করে কি দারুণ হিট সং করে তুলেছেন সে তো জানোই?৩২
            মোহরদি ঠিক কী গেয়ে হিটসং করেছিলেন? তার সঙ্গে তার কাকার (শুভ গুহঠাকুরতা)আবিষ্কার মেলে কি? এ সম্পর্কে ঋতু কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবেই নীরব।
           এখানে বলি, শৈলজারঞ্জন মজুমদার এবং ঋতু গুহ দুজনেই তত্ত্ববোধিনী পত্রিকার নাম করেছেন। হওয়া উচিত বীণাবাদিনী। আসলে ১৩০০ বঙ্গাব্দে আদি ব্রাহ্মসমাজ মন্দিরে মাঘোৎসবে এই গানটি গীত হওয়ার খবর ওই বছরই ফাল্গুন সংখ্যা তত্ত্ববোধিনীতে প্রকাশিত হয়ছিল। সম্ভবত এটাই এই বিভ্রান্তির কারণ।
এ গানে রমেশচন্দ্র প্রচারিত সুরটি যে কোনোমতেই রবীন্দ্রনাথের হতে পারেনা তার আরএকটি জোরালো প্রমাণ হল রবীন্দ্রনাথের স্বরচিত গানের অন্যতম স্বরলিপিকার সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাক্ষ্য।বিশিষ্ট সঙ্গীতগুনী নিহাররঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতে রবীন্দ্রনাথ প্রবন্ধে জানাচ্ছেন –
“শ্রীযুক্ত  সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয় বলেন যে তিনি দরবারী কানাড়া ও মালকৌশে সুর সংযোজনা করতে চাইতেননা  এবং এই দুটি রাগে কোনো গান রচনা করেননি।হয়তো তার রসবোধের সঙ্গে রাগ দুটির অন্তর্নিহিত ভাবের সামঞ্জস্য ছিলনা তাই।রবীন্দ্রনাথ ছিলেন গীতিকবি-তার সূক্ষসৌন্দর্য চেতনা দরবারী কানাড়া ও মালকৌশের মহাকাব্যীয় গাম্ভীর্য্যের বিপরীতধর্মী হওয়াই স্বাভাবিক।”
রবীন্দ্রনাথ কানাড়ায় লিখেছিলেন বিদায় করেছ যারে কিংবা ঘোরা রজনীর মত গান।কিন্তু একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে যে এগুলিতে কোথাওই বিশুদ্ধভাবে দরবারী কানাড়া বজায় থাকেনি।সুর ইতিউতি সরে গেছে।ঠিক যেভাবে আনন্দধারা গানে সুর বিশুদ্ধ মালকোশ না হয়ে একটা মিশ্ররুপ নিয়েছে।
          এবারে যে গানটির কথা বলব সেটি নিয়ে খুব বেশী কিছু বলবার নেই। তবু রবীন্দ্রজন্মের একশো পঞ্চাশ বছর পূর্তিতে এটি বিশ্বভারতীর একটি অভিনব রবীন্দ্রবন্দনার নিদর্শন।
           আমরা জানি গীতবিতানে এমন অনেক গানই সূচিভুক্ত আছে যেগুলির সুরের উৎস জানা নেই। সুরও পাওয়া যায় নি। কিছু গান আছে যেগুলির সুরের নির্দেশ পাওয়া যায় রাগ-তালের উল্লেখে। এমনই একটি গান ‘আঁধার সকলই দেখি’। ১২৯৩ বঙ্গাব্দের চৈত্রে গানটি মুদ্রিত হয় তত্ববোধিনী পত্রিকায়। রচয়িতার নাম ছিল না। পরে গীতবিতান তৃতীয় খন্ডে পরিশিষ্ট ৪’ বিভাগে গানটি ব্রহ্মসঙ্গীত(মাঘ ১৩৩৮) গ্রন্থ থেকে সঙ্কলিত হয়। এই বিভাগের গানগুলি রবীন্দ্র নামাঙ্কিত কোনো গ্রন্থে বা রচনায় মেলে না। তবে নানা জনের সংগীতসঙ্কলনে বা রচনায় ছড়ানো আছে। এই বিশেষ গানটি অবশ্য রবীন্দ্রনাথের নামেই নানা জায়গায় প্রচারিত।  
      অমিত্রসূদন ভট্টাচার্য সম্পাদিত ‘বিশ্বভারতী’ পত্রিকায় শ্রাবণ-পৌষ,১৪১৭ সংখ্যার দেবাশিস রায় কৃত এ গানের একটি স্বরলিপি প্রকাশিত হয়েছে।ইতিপূর্বে এ গানটির সুরের কোনোই প্রামান্য সন্ধান ছিলনা।গীতবিতানে এর রাগ-তাল নির্দেশিত ছিল “কানাড়া আড়াঠেকা”বিশ্বভারতী পত্রিকা থেকে জানা যাচ্ছে যে দেবাশিস রায়ের করা স্বরলিপিটি প্রস্তুত হয়েছে রাজেশ্বরী দত্তের গাওয়া একটি ক্যাসেটের সুর অবলম্বনে।ক্যাসেটটি বিশ্বভারতী সঙ্গীত সমিতি অনুমোদিত।স্বভাবতই মনে প্রশ্ন জাগে,রাজেশ্বরী দত্ত এই সুর পেলেন কোথা থেকে?রাজেশ্বরী দত্ত শান্তিনিকেতনে এসেছিলেন ১৯৩৮ সালে।শিক্ষা সমাপ্ত করে ১৯৪২ এ ফিরে যান।তাহলে ৫০বছরেরও বেশি আগে লেখা এই গানটির সুর তিনি কার কাছে শিক্ষা করলেন?বিশ্বভারতীর সঙ্গীতগুণীরা তো কেউই এ গানের সুরটি জানতেন না।জানলে কখনোই গীতবিতানে ওভাবে বিষয়টি ছাপা হত না।তাহলে?প্রফুল্ল কুমার চক্রবর্তীর পূর্বোক্ত প্রবন্ধটি থেকে জানতে পারছি যে এ গানেরও সুরের উৎস হলেন রমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়।বহু বৎসর আগে এ গানটি রেকর্ডে গেয়ে প্রচার করেছিলেন রিনি কোনার,রমেশবাবুরই সুরে।পরে ইনি রিনি চৌধুরী হন।সেই রেকর্ডে গানটি অবশ্য রবীন্দ্রসংগীত বলে চিহ্নিত হয়নি।বলা হয়েছিল “ব্রহ্মসঙ্গীত”সম্ভবত বিতর্ক এড়ানোর জন্যই।কিন্তু পরবর্তীকালে সম্ভবত  এ গানের বাণী রবীন্দ্রনাথের হবার কারণেই এটি রবীন্দ্রসংগীত হিসেবেই গাইতে থাকেন অনেকে।এই তালিকায় আছেন রাজেশ্বরী দত্ত, রণো গুহঠাকুরতার মতো বিশিষ্ট শিল্পীরা।বিশ্বভারতী সাউন্ড উইং প্রকাশিত রাজেশ্বরী দত্তের ক্যাসেটটিকে ছাড়পত্রও দেন। এঁদের গাওয়াগুলি পাশাপাশি শুনলে বোঝা যাবে যে সুরের মোচড়ে অল্প-স্বল্প স্বাধীনতা থাকলেও মূল কাঠামোটা সবারই এক। অর্থাৎ মূল উৎসটা অভিন্ন। রমেশবাবুর তত্ত্বাবধানে রাজেশ্বরী দত্ত যে রবীন্দ্সংগীত চর্চা করতেন তা আমরা সকলেই কিন্তু জানি। প্রফুল্ল চক্রবর্ত্তী নিজে ছিলেন রমেশবাবুর ছাত্র। তিনি এ গানটি বহুবার তাঁকে শেখাতে দেখেছিলেন এবং বহুদিন আগে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের রবীন্দ্রসংগীত বিভাগের পত্রিকায় “কানাড়া হেমলতেব তন্বী” নামক একটি প্রবন্ধে এ গানের একটি স্বরলিপিও প্রকাশ করেছিলেন তার সঙ্গে দেবাশিস বাবুর স্বরলিপি হুবহু এক না হলেও কাঠামোগত ঐক্যটা ধরা পড়েই। অথচ বিশ্বভারতী পত্রিকায় নির্বিবাদে ছাপা হয়ে গেল- “কথা ও সুর: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর”দু’দিন পরে হয় তো স্বরবিতানের কোন খণ্ডেও এটি অন্তর্ভূক্ত হবে! নানা কারণে প্রফুল্ল বাবুর করা স্বরলিপিটি এখানে ছাপানো গেলো না। তবু ব্যাপার দেখে শুনে না বলে থাকতে পারছি না – “সত্য সেলুকাস কি বিচিত্র এই দেশ!”
          এখানে প্রফুল্লবাবুর আনন্দধারা সংক্রান্ত একটি বক্তব্য নিয়ে দু’কথা বলব। প্রফুল্লবাবু তাঁর প্রবন্ধে জানিয়েছেন যে আনন্দধারা গানের বিশুদ্ধ  মালকোষের যে সুর রমেশবাবুর সৌজন্যে মেলে তা মূল গানের অনুসারী। অথচ প্রফুল্লকুমার দাসের লেখা রবীন্দ্রসংগীত গবেষণা গ্রন্থমালা’র প্রথম খণ্ড থেকে এর মূল গান লাগি মোরের যে স্বরলিপি বিশ্বভারতী স্বরবিতান ৬৪ তে প্রকাশ করেছেন তার সঙ্গে রমেশবাবুর দেওয়া সুরটি এক নয়। কিন্তু যদি ধরেও নেই যে এ গানে রমেশচন্দ্রের সুরারোপের পিছনে মূলানুগত্যই ছিল প্রধান কারণ, তাহলেও সে ইচ্ছাকেও কোন মতেই রাবীন্দ্রিক বলতে পারব না আমরা। কারণ আমরা জানি রবীন্দ্রনাথ কোনোদিনই রাগ-রাগিণীর দাসত্ব করেন নি। ভাঙা গানের ক্ষেত্রেও অনেক দৃষ্টান্ত মেলে যেখানে দেখেছি মূলের থেকে রাগ-তাল-- দুয়ের প্রশ্নেই কবি লক্ষণীয় স্বাতন্ত্র বজায় রেখেছেন। ভৈরবী সুরের কিণ্হে দেখা কানহাইয়া ভেঙে করেছেন কখন দিলে পরায়ে, সুর বদলে গেছে পিলু-বারোঁয়ায়। ১২ মাত্রার চৌতালে বাঁধা ইন্দ্রহুঁ কী আশয়ারি ভেঙে করেছেন ১৬ মাত্রার ত্রিতালের গান গহন ঘন ছাইল
        আমরা ভুল করি। ভুলের সংশোধনও করি। বিশ্বভারতী কী তা করবেন না? গীতবিতান তৃতীয় খণ্ডের গ্রন্থপরিচয়ে রবীন্দ্র-বাণীতে অন্যের সুরারোপের মাত্র ৫ টি দৃষ্টান্ত দিয়ে তাঁরা দায় সেরেছেন। কিন্তু তাঁদের অনবধানতা আর ইচ্ছাকৃত শৈথিল্যের ফলে এভাবে কত গানে যে ছোট বড় নানা মাত্রায় অন্যের সুর ছড়িয়ে গিয়েছে, তার কি হিসেব আছে কোনো?

উল্লেখসূত্র
) গ্রন্থপরিচয়ঃ গীতবিতান(অখন্ড), বিশ্বভারতী
) রবীন্দ্রসংগীত বিচিত্রা; শান্তিদেব ঘোষ; আনন্দ পাঃ
৩) রবীন্দ্রসঙ্গীতঃ রবীন্দ্রনাথঃ শিক্ষক দিনেন্দ্রনাথ; কিরনশশী দে; দে'জ পাঃ
৪) রেকর্ডে রবীন্দ্রসংগীত, সিদ্ধার্থ ঘোষ; ইন্দিরা
৫) রবীন্দ্রসঙ্গীতের প্রামান্য সুর, কিরনশশী দে, দে'জ পাঃ
৬) 'তোমায় নতুন করে পাব বলে', অমিতাভ ঘোষ, অরুপরতন প্রকাশনী
৭) তদেব
8) তদেব
৯) রবীন্দ্রসংগীত চিন্তা; শৈলজারঞ্জন মজুমদার, পঃবঃ রাজ্য সংগীত একাডেমি
১০) তদেব
১১)তদেব
১২)তদেব
১৩)তদেব
১৪) রেকর্ডে রবীন্দ্রসংগীত, সিদ্ধার্থ ঘোষ, ইন্দিরা
১৫) রবীন্দ্রসংগীতঃ ঐতিহ্যের সংকট, বন্দনা দে, বাংলা বই, পঃ বঃ বাংলা একাডেমি
১৬) রবীন্দ্রসংগীত, শান্তিদেব ঘোষ, বিশ্বভারতী
১৭) গীতবিতান কালানুক্রমিক সূচি, প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যয়
১৮) স্বরবিতান ৬৪, বিশ্বভারতী
১৯)রবীন্দ্রসঙ্গীত মহাকোষ; প্রবীর গুহঠাকুর, দে'জ পাঃ
২০) সংগীতচিন্তা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর; বিশ্বভারতী
২১) চিঠিপত্র ৫, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিশ্বভারতী
২২) স্বরবিতান ৬৪, বিশ্বভারতী
২৩) তবলার ইতিবৃত্ত, শম্ভুনাথ ঘোষ
২৪) স্বরবিতান ৬৪, বিশ্বভারতী
২৫) রবীন্দ্রসংগীত বিচিত্রা; শান্তিদেব ঘোষ; আনন্দ পাঃ
২৬) গীতবিতানের একটি গান; প্রফুল্ল কুমার চক্রবর্তী; ''রম্যবীনা'' গোষ্ঠীর স্মারক ক্রোড়পত্র, ২০০৭
২৭) ব্রাত্যজনের রূদ্ধসংগীত, দেবদ্রত বিশ্বাস, করুণা
২৮) জর্জ বিশ্বাস, বিবেক গুহ ও চন্দন দাশশর্মা(সম্পাঃ), এ মুখার্জি অ্যাণ্ড কোং, প্রাঃ লিঃ
২৯) রবীন্দ্রসংগীত চিন্তা, শৈলজারঞ্জণ মজুমদার, পঃ বঃ রাজ্য সংগীত একাডেমি
৩০) সুরের আগুণ, সন্ধ্যা সেন, দে'
৩১) আনন্দধারা, কণিকাবন্দ্যোপাধ্যায়, আজকাল
৩২) সুরের আগুণ, সন্ধ্যা সেন,দে'

বিশেষ কৃতজ্ঞতা
শৈলজারঞ্জণ মজুমদারের চিঠিটি মাননীয় শ্রী সুভাষ চৌধুরীর সৌজন্যে প্রাপ্ত এ ছাড়াও আরও অজানা তথ্য ও দুষ্প্রাপ্য পত্রিকার সন্ধান দিয়ে তিনি বর্তমান প্রবন্ধ লেখককে অশেষ কৃতজ্ঞতাপাশে বেঁধেছেন

কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রেকর্ড ও ক্যাসেট থেকে দুটি স্বরলিপি প্রস্তুত করে দিয়েছেন গীতবিতান সংগীত শিক্ষায়তনের প্রাক্তনী শ্রীমতী সোমা বসু তাঁকেও অনেক ধন্যবাদ

1 comment:

  1. একটি তথ্যসমৃদ্ধ, গবেষণাধর্মী রচনা। কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় কর্তৃক গীত "আনন্দধারা বহিছে ভুবনে" গানটির সুরবিকৃতির ইতিহাস যথাযথভাবে বিশ্লেষিত হয়েছে লেখকের কলমে। প্রয়োজনীয় তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করে তার ভিত্তিতে এরকম একটি রচনা গড়ে তোলা প্রশ্নাতীতভাবেই একটি শ্রমসাধ্য উদ্যোগ। কিন্তু এতকিছুর পরেও সমগ্র রচনা জুড়ে সংখ্যাতীত মুদ্রণ প্রমাদ এবং অশুদ্ধ বানানের উপস্থিতি পাঠকের মননকে পীড়িত করে। বানান-বিষয়ে পত্রিকা কর্তৃপক্ষের আরও সতর্ক ও যত্নবান হওয়া কাম্য।

    ReplyDelete